
তোমাদের আঁকা
ফেউ

মানহা
আহমেদ সাব্বির

মানহাকে জোর করে যায় না তো খাওয়ানো
দুধভাত মেখে দিলে বলে, ‘ধ্যাৎ জাউ আনো।’
ডিম দিলে সুজি চায়, নান দিলে পরাটা
দুই কান চেপে ধরে, শুনবে না ছড়াটা।
সন্দেশ মুখে দিলে বলে, ‘থুক! মজা না’
মানহার চিৎকার নয় কারো অজানা।
খাওয়ানোর চেষ্টায় আম্মুটা ঘেমে যায়
এক গাল মুখে নিয়ে কোল থেকে নেমে যায়।
মানহার হাতে এলে আব্বুর ফোনটা
হেসে বলে, ‘মাম্মাম, খাব বলো কোনটা?’
[ জানতে নাকি ]
খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে শিশুরা আসে কেন
আল সানি

২০০১ সালের কোনো এক বিকেল। চেলসির অধিনায়ক জন টেরির হাত ধরে মাঠে ঢুকছে ছয় বছরের এক ছেলে। গ্যালারি ভর্তি হাজারো দর্শকের তুমুল গর্জন। চারদিকে ক্যামেরার ঝলকানি। ছোট্ট সেই শিশুর চোখে-মুখে তখন উজ্জ্বল স্বপ্ন। ১৫ বছর পরের কথা। সেদিনের সেই ছেলেটি একদিন চেলসির মূল দলে খেলার সুযোগ পেল। নাম তাঁর ম্যাসন মাউন্ট। অভিষেকের দিন গ্যালারি থেকে হাততালিতে স্বাগত জানালেন স্বয়ং জন টেরি! বিশ্বকাপ ফুটবলে ম্যাচ শুরুর আগে খেলোয়াড়দের হাত ধরে শিশুদের মাঠে ঢোকার এমন দৃশ্য তুমিও নিশ্চয়ই টেলিভিশনে দেখেছ। ফুটবলাররা এদের বলেন ‘প্লেয়ার এসকট’ বা ‘ম্যাচ মাসকট’। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে শুধুই সুন্দর এক নিয়ম মনে হয়। কিন্তু তুমি কি জানো, এর পেছনে রয়েছে স্বপ্নপূরণের অদ্ভুত এক গল্প।

বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচে নেইমার ও মেসির সঙ্গে প্লেয়ার মাসকট
বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে ম্যাচ শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তটি খেলোয়াড়দের জন্য আসলে ভীষণ উত্তেজনার। কোটি কোটি দর্শকের চোখ থাকে তাদের ওপর। জেতার জন্য মরিয়া ফুটবলাররা তখন সাধারণত তীব্র মানসিক চাপে থাকেন। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, ঠিক এই সময়ে শিশুদের নিষ্পাপ উপস্থিতি খেলোয়াড়দের মন চাঙ্গা করে। মাঠে নামার আগে একটি শিশুর হাতের স্পর্শে ফুটবলারদের ভেতরের ভয় ও নার্ভাসনেস অনেকটাই কমে যায়। এটি তাঁদের মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর খেলা। মাঠে সবার সঙ্গে ভালো আচরণ করতে এই শিশুরা অদৃশ্য একটা ভূমিকা পালন করে।

জন টেরির সঙ্গে ছোট্ট ম্যাসন মাউন্ট
মাঠে তারকা ফুটবলারদের সঙ্গের সেই ছোট্ট মুহূর্তটি শিশুদেরও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক তারকা আছেন, যাঁরা ছোটবেলায় মাসকট হিসেবে মাঠে ঢুকেছিলেন। ইংল্যান্ড দলের বর্তমান অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কথাই ধরা যাক। ২০০৫ সালে বিখ্যাত ফুটবলার ডেভিড বেকহামের হাত ধরে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন ১১ বছরের কেইন। সেদিনের রোমাঞ্চ কেইনের মনে বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। বড় হয়ে তিনি শুধু ইংল্যান্ড দলের প্রধান স্ট্রাইকারই হননি, বেকহামের মতো নিজের দেশের অধিনায়কও হয়েছেন। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ম্যানচেস্টার সিটির তারকা ফিল ফোডেনের ক্ষেত্রেও। ২০০৭ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে সিটির এক খেলোয়াড়ের হাত ধরে মাঠে ঢুকেছিলেন ফোডেন। বড় হয়ে ফোডেন যখন সিটির হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন তখন তাঁকে ছোটবেলার সেই ভিডিওটি দেখানো হয়। দেখে ফোডেন বলেছিলেন, ‘মাঠের ভেতর দর্শকের গর্জন আর খেলোয়াড়দের হাত ধরে হাঁটার ওই ৯০ সেকেন্ডই আমাকে ফুটবলার হওয়ার চূড়ান্ত জেদ এনে দিয়েছিল।’ স্পেনের তারকা ড্যানি ওলমো ছোটবেলায় জেরার্ড পিকের হাত ধরে বার্সেলোনার মাঠে ঢুকেছিলেন। বড়বেলায় স্পেনের হয়ে ইউরো কাপ জিতেছেন তিনি।
১৯৩০-এর দশকে প্রথমবার শিশুদের মাঠে আনার প্রথা চালু হয়। ২০০২ বিশ্বকাপে ফিফা ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এটিকে একটি অফিশিয়াল রূপ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল, বিশ্বজুড়ে শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং শান্তির বার্তা ছড়ানো। এখন স্পনসররা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাছাইকৃত সুবিধাবঞ্চিত বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদেরএই সুযোগ করে দেয়।
ভূত গাছ
রবিউল কমল

আমাদের বাড়ির পেছনে বিশাল বাগান। সেই বাগানে একটি গাছ আছে। আমগাছ, জামগাছ বা কাঁঠালগাছ নয়, আস্ত একটা ভূতগাছ! শুনতে অদ্ভুত লাগছে, তাই না? ভাবছ বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছি? একদমই না, সত্যি সত্যি একটি ভূতগাছ আছে! এই গাছ লাগিয়েছিলেন আমার দাদু। তাতে নানা রকম ভূত ধরে। থোকায় থোকায় ভূত। ডালে ডালে ঝুলে থাকে। আর যখন পেকে যায়, অমনি ভূতগুলো ঝরে পড়ে।
ভূতগাছের পাতাগুলো লাল। ডালগুলো মানুষের হাতের মতো। কেউ গাছতলায় গেলে অমনি লম্বা হয়ে যায়। তারপর গলা চেপে ধরে। দাদুর মুখে এসব শুনেছি। তবে আমি কখনো ভূতগাছের নিচে যাইনি। কেন যাইনি? সে কথাই বলছি শোনো।
দাদু একদিন বললেন, ‘শোন বাবুন, ওই গাছের নিচে কখনো যাবি না।’
আমি বলেছিলাম, ‘কেন গো দাদু। ওই গাছের নিচে গেলে কী হবে শুনি?’
‘ওখানে অনেক ভূত থাকে। ওইটা হলো ভূতগাছ,’ দাদু বলেছিলেন।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, ‘তা কী কী ভূত থাকে বলো দেখি?’
‘কয়টার নাম বলব। আমার কি আর অত নামধাম মনে থাকে। হরেক রকম ভূত থাকে, বুঝলি। তাদের নামও বেশ বাহারি। এই শুঁটকি ভূত, মুটকি ভূত, ধলা ভূত, কালা ভূত, নলা ভূত...আরো কী কী যেন নাম ওদের,’ একনাগাড়ে বলেছিলেন দাদু।
‘তুমি যখন এত করে বলছ, তা না হয় না-ই বা গেলাম,’ দাদুকে বলেছিলাম সেদিন।
তারপর কয়েকটা দিন কেটে গেল। আমার মাথা থেকে ভূতগাছের ব্যাপারটা যাচ্ছেই না। কোথাও কোনো একটা গণ্ডগোল তো আছেই। ভূতগাছে নাকি ফলের মতো ভূত ধরে। মানলাম ধরে, ঝুলেও থাকে। আবার পেকে গেলে ঝরে পড়ে! এ কথাও মেনে নিলাম। কিন্তু ঝরে পড়ার পর ওরা কোথায় যায়? কোথায় থাকে?
সেদিন দাদু বারান্দায় বসে পেপার পড়ছিলেন। আমি গেলাম তাঁর কাছে। আমাকে পুরো ব্যাপারটা জানতে হবে। বললাম, দাদু, তুমি তো বলেছিল, ভূতগুলো পেকে গেলে ঝরে পড়ে। তা বলো তো দেখি, ঝরে পড়ার পর ওরা কোথায় যায়? কোথায় থাকে? এত এত ভূতের তো আর ওই গাছে জায়গা হবে না, তাই না?
দাদু বললেন, ‘বাবুন, আমি ঢের বুঝতে পারছি, তুই আমার কথা বিশ্বাস করিসনি। শোন দাদুভাই তাহলে বলি, ভূত কি আর এক জায়গায় থাকে? ওরা নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ স্কুলে পড়তে যায়। স্কুলে ওদের হোস্টেল আছে, সেখানে থাকে। আবার কেউ যায় পুলিশের চাকরিতে, কেউ যায় সেনাবাহিনীতে। ওদের কি আর বসে থাকার সময় আছে?’
‘কী বলছ দাদু! ভূতের আবার স্কুল আছে?’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
‘তা কেন থাকবে না শুনি। ভূত বলে ওদের পড়ালেখার অধিকার নেই নাকি? ওরা কি ডাক্তার হবে না, ইঞ্জিনিয়ার হবে না?’ চশমাটা চোখে দিতে দিতে বললেন দাদু।
আমি আবার প্রশ্ন করি, ‘কিন্তু সেনাবাহিনী ও পুলিশের কথা বললে, এটা কি সত্যি?’
‘অবশ্যই সত্যি! তিন সত্যি! রাতের বেলা যেসব ভূত মানুষকে ভয় দেখায়, ওরাই হলো সেনাবাহিনী ও পুলিশ ভূত। তবে সব ভূতের ভয় দেখানোর অধিকার নেই। এ জন্য ওদের পরীক্ষায় বসতে হয়। যারা পাস করে তারাই শুধু ভয় দেখাতে পারে। মানে সেনাবাহিনী ও পুলিশ হতে পারে। আর যারা ফেল করে তারা হয় মেছো ভূত, গেছো ভূত,’ বলতে বলতে চলে গেলেন দাদু।
দাদুর কথা শুনে আমি পড়লাম দোটানায়। বাগানের ওই গাছটা কি সত্যিই ভূতগাছ? আর তাতে কি আসলেই ভূত ঝুলে থাকে? মাথা থেকে এসব প্রশ্ন কোনোভাবেই যাচ্ছে না। তাই একদিন গাছটার ওখানে যেতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু যদি ঘাড় মটকে দেয়! হাত ভেঙে দেয়! দাঁত তুলে নেয়!
পরদিন সাহস করে বিল্লুকে নিয়ে বাগানের দিকে গেলাম। বিল্লু হলো আমার পোষা বিড়াল। আদর করে বিল্লু ডাকি। কিছুদূর যাওয়ার পর ভূতগাছটা চোখে পড়ল। বুনোলতা আঁকড়ে রেখেছে। চারপাশে ঘন জঙ্গল। সূর্যের আলো ঠিকঠাক পড়ছে না। ভূতগাছ ও আশপাশে অন্ধকার হয়ে আছে। আর নিচে পাতা ঝরে ঝাঁপ হয়ে আছে। ঝরাপাতায় পা পড়তেই মড়মড় শব্দ হয়। ভয়ে আমি লাফিয়ে উঠি। পাতার শব্দ কেন মড়মড় হবে? তখন ডানা ঝাপটে উড়ে গেল একটি বিশাল পাখি। পুরো গাছটা যেন কেঁপে ওঠে।
ভয়ে আমি পিছিয়ে এলাম। পেছন ফিরে প্রাণপণে দৌড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এক পাও এগোতে পারছি না। জোরে চিৎকার করলাম। তবে গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। আমি ঘামছি। কপাল বেয়ে ঝরঝর ঘাম ঝরছে। কানের নিচে হালকা ঠাণ্ডা শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। পেছন ফিরে দেখি, একটি ডাল আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ডালটা হাত হয়ে গেছে। তারপর সে আমার গলা চেপে ধরে।
আমি আবার চিৎকার করি। বারবার চিৎকার করি। কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। হঠাৎ বিশাল জোরে কেউ যেন ধাক্কা দিল। চোখ খুলতেই দেখি, আম্মু পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আম্মু বলল, ‘এই সাতসকালে গোঙাচ্ছিস কেন? সকাল হয়েছে সেই কখন, স্কুলে যাবি না?’
