ছোটবেলায় সাজগোজপ্রিয় ছিলাম। রঙিন ফিতা, কাচের চুড়ি, টিপ—এসবের প্রতি ছিল অদ্ভুত আকর্ষণ। মনে হতো, এগুলোই বুঝি বড় হয়ে ওঠার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়। পুতুল খেলতাম। আব্বাজি কাঠ দিয়ে পুতুলের খাট তৈরি করে দিয়েছিলেন। একদিন নতুন চুড়ি পরে খুব আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আব্বাজি অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কাছে ডেকে আমার হাতের চুড়িগুলো খুলে ভেঙে ফেললেন। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি আমার চুড়ি ভাঙলে কেন?’ শান্তভাবে বললেন, ‘তোমার নামের অর্থ জানো? তুমি নেতৃত্ব দেবে, দেশ চালাবে। আট-দশটা মেয়ের মতো চুড়ির শিকলে বন্দি হয়ে থাকার জন্য তোমার জন্ম হয়নি।’ সেদিন কথাগুলোর অর্থ বুঝিনি। কিন্তু আজ বুঝি, তিনি চুড়ি ভাঙেননি, ভেঙেছিলেন সমাজের তৈরি এক অদৃশ্য সীমারেখা। চার ভাইয়ের সঙ্গে আমার কোনো ভেদাভেদ ছিল না। গণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের তত্ত্ব, যুক্তির অনুশীলন—সবকিছুই তিনি আমাকে কঠোরভাবে শিখিয়েছেন। কখনো বকেছেন, কখনো শাসন করেছেন, ভুল করলে রেহাই দেননি। তখন মনে হতো, কেন এত কঠিন? আজ বুঝি, তাঁর সেই কঠোরতাই ছিল বড় আশীর্বাদ। তিনি শিখিয়েছিলেন, কারো করুণার জন্য নয়, মেয়েরা নিজের যোগ্যতায় দাঁড়ানোর জন্য জন্মায়। মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। আজ জীবনের বহু পথ পেরিয়ে যখন প্রতিকূলতার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি, তখন বারবার সেই ভাঙা চুড়ির শব্দ কানে বাজে। মনে হয়, সেটি ছিল মুক্তির শব্দ। একটি মেয়ে আকাশ ছুঁতে পারে, যদি তাকে ডানা মেলার সাহস শেখানো হয়। আর সেই সাহসের প্রথম শিক্ষক ছিলেন আমার আব্বাজি।
নন্দিনী লুইজা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা