চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়ার (ফারহান ফাইয়াজ) বাবা শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া।
আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি দাবি করেন ট্রাইব্যুনালের কাছে।
এর আগে গত ১০ মে এ মামলার ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ১৫ জুন প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিচারকাজ। গতকাল থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
ফারহান ফাইয়াজ ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল উল্লেখ করে সাক্ষ্যে শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকালে সে বাসা থেকে বের হয়ে কলেজে যায়। কলেজ থেকে বন্ধুদের সঙ্গে সে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয় এবং মিছিল নিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমণ্ডি-২৭ (পুরাতন) নম্বরে অবস্থান নেয়। তারা ছিল নিরস্ত্র। কিন্তু তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী, আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপরে চড়াও হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রদের ওপরে নির্বিচারে গুলি চালায়।
দুপুর আড়াইটার দিকে ফারহান গুলিবিদ্ধ হয় জানিয়ে সাক্ষী বলেন, ‘তখন ঘটনাস্থল থেকে এক অভিভাবক আমাকে ফোন করে জানান যে ফারহান গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি তখন মালিবাগে আমার অফিসে অবস্থান করছিলাম। একমাত্র ছেলের গুলির খবর শুনে আমি তখন প্রায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
সাক্ষী জানান, লালমাটিয়া সিটি হাসপাতালে পৌঁছে তিনি বীভৎস অবস্থা দেখতে পান। হাসপাতালের আইসিইউতে গিয়ে দেখেন ফারহানের মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। এক পর্যায়ে ডাক্তার অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফারহানের মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন।
সাক্ষী বলেন, ‘তাতে আমি বুঝলাম আমার ছেলে আর নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যে মৃত্যু সনদ দিয়েছিল তাতে লেখা ছিল সে ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছে।’
হাসপাতালের পেছনের গেট দিয়ে ফারহানের লাশ নিয়ে আল মারকাজুল লাশ দাফন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয় জানিয়ে সাক্ষ্যে শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, সেখানে লাশের গোসল দেওয়ার পর ফারহানের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের মাঠে। সেখানে বিকেল সাড়ে ৫ প্রথম নামাজে জানাজা হয়। জানাজা শেষে লাশ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পথে প্রথমে রাজধানীর কাকরাইল মোড় ও যাত্রবাড়ী মোড়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন বলে জানান সাক্ষী।
শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া আরো বলেন, ‘তারা সম্ভবত লাশটা নিয়ে যেতে চেয়েছিল। লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছার পর সেখানকার স্থানীয় আওয়ামী বাহিনী লাশ দাফন করার জন্য আমাদের মাত্র ৪০ মিনিট সময় দিয়েছিল। রাত আনুমানিক ৯টার দিকে জানাজা সম্পন্ন করে বরপা সামাজিক কবরস্থানে কবরস্থ করি। আমার একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী আমি তাদের শাস্তি দাবি করছি।’
মামলার ২৮ আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা হয়েছে। তারা হলেন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। গতকাল কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
নানক-তাপস ছাড়া পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম।
২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নৃশংসতা চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। আসামিদের উসকানি-প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপস্থিতিতে জুলাই আন্দোলনে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজসহ ৯ জন নিহত হন। আহত হন আরো অনেকে।







