প্রায় ৩৩ বছর পর আবারও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর। এবারের জাকসু নির্বাচনে ছয়টি প্যানেল বিভিন্ন নামে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে।
জানা যায়, সম্ভাব্য ছয়টি প্যানেলের মধ্যে রয়েছে—গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’, ছাত্রশিবিরের ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত একটি প্যানেল, তাদের প্যানেলের নাম ও প্রার্থীদের চূড়ান্ত করতে পারেনি এখনো। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া আব্দুর রশিদ জিতুর নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা প্যানেল, বামপন্থী শিক্ষার্থীদের দুইটি প্যানেল। এর বাহিরে স্বতন্ত্রভাবে অনেকে নির্বাচন করবেন।
সবার আগে প্যানেল ঘোষণা শিবিরের, নেই নৃগোষ্ঠী ও ভিন্নধর্মাবলম্বী কেউ, ইসলামী ছাত্রশিবির সবার আগে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। কারণ, তারা শুধু তাদের দলকেন্দ্রিক প্যানেল ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হলেও শিবিরের প্যানেলে স্থান পেয়েছেন ছয় নারী শিক্ষার্থী, জুলাই আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী, তবে তাদের প্যানেলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং অনান্য ধর্মাবলম্বী কোনো শিক্ষার্থী নেই।
এ বিষয়ে শিবিরের প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের জিএস পদপ্রার্থী এবং শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছি। এখনো তো মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় আছে। কেউ যদি আমাদের সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী আসে তাহলে আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রী সংস্থার প্রকাশ্যে কার্যক্রম আছে বলে জানি না। সেক্ষেত্রে যারা আমাদের সাথে আসতেছে তারা প্রত্যেকেই অরাজনৈতিক।’
শাখা শিবির দাবি করছে তাদের প্যানেলে শুধু শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত শিক্ষার্থী নয় বরং সাধারণ শিক্ষার্থী অনেকে যুক্ত হয়েছেন।
এ বিষয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের এজিএস (মহিলা) প্রার্থী আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা বলেন, ‘আমি সাড়ে তিন বছর সাংবাদিকতা করেছি এবং এর পরবর্তীতে এক বছর এক্টিভিজমের সাথে জড়িত ছিলাম। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে না থাকায় আমার সাথে একাধিক ছাত্র সংগঠন যোগাযোগ করে। সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত পদ দিতে চেয়েছেন। এ ছাড়া কয়েকটি প্যানেলের নেতাদের সাথে কথা বলে বুঝতে পারি তাদের নিজেদের ভেতর কোন্দল চলছিল। তাই আমার মনে হয়েছে শিক্ষার্থী সমন্বিত জোটে গেলে আমি ভালো কিছু করতে পারব। শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করতে পারব। এ কারণেই এই জোটে আমি যুক্ত হয়েছি।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একাধিক নেতাকে আলাদা আলাদাভাবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে দেখা যায়। ছাত্রদলের নেতারা জানান, সংগঠন থেকে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তারা এক প্রার্থী একাধিক পদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে কে কোন পদে প্রার্থী হবেন, সেটি এখনো ঠিক হয়নি। গত বুধবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সংসদের কয়েকজন নেতা আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই রাতে শাখা ছাত্রদলের যারা প্রার্থী তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। একটা শর্ট লিস্ট করা হয়েছে বলেও জানা যায়। তাছাড়া শাখা ছাত্রদল একমাত্র সংগঠন যারা ছেলেদের প্রতিটি হলে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিবে এবং মেয়েদের হলগুলোতে আংশিক প্যানেল দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভিপি, জিএস এবং এজিএস পদে আলোচনায় রয়েছেন শাখা ছাত্রদলের মীর মশাররফ হোসেন হলের সভাপতি শেখ সাদি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের সভাপতি হামিদুল্লাহ সালমান, কাজি নজরুল ইসলাম হলের সভাপতি মেহেদী হাসান ইমন, ১৩নং ছাত্রী হলের সভাপতি তানজিলা হোসেন বৈশাখী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রুবেল হোসেনসহ একাধিক নেতাকর্মী। তারা সবাই একাধিক পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মীর মশাররফ হোসেন হলের সভাপতি শেখ সাদী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছাত্রদল বৃহৎ একটি ছাত্র সংগঠন। ২৫টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের অসংখ্য প্রার্থী রয়েছেন।যোগ্যতায় কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নেই। যে কারণে চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগছে। আমরা শাখা ছাত্রদল ঐক্যবদ্ধ। আমরা জাকসুর জন্য প্রস্তুত। ইনশাআল্লাহ ছাত্রদল ভালো কিছুই করবে।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, ‘ছাত্রদল একমাত্র সংগঠন যারা কেন্দ্রীয় সংসদে প্যানেল দিচ্ছে। একই সাথে ছেলেদের হলগুলোতে প্যানেল দিচ্ছে এবং মেয়েদের হলগুলোতে আংশিক প্যানেল দিবে। আমাদের প্যানেল মোটামুটি চূড়ান্ত। আগামীকাল আমরা হয়তো প্যানেল ঘোষণা করব’।
বাগছাসের শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম
জাকসু নির্বাচনে ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ থেকে লড়বে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)। এই প্যানেলে ভিপি পদে আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল, জিএস পদে আবু তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম এবং এজিএস পদে জিয়া উদ্দিন আয়ান নির্বাচন করবেন। শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে এক প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে তারা তাদের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেন।
এ সময় শাখা বাগছাসের আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ আত্মপ্রকাশের পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দাবিদাওয়া, একাডেমিক সংস্কার নিয়ে সরব ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি আমাদেরকে ভোটের মাধ্যমে রায় দেন তাহলে আমরা আরো বেশি করে কাজ করতে পারব।’
গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া জিতু-শাকিলের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র প্যানেল
গণ-অভ্যুত্থানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দেওয়া, সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্নয়ক আব্দুর রশিদ জিতু ও গণ-অভ্যুত্থানে আহত হওয়া শাকিল আলীর নেতৃত্বে ‘স্বতন্ত্র’ প্যানেল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদে (জাকসু) নির্বাচন করবেন। তাদের প্যানেলে গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থী, আহত হওয়া শিক্ষার্থীরা থাকবেন। তা ছাড়া ইনক্লুসিভ প্যানেল করার জন্য ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, আদিবাসী এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটা প্যানেল তৈরি করা হবে।
বামপন্থীদের নেই ঐক্য, হচ্ছে প্যানেল ২টি
বামপন্থী, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের প্যানেল হবে দুইটি। একটি প্যানেলের নেতৃত্বে দেবেন শাখা ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের সাবেক সভাপতি অমর্ত্য রায় ও সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি শরণ এহসান। এই প্যানেলের নাম হতে পারে ‘সম্প্রীতির ঐক্য’। এই প্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্বশীলরা এবং আদিবাসী ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর অনেক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবেন।
এ বিষয়ে শরণ এহসান বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাসটা হচ্ছে বৈচিত্র্য, সম্প্রীতি, ঐক্য। আমরা হয়তো রবিবার বা সোমবার প্যানেল ঘোষণা করতে পারি। আমাদের প্যানেলে ৮ থেকে ১০ জন নারী শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাছাড়া আদিবাসী শিক্ষার্থী এবং ভিন্ন ধর্মালম্বী অনেক শিক্ষার্থী আমাদের প্যানেলে রয়েছেন।’
বামপন্থীদের আরেকটা প্যানেলের নেতৃত্বে থাকবেন সাংস্কৃতিক জোট আরেক অংশের আহ্বায়ক মাহফুজ ইসলাম মেঘ ও শাখা ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ইমন। এ প্যানেলের সম্ভাব্য নাম হতে পারে ‘শিক্ষার্থী ঐক্য সংসদ’।
এ বিষয়ে জাহিদুল ইসলাম ইমন বলেন, ‘আমাদের প্যানেলে রাজনৈতিক মানুষের পাশাপাশি অরাজনৈতিক কিন্তু ক্যাম্পাসের জন্য কাজ করতে চান তাদের নিয়েই প্যানেল হচ্ছে। তাছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠক, আদিবাসী এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী নিয়ে একটা ইনক্লুসিভ প্যানেল হচ্ছে। এই ছয়টি প্যানেলের বাহিরেও স্বতন্ত্রভাবে বা আংশিক প্যানেল করেও অনেকের জাকসুতে নির্বাচন করবেন। আংশিক প্যানেল করতে পারেন ছাত্রফ্রন্টের সোহাগী সামিয়া।
তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকটি সংগঠনের সাথে আলাপ-আলোচনা জারি রেখেছি। যদি তাদের সাথে আমাদের ঐক্য হয় তাহলে তাদের সাথে প্যানেল করে নির্বাচন করব, নয়তো আমরা আমাদের মতাদর্শী কয়েকজন মিলে নিজেরাই একটা আংশিক প্যানেল করতে পারি।’







