ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে, আলজেরিয়ার রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এক বিস্ময়—‘জামিউল জাজাইর’। ইসলামের সৌন্দর্য, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই বিশাল মসজিদ আজ শুধু আলজেরিয়ার নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গর্বের প্রতীক। চার লাখ বর্গমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই মহাপরিকল্পনা মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং আফ্রিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।
যে ভূমিতে আজ ইসলামের এই মহিমান্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে সেই এলাকাকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল লাভিজেরির নামে নামকরণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ইসলামী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল মাজিদ তেব্বুন আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
জামিউল জাজাইরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ২৩৫ মিটার (প্রায় ৮৬৯ ফুট) উচ্চতার মিনার, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজানের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর ভেতরে রয়েছে— ইসলামি সভ্যতা জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক গ্রন্থাগার, পর্যটকদের জন্য অবজারভেশন ডেক ও রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক সুবিধা। মিনারের উপরের তলা থেকে পুরো আলজিয়ার্স শহর এবং ভূমধ্যসাগরের অপূর্ব দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়। রাতের বেলায় এটি সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য বাতিঘরের ভূমিকাও পালন করে।
লাখো মুসল্লির ইবাদতের কেন্দ্র
মসজিদের মূল নামাজঘরে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশাল চত্বর ও বহিরাঙ্গনসহ মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের। ২২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নামাজঘরের উপরে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল গম্বুজ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে কোরআনের আয়াত ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ ও প্রাকৃতিক মুক্তা দিয়ে নির্মিত।
ভয়াবহ ভূমিকম্পেও নিরাপদ
আলজিয়ার্স অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় মসজিদটির নিচে বসানো হয়েছে শত শত আধুনিক সিসমিক আইসোলেটর ও ড্যাম্পার। এই প্রযুক্তি ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্যভাবে শোষণ করে ভবনকে নিরাপদ রাখে। ফলে এটি আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন
মসজিদ কমপ্লেক্সের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর ইসলামিক বাগান। এখানে কোরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন বৃক্ষ যেমন— ত্বীন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম, সুগন্ধি লেবু, জুঁই ফুল রোপণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের মাটি থেকে আনা অলিভ গাছও এখানে স্থান পেয়েছে।
স্বর্ণখচিত বিশাল ঝাড়বাতি
মসজিদের কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতিগুলোর অন্যতম। ১৩.৫ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৯.৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে আবৃত। এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিন লক্ষাধিক স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল, যা আলো প্রতিফলিত করে পুরো নামাজঘরকে অপূর্ব আভায় আলোকিত করে তোলে।
জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
জামিউল জাজাইর শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে রয়েছে— দারুল কোরআন, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ১০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হল, আধুনিক ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা। এসব সুবিধা ইসলামের জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর ইতিহাস, স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামি সভ্যতার এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহান স্থাপনাটি যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জ্ঞান, সৌন্দর্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা।




