• ই-পেপার

রমজান, নাকি রামাদান?

হিজরি সনের ইতিহাস

মুসলিম উম্মাহর স্বকীয় পরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মুসলিম উম্মাহর স্বকীয় পরিচয়ের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্ষপঞ্জি শুধু দিন-তারিখ গণনার একটি পদ্ধতি নয়; বরং এটি একটি জাতির পরিচয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতীক। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেছে। মুসলিম উম্মাহও এর ব্যতিক্রম নয়। ইসলামের ইতিহাসে হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল মুসলিম জাতিসত্তার স্বকীয়তা রক্ষার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই বর্ষপঞ্জি শুধু সময় গণনার মাধ্যম নয়; বরং এটি ইসলামের ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং বিজয়ের ইতিহাসকে চিরস্মরণীয় করে রাখার এক অনন্য নিদর্শন।

প্রাক্-ইসলামি আরবে সাল গণনার পদ্ধতি

ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সন বা বর্ষপঞ্জি প্রচলিত ছিল না। তারা সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনা বা স্মরণীয় দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বছর নির্ধারণ করত। যেমন—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে আরবরা ‘আমুল ফিল’ বা ‘হস্তীবাহিনীর বছর’ নামে স্মরণ করত। কোনো বড় যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ঘটনাও কখনো কখনো সাল নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ফলে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত তারিখ পদ্ধতির অভাব ছিল সুস্পষ্ট।

ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তার এবং প্রশাসনিক সংকট

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের বিজয়ধারা দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। খিলাফতে রাশেদার যুগে আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে ইরাক, শাম, মিসর ও পারস্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুসলিম সমাজ তখন আর শুধুমাত্র গোত্রভিত্তিক সম্প্রদায় নয়; বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

ওমর (রা.)-এর খিলাফতের ষষ্ঠ বছরে ইরাকের গভর্নর ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবু মুসা আশআরি (রা.)। তিনি লক্ষ্য করলেন, মদিনা থেকে আগত সরকারি নির্দেশনাগুলোতে কোনো সাল বা তারিখ উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন নির্দেশ আগে এসেছে, কোনটি পরে এসেছে এবং কোন ফরমান আগে কার্যকর করতে হবে—তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এই জটিল পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি আমিরুল মুমিনিন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নিকট একটি চিঠি পাঠান এবং একটি স্থায়ী সমাধানের আবেদন জানান।

ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক শুরা সভা

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এই সমস্যাকে ওমর (রা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। তিনি মদিনায় বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সে সভায় উপস্থিত ছিলেন ওসমান ইবন আফফান (রা.), আলী ইবন আবি তালিব (রা.), তালহা (রা.), জুবায়ের (রা.), আবু হুরায়রা (রা.)-সহ ইসলামের প্রখ্যাত সাহাবিরা।

সভায় বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। কেউ রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণের কথা বলেন, কেউ পারস্যের পঞ্জিকা গ্রহণের পরামর্শ দেন, আবার কেউ ইহুদিদের তারিখ পদ্ধতি অনুসরণের মত দেন। কিন্তু ওমর (রা.) অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব আকীদা, সংস্কৃতি ও সভ্যতা রয়েছে; তাই তাদের সময় গণনার পদ্ধতিও স্বতন্ত্র হওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘মুসলিমদের নিজস্ব একটি বর্ষপঞ্জি থাকবে, যা তাদের স্বকীয় পরিচয় ও ইতিহাসকে ধারণ করবে।’ সাহাবায়ে কেরামও এ সিদ্ধান্তকে সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন করেন।

কোন ঘটনা থেকে শুরু হবে নতুন সন?

নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর প্রশ্ন দেখা দিল—কোন ঘটনাকে ভিত্তি করে এই সনের সূচনা হবে? এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে— কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মবছরকে সূচনাবিন্দু করার প্রস্তাব দেন। কেউ নবুওয়াত লাভের বছরকে ভিত্তি করার কথা বলেন। আবার কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের বছরকে শুরুর বছর হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু আলী (রা.) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হলো হিজরত। কারণ, মক্কায় নির্যাতিত মুসলমানদের একটি ক্ষুদ্র দল মদিনায় হিজরতের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কিছু চুক্তিপত্রে ‘হিজরতের পঞ্চম বছর’ জাতীয় তারিখ ব্যবহৃত হয়েছিল। তাই হিজরতকেই সনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা অধিক যুক্তিসঙ্গত। সাহাবায়ে কেরাম এ মতামতকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেন। এভাবেই ‘হিজরি সন’-এর সূচনা হয়।

কেন হিজরতকেই ভিত্তি করা হলো?

হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর ছিল না; বরং সত্য ও মিথ্যার সংঘাতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। হিজরতের মাধ্যমে— মুসলমানরা স্বাধীনভাবে দ্বীন পালন করার সুযোগ লাভ করে। ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম উম্মাহ একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ইসলামের বিশ্বব্যাপী প্রসারের পথ উন্মুক্ত হয়। এ কারণেই মুসলিম জাতির ইতিহাসে হিজরতকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররম নির্বাচন

হিজরতকে সনের সূচনা হিসেবে গ্রহণ করার পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—বছরের প্রথম মাস কোনটি হবে? কিছু সাহাবি রবিউল আউয়াল মাসকে প্রথম মাস করার মত দেন, কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মাসেই মদিনায় পৌঁছেছিলেন। অন্যদিকে কেউ কেউ রমজান মাসকে প্রথম মাস করার প্রস্তাব দেন, কারণ এটি কোরআন নাজিলের মাস এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তখন ওসমান (রা.) একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মতামত পেশ করেন। তিনি বলেন, যদিও রাসুলুল্লাহ (সা.) রবিউল আউয়ালে মদিনায় পৌঁছেছিলেন, কিন্তু হিজরতের সিদ্ধান্ত, প্রস্তুতি এবং পরিকল্পনার সূচনা হয়েছিল মহররম মাসে। উপরন্তু, আরবদের প্রাচীন প্রথাতেও মহররম ছিল বছরের প্রথম মাস।

আলী (রা.)-সহ অন্যান্য সাহাবিগণ এ মতকে সমর্থন করেন। অবশেষে ওমর (রা.) ঘোষণা করেন, ‘হিজরত হবে আমাদের সনের ভিত্তি এবং মহররম হবে এর প্রথম মাস।’ এভাবেই মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ‘হিজরি সন’ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

হিজরি সনের তাৎপর্য

হিজরি সন শুধু একটি ক্যালেন্ডার নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের জীবন্ত স্মারক। প্রতি বছর মহররম মাসের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা স্মরণ করে সেই ঐতিহাসিক হিজরতের ঘটনা, যার মাধ্যমে ইসলামের বিজয়ের নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল। আজও ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত—যেমন রমজান, হজ, জাকাতের হিসাব, আশুরা, আরাফাহ দিবস ইত্যাদি—হিজরি বর্ষপঞ্জির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয়।

হিজরি সনের প্রবর্তন ছিল ওমর (রা.)-এর দূরদর্শী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি মুসলিম উম্মাহকে শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই দেয়নি; বরং তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়, ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করার এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আজ যখন মুসলমানরা নতুন হিজরি বছরকে স্বাগত জানায়, তখন তাদের স্মরণ করা উচিত যে এই সনের সূচনা কোনো রাজা-বাদশাহর জন্ম, কোনো যুদ্ধের বিজয় কিংবা কোনো সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা দিয়ে হয়নি; বরং তা শুরু হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ, ঈমান, ধৈর্য এবং সংগ্রামের এক মহান ইতিহাস—হিজরত—দিয়ে। আর এ কারণেই হিজরি সন মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয় ও গৌরবের এক চিরন্তন প্রতীক।

তথ্যসূত্র : সহিহ বুখারি, ফাতহুল বারি (৭/২৬৮), আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ইসমাইল রেহান প্রণীত তারিখে মুসলিম উম্মাহ।

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক পরিবর্তন

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক পরিবর্তন
সংগৃহীত ছবি

মানবসমাজে অর্থনৈতিক শোষণের ইতিহাস যত পুরনো, সুদের (রিবা) ইতিহাসও ততটাই প্রাচীন। যুগে যুগে ক্ষমতাবান ও ধনীরা সুদের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। ঋণের বোঝা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, সমাজে সৃষ্টি করেছে বৈষম্য, শত্রুতা ও অবিচার। ইসলাম যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়, তখন আরব সমাজেও সুদের ভয়াবহ প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এমনকি ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার সম্পদ, পরিবার এমনকি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়ত।

এই অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ইসলাম ধাপে ধাপে এক অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটায়। কোরআনুল কারিম সুদকে শুধু একটি আর্থিক অপরাধই বলেনি; বরং এটিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার সমতুল্য ভয়াবহ গুনাহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ফলে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

জাহেলি যুগে সুদের প্রচলন
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে সবচেয়ে প্রচলিত সুদের ধরন ছিল ‘রিবা আন-নাসিয়াহ’। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো এবং সময় বাড়ানো হতো। তারা বলত, ‘ঋণ পরিশোধ কর, নতুবা ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি কর।’ ফলে একজন দরিদ্র ব্যক্তি অল্প ঋণ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বহুগুণ ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হতো। এতে ধনীরা আরো ধনী এবং গরিবরা আরো দরিদ্র হয়ে পড়ত।

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ধাপসমূহ
ইসলাম মানুষের স্বভাব ও সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে সুদ নিষিদ্ধ করেছে।

প্রথম ধাপ : সুদের অনৈতিকতা তুলে ধরা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার উদ্দেশ্যে যে সুদ দিয়ে থাক, তা আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৩৯)
এ আয়াতে সুদের নৈতিক অসারতা তুলে ধরা হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপ : পূর্ববর্তী জাতির ওপর সুদের কারণে শাস্তির কথা উল্লেখ
আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সুদ গ্রহণের কারণে (তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল), অথচ তাদেরকে তা থেকে নিষেধ করা হয়েছিল।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৬১)
এখানে ইহুদিদের সুদখোরির কারণে আল্লাহর শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তৃতীয় ধাপ : সুদের কঠোর নিন্দা
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ ভক্ষণ কর না।’ (সুরা : ইমরান, আয়াত : ১৩০)
এ আয়াতে সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে মুমিনদের সতর্ক করা হয়েছে।

চতুর্থ ধাপ : চূড়ান্ত ও পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা
সুরা বাকারার শেষাংশে সুদ সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৮)
এরপর আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ‘যদি তোমরা তা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৯)

সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
তাফসিরবিদদের মতে, বনু সাকীফ ও বনু মুগিরা গোত্রের মধ্যে সুদের লেনদেন ছিল। ইসলাম গ্রহণের পরও পূর্বের কিছু সুদের দাবি অবশিষ্ট ছিল। তখন এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয় এবং সকল প্রকার বকেয়া সুদ বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘সাবধান! জাহেলি যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১২১৮)
এরপর তিনি সর্বপ্রথম তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.)-এর সমস্ত সুদ বাতিল ঘোষণা করেন, যাতে কেউ মনে না করে যে ইসলাম শুধু অন্যদের জন্য আইন প্রণয়ন করেছে।

সুদ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কবাণী

১. সুদ সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহের একটি
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘...সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাক।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলে তিনি সুদ ভক্ষণকেও তার মধ্যে উল্লেখ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬)

২. সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিশপ্ত
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীর ওপর অভিশাপ করেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৫৯৮)


সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সামাজিক পরিবর্তন

১. অর্থনৈতিক শোষণের অবসান : দরিদ্রদের ওপর ধনীদের অন্যায় আধিপত্য কমে যায় এবং ঋণের ফাঁদ থেকে মানুষ মুক্তি পেতে শুরু করে।

২. দান ও সদকার সংস্কৃতি বৃদ্ধি : সুদের পরিবর্তে ইসলাম ক্বারযে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ), যাকাত, সদকা ও ওয়াকফের ব্যবস্থা চালু করে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৬)

৩. সামাজিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা : সুদ মানুষকে স্বার্থপর করে, কিন্তু দান ও সহযোগিতা সমাজে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে।

৪. সম্পদের সুষম বণ্টন : সুদের মাধ্যমে সম্পদ ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়; ইসলাম ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বভিত্তিক অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে।

৫. ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা : ইসলাম লাভের অধিকারকে ঝুঁকি ও পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাই ব্যবসা হালাল এবং সুদ হারাম।
সুতরাং সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। এটি শুধু একটি আর্থিক বিধান নয়; বরং মানবমর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মহান ঘোষণা। ইসলাম এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ধনী-গরিবের মধ্যে শোষণ নয়, বরং সহযোগিতা থাকবে; স্বার্থপরতা নয়, বরং মানবকল্যাণ হবে মূলনীতি।

আজও বিশ্বের বহু অর্থনৈতিক সংকট, ঋণদাসত্ব ও বৈষম্যের মূল কারণ সুদভিত্তিক ব্যবস্থা। তাই কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে সুদমুক্ত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও কল্যাণকর সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুদের সকল প্রকার লেনদেন থেকে বেঁচে থাকার এবং হালাল উপার্জনের পথে অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যে পাঁচ বিপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
যে পাঁচ বিপদ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া উচিত
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কিছু নিয়ামত আছে, এগুলো যেমন সুখশান্তির কারণ হয়, তেমনি কিছু বিষয় এমনও আছে, যেগুলো দুনিয়াকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে বিশেষ কিছু অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই খারাপ প্রতিবেশী থেকে, এমন স্ত্রীর অনিষ্ট থেকে যে বার্ধক্য আসার আগেই আমাকে বৃদ্ধ করে দেয়, এমন সন্তানের অনিষ্ট থেকে যে আমার ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে চায়, এমন সম্পদ থেকে যা আমার জন্য শাস্তির কারণ হয় এবং এমন ধূর্ত বন্ধুর অনিষ্ট থেকে, যে আমার ভালো দেখলে গোপন করে আর মন্দ দেখলে প্রচার করে।’ (তাবরানি)

এই দোয়ায় মানবজীবনের পাঁচটি বড় পরীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে বিষয়গুলো আরেকটু স্পষ্ট করে তুলে ধরা হলো—

১. খারাপ প্রতিবেশী : প্রতিবেশী মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী লোকজন। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হয়, বিভিন্ন রকম সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।

কিন্তু প্রতিবেশী যদি খারাপ হয়, তা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই রাসুল (সা.) এমন প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ যাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিবেশী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক কোরো না।

আর সদ্ব্যবহার করো মা-বাবার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম, মিসকিন, নিকটাত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথি, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদের যারা দাম্ভিক, অহংকারী।’ (সুরা : নিসা, আয়াত ৩৬)
প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাও ঈমানের অন্যতম অঙ্গ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়।

আল্লাহর শপথ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। জিজ্ঞেস করা হলো : হে আল্লাহর রাসুল! কে সে লোক? তিনি বললেন, যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৬)
তাই খারাপ প্রতিবেশী থেকে যেমন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে, তেমনি নিজেকেও একজন কল্যাণকামী প্রতিবেশী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

২. কষ্টদায়ক জীবনসঙ্গী : স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হতে হবে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির ভিত্তিতে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)

কিন্তু জীবনসঙ্গী যদি নির্যাতন, অশান্তি ও মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংসারের সুখ নষ্ট হয়ে যায়। তাই নিজেকে এমন জীবনসঙ্গী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যেন সংসারে সুখশান্তি অটুট থাকে, তেমনি যে ধরনের সঙ্গীর কারণে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়, সে ধরনের সঙ্গী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

৩. অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী সন্তান : সন্তান আল্লাহর বড় নিয়ামত। কিন্তু সন্তান যদি অবাধ্য, জালেম বা অহংকারী হয়ে ওঠে, তবে তা মা-বাবার জন্য বড় পরীক্ষা। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৪)

এর পরের আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো শুধু পরীক্ষামাত্র।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৫)

এ জন্যই রাসুল (সা.) সন্তানদের সুশিক্ষা ও উত্তম চরিত্র গঠনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। কারণ অবাধ্য সন্তান দুনিয়া ও আখিরাত উভয় ক্ষেত্রেই বিপদের কারণ হতে পারে।

৪. শাস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ানো সম্পদ : অর্থ-সম্পদ মহান আল্লাহর নিয়ামত। তবে মানুষের কর্মপদ্ধতি ও বদ আমলের কারণে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যেমন—হারাম উপার্জন, কৃপণতা বা সম্পদের মোহ মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এ জন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন না করে।’ (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ৯)

আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে হালালভাবে সম্পদের উপার্জন ও আল্লাহর পথে ব্যয় করার মাধ্যমে মানুষ তাদের দুনিয়া  ও আখিরাতকে সাজাতে পারে। আবার সম্পদের মোহে পড়ে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে গেলে এই সম্পদই মানুষের দুনিয়া-আখিরাতে লাঞ্ছনা ও কঠিন শাস্তির কারণ হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৪)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোনো না কোনো ফিতনা আছে, আর আমার উম্মতের ফিতনা হলো সম্পদ।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৩৬)

৫. ধূর্ত ও কপট বন্ধু : বন্ধু মানুষের চরিত্র ও জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অসৎ বন্ধু মানুষের গোপন ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, ঈর্ষা করে, সম্ভাবনা নষ্ট করতে গোপনে ষড়যন্ত্র করে এবং বিপদে সহযোগিতা না করে দূরে সরে থাকে, সম্ভব হলে ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

বন্ধুত্বের ভিত্তি যদি ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়, তাহলে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়া স্বাভাবিক। আর যদি তার ভিত্তি হয় ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাহলে কঠিন কিয়ামতের দিনও সেই বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। এ ব্যাপারে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘সেদিন ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা পরস্পর শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সুরা : যুখরুফ, আয়াত : ৬৭)

তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। এমন বন্ধুদের থেকে দূরে থাকতে হবে, যারা দুনিয়া-আখিরাতে ক্ষতির কারণ হয়।

আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো, কস্তুরিওয়ালা ও কামারের হাঁপরের ন্যায়। কস্তুরিওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাঁপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৩৪)

উল্লিখিত পাঁচ বিষয় থেকে আশ্রয় চেয়ে রাসুল (সা.)-এর করা এই দোয়া আমাদের শেখায় যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট অনেক সময় বাইরের শত্রুর কারণে নয়; বরং নিকটবর্তী সম্পর্কগুলোর মাধ্যমে আসে। খারাপ প্রতিবেশী, অশান্তিকর জীবনসঙ্গী, অবাধ্য সন্তান, উদাসীনকারী সম্পদ এবং ধূর্ত বন্ধু—মানুষের জীবনকে তছনছ করে দিতে পারে। ঈমান-আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত, এসব বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং নিজের চরিত্র ঠিক করা। যাতে নিজের কারণে অন্যদের কষ্ট না হয়। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।

ছয় জিনিসের পবিত্রতা মুমিনের শ্রেষ্ঠ অবলম্বন

আলেমা হাবিবা আক্তার
ছয় জিনিসের পবিত্রতা মুমিনের শ্রেষ্ঠ অবলম্বন
সংগৃহীত ছবি

পার্থিব জীবনে মুমিনের লক্ষ্য মহান আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জন করা। এই ভালোবাসা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো জীবনকে সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা ও অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে মানুষ! আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৯৮৯) 

বিজ্ঞ আলেমরা বলেন, ছয় ধরনের পবিত্রতার মাধ্যমে মুমিন তার জীবনে পরিশুদ্ধি লাভ করে থাকে। তা হলো—

১. বিশ্বাসের পবিত্রতা : মহান স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে ভুল বিশ্বাস লালন করা হলো বিশ্বাসের অপবিত্রতা। মুমিন বিশ্বাস ও মননে অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! নিশ্চয়ই মুশরিকরা নাপাক। সুতরাং তারা যেন এই বছরের পর আর মসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২৮)

২. কাজের পবিত্রতা : মুমিন তার দৈনন্দিন কাজ ও আমলের ক্ষেত্রে পবিত্রতা রক্ষা করে এবং অশ্লীলতা, কলুষতা, নোংরামি ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাজ পরিহার করে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো। যাতে তোমরা সফল হও।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৯০)

৩. খাবারের পবিত্রতা : পানাহারে মুমিনরা পবিত্র রক্ষা করে। আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কোরো এবং সৎকাজ কোরো। তোমরা যা কোরো সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবগত।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত ৫১)

৪. পোশাকের পবিত্রতা : মুমিনের পোশাক-পরিচ্ছদও হয় পবিত্র। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! দাঁড়ান, (আপনজনদের) সতর্ক করুন, আপনার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন এবং আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন।’ (সুরা : মুদ্দাসসির, আয়াত : ১-৪)

৫. ইবাদতে পবিত্রতা : ইবাদত প্রার্থনায় অংশগ্রহণের আগে মুমিন পবিত্রতা অর্জন করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হইবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে এবং তোমাদের মাথা মাসাহ করবে; পা গ্রন্থি পর্যন্ত ধৌত করবে। যদি তোমরা অপবিত্র থাকো, তবে বিশেষভাবে পবিত্র হবে।’ (সুরা :  মায়িদা, আয়াত : ৬)

৬. ব্যক্তিগত জীবনে পবিত্রতা : শুধু ঈমান ও ইবাদতের ক্ষেত্রে নয়, বরং মুমিন একান্ত ব্যক্তিগত জীবনেও পবিত্রতা রক্ষা করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকে তোমাকে রজঃস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, তা অশুচি। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী সংগম বর্জন করবে এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী সংগম করবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২) আল্লাহ সবার জীবনকে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে দেন। আমিন।

রমজান, নাকি রামাদান? | কালের কণ্ঠ