• ই-পেপার

সাবধানে থাকিস

আজন্ম খেলাপি

আজন্ম খেলাপি

আব্বা রাগ হয়ে একবার বলল, তোমারে বড় করতে অনেক টাকা খরচ করছি। সব পরিশোধ করে যেদিকে চলে যেতে মন চায়, যাও। বললাম, তোমাকেও যতবার আব্বা ডাকছি, ততবার আমাকে আব্বা ডাকো। আব্বা হেসে বলল, তোমার-আমার এই ঋণে দুজনেই আজন্ম খেলাপি।

এহসান টিপু

সহকারী শিক্ষক, বেতাগী শিকদারিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পটুয়াখালী

বাবা হয়ে বুঝেছি

বাবা হয়ে বুঝেছি

বাবাকে দেখেছি শাসনপ্রিয় মানুষ হিসেবে। তাঁর উপদেশগুলো বিরক্তিকর, নিষেধাজ্ঞাগুলো স্বাধীনতার পথে বাধা বলে মনে হতো। কিন্তু জীবন যখন নিজেই শিক্ষক হয়ে উঠল, তখন বুঝলামবাবার প্রতিটি কথার পেছনে ছিল অভিজ্ঞতার আলো এবং ভালোবাসার গভীরতা। শৈশবে সংসারের অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা খুব একটা বুঝিনি। কারণ বাবা ছিলেন সেই ঢাল, যার আড়ালে আমরা নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি। আজ বুঝি সবকিছুর পেছনে বাবার নীরব আত্মত্যাগ। আজ আমিও একজন বাবা। নিজের সন্তানের মুখের দিকে তাকালে বাবার অনেক আচরণের অর্থ নতুন করে আবিষ্কার করি। এখন বুঝি সন্তানের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে রাত জেগে থাকা কী, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা কী, নিজের ইচ্ছাগুলোকে গোপনে বিসর্জন দেওয়া কী। সন্তানকে নিরাপদ রাখার জন্য কঠোর হওয়া কখনো কখনো ভালোবাসারই আরেকটি ভাষা। যে কথাগুলো একসময় কঠিন মনে হতো, আজ সেগুলোই জীবনের মূল্যবান শিক্ষা বলে মনে হয়।

মোহাম্মদ শাহজামান শুভ

সিনিয়র শিক্ষক, বাতাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা

মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াস

মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াস

বাবা বড় বড় কথা বলতেন না। আজীবন সহজ-সরল জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, লোভ নেই। মোহ তাঁকে পরাভূত করতে পারেনি। তাঁর ভালোবাসার ভাষা ছিল ভোরবেলার সাইকেলের ঘণ্টা, সন্ধ্যায় বাজারের ব্যাগ, আর রাত জেগে আমার পরীক্ষার খাতা গুছিয়ে রাখা। একদিন পুরনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি হলদে খাম পেলাম। খামের ওপরে লেখা—‘আমার ছেলের জন্য, যখন সে আমাকে বুঝতে শিখবে। বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে চিঠিটি খুললাম। লেখা ছিল—‘তুই হয়তো ভাবিস, আমি তোকে খুব বকাঝকা করি। কিন্তু জানিস, যে গাছটি প্রিয়, সেই গাছটিকেই প্রয়োজনমতো জল দিয়ে, বেড়া দিয়ে যত্ন করতে হয়। তুই যেন আমার চেয়ে বড় মানুষ হোসএটাই আমার স্বপ্ন। বড় চাকরি পেলি কি পেলি না, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াস, তাহলেই আমি জিতে যাব। চিঠির শেষে আর কোনো লেখা নেই। কলমের কালি হঠাৎ থেমে গেছে। মনে হলো, সেদিনই হয়তো বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন! আর সেই চিঠি কোনো দিন শেষ করতে পারেননি! এত দিন ভেবেছিলাম, বাবা আমাকে কখনোই বোঝেননি। অথচ তিনি নীরবে আমার ভবিষ্যেক সাজিয়ে রেখেছিলেন। পরদিন বাবার পুরনো সাইকেলটি বের করলাম। মরচে পড়া ঘণ্টিটি বাজাতেই মনে হলো, বাবা দূর থেকে বলছেন, ধীরে চালা, পড়ে যাস না। সেই সাইকেলে চেপে গ্রামের স্কুলে গেলাম। কিছু দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীকে বই-খাতা দিলাম। তাদের হাসিমুখ দেখে মনে হলো, বাবার অসমাপ্ত চিঠির শেষ লাইনটি আজ নিজের হাতে লিখে দিলাম। বাড়ি ফিরে চিঠির নিচে ছোট্ট করে লিখলাম—‘বাবা, তুমি যে মানুষ হতে বলেছিলে, সেই পথেই হাঁটছি। পথটা কঠিন, কিন্তু তোমার শিক্ষা আমার সবচেয়ে বড় সাহস।

 

দেবব্রত দত্ত, পূর্ব মেদিনীপুর, ভারত

চুড়ি ভাঙার গল্প

চুড়ি ভাঙার গল্প

ছোটবেলায় সাজগোজপ্রিয় ছিলাম। রঙিন ফিতা, কাচের চুড়ি, টিপএসবের প্রতি ছিল অদ্ভুত আকর্ষণ। মনে হতো, এগুলোই বুঝি বড় হয়ে ওঠার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়। পুতুল খেলতাম। আব্বাজি কাঠ দিয়ে পুতুলের খাট তৈরি করে দিয়েছিলেন। একদিন নতুন চুড়ি পরে খুব আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আব্বাজি অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কাছে ডেকে আমার হাতের চুড়িগুলো খুলে ভেঙে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি আমার চুড়ি ভাঙলে কেন? শান্তভাবে বললেন, তোমার নামের অর্থ জানো? তুমি নেতৃত্ব দেবে, দেশ চালাবে। আট-দশটা মেয়ের মতো চুড়ির শিকলে বন্দি হয়ে থাকার জন্য তোমার জন্ম হয়নি। সেদিন কথাগুলোর অর্থ বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝি, তিনি চুড়ি ভাঙেননি, ভেঙেছিলেন সমাজের তৈরি এক অদৃশ্য সীমারেখা। চার ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোনো ভেদাভেদ ছিল না। গণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের তত্ত্ব, যুক্তির অনুশীলনসবকিছুই তিনি আমাকে কঠোরভাবে শিখিয়েছেন। কখনো বকেছেন, কখনো শাসন করেছেন, ভুল করলে রেহাই দেননি। তখন মনে হতো, কেন এত কঠিন? আজ বুঝি, তাঁর সেই কঠোরতাই ছিল বড় আশীর্বাদ। তিনি শিখিয়েছিলেন, কারো করুণার জন্য নয়,  মেয়েরা নিজের যোগ্যতায় দাঁড়ানোর জন্য জন্মায়। মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। আজ জীবনের বহু পথ পেরিয়ে যখন প্রতিকূলতার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, তখন বারবার সেই ভাঙা চুড়ির শব্দ কানে বাজে। মনে হয়, সেটি ছিল মুক্তির শব্দ। একটি মেয়ে আকাশ ছুঁতে পারে, যদি তাকে ডানা মেলার সাহস শেখানো হয়। আর সেই সাহসের প্রথম শিক্ষক ছিলেন আমার আব্বাজি।

 

নন্দিনী লুইজা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা