• ই-পেপার

এক নজরে হজ: যেসব কাজ হাজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ

জুমার দিন সুরা কাহাফ মিস হলে করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
জুমার দিন সুরা কাহাফ মিস হলে করণীয়
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলা মানুষের হেদায়াতের জন্য পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। কোরআনের প্রতিটি সুরা, প্রতিটি আয়াতই মুমিনের জন্য রহমত, নুর ও কল্যাণের উৎস। তবে কিছু সুরা বিশেষ সময়ে তেলাওয়াত করার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হলো সুরা আল-কাহাফ, যা জুমার দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথের দিশা দেয়, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক মুসলিম ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কখনো ভুলে যান, কখনো কর্মব্যস্ততার কারণে জুমার দিনে সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করতে পারেন না। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—মাগরিবের পরে পড়লে কি একই ফজিলত পাওয়া যাবে? অথবা মিস হয়ে গেলে করণীয় কী?

জুমার দিনে সুরা কাহাফ তেলাওয়াতের ফজিলত
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর বিকশিত থাকবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৩৩৯২)
তাই সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা একটি মহানবী (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ ও অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল।

‘জুমার দিন’ বলতে কোন সময়কে বোঝায়?
 প্রসিদ্ধ একটি মত অনুযায়ী অনেক ফকিহ ও মুহাদ্দিসিনে কেরাম বলেন, বৃহস্পতিবার মাগরিব-শুক্রবার মাগরিব-এই পুরো সময়ই জুমার দিনের অন্তর্ভুক্ত। এ মত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাতেও সুরা কাহাফ পড়লে ইনশাআল্লাহ ফজিলত পাওয়ার আশা করা যায়।

একটি বিষয়ে সকলেই একমত যে, শুক্রবার সূর্যাস্ত (মাগরিব)-এর পর জুমার দিনের নির্দিষ্ট সময় শেষ হয়ে যায়। তাই মাগরিবের পর সুরা কাহাফ পড়লে কোরআন তেলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব অবশ্যই হবে, কিন্তু জুমার দিনের নির্দিষ্ট ফজিলত আর প্রযোজ্য হবে না।

যদি জুমার দিনে সুরা কাহাফ পড়া মিস হয়ে যায়
এখানে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ—সুরা কাহাফ পড়া ফরজ নয়, ওয়াজিবও নয়। এটি একটি মুস্তাহাব সুন্নাহ আমল। অতএব, ভুলে গেলে গুনাহ হবে না। ব্যস্ততার কারণে পড়তে না পারলেও পাপ হবে না। পরে যেকোনো সময় কোরআনের অংশ হিসেবে তেলাওয়াত করলে কোরআন তেলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব পাওয়া যাবে।

মিস না করার সহজ উপায়
সুরা কাহাফ নিয়মিত পড়ার জন্য কয়েকটি অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে—
১. বৃহস্পতিবার রাতেই প্রস্তুতি নেওয়া
২. শুক্রবার ফজরের পরপরই তেলাওয়াত করা
৩. মোবাইলে রিমাইন্ডার সেট করা
৪. পরিবারসহ একসঙ্গে তেলাওয়াতের অভ্যাস করা। অর্থ ও তাফসিরসহ পড়ার চেষ্টা করা। এভাবে আমলটি নিয়মিত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

অতএব, সুরা কাহাফ তেলাওয়াত জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ আমল। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছু মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ আলেম একে একটি উৎসাহিত ও আমলযোগ্য সুন্নাহ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

জুমার দিনের সময়সীমা নিয়েও ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার মাগরিব পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আবার কেউ শুক্রবার ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়কেই নির্ধারিত বলেছেন। তবে সবাই একমত যে, শুক্রবার মাগরিবের পর এই বিশেষ ফজিলতের সময় শেষ হয়ে যায়।

তাই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম পন্থা হলো শুক্রবার ফজরের পর থেকে মাগরিবের আগেই সুরা কাহাফ তেলাওয়াত সম্পন্ন করা। আর যদি কোনো কারণে মিস হয়ে যায়, তবে হতাশ না হয়ে অন্য সময় কোরআনের অংশ হিসেবে তা তেলাওয়াত করা উচিত। কারণ আল্লাহ তাআলার কিতাবের প্রতিটি অক্ষরই মুমিনের জন্য নূর, রহমত ও অশেষ সওয়াবের উৎস।

সততার পুরস্কার কি কখনো কখনো শাস্তি হয়ে আসে?

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
সততার পুরস্কার কি কখনো কখনো শাস্তি হয়ে আসে?
সংগৃহীত ছবি

মনুষ্য সমাজের একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো সৎ মানুষ অনেক সময় বঞ্চিত হয়, আর অসৎ মানুষ সুবিধা পেয়ে যায়। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, রাজনীতি, এমনকি পারিবারিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়—সত্য কথা বলা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা বা দুর্নীতির বিরোধিতা করার কারণে কেউ কেউ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কখনো আবার (চাকরির ক্ষেত্রে) চাকরিচ্যুতি কিংবা শাস্তিমূলক বদলির শিকার হয়। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? এ ব্যাপারে কোরআন-হাদিসেই বা কী আছে?

এর উত্তরে প্রথমত বলতে হবে, দুনিয়া মুমিনের জন্য পরীক্ষাগার। কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করেন যে সৎভাবে চলতে গিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েও কারা কারা সত্য ও ন্যায়ের পথে অটল থাকতে পারে? পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “মানুষ কি মনে করে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?” (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২) 

কোনো ঈমানদার ও ভদ্র মানুষের ওপর বিপদ এলে আমরা অনেক সময় ভাবি, লোকটা এত সৎ মানুষ, তার ওপর বিপদ আসে কেন? তার বিরোধী কপট শ্রেণির মানুষরাতো অপবাদ দিয়ে বসে যে তার গোপন বদ আমলের কারণে তার ওপর বিপদ আসছে। অথচ বিষয়টা সব ক্ষেত্রে এমন নাও হতে পারে। 

আল্লাহর ঈমানদার বান্দাদেরও আল্লাহ পরীক্ষা করেন। এমনকি আল্লাহর বিশেষ বান্দা নবী-রাসুলরাও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। মুসআব ইবনে সাআদ (রহ.) তাঁর বাবার সূত্রে বর্ণনা করেন, তাঁর বাবা সাআদ (রা.) বলেন, একদিন আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করলাম, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! মানুষের মধ্যে কার বিপদের পরীক্ষা সবচেয়ে কঠিন হয়?’ তিনি বলেন, ‘নবীদের বিপদের পরীক্ষা, তারপর যারা নেককার তাদের, এরপর যারা নেককার তাদের বিপদের পরীক্ষা।’ মানুষকে তার ধর্মানুরাগের অনুপাত অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। তুলনামূলকভাবে যে লোক বেশি ধার্মিক তার পরীক্ষাও সে অনুপাতে কঠিন হয়ে থাকে। আর যদি কেউ তার দ্বিনের ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে থাকে তাহলে তাকে সে মোতাবেক পরীক্ষা করা হয়। অতএব, বান্দার ওপর বিপদ-আপদ লেগেই থাকে, অবশেষে তা তাকে এমন অবস্থায় ছেড়ে দেয় যে সে জমিনে চলাফেরা করে অথচ তার কোনো গুনাহই থাকে না। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৯৮)

সুতরাং সততার কারণে কষ্ট পাওয়া সব সময় ব্যর্থতার লক্ষণ নয়; বরং এটি ঈমান ও চরিত্রের পরীক্ষার অংশও হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অসৎ লোকেরা অনেক সময় ক্ষমতাবানদের স্বার্থ রক্ষা করে। যে ব্যক্তি অন্যায়কে সমর্থন করে, তোষামোদ করে বা সত্য গোপন করে, তাকে কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে পছন্দ করাটা স্বাভাবিক। কারণ সে তাদের ভুলের প্রতিবাদ করবে না। পক্ষান্তরে সৎ ব্যক্তি অকপটে সত্য কথা বলে দেয়, নির্দ্বিধায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়; ফলে সে অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু কর্তাব্যক্তি কিংবা সহকর্মীরা সৎ লোকদের বশে রাখতে চায়, বেআইনি কাজে সহযোগী বানাতে চায়, তা না পারলেই তাদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহ তাঁর হাবিবকে এ ধরনের লোকের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন, তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তারা কামনা করে, যদি তুমি আপসকামী হও, তবে তারাও আপসকারী হবে।’ (সুরা : কলম, আয়াত : ৯)

অর্থাৎ অন্যায়কারীরা বরাবরই চায় যে সত্যবাদী মানুষ তার নীতিতে ছাড় দিক। যখন সে তা করে না, তখন তাকে চাপের মুখে ফেলা হয়। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়। বিভিন্ন দিক থেকে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়।

তবে বাস্তবতা হলো কখনো কখনো বাহ্যিকভাবে সৎ মানুষদের ক্ষতিগ্রস্ত আর অসৎ মানুষদের জয়যুক্ত মনে হলেও তারা আল্লাহর দরবারে হেরে যায়। তাদের পরকাল ধ্বংস হয়ে যায়। এর বিপরীতে যারা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সততার ওপর অটল থাকে, মহান আল্লাহ তাদের কোনো না কোনোভাবে এর প্রতিদান দিয়ে দেন। যেমন—ইউসুফ (আ.)-কে কূপ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এক সময় রাজত্বের আসনে বসিয়ে দেন। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এমনিভাবে আমি ইউসুফকে জমিনে কর্তৃত্ব প্রদান করেছি, সে তার যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমত দান করি, আর আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৬)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দুনিয়ার লাভ-লোকসানই শেষ বিচার নয়; আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচারের দিন রয়েছে। সৎ মানুষের দায়িত্ব হলো হতাশ না হয়ে সত্য, ন্যায় ও আমানতের পথে অটল থাকা। ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ এর প্রতিদান দুনিয়া ও আখিরাতে দেবেন।

ইসলামে আত্মশুদ্ধি ও আত্মউন্নয়নের ১০ উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামে আত্মশুদ্ধি ও আত্মউন্নয়নের ১০ উপায়
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা বাহ্যিক সৌন্দর্য, সম্পদ বা ক্ষমতার মধ্যে নয়; বরং অন্তরের পবিত্রতা ও আত্মার পরিশুদ্ধতার মধ্যেই নিহিত। মানুষ যতই পার্থিব উন্নতির শিখরে আরোহণ করুক না কেন, যদি তার হৃদয় কলুষিত হয়, তবে সে প্রকৃত শান্তি ও মুক্তি লাভ করতে পারে না। ইসলাম মানুষের বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি অন্তরের সংশোধন ও আত্মশুদ্ধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কারণ একটি পরিশুদ্ধ আত্মাই মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য, দুনিয়ার প্রশান্তি এবং আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতার পথে পরিচালিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

  قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا ۝ وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا

অর্থ্যাৎ : ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা : শামস, আয়াত : ৯-১০)
তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো আত্মশুদ্ধির উপায়গুলো জানা এবং সেগুলো বাস্তব জীবনে অনুসরণ করা। নিচে আত্মশুদ্ধির দশটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় আলোচনা করা হলো—

১. কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ অনুধাবন করা
কোরআন মানুষের অন্তরের রোগের সর্বোত্তম চিকিৎসা। এর তিলাওয়াত হৃদয়কে কোমল করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ

অর্থ্যাৎ : ‘হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশ ও অন্তরের রোগের নিরাময় এসেছে।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ৫৭)
শুধু তিলাওয়াত নয়, কোরআনের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করাও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

২. নিয়মিত সালাত আদায় করা
সালাত মানুষের চরিত্র গঠন করে এবং পাপাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ

অর্থ্যাৎ : ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
যে ব্যক্তি একাগ্রতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সালাত আদায় করে, তার অন্তর ধীরে ধীরে পরিশুদ্ধ হতে থাকে।

৩. আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করা
জিকির অন্তরকে জীবন্ত রাখে এবং ইস্তিগফার গুনাহের কালিমা দূর করে। আল্লাহ বলেন, 

أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ

অর্থ্যাৎ : ‘জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৮)
তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও দিনে সত্তরের অধিক এবং অন্য বর্ণনায় একশতবার ইস্তিগফার করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭০২)

৪. গুনাহ থেকে আন্তরিক তওবা করা
তওবা আত্মাকে পাপের বোঝা থেকে মুক্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

অর্থ্যাৎ : ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
সত্যিকার তওবা মানুষকে নতুন জীবনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

৫. সৎ ও নেককার মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা
মানুষ তার বন্ধু ও সঙ্গীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই আত্মশুদ্ধির জন্য নেককারদের সাহচর্য অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ বলেন, 

وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

অর্থ্যাৎ : ‘তোমরা সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১১৯)

৬. আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা
মুমিন ব্যক্তি সর্বদা নিজের আমল ও চরিত্র পর্যালোচনা করে। ওমর (রা.) বলেছেন, ‘হিসাব গ্রহণের পূর্বেই তোমরা নিজেদের হিসাব নাও।’ যে ব্যক্তি প্রতিদিন নিজের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করে সংশোধনের চেষ্টা করে, তার আত্মা ক্রমেই পরিশুদ্ধ হয়।

৭. রিয়া, অহংকার ও হিংসা থেকে বেঁচে থাকা
অহংকার, লোক দেখানো ইবাদত এবং হিংসা আত্মার জন্য মারাত্মক ব্যাধি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)

অন্য হাদিসে তিনি আরো বলেন, ‘হিংসা নেক আমলকে এমনভাবে খেয়ে ফেলে যেমন আগুন কাঠকে খেয়ে ফেলে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯০৩)

৮. মৃত্যু ও আখিরাতের কথা বেশি স্মরণ করা
মৃত্যুর স্মরণ মানুষের হৃদয়কে নরম করে এবং দুনিয়ার মোহ কমিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 

أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ

অর্থ্যাৎ : ‘তোমরা আনন্দ-বিলাস ধ্বংসকারী মৃত্যু অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৩০৭)
মৃত্যুর চিন্তা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আখিরাতমুখী করে তোলে।

৯. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা
দান মানুষের হৃদয়কে উদার করে এবং কৃপণতা দূর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, 

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا

অর্থ্যাৎ : ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)
মানুষের উপকার করা আত্মশুদ্ধির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।

১০. আল্লাহর কাছে আত্মশুদ্ধির জন্য দোয়া করা
আত্মশুদ্ধির সর্বোত্তম উপায় হলো আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। কারণ প্রকৃত পরিশুদ্ধি একমাত্র আল্লাহই দান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন,

اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا

অর্থ্যাৎ : ‘হে আল্লাহ! আমার আত্মাকে তাকওয়া দান করুন এবং তাকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই সর্বোত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনিই তার অভিভাবক ও মালিক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২২)

আত্মশুদ্ধি কোনো একদিনের কাজ নয়; বরং এটি আজীবনের সাধনা। একজন মুমিন যত বেশি কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে, সালাত ও জিকিরে মনোযোগী হবে, গুনাহ থেকে তওবা করবে, নেককারদের সাহচর্য গ্রহণ করবে এবং নিজের অন্তরের রোগ দূর করার চেষ্টা করবে, ততই তার আত্মা পবিত্র ও আলোকিত হবে।

আজকের বস্তুবাদী ও অস্থির পৃথিবীতে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ পরিশুদ্ধ আত্মাই মানুষকে প্রকৃত শান্তি, নৈতিক সৌন্দর্য এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজেদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সচেষ্ট হই এবং আল্লাহর কাছে সর্বদা এই দোয়া করি, ‘হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরকে পবিত্র করুন, আমাদের আত্মাকে তাকওয়া দান করুন এবং আমাদেরকে নেককার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আত্মশুদ্ধির পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্প থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানালেন শায়খ আহমাদুল্লাহ
সংগৃহীত ছবি

ভেনেজুয়েলায় সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পকে শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষকে মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বাস্তবতা এবং আখিরাতের অনিবার্যতার কথা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় শায়খ আহমাদুল্লাহ ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে নিহতদের জন্য দোয়া এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, স্থাপনা ও মানুষের স্বপ্ন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত অবকাঠামো কিংবা বিপুল সম্পদ—কোনোটিই আল্লাহর ইচ্ছার সামনে চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।

তিনি আরো বলেন, এ ধরনের ঘটনা মানুষের জন্য আত্মসমালোচনা, তওবা এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। মানুষ দুনিয়ার জীবনে যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর সব আয়োজন একদিন শেষ হয়ে যাবে এবং প্রত্যেককেই মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে।

শায়খ আহমাদুল্লাহ বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে ছোট ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। তাই ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা আমাদের জন্যও সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণবিধি না মেনে ভবন নির্মাণ, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, সংকীর্ণ সড়ক এবং পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ভূমিকম্পকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যমান ভবনের নিরাপত্তা যাচাই, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেন।

বার্তার শেষাংশে শায়খ আহমাদুল্লাহ সবাইকে বেশি বেশি তওবা, ইস্তিগফার, দোয়া এবং নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সংশোধন করার আহ্বান জানান। তার মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু বৈজ্ঞানিক বা ভৌগোলিক একটি ঘটনা নয়; এটি মানুষের জন্য শিক্ষা গ্রহণ, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নিজেদের আমল ও জীবনযাত্রা পর্যালোচনা করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

ভেনেজুয়েলার এই মর্মান্তিক ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের সব শক্তি, সামর্থ্য ও অর্জনের ঊর্ধ্বে রয়েছেন মহান আল্লাহ। তাই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নিরাপদ নির্মাণ, সচেতন নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি গ্রহণই হতে পারে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।