• ই-পেপার

দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি

  • ড. সুলতান মাহমুদ রানা

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেন

নির্মল চক্রবর্তী

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেন

দৈনন্দিন জীবনে টাকার ব্যবহার অপরিহার্য। কোনো বস্তুর দাম পরিশোধের আধুনিক মাধ্যম হলো টাকা। টাকা দিয়েই প্রতিদিনের জিনিসপত্র কেনাকাটা করি। এটি হচ্ছে পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম, মূল্যের পরিমাপক। টাকা ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা অচল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য এই যে ছেঁড়া টাকা, পোড়া টাকা, আজেবাজে লেখাযুক্ত টাকা এবং ময়লা টাকায় ভরে গেছে পুরো দেশ। এসব টাকা দিয়ে লেনদেন করতে অনেক কষ্ট হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের খুচরা বাজারে এই জরাজীর্ণ টাকা গ্রাহকদের জন্য এক বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ, ১০ ও ২০ টাকার মলিন ও ছেঁড়া কাগজের নোট দৈনিক বাজারব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসবাই এসব নোট নিয়ে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিকেও ব্যাহত করছে।

জরাজীর্ণ এসব নোট নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষ। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি করে যে টাকা উপার্জন করছেন, তার মধ্যে যদি দু-একটি এমন নোট ঢুকে যায়, তবে দিনশেষে চাল-ডাল কিনতে গিয়ে তাঁকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। প্রতিদিন সামান্য কয়েক টাকার লেনদেন নিয়ে তৈরি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত তর্কাতর্কি, হাতাহাতি ও চরম তিক্ততা। বাস-লেগুনার কন্ডাক্টর, ফুটপাতের হকার, রিকশাচালক এবং সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে এই নোট আদান-প্রদান নিয়ে বচসা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

টাকা শুধু বিনিময়ের মাধ্যমই নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার এবং জাতীয় মর্যাদারও ব্যাপার। বিদেশি পর্যটক বা ব্যবসায়ীরা যখন দেশে আসেন, তখন তাঁদের হাতে এমন জরাজীর্ণ নোট গেলে তাতে দেশেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেনঅথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট পরিবর্তন করে নতুন বা উপযোগী নোট দিতে বাধ্য। বিশেষ করে পাঁচ, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার ছোট নোট বিনিময়ের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ কাউন্টার চালু রয়েছে। কিন্তু সেই সুফল লাভ মোটেই সহজলভ্য নয়। নিয়ম থাকলেও ব্যাংকগুলো এটি মানতেই চায় না। উল্টো আরো বিব্রত হতে হয়। অভিযোগ করেও তেমন একটা ফল হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা শুধু বিভিন্ন ব্যাংক শাখার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতেই দেখা যায়। কিন্তু নির্দেশনাটুকু মানতে দেখা যায় না। ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার বিনিময় মূল্য প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে, বিনিময় মূল্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আপনার কাছে থাকা ছেঁড়া বা নষ্ট নোট বদলানোর জন্য আপনার অ্যাকাউন্ট থাকা যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় অথবা নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন। যেকোনো ব্যাংকের শাখা যদি ছেঁড়া-ফাটা নোট গ্রহণ করতে বা বদল করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপন্থী। কোনো ব্যাংক শাখা সহযোগিতা না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।

গত এপ্রিল মাসেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সার্কুলারে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়, বাজারে ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোটের আধিক্য বেড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোকে এসব নোট বদলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তার পরও এসব নোটের প্রচলন বাজারে বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকার ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট বদল করে নিতে বিশেষ কাউন্টার খোলার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক পেজেও সার্কুলারটি আপলোড করা হয়েছে। সার্কুলারটি দেখার পর দেশের নাগরিকরা যেসব মন্তব্য করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

নাজমুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ব্যাংকাররা কানাকে হাইকোর্ট দেখায়। ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে গেলে বলে, ছয় মাস পরে নতুন নোট নিতে হবে। তারা ১০০টা ছেঁড়া নোটের একটা বান্ডেল মিলিয়ে সেটা তাদের হেড অফিসে পাঠাবে, হেড অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক হেড অফিসকে নতুন নোটের বান্ডেল দেবে, সেই নতুন নোটের বান্ডেল হেড অফিস থেকে ব্রাঞ্চে আসবে। এরপর গ্রাহককে নতুন নোট দেওয়া হবে। একাধিক ব্যাংকে গিয়ে এসব হয়রানিমূলক কথা শুনেছি।

এস এম ইমামুল হক লিখেছেন, আপনাদের এই বক্তব্য ঘোষণা বা পোস্ট পর্যন্ত কার্যকর, সোনালী ব্যাংকে সেদিন দুই হাজার টাকা দিলাম নিল না। ম্যানেজারের রুম পর্যন্ত গেলাম। তিনি বললেন, আমরা এগুলো নিতে পারব না।

ওমর শাহাদাত লিখেছেন, ইসলামী ব্যাংকে গিয়েছিলাম টাকা জমা দেওয়ার জন্য। ৫০০ টাকার ছেঁড়া নোট নেয় না, বলে নতুন টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে দিতে।

নাজমুল হোসাইন নাইম লিখেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা মোটামুটি বেশির ভাগ ব্যাংকই মানে না। ছেঁড়া, ময়লা বা ফাটা জাতীয় টাকা দিলে কোনো ব্যাংকই গ্রহণ করে না। সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দিয়ে দেয় এবং বলে, টাকা পরিবর্তন করে দিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই বিষয়গুলো খুব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য।

এমন কয়েক শ অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানিয়েছেন নেটিজেনরা। আর এসব অভিযোগে ছেঁড়া-ফাটা নোট ছাড়াও এসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথাও সামনে এসেছে, যার সমাধান একেবারেই বাঞ্ছনীয়। ছেঁড়া-ফাটা নোট থেকে বাঁচতে এম মোরশেদ নামের একজন লিখেছেন, অতি জরুরি ভিত্তিতে ক্যাশলেস ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মান্ধাতার আমলের ব্যাংকিং কার্যক্রম আর কতকাল দেখবে জনগণ?

ছেঁড়া-ফাটা নোট, জাল টাকা ও খুচরা টাকার ঝামেলা কমাতে ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বাংলা কিউআর লেনদেন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একটিমাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা সহজেই পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের আর্থিক সচেতনতা বা ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষের আর্থিক সচেতনতা এখনো কম। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি শেখানো প্রয়োজন।

আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানো গেলে বাংলা কিউআরের মতো উদ্যোগ থেকে টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তবেই বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহজ করে তুলবে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

বাংলাদেশ পুলিশের নতুন বাস্তবতা ও করণীয়

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার

বাংলাদেশ পুলিশের নতুন বাস্তবতা ও করণীয়

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে পুলিশ বাহিনী নানা পর্যায়ে আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, তদন্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যুক্ত হয়েছে, জরুরি সেবার জন্য ৯৯৯ চালু হয়েছে, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় বিশেষ সক্ষমতা গড়ে উঠেছে এবং কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক আরো জোরদার করার চেষ্টা হয়েছে। তবু একটি মৌলিক বাস্তবতা আজও বাকি রয়ে গেছেদেশের বেশির ভাগ থানা এখনো প্রায় একই ধরনের সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, যদিও তাদের জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি, অপরাধের ধরন এবং কাজের চাপ একেবারেই এক নয়।

বাংলাদেশে এমন বহু থানা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিনের কাজের চাপ একটি ছোট জেলার সমান, আবার কোথাও একটি থানার জনসংখ্যা একটি জেলার জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে এমন অনেক থানা রয়েছে, যেখানে মামলার সংখ্যা, অপরাধের প্রকৃতি এবং জননিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কিন্তু জনবল বণ্টন, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে এই বৈষম্যের যথাযথ প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়।

রাজধানীর পাশের কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা কিংবা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মতো থানাগুলো এই বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এসব থানায় জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ, শিল্প-কারখানার বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য, মহাসড়ক, শ্রমিকের চলাচল এবং প্রতিদিনের জনসমাগমের কারণে পুলিশকে বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। স্থানীয় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা প্রচলিত যে কেরানীগঞ্জ থানার জনসংখ্যা দেশের কয়েকটি ছোট জেলার সমপর্যায়ের। একইভাবে ফটিকছড়ি থানায় মামলার চাপ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ অনেক জেলার তুলনায় বেশি বলে মাঠ পর্যায়ে আলোচিত হয়। এসব তুলনা সরকারি হালনাগাদ তথ্য দিয়ে যাচাই করা উচিত হলেও বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট করেসব থানাকে একই কাঠামোতে পরিচালনা করা আর কার্যকর সমাধান নয়।

আজকের বাংলাদেশে অপরাধের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় একটি থানার প্রধান কাজ ছিল চুরি, ডাকাতি, মারামারি বা হত্যা মামলার তদন্ত। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সাইবার প্রতারণা, মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, মাদকচক্র, কিশোর গ্যাং, নারী ও শিশু নির্যাতন, সড়ক নিরাপত্তা, শিল্পাঞ্চলের শ্রম অসন্তোষ, ভিআইপি নিরাপত্তা, বড় জনসমাবেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জরুরি সেবায় তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়ার মতো অসংখ্য নতুন দায়িত্ব। একজন পুলিশ সদস্যের পক্ষে একই সঙ্গে এসব বিষয়ে সমান দক্ষতা অর্জন করা বাস্তবসম্মত নয়।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশেষায়ণ একটি স্বীকৃত নীতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেমন একজন চিকিৎসক একই সঙ্গে হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ ও শিশু চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ হন না, তেমনি পুলিশিংয়েও প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে সব ধরনের কাজে সমান দক্ষতা প্রত্যাশা করা যৌক্তিক নয়। উন্নত বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে তাই থানা বা স্থানীয় পুলিশ ইউনিটের ভেতরেই তদন্ত, সাইবার অপরাধ, জনশৃঙ্খলা, গোয়েন্দা তথ্য, ভিকটিম সাপোর্ট এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার জন্য পৃথক বিশেষায়িত দল গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

কেন জনসংখ্যাভিত্তিক পুলিশ ইউনিট গঠন এখন সময়ের দাবি : একটি থানার দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ভৌগোলিক আয়তন বিবেচনা করলেই চলবে না। অন্তত পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে(১) জনসংখ্যা, (২) দৈনিক জনসমাগম বা ভাসমান জনগোষ্ঠী, (৩) অপরাধের ধরন ও সংখ্যা, (৪) শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং (৫) গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা। এই পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে থানার জনবল, যানবাহন, প্রযুক্তি, তদন্ত সক্ষমতা এবং নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হলে পুলিশি সেবা আরো কার্যকর হবে।

ধরা যাক, একটি থানায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ বসবাস করে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ কর্মস্থল, বাজার, আদালত, শিল্পাঞ্চল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে। সেখানে প্রতিদিন শত শত সাধারণ ডায়েরি (জিডি), বহু অভিযোগ, অসংখ্য ট্রাফিক সমস্যা, পারিবারিক বিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ, সাইবার প্রতারণা, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ এবং বিভিন্ন ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে একটি ছোট জেলায় বা কম জনসংখ্যার থানায় একই মাত্রার চাপ না-ও থাকতে পারে। কিন্তু যদি উভয় থানাকে প্রায় একই প্রশাসনিক কাঠামো ও সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালনা করা হয়, তাহলে বড় থানার জনগণ স্বাভাবিকভাবেই কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধের প্রকৃতি বদলে গেছে। বর্তমানে পুলিশের কাজ শুধু মামলা নেওয়া বা তদন্ত করা নয়। একটি থানাকে একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত, নারী ও শিশু সুরক্ষা, মাদকবিরোধী অভিযান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, বড় জনসমাবেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং জরুরি সেবায় তাৎক্ষণিক সাড়া দিতে হয়। এত ভিন্নধর্মী দায়িত্ব একই কর্মকর্তা বা একই টিমের ওপর অর্পণ করলে দক্ষতা ও জবাবদিহিদুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে জন্য এখন সময় এসেছে প্রতিটি থানায় দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন করার। 

জনসংখ্যাভিত্তিক পুলিশ ইউনিট গঠন এবং অপরাধভিত্তিক কর্মবিভাজন শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয়, এটি জনগণের সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে কার্যকর পুলিশিং মানেই শুধু অপরাধ দমন নয়, বরং মানুষের কাছে দ্রুত, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দেওয়া। এর পরের অংশে আমি প্রতিটি থানায় কী ধরনের বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে, কতজন সদস্য থাকবে এবং কেন বড় থানাগুলোকে এসপি বা অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে মিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিতএ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

থানায় বিশেষায়িত ইউনিট গঠন ও আধুনিক পুলিশিংয়ের অপরিহার্য রূপরেখা : বর্তমান সময়ে একটি থানার কাজ শুধু মামলা নেওয়া বা আসামি গ্রেপ্তার করা নয়। একটি থানা এখন একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ তদন্ত, সাইবার অপরাধ মোকাবেলা, নারী ও শিশু সুরক্ষা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ভিআইপি নিরাপত্তা, দুর্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম এবং জনগণের জরুরি সেবার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের উন্নত পুলিশ বাহিনীগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, থানার ভেতরেই পৃথক ইউনিট গঠন করে প্রতিটি ইউনিটকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে একজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই বিষয়ে কাজ করতে করতে সেই ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশেও সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা গেলে তদন্তের মান যেমন বাড়বে, তেমনি জনগণও দ্রুত ও উন্নত সেবা পাবে।

১. পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ইউনিট : এটি হবে থানার সবচেয়ে বড় ইউনিট। রাজনৈতিক কর্মসূচি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ঈদ, পূজা, নির্বাচন, শ্রমিক আন্দোলন, বড় জনসমাবেশ, সড়ক অবরোধ, ভিআইপি সফর, আকস্মিক সংঘর্ষ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই ইউনিট মাঠে কাজ করবে। সাধারণ থানায় এই ইউনিটে ৮০ থেকে ১৫০ জন সদস্য থাকতে পারেন।

২. মামলা তদন্ত ও ফরেনসিক ইউনিট : বাংলাদেশে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ার অন্যতম কারণ তদন্তের ওপর অতিরিক্ত চাপ। একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে মামলা তদন্ত, আদালতে হাজিরা, আসামি গ্রেপ্তার, ভিআইপি ডিউটি এবং প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। ফলে তদন্তের গতি কমে যায়। প্রতিটি থানায় একটি স্বতন্ত্র তদন্ত ইউনিট গঠন করা উচিত, যেখানে থানার আকার অনুযায়ী ২০ থেকে ৬০ জন তদন্ত কর্মকর্তা থাকবেন।

৩. সাইবার ক্রাইম ও ডিজিটাল ফরেনসিক ইউনিট : বর্তমানে প্রতারণার বড় অংশই অনলাইনে সংঘটিত হচ্ছে। বিকাশ, নগদ, ব্যাংকিং জালিয়াতি, ফেসবুক হ্যাকিং, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ডিজিটাল প্রতারণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপরাধ দ্রুত বাড়ছে। তাই প্রতিটি থানায় কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচজন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়ে একটি সাইবার ইউনিট থাকতে হবে।

৪. জরুরি সাড়া ও ৯৯৯ রেসপন্স ইউনিট : অনেক সময় দেখা যায়, জরুরি ফোন পাওয়ার পরও ঘটনাস্থলে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়। কারণ নির্দিষ্ট রেসপন্স টিম থাকে না। প্রতিটি থানায় ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত একটি রেসপন্স ইউনিট থাকতে হবে, যেখানে ১৫ থেকে ৩০ জন সদস্য পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন।

৫. কমিউনিটি পুলিশিং ও ভিকটিম সাপোর্ট ইউনিট : অপরাধ দমন শুধু গ্রেপ্তার করলেই হয় না, অপরাধ প্রতিরোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অপরিহার্য। এই ইউনিটে ১০ থেকে ২০ জন সদস্য থাকবেন। তাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, মন্দির, শিল্প-কারখানা, নারী সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করবেন। নারী ও শিশু নির্যাতনের ভুক্তভোগীদের আইনি ও মানবিক সহায়তাও দেবেন।

৬. গোয়েন্দা ও অপরাধ বিশ্লেষণ ইউনিট : অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ ঘটার আগেই তথ্য সংগ্রহ করা বেশি কার্যকর। প্রতিটি থানায় ১০ থেকে ১৫ জন সদস্যের একটি গোয়েন্দা ও ক্রাইম অ্যানালিসিস ইউনিট থাকতে হবে। তারা অপরাধপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করবে, কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ চক্র এবং সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তথ্য বিশ্লেষণ করবে।

বড় থানাগুলোকে কেন মিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটে রূপান্তর করতে হবে : বাংলাদেশের অনেক থানার কাজের চাপ এরই মধ্যে একটি জেলার সমান বা তারও বেশি। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো এখনো একটি সাধারণ থানার মতো। এর ফলে একজন পুলিশ সুপারকে পুরো জেলার পাশাপাশি এমন একটি বিশাল থানার দিকেও সমানভাবে নজর দিতে হয়, যা বাস্তবে কঠিন। এ কারণে কেরানীগঞ্জ, সাভার, ফতুল্লা, ফটিকছড়ি, আশুলিয়া, সীতাকুণ্ড, রূপগঞ্জ, টঙ্গীসহ উচ্চ জনসংখ্যা ও উচ্চ অপরাধপ্রবণ থানাগুলোকে মিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। যেসব থানার জনসংখ্যা ১০ লাখের বেশি, বছরে হাজার হাজার মামলা রুজু হয়, গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল রয়েছে এবং নিয়মিত বড় জনসমাগম ঘটে, সেসব ইউনিটের নেতৃত্বে একজন পুলিশ সুপার (এসপি) থাকা উচিত।

এ ধরনের সংস্কারের ফলে একদিকে জেলার পুলিশ সুপার পুরো জেলার সার্বিক তদারকিতে মনোযোগ দিতে পারবেন, অন্যদিকে বড় থানাগুলোও নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত জনবল পাবে। এতে মামলা তদন্তের মান উন্নত হবে, জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ হবে, জরুরি সেবায় সাড়া দেওয়ার সময় কমবে, পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটবে।

বাংলাদেশে কেন এই পরিবর্তন জরুরি : বাংলাদেশ আজ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, মেট্রো রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে মানুষের চলাচল ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু পুলিশের অনেক থানার সাংগঠনিক কাঠামো এখনো বহু বছর আগের বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে পরিচালিত হচ্ছে।

কেন এই সংস্কার অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ : আইন-শৃঙ্খলা শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত। যেখানে মামলা দ্রুত তদন্ত হয়, অপরাধ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পুলিশ দ্রুত সাড়া দেয়, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ পুলিশ প্রশাসনের আধুনিকায়ন শুধু পুলিশের স্বার্থে নয়, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই বাংলাদেশ পুলিশের আগামী দিনের সংস্কার শুধু নতুন পদ সৃষ্টি বা জনবল বৃদ্ধি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রকৃত সংস্কার হবে তখনই, যখন জনসংখ্যা, অপরাধের ধরন, অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং প্রযুক্তিগত বাস্তবতাকে ভিত্তি করে প্রতিটি থানার জন্য পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। সেই সংস্কারের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব বাংলাদেশ পুলিশ।

লেখক : অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি

জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে

ড. কবিরুল বাশার

জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে

কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই প্রায় এক হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা এর অন্তত পাঁচ গুণ বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ অনেক রোগী হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে অথবা তাদের রোগ শনাক্তই হচ্ছে না। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে বাংলাদেশ আবারও একটি বড় ডেঙ্গু মৌসুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৬৪ সালে দেশে প্রথম ডেঙ্গুর উপস্থিতি ধরা পড়ে। তখন এটিকে ঢাকা ফিভার নামে চিহ্নিত করা হয়। ২০০০ সালে প্রথম বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের মাধ্যমে এটি বৈজ্ঞানিকভাবে ডেঙ্গু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে বছর কয়েক হাজার মানুষ আক্রান্ত হয় এবং বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর পর থেকে ডেঙ্গু প্রায় প্রতিবছরই ফিরে এসেছে; কখনো সীমিত আকারে, কখনো মহামারির রূপ নিয়ে। ২০১৯ সালে এটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়। ২০২৩ সালে লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত এবং সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু মহামারির সাক্ষী হয় দেশ। ২০২৬ সালেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। চলতি মৌসুমে গতকাল পর্যন্ত প্রায় সাত হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায় এডিস মশার দুটি প্রধান প্রজাতি; এডিস ইজিপটাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের মাধ্যমে। এডিস ইজিপটাই মূলত নগরাঞ্চলে এবং মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে বংশবিস্তার করে, আর অ্যালবোপিকটাস শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় বেশি দেখা যায়। উভয় প্রজাতিই কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে এবং বর্ষাকালে দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উচ্চ তাপমাত্রাও এখন এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য আরো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হতে পারেএকসময় ডেঙ্গুকে শুধু ঢাকার রোগ বলা হতো। কিন্তু সেই বাস্তবতা এখন অতীত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের জরিপে বেশির ভাগ জেলায় ব্রেটো ইনডেক্স ২০ বা তার বেশি পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানে এই সূচক ২০-এর বেশি হলেই ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি থাকে। অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ এলাকাই এখন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে আর শুধু সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে।

আমরা এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছি। এই মডেল অনুযায়ী, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যদি এখনই কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। এরই মধ্যে জুলাইয়ের শুরু থেকেই রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী এবং মাঠ পর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্বও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে এ বছর ডেঙ্গুর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশাল, বাগেরহাট, কক্সবাজার, ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, কুমিল্লা, বান্দরবান, চাঁদপুর, খুলনাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তাই এখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

অনেকেই মনে করেন, বর্তমানে মশা কম, তাই ডেঙ্গুর ঝুঁকিও কম। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ষাকালে কিউলেক্স মশার সংখ্যা বৃষ্টির কারণে কমে যায় বলে সামগ্রিকভাবে মশা কম মনে হয়। কিন্তু প্রকৃতিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার অনুপাত মোট মশার ১ শতাংশের কম হলেও একটি সংক্রমিত এডিস মশার একটি কামড়ই একজন মানুষকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। ফলে বাসায় মশা কম দেখেই মশারি ব্যবহার না করা, ফুলহাতা পোশাক না পরা কিংবা দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত না রাখা মারাত্মক ভুল হতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। সরকার, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং প্রতিটি নাগরিককে এ কাজে একযোগে অংশ নিতে হবে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, অব্যবহৃত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম, এসির ট্রে কিংবা যেকোনো পাত্রে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে পরিবেশবান্ধব জৈব লার্ভিসাইড অথবা ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর (আইজিআর) ব্যবহার করা যেতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।

তবে প্রযুক্তি বা কীটনাশক একা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই এই লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তরুণসমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে সারা বছরই সচেতনতা ও উৎস ধ্বংস কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য রোগীর চাপ মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখতে হবে। চিকিৎসক ও নার্সদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় নিয়মিত ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

ডেঙ্গু এখন আর কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিক্রিয়ামূলক নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক, তথ্যনির্ভর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়। আমরা যদি আজ এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, আধুনিক নজরদারিব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করি, তাহলে আগামী দিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই সংকট আরো বড় আকারে ফিরে আসবে, যার মূল্য দিতে হবে আমাদের সমাজ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই লড়াই শুধু সরকারের নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ও আমাদের প্রস্তুতি

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ও আমাদের প্রস্তুতি

মধ্য জুন ২০২৬ থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন ঘন সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা, জাপান, আফগানিস্তান, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, চীনের সিচুয়ান এবং বাংলাদেশের ভূমিকম্পমানুষের মনে ভয় জাগিয়ে তুলেছে। আমাদের দেশে যাঁরা বহুতল ইমারতে বসবাস করছেন, পুরনো ঘিঞ্জি এলাকায় নড়বড়ে দালানকোঠায় কোনো রকমে ঠাঁই নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁরা বেশ আতঙ্কিত জীবন যাপন করছেন। গেল মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প আসলে আমাদের কী বার্তা দিয়ে ফেলেছে, তা নিয়ে ভূমিকম্পবিশারদদের মধ্যে ভাবনার অন্ত নেই।

ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা টেকটোনিক প্লেটগুলো ক্রমাগত সঞ্চালিত হচ্ছে। যখন দুটি প্লেটের মধ্যে চাপ দীর্ঘদিন ধরে জমা হয় এবং হঠাৎ তা মুক্তি পায়, তখনই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান এ ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়ার উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এসব ভূমিকম্প মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তাও।

সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় একাধিক ভূমিকম্প স্থানীয় জনগণের সঙ্গে গোটা দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ২৪ জুন ২০২৬ দেশটিতে আঘাত হানা ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ জুলাই পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এটিকে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের দুই হাজার ছয় শর বেশি উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতির সহায়তায় ভেনেজুয়েলার উদ্ধার দলগুলো কংক্রিট ও লোহার স্তূপের নিচে চাপা পড়া জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। চার দিন পর আবারও ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় ৪.৬ মাত্রার একটি আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকর্মী ও বেঁচে যাওয়া মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সেখানে সাড়ে চার হাজার মানুষ আহত এবং ৫২ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।

অন্যদিকে জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। প্রায় প্রতিবছরই দেশটি ছোট-বড় অসংখ্য ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়। তবু জাপানে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ তারা ভূমিকম্পকে অস্বীকার করেনি, বরং বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করে প্রস্তুতি নিয়েছে। ভূমিকম্প সহনশীল ভবন, উন্নত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত মহড়া এবং জনগণের সচেতনতা জাপানকে বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় উদাহরণে পরিণত করেছে।

আফগানিস্তানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছরে দেশটিতে সংঘটিত একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প কয়েক হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চল, দুর্বল আবাসনব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সীমিত উদ্ধার সক্ষমতার কারণে ভূমিকম্প সেখানে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়। আফগানিস্তানের ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের মাত্রা শুধু ভূমিকম্পের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, একটি দেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে।

বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের বিধ্বংসী ভূমিকম্প ঘটেনি, তবু মাঝেমধ্যে অনুভূত কম্পন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বাংলাদেশ কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি অবস্থান করছে। দেশের দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্ব এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক প্রভাব বিদ্যমান। সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা অঞ্চলের আশপাশে কয়েকটি সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা শক্তি কোনো এক সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসও সে সাক্ষ্য দেয়। ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প এই অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল। ফলে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।

ঢাকা মহানগরীকে কেন্দ্র করে যে ভয় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তা হলো একটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি। রাজধানীতে বহু ভবন যথাযথ প্রকৌশল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা এবং অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো তাই বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের আগাম সতর্কসংকেত। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই নগরীতে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং খোলা জায়গার অভাব বড় ধরনের দুর্যোগে উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ বা উদ্ধারযান প্রবেশ করাই কঠিন। তাই নগর পরিকল্পনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কোথাও ভূমিকম্প হলে আমরা প্রায়ই ভয়ে নানা কথা বলি, ভূমিকম্প মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে লেখালেখি, সেমিনার, টক শো শুরু করি। এসব তৎপরতা দুই দিন পরেই থেমে যায়। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেট, হাসপাতাল, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালতে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া দেওয়ার কথা ভুলে যাই! তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায়, এমনকি আমাদের আশপাশে ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রবণতা অনুধাবন করে আমাদের সদা সতর্ক থাকা উচিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতি বারবার সতর্ক করে। যারা সেই সতর্কবার্তা বুঝতে পারে, তারা টিকে থাকে; আর যারা উপেক্ষা করে, তারা বিপর্যয়ের মূল্য চোকায়। তাই এত ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নতুন কৌশল নিতে হবে। কারণ এসব ঘন ঘন ভয়াবহ ভূমিকম্প মানবসভ্যতার জন্য একটি বিশেষ জাগরণী বার্তা!

এ জন্য প্রথম বার্তা হলো, নগর পরিকল্পনার বিকল্প নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক শহরের মতো বাংলাদেশের শহরগুলোও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজেই ভবন নির্মাণে কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ, পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রণয়ন এবং নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসচেতনতা। ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং কী করা উচিত নয়এসব বিষয়ে এখনো দেশের বেশির ভাগ মানুষ পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখে না। আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে বা জানালা দিয়ে লাফ দেওয়ার কারণে অনেক সময় প্রাণহানি ঘটে। তাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত এবং আবাসিক এলাকায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

তৃতীয়ত, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া চালু করা জরুরি। জাপান, নিউজিল্যান্ড, সুমাত্রা কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে নিয়মিত মহড়া জনগণকে প্রস্তুত রাখে। বাংলাদেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বছরে কয়েকবার বাধ্যতামূলক মহড়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে মানুষ দুর্যোগের সময় কিভাবে দ্রুত ও নিরাপদভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, তা শিখতে পারবে।

চতুর্থত, আমাদের দেশে দুর্যোগ হলে উদ্ধার ও জরুরি সেবা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে হবে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করা গেলে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এ জন্য ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স, সেনাবাহিনী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আধুনিক অনুসন্ধান ও উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং পর্যাপ্ত জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটি পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। ভূমিকম্পের পর প্রথম সহায়তা সাধারণত প্রতিবেশী ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেই আসে। তাই ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এবং উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কমিউনিটিভিত্তিক প্রস্তুতি অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার চেয়েও দ্রুত কার্যকর হয়।

এ ক্ষেত্রে জাপান একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশটি ভূমিকম্প বন্ধ করতে পারেনি, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সক্ষম হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখায় যে দুর্যোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রস্তুতি। অন্যদিকে আফগানিস্তান বা অন্য কিছু দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুর্বল অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের উচিত ইতিবাচক উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং দুর্বলতার জায়গাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা।

ভূমিকম্প কখন হবে, তা আমরা জানি না, কিন্তু এটি যেকোনো সময় ঘটতে পারে। এই বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতে হবে। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার কার্যক্রমের চেয়ে দুর্যোগের আগে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ বেশি জরুরি। নিরাপদ অবকাঠামো, সচেতন নাগরিক, আধুনিক উদ্ধারব্যবস্থা, শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনাএই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প সহনশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে। প্রকৃতি কখন সতর্কবার্তাকে বাস্তবে রূপ দেবে, তা কেউ জানে না। কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। আর সেই প্রস্তুতি গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো এখনই।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়