১৯৫৪ সালে স্যার আর্থার লুইস যখন ‘ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট উইথ আনলিমিটেড সাপ্লাইজ অব লেবার’ শিরোনামে তাঁর ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন, তখন বিশ্বের কেউ ভাবেননি যে ৭০ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ তাঁর সেই তত্ত্বের জীবন্ত পরীক্ষাক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করতে বসলে লুইসের দ্বি-পথ কাঠামো যেন দর্পণের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়।
লুইস বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে দুটি সমান্তরাল পথ থাকে। একদিকে থাকে ‘ঐতিহ্যবাহী পথ’—কৃষি, অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য, গ্রামীণ শ্রম, যেখানে প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শূন্যের কাছাকাছি, কিন্তু মানুষ টিকে থাকে। অন্যদিকে থাকে ‘আধুনিক পথ’—কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প, শহরের নতুন পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা যেখানে শ্রমের চাহিদা ক্রমবর্ধমান। এই দুটি পথের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনাই হলো উন্নয়নের মূল রহস্য বা সূত্র।
লুইস তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটি হলো ‘টার্নিং পয়েন্ট’, যখন ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হয়ে যায় এবং মজুরি বাড়তে শুরু করে। এই বিন্দু অতিক্রম করলে দেশটি প্রকৃত উন্নয়নের পথে প্রবেশ করে। কিন্তু বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমরা এই টার্নিং পয়েন্টের সামনে এসে থমকে আছি—এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু নীতিকাঠামো সেই সুযোগ ধরতে পারছে না।
দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো কৃষিতে নিয়োজিত। তাদের প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা শিল্প বা সেবা খাতের তুলনায় চার থেকে ছয় গুণ কম। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮ শতাংশ। লুইসের ভাষায়, এই বরাদ্দ ঐতিহ্যবাহী পথ আরো দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখবে।
বাজেটে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু এই বৃদ্ধির গঠন দেখলে লুইসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর উদ্বেগ জাগায়। বরাদ্দের বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে বিদ্যমান বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করছাড় ও প্রণোদনায়, কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নয়।
লুইস দেখিয়েছেন যে আধুনিক পথ শুধু তখনই ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে শ্রম আকর্ষণ করতে পারে, যখন সেখানে মজুরির পার্থক্য বজায় থাকে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি শ্রম সরবরাহের গতির চেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে মাত্র পাঁচ থেকে সাত লাখ। বাকিরা কোথায় যাচ্ছে? তারা ভিড় করছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, রিকশায়, ফুটপাতে, মৌসুমি কৃষিতে—লুইসের ঐতিহ্যবাহী পথের গভীরে।
মানবপুঁজির রূপান্তরের পূর্বশর্ত পূরণ হচ্ছে কি? লুইসের তত্ত্বে একটি প্রায়-উপেক্ষিত দিক হলো ‘সক্ষমতা-সেতু’। শুধু শ্রম স্থানান্তরিত হলেই হয় না—সেই শ্রমকে আধুনিক পথে উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হয়। এই সেতু না থাকলে শহরে মানুষ আসে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ে না।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য সহজ ঋণ, ডিজিটাল লেনদেনের সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হয়রানি থেকে মুক্তি—এই তিনটি বিষয় অনানুষ্ঠানিক খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক খাতের দিকে টেনে আনতে পারে। বাজেটে এর প্রতিফলন কোথায়? ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরিতে কোনো বিনিয়োগ নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স একটি অনন্য মাত্রা যোগ করেছে, যা লুইস নিজে কল্পনা করেননি। বিদেশে যাওয়া শ্রমিকরা মূলত ঐতিহ্যবাহী পথ থেকে আসেন এবং তাঁদের পাঠানো অর্থ পরিবারের ভোগব্যয় বাড়ায়, কিন্তু উৎপাদনশীল বিনিয়োগ সব সময় হয় না। ভোগব্যয় অন্যভাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে, কিন্তু টেকসই রূপান্তরে দ্রুত প্রভাব রাখে না।
লুইস দেখিয়েছেন, উন্নয়নের চালিকাশক্তি হলো একটি বিনিয়োগ চক্র : আধুনিক পথ মুনাফা করে, সেই মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ হয়, আরো মুনাফা আসে। এই চক্রের গতি বাড়াতে হলে আধুনিক খাতকে মুনাফা ধরে রাখার সুযোগ দিতে হবে—সেই সঙ্গে সেই মুনাফার উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের করপোরেট ট্যাক্সের কাঠামো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে, কিন্তু বড় সমস্যা রয়ে গেছে—দেশীয় মুনাফার একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে বা বিদেশে চলে যাচ্ছে। পুঁজিপাচারের এই সমস্যার বিরুদ্ধে বাজেটে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেই। লুইসের বিনিয়োগচক্র তাই সম্পূর্ণ হচ্ছে না।
নারীশ্রমের রূপান্তর : লুইসের তত্ত্বের অপূর্ণ অধ্যায়—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্য মূলত নারীশ্রমের আধুনিক পথে প্রবেশের ফসল, এটি একটি সত্যিকারের লুইসীয় রূপান্তর। ৪০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক ঐতিহ্যবাহী পথের গৃহস্থালি ও অনানুষ্ঠানিক কাজ ছেড়ে আনুষ্ঠানিক শিল্পে এসেছেন। এই রূপান্তর শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও।
স্যার আর্থার লুইস নোবেল বক্তৃতায় সতর্ক করেছেন, ‘উন্নয়নের কোনো স্বয়ংক্রিয় পথ নেই। প্রতিটি দেশকে তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই সিদ্ধান্তগুলো এখন নিতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট একটি সন্ধিক্ষণের বাজেট। দেশের সামনে সুযোগ আছে লুইসের টার্নিং পয়েন্ট অতিক্রম করার। কিন্তু সে জন্য দরকার তিনটি জিনিস : আধুনিক খাতে কর্মসংস্থান সৃজন, মানবপুঁজিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক রূপান্তর।
লুইস একবার বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের অর্থ হলো মানুষকে সুযোগ দেওয়া।’ বাংলাদেশের বাজেট সেই সুযোগের কাঠামো তৈরি করছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে নীতিনির্ধারকদের। সংখ্যার আড়ালে যে মানুষগুলো লুকিয়ে আছেন গ্রামের মাঠে, শহরের ফুটপাতে, কারখানার সারিতে—তাঁদের জীবনের গল্পই বলবে এই বাজেট সত্যিকারের উন্নয়নের বাজেট ছিল কি না।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও গবেষক



গত ২ জুন ২০২৬ ‘ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন’ আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকে ‘এল নিনোর জন্য সতর্ক হোন’ শিরোনামে সাবধান করেছে। সংস্থার মহাসচিব সম্ভাব্য খরা, ভারি বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহবান জানিয়েছেন। ১১ জুন ২০২৬ ‘ন্যাশনাল ওশিয়ানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ ঘোষণা করেছে, এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং শরৎকালে এটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। গত ১৬ জুন রয়টার্স এবারের এল নিনো গত ‘সাত দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি’ হতে পারে বলে প্রতিবেদন ছেপেছে। প্রতিবেদনে এশিয়ায় গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া এবং খাদ্য উৎপাদনে ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। এই একই তারিখে গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘শক্তিশালী এল নিনো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের যুগপৎ প্রভাব অস্ট্রেলিয়ায় তাপপ্রবাহ, দাবানল ও প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’ এবারের এই এল নিনো নিয়ে বিবিসি (১১ জুন ২০২৬) লিখেছে, এটি শেষ পর্যন্ত ‘সুপার’ এল নিনোতে রূপ নিতে পারে—এমনকি এটি এযাবৎকালের রেকর্ডকৃত শক্তিশালী এল নিনোগুলোর মধ্যেও অন্যতম হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী ২৬ জুন সকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও শিক্ষা, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বিনিময় ও সহযোগিতা জোরদার, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারি ইত্যাদি গুরুত্ব পায়। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে এবং উভয় দেশের মৌলিক স্বার্থ ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়গুলোতে পরস্পরকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি করতে চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরের উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে চীনের সহযোগিতার কথা জানান। তিনি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করার ব্যাপারে চীনের আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। ওই দিন তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ন্যাশনাল স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি। তাঁদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি ছাড়াও রাজনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে কথাবার্তা হয়।