দৈনন্দিন জীবনে টাকার ব্যবহার অপরিহার্য। কোনো বস্তুর দাম পরিশোধের আধুনিক মাধ্যম হলো টাকা। টাকা দিয়েই প্রতিদিনের জিনিসপত্র কেনাকাটা করি। এটি হচ্ছে পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম, মূল্যের পরিমাপক। টাকা ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা অচল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য এই যে ছেঁড়া টাকা, পোড়া টাকা, আজেবাজে লেখাযুক্ত টাকা এবং ময়লা টাকায় ভরে গেছে পুরো দেশ। এসব টাকা দিয়ে লেনদেন করতে অনেক কষ্ট হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের খুচরা বাজারে এই জরাজীর্ণ টাকা গ্রাহকদের জন্য এক বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ, ১০ ও ২০ টাকার মলিন ও ছেঁড়া কাগজের নোট দৈনিক বাজারব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সবাই এসব নোট নিয়ে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিকেও ব্যাহত করছে।
জরাজীর্ণ এসব নোট নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষ। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি করে যে টাকা উপার্জন করছেন, তার মধ্যে যদি দু-একটি এমন নোট ঢুকে যায়, তবে দিনশেষে চাল-ডাল কিনতে গিয়ে তাঁকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। প্রতিদিন সামান্য কয়েক টাকার লেনদেন নিয়ে তৈরি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত তর্কাতর্কি, হাতাহাতি ও চরম তিক্ততা। বাস-লেগুনার কন্ডাক্টর, ফুটপাতের হকার, রিকশাচালক এবং সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে এই নোট আদান-প্রদান নিয়ে বচসা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।
টাকা শুধু বিনিময়ের মাধ্যমই নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার এবং জাতীয় মর্যাদারও ব্যাপার। বিদেশি পর্যটক বা ব্যবসায়ীরা যখন দেশে আসেন, তখন তাঁদের হাতে এমন জরাজীর্ণ নোট গেলে তাতে দেশেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট পরিবর্তন করে নতুন বা উপযোগী নোট দিতে বাধ্য। বিশেষ করে পাঁচ, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার ছোট নোট বিনিময়ের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ কাউন্টার চালু রয়েছে। কিন্তু সেই সুফল লাভ মোটেই সহজলভ্য নয়। নিয়ম থাকলেও ব্যাংকগুলো এটি মানতেই চায় না। উল্টো আরো বিব্রত হতে হয়। অভিযোগ করেও তেমন একটা ফল হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা শুধু বিভিন্ন ব্যাংক শাখার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতেই দেখা যায়। কিন্তু নির্দেশনাটুকু মানতে দেখা যায় না। ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার বিনিময় মূল্য প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে, বিনিময় মূল্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘আপনার কাছে থাকা ছেঁড়া বা নষ্ট নোট বদলানোর জন্য আপনার অ্যাকাউন্ট থাকা যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় অথবা নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন। যেকোনো ব্যাংকের শাখা যদি ছেঁড়া-ফাটা নোট গ্রহণ করতে বা বদল করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপন্থী। কোনো ব্যাংক শাখা সহযোগিতা না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।’
গত এপ্রিল মাসেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সার্কুলারে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়, ‘বাজারে ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোটের আধিক্য বেড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোকে এসব নোট বদলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তার পরও এসব নোটের প্রচলন বাজারে বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকার ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট বদল করে নিতে বিশেষ কাউন্টার খোলার নির্দেশ দিয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক পেজেও সার্কুলারটি আপলোড করা হয়েছে। সার্কুলারটি দেখার পর দেশের নাগরিকরা যেসব মন্তব্য করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।
নাজমুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘ব্যাংকাররা কানাকে হাইকোর্ট দেখায়। ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে গেলে বলে, ছয় মাস পরে নতুন নোট নিতে হবে। তারা ১০০টা ছেঁড়া নোটের একটা বান্ডেল মিলিয়ে সেটা তাদের হেড অফিসে পাঠাবে, হেড অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক হেড অফিসকে নতুন নোটের বান্ডেল দেবে, সেই নতুন নোটের বান্ডেল হেড অফিস থেকে ব্রাঞ্চে আসবে। এরপর গ্রাহককে নতুন নোট দেওয়া হবে। একাধিক ব্যাংকে গিয়ে এসব হয়রানিমূলক কথা শুনেছি।’
এস এম ইমামুল হক লিখেছেন, ‘আপনাদের এই বক্তব্য ঘোষণা বা পোস্ট পর্যন্ত কার্যকর, সোনালী ব্যাংকে সেদিন দুই হাজার টাকা দিলাম নিল না। ম্যানেজারের রুম পর্যন্ত গেলাম। তিনি বললেন, আমরা এগুলো নিতে পারব না।’
ওমর শাহাদাত লিখেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংকে গিয়েছিলাম টাকা জমা দেওয়ার জন্য। ৫০০ টাকার ছেঁড়া নোট নেয় না, বলে নতুন টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে দিতে।’
নাজমুল হোসাইন নাইম লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা মোটামুটি বেশির ভাগ ব্যাংকই মানে না। ছেঁড়া, ময়লা বা ফাটা জাতীয় টাকা দিলে কোনো ব্যাংকই গ্রহণ করে না। সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দিয়ে দেয় এবং বলে, টাকা পরিবর্তন করে দিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই বিষয়গুলো খুব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য।’
এমন কয়েক শ অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানিয়েছেন নেটিজেনরা। আর এসব অভিযোগে ছেঁড়া-ফাটা নোট ছাড়াও এসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথাও সামনে এসেছে, যার সমাধান একেবারেই বাঞ্ছনীয়। ছেঁড়া-ফাটা নোট থেকে বাঁচতে এম মোরশেদ নামের একজন লিখেছেন, ‘অতি জরুরি ভিত্তিতে ক্যাশলেস ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মান্ধাতার আমলের ব্যাংকিং কার্যক্রম আর কতকাল দেখবে জনগণ?’
ছেঁড়া-ফাটা নোট, জাল টাকা ও খুচরা টাকার ঝামেলা কমাতে ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একটিমাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা সহজেই পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের আর্থিক সচেতনতা বা ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষের আর্থিক সচেতনতা এখনো কম। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি শেখানো প্রয়োজন।
আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানো গেলে বাংলা কিউআরের মতো উদ্যোগ থেকে টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তবেই বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহজ করে তুলবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক




একসময় ডেঙ্গুকে শুধু ঢাকার রোগ বলা হতো। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন অতীত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের জরিপে বেশির ভাগ জেলায় ব্রেটো ইনডেক্স ২০ বা তার বেশি পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানে এই সূচক ২০-এর বেশি হলেই ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ এলাকাই এখন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আর শুধু সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।