kalerkantho

শুক্রবার। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। ১৮ রবিউস সানি ১৪৪২

সরকারি গাড়ির চাহিদা মেটাচ্ছে প্রগতি

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারি গাড়ির চাহিদা মেটাচ্ছে প্রগতি

জেনারেল মোটরসের কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৬৬ সালে ‘গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজ’ নামে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র গাড়ি সংযোজন কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে; সেই কারখানাটিই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশে ‘প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ (পিআইএল) নাম দিয়ে জাতীয়করণ করা হয়। গত ৪৮ বছরে বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুল্যান্স, পাজেরো মডেলের গাড়ি সংযোজন করে আসছে। নিজেদের কারিগরি দক্ষতার উন্নয়নের ফলে এই বহরে বর্তমানে জাপানের বিশ্বখ্যাত মিত্সুবিশি মোটরস করপোরেশনের সর্বাধুনিক পাজেরো স্পোর্টস কিউএক্স মডেলের সংযোজন হচ্ছে। অচিরেই একই প্রতিষ্ঠানের ডাবল কেবিন পিকআপ (এল ২০০ মডেল) সংযোজন হবে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে। নিজেরাই সংযোজন করবে বলে অপেক্ষাকৃত কম দামে গাড়িটি বিক্রি করতে পারবে প্রগতি। ফলে বিপুল চাহিদার ডাবল কেবিন পিকআপের বড় বাজারটির দখল করতে পারবে বলে আশা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য অত্যাধুনিক সংযোজন কারখানা স্থাপনের জন্য কাজ করছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

পিআইএল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মূলত সরকারি পুলের গাড়ি সরবরাহের দায়িত্ব প্রগতি একাই পালন করে আসছে। সরকারি চাহিদার গাড়ি সরবরাহ করেই গত অর্থবছরে আয় করেছে ৭৩৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। সরকারি কোষাগারে ৪৩২ কোটি টাকা দেওয়ার পরও সব মিলিয়ে ১০১ কোটি ৪০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ যেখানে লোকসান গুনছে সেখানে গাড়ি বিক্রি এবং মুনাফা দ্বিগুণ করার হাতছানি এখন প্রগতির সামনে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত বছর দেশে সিঙ্গল ও ডাবল কেবিন পিকআপ নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ১১ হাজার। এর মধ্যে ডাবল কেবিন পিকআপের চাহিদা ছিল প্রায় ছয় হাজার। গত অর্থবছরেও জাপানের বিখ্যাত মিত্সুবিশি ব্র্যান্ডের ডাবল কেবিন পিকআপের ৭০০ ইউনিট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এত দিন এসব গাড়ি তারা সরাসরি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় (সিবিইউ-কমপ্লিট বিল্ট ইউনিট) এনে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিত। কিন্তু এবার নিজস্ব কারখানায় ডাবল কেবিন পিকআপ সংযোজন করতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত গাড়ি সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। বর্তমানে এল-২০০ মডেলের ডাবল কেবিন পিকআপের দাম পড়ে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা। কিন্তু প্রগতি সংযোজিত একই মডেলের গাড়ির দাম ৪০ লাখ টাকার মধ্যে থাকবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ সাশ্রয় হবে বলে তাঁরা জানান।

ডাবল কেবিন পিকআপ সংযোজনের সুবিধা বর্ণনা করতে গিয়ে পিআইএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিত্সুবিশি এল-২০০ মডেলের ডাবল কেবিন পিকআপ গাড়িটি সংযোজন হলে বর্তমান অসম প্রতিযোগিতার বাজারে প্রগতিকে আর ব্যবসা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। বর্তমানে এই মডেলের সিবিইউ গাড়ির বাজারমূল্য ৪৮ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু আমরা সংযোজন করলে এই গাড়ির দাম ৪০ লাখের মধ্যে চলে আসবে। এতে সরকারি অর্থ যেমন সাশ্রয় হবে তেমনি প্রগতির ব্যবসা ও মুনাফাও দ্বিগুণ করা সম্ভব।’

এ জন্য চলতি মার্চ থেকে বাণিজ্যিক উত্পাদনে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গত ১১ নভেম্বর থেকে বিপুল চাহিদার মিত্সুবিশি এল-২০০ মডেলের ডাবল কেবিন পিকআপ পরীক্ষামূলক উত্পাদন শুরু করছে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ। বছরে কয়েক শ কোটি টাকার ব্যবসার হাতছানি থাকলেও এই প্রকল্পে প্রগতিকে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে সাকল্যে এক থেকে দেড় কোটি টাকা। দুই দফা পরীক্ষামূলক উত্পাদনে ১২টি গাড়ি সংযোজন করে উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রগতির প্রকৌশলীরা। আগামী ২৫ মার্চ সর্বশেষ কোয়ালিটি কন্ট্রোল সভায় বাণিজ্যিক উত্পাদনের অনুমোদন পাওয়ার কথা থাকলেও বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সেটি কিছুটা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। কারণ করোনাভাইরাস ভীতির কারণে মিত্সুবিশির জাপান ও থাইল্যান্ড থেকে আট বিশেষজ্ঞের টিম তাঁদের সফর বাতিল করেছে।

চুক্তি অনুযায়ী ডাবল কেবিন পিকআপ বাণিজ্যিক উত্পাদনে গেলে প্রথম বছরে সংযোজন করতে হবে এক হাজার ২০০ ইউনিট এল-২০০ পিকআপ আর দ্বিতীয় বছরে দুই হাজার ইউনিট। তবে প্রগতির চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড এলাকায় অবস্থিত কারখানায় বর্তমান যে সেটআপ তাতে প্রতিদিন চারটি গাড়ি সংযোজন করা সম্ভব। বর্তমানে পাজেরো কিউএক্স মডেলটি বছরে কমবেশি ৫০০টি সংযোজন করা হয়। এর সঙ্গে বছরে আরো এক হাজার এল-২০০ পিকআপ সংযোজন হলে ২০২০ সালে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি সংযোজন করতে হবে প্রগতির কারখানায়। বছরে আড়াই শ কর্মদিবস হিসেবে যা প্রতিদিন ছয়টি করে। বর্তমান জনবল দিয়ে তা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নের জবাবে পিআইএলের উপপ্রধান প্রকৌশলী (কারখানা প্রধান) কায়কোবাদ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান জনবল দিয়েই শিফটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিদিন ৬ ইউনিট গাড়ি সংযোজন সম্ভব। কয়েক মাস আগে বেশ কিছু জনবল নিয়োগ হয়েছে। তা ছাড়া প্রস্তাবিত নতুন অত্যাধুনিক অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট স্থাপন হলে তখন প্রতিদিন অনেক বেশি গাড়ি সংযোজন সম্ভব হবে।’

এ জন্য ৫৪ বছরের পুরনো সংযোজন কারখানার পাশে অত্যাধুনিক আরেকটি গাড়ি অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে প্রগতির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। নতুন সংযোজন কারখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ড্রয়িং, ডিজাইন, সম্ভাব্য খরচসহ সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নে এরই মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার অটোমেটিভ ইনভেস্টমেন্ট হোল্ডিংস পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে।

নতুন কারখানা চালু হলে এখনকার বছরে এক হাজার ইউনিট গাড়ির পরিবর্তে এক শিফটে বছরে ২৫ হাজার গাড়ি সংযোজন করা যাবে। আর যদি চাহিদার ভিত্তিতে দুই শিফট চালু করা যায় তাহলে বছরে ৫০ হাজার ইউনিট গাড়ি সংযোজন সম্ভব হবে বলে জানালেন পিআইএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুজ্জামান। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের রিপোর্ট জমা দিলে সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্বের সবচেয়ে নামি কম্পানি দিয়েই অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট তৈরি করা হবে। এ জন্য সুনির্দিষ্ট নির্মাণ ব্যয় কত হবে তা আমাদের জানা নেই। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট হাতে পেলেই ব্যয়ের প্রকৃত হিসাবটা জানা যাবে।’ তবে সম্পূর্ণ ব্যয় সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হবে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য