অজেয় হয়ে উঠেছিল ইংল্যান্ডের আইলিংটন কোরিন্থিয়ান্স। ১৯৩৭ সালে তিন মাস বিদেশ সফরে থাকা এই দল হারেনি কোনো ম্যাচ। জয়যাত্রাটা থামল ২ নভেম্বর ঢাকা স্টেডিয়ামে। হেরে বসে ঢাকা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের কাছে। রুদ্ধশ্বাস ফুটবল ম্যাচটিতে জয়সূচক গোলটি করেছিলেন ময়মনসিংহ জেলারই কৃতী ফুটবলার পাখী সেন (আসল নাম ভূপেন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত)। তাঁর মতো কীর্তিমান আরো অনেক ফুটবলার এই জেলাকে পঞ্চাশের দশকে এনে দিয়েছিলেন অনন্য সম্মান। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, ১৯৫১ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রাদেশিক ফুটবলের প্রথম তিনটি আসরের চ্যাম্পিয়ন ময়মনসিংহ জেলা দল। প্রায় শতাব্দী পুরনো সূর্যকান্ত শিল্ড ফুটবল টুর্নামেন্টে কলকাতার মোহনবাগান, ইস্ট বেঙ্গল, কালীঘাট, অরিয়ান্স বেঙ্গল রেলওয়ে ছাড়াও এই অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দলগুলো খেলতে আসত ময়মনসিংহে। স্টেডিয়ামে থাকা শিল্ডটির গায়ে রুপার পাতে খচিত বিজয়ীদের তালিকায় কলকাতা মোহনবাগানের নাম (১৯২০) না থাকলে এটাও অবিশ্বাস্য মনে হতো। ব্রহ্মপুত্র কাপ ফুটবল, সুরেন্দ্র সরোজিনী থমসন কাপ ফুটবল, কিন্ডারসলি কাপ ও পরে মোনায়েম খান গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট এ জেলা শহরে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো এ কথা এ প্রজন্মের অনেকের জানা নেই। ফুটবলের বর্তমান হাল দেখলে এটা বিশ্বাস করারও কথা নয়। ময়মনসিংহ ফুটবলের বর্ণাঢ্য অতীতও প্রজন্মের অনেকের কাছেই স্বপ্নের মতো মনে হবে। তবে যাঁরা স্থানীয় জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত লীলাদেবী শিল্ড ফুটবল সম্পর্কে জানেন তাঁদের ধারণাটা অন্য রকম। প্রায় শত বছরের পুরনো এই টুর্নামেন্টটি সম্ভবত এ দেশের অন্যতম সেরা ফুটবল টুর্নামেন্ট। বালকদের অংশগ্রহণে (৪ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া ছাত্ররাই এ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে) এত দীর্ঘকালব্যাপী কোনো টুর্নামেন্ট বাংলাদেশের অন্য কোথাও হয়তো হয়নি। এশিয়াটিক ইউনাইটেড ক্লাব মুক্তাগাছায় প্রথম এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। ১৯১৫ থেকে ১৯১৯ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ময়মনসিংহ ক্রীড়া সংস্থা বা এমএসএ (বর্তমানে ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা)। এরপর ১৯২০ থেকে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করছে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল। মাঝে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযু্দ্ধ ও অনিবার্য কারণেই কয়েক বছর টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। শুরুতে শিশুদের অংশগ্রহণ উন্মুক্ত হলেও জিলা স্কুল টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শুধু স্কুলগুলোই এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করছে। যদিও ২০০৭ সালের পর থেকে এটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি। বালক ফুটবলারদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হতো এখান থেকেই। বড় হয়ে এরাই হয়ে ওঠে জেলা ও দেশের সেরা ফুটবলার। তবে এখন আর এ দেশের সেরা ফুটবলার হয়ে উঠতে পারে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে কিংবা আরো আগে যা হতে পারত। ৫ আগস্ট থেকে ময়মনসিংহ স্টেডিয়ামে শুরু হয়বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লিগ। ঘরোয়া ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর এটি। দেশের সেরা ক্লাবগুলোর (১২টি ক্লাব) সেরা খেলোয়াড়রা এতে অংশ নিয়েছেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো স্টেডিয়াম থেকে সরাসরি খেলাগুলো সম্প্রচার করেছে। প্রিয় দলের সমর্থনে গ্যালারিতে গগনবিদারী চিৎকারও শোনা গেছে। কিন্তু মাঠে থাকছে না এ জেলার কোনো ক্লাব (আগের আসরগুলোয়ও যেমন ছিল না)। এমনকি ময়মনসিংহের খেলোয়াড়ও হাতে গোনা কয়েকজন। ময়মনসিংহ শুধু আয়োজন করেই যাচ্ছে, আর বসে থাকছে শুধু দর্শক সারিতে। তবে সম্ভাবনার নতুন দ্বারও খুলে দিয়েছে এই আসর। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ঘিরে যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে সেটা ধরে রেখে এখন কাজ শুধু এগিয়ে যাওয়ার। নতুন করে শুরুর কিছু নেই। যেখান থেকে শুরু করার কথা অর্থাৎ একেবারে বালক বয়স থেকে সেই কাজটি কিন্তু কখনো থেমে থাকেনি। লীলাদেবী শিল্ড টুর্নামেন্টের কথাই বলছি, যা নাকি এ দেশে বালকদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সেরা টুর্নামেন্ট। কিন্তু আমাদের আর উত্তরণ হচ্ছে না কেন? কারণ লীলাদেবী শিল্ড ফুটবল আয়োজনের পরে এর আর কোনো ফলোআপ নেই। আমরা টুর্নামেন্ট শুধু আয়োজন করেই ক্ষান্ত হচ্ছি। ওদের মাঝ থেকেই প্রতিভা অন্বেষণ করে পরিচর্যা করার প্রয়োজন আছে, এ কাজটি করছে না কেউ, যা আগে নিয়মিতই হতো। বাল্য পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণে এই ফুটবলাররা শুরু করত থমসন কাপ ফুটবল। সেই স্কুলের ছেলেদের নিয়ে। এরপর লিগ ও অন্যান্য আয়োজন। খেলোয়াড় তৈরির এই যে ক্রমধারা, এটি ছিল বলেই এ জেলায় তৈরি হয়েছিল অনেক প্রতিভাধর ফুটবলার। এ জেলার ফুটবলের খ্যাতি ছড়িয়ে পরেছিল উপমহাদেশজুড়ে। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগকে ঘিরে আমরা যদি নিজেদের কাজটা শুরু করি তাহলে আবারও ফিরে পেতে পারি বর্ণাঢ্য অতীত। তাহলেই কেবল দর্শক হয়ে গ্যালারিতে নয় এই জেলার ফুটবলাররাও মাতাবেন মাঠ।