বাবা বড় বড় কথা বলতেন না। আজীবন সহজ-সরল জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন। উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, লোভ নেই। মোহ তাঁকে পরাভূত করতে পারেনি। তাঁর ভালোবাসার ভাষা ছিল ভোরবেলার সাইকেলের ঘণ্টা, সন্ধ্যায় বাজারের ব্যাগ, আর রাত জেগে আমার পরীক্ষার খাতা গুছিয়ে রাখা। একদিন পুরনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি হলদে খাম পেলাম। খামের ওপরে লেখা—‘আমার ছেলের জন্য, যখন সে আমাকে বুঝতে শিখবে।’ বিস্ময়ে কাঁপতে কাঁপতে চিঠিটি খুললাম। লেখা ছিল—‘তুই হয়তো ভাবিস, আমি তোকে খুব বকাঝকা করি। কিন্তু জানিস, যে গাছটি প্রিয়, সেই গাছটিকেই প্রয়োজনমতো জল দিয়ে, বেড়া দিয়ে যত্ন করতে হয়। তুই যেন আমার চেয়ে বড় মানুষ হোস—এটাই আমার স্বপ্ন। বড় চাকরি পেলি কি পেলি না, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াস, তাহলেই আমি জিতে যাব।’ চিঠির শেষে আর কোনো লেখা নেই। কলমের কালি হঠাৎ থেমে গেছে। মনে হলো, সেদিনই হয়তো বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন! আর সেই চিঠি কোনো দিন শেষ করতে পারেননি! এত দিন ভেবেছিলাম, বাবা আমাকে কখনোই বোঝেননি। অথচ তিনি নীরবে আমার ভবিষ্যেক সাজিয়ে রেখেছিলেন। পরদিন বাবার পুরনো সাইকেলটি বের করলাম। মরচে পড়া ঘণ্টিটি বাজাতেই মনে হলো, বাবা দূর থেকে বলছেন, ‘ধীরে চালা, পড়ে যাস না।’ সেই সাইকেলে চেপে গ্রামের স্কুলে গেলাম। কিছু দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীকে বই-খাতা দিলাম। তাদের হাসিমুখ দেখে মনে হলো, বাবার অসমাপ্ত চিঠির শেষ লাইনটি আজ নিজের হাতে লিখে দিলাম। বাড়ি ফিরে চিঠির নিচে ছোট্ট করে লিখলাম—‘বাবা, তুমি যে মানুষ হতে বলেছিলে, সেই পথেই হাঁটছি। পথটা কঠিন, কিন্তু তোমার শিক্ষা আমার সবচেয়ে বড় সাহস।’
দেবব্রত দত্ত, পূর্ব মেদিনীপুর, ভারত