• ই-পেপার

কোরআনের বাণী

কোরআন ও হাদিসের বিশ্লেষণে জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ

বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’
সংগৃহীত ছবি

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে, আলজেরিয়ার রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এক বিস্ময়—‘জামিউল জাজাইর’। ইসলামের সৌন্দর্য, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই বিশাল মসজিদ আজ শুধু আলজেরিয়ার নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গর্বের প্রতীক। চার লাখ বর্গমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই মহাপরিকল্পনা মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং আফ্রিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।

যে ভূমিতে আজ ইসলামের এই মহিমান্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে সেই এলাকাকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল লাভিজেরির নামে নামকরণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ইসলামী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল মাজিদ তেব্বুন আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। 

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
জামিউল জাজাইরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ২৩৫ মিটার (প্রায় ৮৬৯ ফুট) উচ্চতার মিনার, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজানের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর ভেতরে রয়েছে— ইসলামি সভ্যতা জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক গ্রন্থাগার, পর্যটকদের জন্য অবজারভেশন ডেক ও রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক সুবিধা। মিনারের উপরের তলা থেকে পুরো আলজিয়ার্স শহর এবং ভূমধ্যসাগরের অপূর্ব দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়। রাতের বেলায় এটি সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য বাতিঘরের ভূমিকাও পালন করে।

লাখো মুসল্লির ইবাদতের কেন্দ্র
মসজিদের মূল নামাজঘরে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশাল চত্বর ও বহিরাঙ্গনসহ মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের। ২২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নামাজঘরের উপরে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল গম্বুজ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে কোরআনের আয়াত ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ ও প্রাকৃতিক মুক্তা দিয়ে নির্মিত। 

ভয়াবহ ভূমিকম্পেও নিরাপদ
আলজিয়ার্স অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় মসজিদটির নিচে বসানো হয়েছে শত শত আধুনিক সিসমিক আইসোলেটর ও ড্যাম্পার। এই প্রযুক্তি ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্যভাবে শোষণ করে ভবনকে নিরাপদ রাখে। ফলে এটি আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন
মসজিদ কমপ্লেক্সের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর ইসলামিক বাগান। এখানে কোরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন বৃক্ষ যেমন— ত্বীন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম, সুগন্ধি লেবু, জুঁই ফুল রোপণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের মাটি থেকে আনা অলিভ গাছও এখানে স্থান পেয়েছে।

স্বর্ণখচিত বিশাল ঝাড়বাতি
মসজিদের কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতিগুলোর অন্যতম। ১৩.৫ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৯.৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে আবৃত। এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিন লক্ষাধিক স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল, যা আলো প্রতিফলিত করে পুরো নামাজঘরকে অপূর্ব আভায় আলোকিত করে তোলে।

জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
জামিউল জাজাইর শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে রয়েছে— দারুল কোরআন, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ১০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হল, আধুনিক ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা। এসব সুবিধা ইসলামের জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর ইতিহাস, স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামি সভ্যতার এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহান স্থাপনাটি যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জ্ঞান, সৌন্দর্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। 

হাদিসের বাণী

যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন
সংগৃহীত ছবি

আবু কাবশাহ আমর ইবনে সাদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, মহানবী (সা.) বলেন, আমি তিনটি বিষয়ে তোমাদের জন্য কসম করছি। আর তোমাদের কাছে একটি হাদিস বর্ণনা করব, তা তোমরা সংরক্ষণ করে রাখবে, ১. কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করলে তার সম্পদ কমে যায় না। ২. কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে, সে তাতে সবর করলে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজাকে খোলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যও দরিদ্রতার দরজাকে খুলে দেন। অথবা তিনি এমন কোনো শব্দ বলেছেন।

আর তোমাদেরকে একটি হাদিস বর্ণনা করব, সেটা সংরক্ষণ রাখো। তিনি বললেন, দুনিয়াতে চার ধরনের লোক আছে, ১. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম দান করেছেন, আর সে আল্লাহকে ভয় করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, আর এতে যে আল্লাহর হক রয়েছে তা সে জানে-(ও সে অনুযায়ী কাজ করে।) তাহলে সে আল্লাহর কাছে উত্তম স্থানে থাকবে। ২. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, কিন্তু সম্পদ দান করেননি। কিন্তু সে সত্য নিয়তে বলে-অমুকের মতো যদি আমারও সম্পদ থাকত, তাহলে আমি অমুকের মতো ভালো কাজ করতাম। ফলে সেও নিয়ত অনুযায়ী সাওয়াব পাবে। আর তাদের দুজনের (দানকারী ও একনিষ্টভাবে দানকরার ইচ্ছাকারী) সাওয়াবও সমান হবে। ৩. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা তাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু তার কোনো ইলম নেই; ফলে সে অবৈধ পন্থায় সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহকে ভয় করে না ও আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে না; ও তার সম্পদে কী হক আছে, তা সে জানে না। (আদায় করে না।)-সে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান থাকবে। ৪. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম কোনো কিছুই দান করেননি; কিন্তু সে বলে, যদি আমার নিকট মাল থাকত, তাহলে আমিও অমুকের মতো আমল করতাম। ফলে তার স্থান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। সুতরাং তাদের উভয়ের গুনাহ হবে সমান। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৮০৩১)

শিক্ষা ও বিধান 
১. সদকা করলে সম্পদ কমে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) কসম করে বলেছেন, সদকা করার কারণে সম্পদ কমে না। বাহ্যিকভাবে কিছু অর্থ খরচ হলেও আল্লাহ তাআলা বরকত, কল্যাণ ও প্রতিদানের মাধ্যমে তা পূরণ করে দেন।
২. জুলুমের শিকার হয়ে সবর করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কেউ অন্যায় করলে প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করা সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ।
৩. ভিক্ষাবৃত্তি দারিদ্র্যের কারণ। অপ্রয়োজনে মানুষের কাছে হাত পাতার অভ্যাস মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে এবং দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম কর্ম ও আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে।
৪. ইলম ও সম্পদের সমন্বয় সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি সম্পদ ও দ্বীনি জ্ঞান উভয়ই পেয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করে, সে সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী।
৫. তাকওয়া সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মূল ভিত্তি। সম্পদ থাকলেই সেটা কল্যাণকর হয় না; বরং তাকওয়া থাকলে সম্পদ কল্যাণের মাধ্যম হয়, আর তাকওয়া না থাকলে তা ধ্বংসের কারণ হয়।
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তাই হাদিসে উত্তম বান্দার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার কথা বলা হয়েছে।
৭. সম্পদে আল্লাহর হক রয়েছে। জাকাত, সদকা, আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা, অসহায়দের সাহায্য—এসব সম্পদের হক। এগুলো আদায় করা মুমিনের দায়িত্ব।
৮. নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য না থাকলে আল্লাহ তাআলা সেই নিয়তের কারণে পূর্ণ সাওয়াব দান করেন।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, বরং তাকওয়া, ইলম, সৎ নিয়ত ও নেক আমলে। সদকা সম্পদকে বরকতময় করে, সবর সম্মান বৃদ্ধি করে এবং সৎ নিয়ত মানুষকে বড় সাওয়াবের অধিকারী বানায়। অন্যদিকে ইলমহীন সম্পদ ও অসৎ নিয়ত মানুষকে আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত ইলম অর্জন করা, সম্পদের হক আদায় করা, সৎ নিয়ত রাখা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা।

মহররম মাসে যেসব কাজ বর্জনীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
মহররম মাসে যেসব কাজ বর্জনীয়
সংগৃহীত ছবি

মহররম ইসলামী বছরের প্রথম মাস এবং আল্লাহ তাআলার নিকট মর্যাদাপূর্ণ চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এ মাস ইবাদত, তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যুগে যুগে কিছু মানুষ এ মাসের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মহররমের বরকত ও শিক্ষার পরিবর্তে সমাজে বিভ্রান্তি, বাড়াবাড়ি ও ধর্মীয় অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে।

ইসলাম আমাদেরকে প্রত্যেক আমল কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে করার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)  যে পথ দেখিয়েছেন, সেটিই হলো মুক্তি ও সফলতার পথ। তাই মহররম মাসের ফজিলত অর্জন করতে হলে যেমন কিছু আমল পালন করা জরুরি, তেমনি কিছু ভুল ও বর্জনীয় কাজ থেকেও দূরে থাকা আবশ্যক। আসুন, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মহররম মাসে প্রচলিত কয়েকটি বর্জনীয় আমল সম্পর্কে জানি।

১. আশুরাকে শোক ও মাতমের দিবস বানানো
অনেক মানুষ আশুরার দিনকে শুধু শোক, বিলাপ ও মাতমের দিন হিসেবে পালন করে। অথচ ইসলাম কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থায়ী শোক দিবস পালনকে সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ

‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মতো বিলাপ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩)
অতএব আশুরাকে শোক ও বিলাপের দিবস বানানো সুন্নাহসম্মত নয়।

২. নিজের শরীরে আঘাত করা ও রক্ত ঝরানো
কিছু সম্প্রদায় আশুরার দিনে নিজেদের শরীরে আঘাত করে, শিকল বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত করে এবং এটিকে ইবাদত বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মনে করে। কিন্তু ইসলাম স্পষ্টভাবে আত্মনির্যাতন নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

 وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস কর না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

 وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
অতএব নিজেকে আঘাত করা, রক্ত ঝরানো বা শারীরিক কষ্ট দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।

৩. বিদআত ও মনগড়া ইবাদত চালু করা
অনেক স্থানে মহররম উপলক্ষে বিশেষ নামাজ, বিশেষ জিকির, নির্দিষ্ট রাকাতের সালাত বা বিশেষ অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় আমল হিসেবে প্রচার করা হয়; অথচ এগুলোর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

 مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন চালু করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭)
সুতরাং দ্বিনের নামে নতুন নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৪. বিশেষ খাবার রান্না আবশ্যক মনে করা
কিছু অঞ্চলে আশুরার দিনে বিশেষ খাবার, খিচুড়ি বা নির্দিষ্ট খাদ্য প্রস্তুত করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করা হয়। বাস্তবে কোরআন বা সহিহ হাদিসে আশুরার দিন বিশেষ কোনো খাবার রান্না করাকে ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত করা হয়নি। কেউ সাধারণ দান-সদকার উদ্দেশ্যে খাবার বিতরণ করলে তা সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু এটিকে সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতি মনে করা সঠিক নয়।

৫. ভিত্তিহীন ফজিলতের গল্প ও জাল হাদিস প্রচার করা
মহররম মাস এলেই অনেক মনগড়া ঘটনা, জাল হাদিস ও ভিত্তিহীন ফজিলতের বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

 مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৭)
তাই কোনো বর্ণনা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

৬. হারাম মাসের মর্যাদা নষ্ট করে গুনাহে লিপ্ত হওয়া
মহররম যেহেতু হারাম মাস, তাই এ মাসে গুনাহ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ

‘সুতরাং তোমরা এসব সম্মানিত মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে হারাম মাসগুলোতে পাপ থেকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

মহররম মাস আমাদের জন্য শোক, কুসংস্কার বা বিদআতের মাস নয়; বরং এটি তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, তওবা ও ইবাদতের মাস। একজন সচেতন মুমিন কখনো আবেগ, অন্ধ অনুসরণ বা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির ভিত্তিতে দ্বীনের আমল নির্ধারণ করেন না; বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন।

তাই আসুন, আমরা মহররম মাসে সব ধরনের বিদআত, কুসংস্কার, মাতম, আত্মনির্যাতন ও ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো বিশুদ্ধ আমলের মাধ্যমে এ মাসের বরকত অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ এবং তার অনুসরণ করার, আর অসত্যকে অসত্য হিসেবে চিনে তা থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মহররম মাসে মুমিনের করণীয় বিশেষ ১০ আমল

মুফতি ওমর বিন নাছির
মহররম মাসে মুমিনের করণীয় বিশেষ ১০ আমল
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে কল্যাণময় করার জন্য কিছু সময়, স্থান ও আমলকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মহররম মাস তেমনই এক মহিমান্বিত মাস। এটি ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং আল্লাহর নিকট সম্মানিত চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এই মাস আমাদের নতুনভাবে আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এনে দেয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষ মহররমকে শুধু আশুরার শোক বা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মাস হলো ইবাদত, তওবা, নফল রোজা, দান-সদকা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সময়। একজন সচেতন মুমিনের উচিত এই মাসের ফজিলত উপলব্ধি করে নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা।

১. মহররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করা
মহররম মাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং এ মাসকে সম্মান করা একজন মুমিনের প্রথম করণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (হারাম) মাস।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
মহররম সেই চারটি হারাম মাসের অন্যতম। তাই এ মাসে পাপ থেকে বিশেষভাবে বেঁচে থাকা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. আন্তরিক তওবা ও আত্মসমালোচনা করা
হিজরি বছরের সূচনা আত্মসমালোচনা ও নতুনভাবে জীবন গঠনের এক উত্তম সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
মহররম মাসে একজন মুমিন বিগত বছরের ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে তওবা করা এবং নতুন বছরকে নেক আমলের মাধ্যমে শুরু করা জরুরি।

৩. অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা
রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
তাই এ মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব।

৪. আশুরার রোজা পালন করা
মহররমের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
আর ইহুদিদের বিরোধিতা করার জন্য রাসুল (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।

৫. বেশি বেশি নফল ইবাদত ও জিকির করা
মহররম মাসে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, দোয়া ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
এ মাসে প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে ব্যয় করলে ঈমান মজবুত হয় এবং অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।

৬. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা
মহররম মাসে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১০)
আর দান-সদকা মানুষের বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

৭. হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা
হারাম মাসে গুনাহের ভয়াবহতা আরো বেশি। তাই এ মাসে পাপ কাজ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা ও সকল ধরনের অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা এসব (সম্মানিত) মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সব সময়ই গুনাহ নিষিদ্ধ; তবে হারাম মাসগুলোতে গুনাহের ভয়াবহতা আরো গুরুতর।


৮. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা তার উপর আমল করা
নতুন হিজরি বছরের শুরুতে কোরআনের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা অত্যন্ত উত্তম আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
মহররম মাসে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অধ্যয়ন এবং জীবনে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।

৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) সুদৃঢ় করা
আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, সম্পর্কের অবনতি দূর করা এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি ও হায়াতের বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
নতুন বছরের শুরুতে আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনর্গঠন একটি সুন্দর ও বরকতময় উদ্যোগ হতে পারে।

১০. ইসলামের ইতিহাস ও আশুরার শিক্ষাগুলো অধ্যয়ন করা
মহররম মাস ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। বিশেষত আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটি এমন এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)
এ ছাড়াও মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা থেকে ঈমান, সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা, ত্যাগ ও ধৈর্যের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।


মহররম মাস নতুন বছরের সূচনা হলেও একজন মুমিনের জন্য এটি শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি নতুন বছর আমাদেরকে আখিরাতের আরো নিকটবর্তী করছে।

অতএব, আসুন আমরা মহররম মাসকে গুনাহ, গাফেলতি ও কুসংস্কারে নষ্ট না করে তওবা, নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা এবং নেক আমলের মাধ্যমে সার্থক করে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহররমের বরকতপূর্ণ দিনগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন এবং আমাদের জীবনকে তাকওয়া ও নেক আমলে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

কোরআন ও হাদিসের বিশ্লেষণে জুমার দিনের শ্রেষ্ঠত্বের বিবরণ | কালের কণ্ঠ