মানুষের ইতিহাসে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো শুধু ভাষার অংশ নয়, বরং মানুষের চিন্তা, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কের বিবর্তনের সাক্ষী। ‘বন’ বা ফরেস্ট তেমনই একটি শব্দ। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা সাধারণত গাছপালায় আচ্ছাদিত বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডকে বুঝি। কিন্তু এই শব্দটি কি আদি কাল থেকেই সেই অর্থ বহন করত? ‘ফরেস্ট’ শব্দটি কি মূলত প্রাকৃতিক অরণ্য বোঝানোর জন্য তৈরি হয়েছিল, নাকি এটি মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ব্যবহারের ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছিল?
কৃষিভিত্তিক সভ্যতার শুরুর দিকে পৃথিবীর বেশির ভাগ ভূখণ্ডই ছিল অনাবাদি, অনিয়ন্ত্রিত এবং মানবপ্রশাসনের বাইরে। এগুলোকে বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন নামে ডাকা হতো—জঙ্গল, অরণ্য ইত্যাদি। এসব ভূমির মূল্য তখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। কৃষি সম্প্রসারণের যুগে অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোকে অনুৎপাদনশীল বা সভ্যতার বাইরে অবস্থিত এলাকা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল যে এই ভূখণ্ড শুধু বন্য প্রকৃতির আশ্রয়স্থল নয়, এগুলো কাঠ, জ্বালানি, শিকার, ঔষধি উদ্ভিদ, পানির উৎস এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভাণ্ডার। আর তখনই ‘বন্য ভূমি’ ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপনার আওতায় ‘পরিচালিত বন সম্পদ’-এ রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, ইংরেজি ফরেস্ট শব্দটি এসেছে পুরনো ফরাসি ভড়ত্ল্গং থেকে, যার উৎস মধ্যযুগীয় লাতিন forestis silva। সে সময় শব্দটি দিয়ে এমন এক ধরনের ভূমিকে বোঝানো হতো, যা বসতির বাইরের হলেও রাষ্ট্রীয় বা রাজকীয় আইনের অধীনে সংরক্ষিত। অর্থাৎ ফরেস্ট শব্দটি প্রথম থেকেই কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদতাত্ত্বিক বা পরিবেশগত শ্রেণিকে নির্দেশ করত না, বরং এটি ছিল প্রশাসনিক ধারণা, ভূমি ব্যবস্থাপনার ধারণা। বনের ধারণা কেন বদলে গেল? আঠারো ও উনিশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে কাঠের চাহিদা বাড়তে থাকে। জাহাজ নির্মাণ, খনি, রেলপথ, ঘরবাড়ি, কাগজশিল্প—সব ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ কাঠ প্রয়োজন হয়। এই সময় বন আর শুধু শিকারক্ষেত্র রইল না, এটি হয়ে উঠল রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সম্পদ। এর ফলে বনবিজ্ঞানের জন্ম হয়। বনকে প্রথমবারের মতো একটি উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে—বনকে সংজ্ঞায়িত করা শুরু হয় তার উৎপত্তি দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা দিয়ে।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী বনের সংজ্ঞা ব্যবহার করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও। সর্বশেষ বনকে সংজ্ঞায়িত করা হয় প্রধানত বৃক্ষ আচ্ছাদন, বৃক্ষের উচ্চতা, ভূমি ব্যবহার এবং বনভিত্তিক কার্যকারিতার ভিত্তিতে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এফএও স্পষ্টভাবে বনকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করেছে—১. যেখানে গাছপালা মূলত প্রাকৃতিকভাবে জন্মেছে। ২. যেখানে বেশির ভাগ গাছ মানুষের রোপণ বা পরিকল্পিত বপনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বনবিজ্ঞানে ‘মানুষের লাগানো বন’ কোনো বিরোধপূর্ণ ধারণা নয়, বরং এটি বহু দশক ধরে স্বীকৃত।
নতুন গবেষণা কী বলছে? সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো আরো সূক্ষ্ম চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালের গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে পুনর্জন্মশীল বন জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক প্রজাতি নির্বাচন করে পুনর্বনায়ন করলে উষ্ণমণ্ডলীয় বন দ্রুত পুনরুদ্ধার হতে পারে এবং এর কার্বন ধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ আধুনিক বনবিজ্ঞান ‘প্রাকৃতিক বন বনাম কৃত্রিম বন’ ধরনের দ্বৈত বিভাজন থেকে অনেকটাই সরে এসেছে।
২০২৫ সালে এফএও জোর দিচ্ছে বনকে একটি বৃহত্তর সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার ওপর। সেখানে বনকে শুধু গাছের সমষ্টি নয়, বরং জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু, ভূমি ব্যবহার ও মানবজীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ এতে বন শব্দটি আরো বেশি কার্যকর ও ব্যবস্থাপনাভিত্তিক ধারণায় পরিণত হয়েছে।
‘বনায়ন’ শব্দটি কি বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ? আন্তর্জাতিক পরিভাষা অনুযায়ী উত্তর হলো, হ্যাঁ। যদি বন শব্দটি শুধু প্রাকৃতিক অরণ্যের জন্য সংরক্ষিত হতো, তাহলে ‘afforestation’ শব্দটির অস্তিত্বই থাকত না। কারণ afforestation-এর আক্ষরিক অর্থই হলো যেখানে আগে বন ছিল না, সেখানে বন সৃষ্টি করা।
বিতর্কের প্রকৃত সমাধান কোথায়? বাস্তবিক অর্থে কোন ভূমিসত্তা ‘বন কি না’ প্রশ্নটি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি কি প্রাকৃতিক বন? এটি কি পুনরুদ্ধারকৃত বন? এটি কি সামাজিক বন? বন একটি প্রাকৃতিক সত্তা, আবার মানবিক নির্মাণও। শব্দের ইতিহাস আমাদের একটি চমকপ্রদ সত্য শেখায়। ফরেস্ট শব্দটির জন্ম হয়েছিল মানুষের ভূমি ব্যবস্থাপনার ভাষা হিসেবে। পরে বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং পরিবেশচিন্তার বিকাশের সঙ্গে এর অর্থ বিস্তৃত হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে বন বলতে আমরা যেমন প্রাচীন অরণ্য বুঝি, তেমনি বুঝি পুনর্জন্মশীল বন, পুনর্বনায়নকৃত ভূখণ্ড, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা বৃক্ষ-বাস্তুতন্ত্রও। তাই বৈজ্ঞানিকভাবে অধিকতর সঠিক বক্তব্য হলো, সব বন সমান নয়, কিন্তু সব বনই যে প্রাকৃতিক হতে হবে এমন কোনো আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা নেই।
লেখক : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



অনেক কিছুই বদলেছে, আরো বদলাবে বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু ভেতরের যে সমাজকাঠামো, সেটা তো বদলাচ্ছে না। সেখানে ভিক্ষাদাতার সংখ্যা যতই হোক, ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক। আর এই মানুষজনের কেউই ইচ্ছা করে ভিক্ষুক হয়নি। বাধ্য হয়েই ভিক্ষুক হয়েছে। আর সাধারণ মানুষের কথাই বা আলাদা করে বলি কেন, আমাদের ধনীরাও ভিক্ষুকই, তদবির করে, তোষামোদে ক্লান্ত হয় না; আমাদের সরকারও তো ভিক্ষার হস্ত প্রসারিত করেই রেখেছে দাতা, সাহায্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদির কাছে। বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থাই হচ্ছে নদী, তার স্রোতই নানা খাল, বিল, জলাশয় ও পুকুরে গিয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সামাজিক বৈষম্যের নদী শুকাবে কী, দিন দিন ফুলেফেঁপে উঠেছে।
সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ওয়েবিনারে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান পরিবেশ আদালত আইন সংশোধন করার ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আইন প্রয়োগে একটি পরিবেশ ফোর্স ইউনিট গঠন প্রয়োজন। পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা রাখা, সরকারি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন এই আইনের সংশোধন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করার অধিকার না থাকাটা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে মূলত এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বশেষ উপলব্ধিটিই প্রকাশ পেয়েছে। এই উপলব্ধি হচ্ছে এমন এক বিষয়, যার মধ্য দিয়ে কার্যত এটিই খোলাসা হয়ে গেল যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের প্ররোচনায় এই যুদ্ধে জড়িয়ে তাদের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ভুল কাজটি করেছে। এটি এমনই এক ভুল, যার জন্য দেশটিকে খেসারত দিয়ে যেতে হবে অনেক দিন। এটি তাদের জন্য এমন এক আত্মঘাতী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার খেসারত দিতে হতে পারে সামনের দিনগুলোতে মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবং নির্বাচনোত্তর সময়ে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য ভরাডুবির মধ্য দিয়ে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিসংশনের মতো বিষয়ও সামনে চলে আসতে পারে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও এরই মধ্যে আবারও একে অপরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখনো হুংকার দিয়ে বলতে শোনা যায়,