শিশুদের বিকাশে আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার জায়গায় প্রধানত শহুরে সমাজে ঘরোয়া বিনোদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের বিনোদনের প্রতি শিশুদের অভ্যস্ত হওয়া তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা হয়তো বিবিধ কারণে এ ধরনের বিনোদনের প্রতি সন্তানদের অভ্যস্ত করছি। সময়ের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত মাঠের অভাব, শিশুদের নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা অন্য কোনো কারণে আমরা ঘরোয়া বিনোদনে সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছি। এই বিনোদনে শিশুদের মধ্যে কোনো শিক্ষণীয় বিষয় লক্ষ করা যায় না, বরং এক ধরনের প্রতিযোগিতা এবং আসক্তি তাদের মধ্যে তৈরি করে।
আমরা হয়তো এ ধরনের বিনোদনকে বিকল্প ভাবছি। কিন্তু এই বিকল্পের পরিণতি নিয়ে ভাবছি না। এখনো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ছোট-বড় মাঠ আছে। এ ছাড়া বাইরে কোনো না কোনো মাঠ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, ছুটির দিন কিংবা বিকেলবেলা এই মাঠ ব্যবহারের কোনো সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠান দেয় না। দ্বিতীয়ত, এখানে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় যদি মাঠগুলো বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে খুলে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী এর সুযোগ নিতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া এবং টিউশনে এতটাই ব্যস্ত রাখি যে ছুটির দিন ছাড়া তাদের কোনো অবসরই নেই। অনেক ক্ষেত্রে শুক্রবারও তাদের টিউশন থাকে। শিশুদের সারাক্ষণ লেখাপড়ায় ব্যস্ত না রেখে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনের সঙ্গে পরিচিত করে না তুলতে পারলে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। অধুনা বিনোদন বলতে বাইরের কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া এবং এক কোণে সেই ঘরোয়া বিনোদন। যেভাবেই বলি না কেন, ঘরোয়া বিনোদন শিশুদের বিকাশের পরিবর্তে গেমসের প্রতি এক ধরনের আসক্তি এবং আবার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করছে।
আমরা বই পড়ে যতটা না শিখি, তার চেয়ে বেশি জানা ও শেখা যায় আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে। অবশ্যই শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে এবং গঠনমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই শিশুরা বেশি শিখবে। ঘরোয়া বিনোদনে আটকে থাকা শিশুর সঙ্গে অন্যদের তেমন কোনো আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয় না। শিশুদের পছন্দ, বিকল্পের অভাব এবং ঝামেলামুক্ত হওয়ায় আজ এমন বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।
অন্যদিকে আমরা যদি বাইরের বিনোদনের দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব, এখানে শেখার সুযোগ অনেক বেশি। ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্যান্য খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ ও গড়ন তৈরি হয়, মানসিক শক্তি ও সাহস বেড়ে যায়, যা তাদের অনেক দূর নিয়ে যায়। অন্যের সঙ্গে তারা দ্রুত মিশতে পারে। আরো বড় সুবিধা আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে তাদের ধ্যান-ধারণা, মনের বিকাশ, আচার-আচরণের পরিবর্তন মোটাদাগে তাদের সামাজিকীকরণে এক বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবারের বাইরে যে প্রতিনিধিকে আমরা সামাজিকীকরণের বড় মাধ্যম বলি, তা হলো পিয়ার গ্রুপ। তাদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা যা শেখে, তা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনোভাবেই শিখতে পারে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাবের বিনিময় না হলে প্রকৃত শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের শিশুদের নিজেদের অজান্তে কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এক অর্থে বঞ্চিত করছি; যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং পরবর্তী জীবনে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের ওপর। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু বড় হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে একদম মেলামেশা করে না। বাসায় মেহমান এলে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনা এবং কথাবার্তা পর্যন্ত হয় না। আমরা এমনও লক্ষ করি, শিশুরা একসঙ্গে থেকেও কারো সঙ্গে কারো ভাব বিনিময় করতে দেখা যায় না। মোবাইল আসক্তি তাদের পেয়ে বসে।
আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যালয়ের মাঠকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যেখানে বিকেলবেলা শিশুরা খেলতে পারে। মাঠের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। যে বিনোদন আমরা ঘরের মধ্যে ব্যবস্থা করছি, তাকে বাইরে নিয়ে আসতে হবে, যেখানে সবাই একসঙ্গে কিংবা কয়েকজন শিশু বিনোদন পেতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের মাঠে দোলনা ও শারীরিক গড়ন তৈরি হয় এমন সব খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুদের বিরতি শুধু টিফিন নয়, নাম হবে টিফিন এবং খেলাধুলা। এ কাজে তাদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যালয়ে শিশুরা শুধু একাডেমিক লেখাপড়া করতে যায় না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার ভিত তৈরিও বড় বিষয়। সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং বিকাশ মুখ্য বিষয়। মানুষের সঙ্গে মেশার এবং ভাব বিনিময়ের এক চারণভূমি হবে প্রতিটি বিদ্যালয়। আমরা যদি বিদ্যালয়গুলোকে এভাবে তৈরি করতে পারি, তাহলে ঘরোয়া বিনোদনের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ থাকবে না। শিশুরা ঘরোয়া বিনোদনকে ‘না’ বলবে। এ কাজে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক, দায়িত্বশীল ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ এ কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পারবে আমাদের শিশুদের সনাতন বিনোদনকে পুনরায় ব্যাপকভাবে ফিরিয়ে আনতে।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট



বিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু একটি বৃহৎ প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি আবেগ। একটি স্বপ্ন। মানবতার সপক্ষে ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন। এই ফুটবলের মধ্যে মানবজাতির কল্যাণ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য লুকিয়ে আছে শক্তিশালী অস্ত্র। কথা হলো কূট আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিপক্ষে লড়ার শক্তি ফিফার খুব কম। এই অবস্থায় মানবতার অপমানকে ফিফা রুখতে পারবে না। এটিই বাস্তবতা। ইরানের প্রতি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দনীয় আচরণের পরও ইরান ফুটবলে অংশ নিয়েছে। ইরানের অংশগ্রহণ পুরো দুনিয়াকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ইরান যেভাবে বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছে, এটি খেলায় জেতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু! এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।


অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণকারী প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে মুদ্রাপ্রবাহ কমানোর ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। তবু খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের একটি বিশাল অংশ খেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।