ফুটবলে কলকাতার ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগান আর মোহামেডান ক্লাবের প্রার্থিত ছিলেন হবিগঞ্জের অনেকে। কলকাতার বিভিন্ন দলে খেলেছেন ভুপেন্দ্র রায় চৌধুরী, আবুল হাশেম, অমিয় চক্রবর্তী, গুপ্ত বিহারী, মওলদ মিয়ারা। ভুপেন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন কলকাতা মোহনবাগানের সম্মানীয় সভাপতিও। ১৯৩৭ সালে ঐতিহ্যবাহী টাউন ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন আবুল হাশেম। অথচ তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র! এ ছাড়া ঢাকা মোহামেডান আর ওয়ান্ডারার্সের অপরিহার্য খেলোয়াড় আব্দুল জব্বার, আজব আলী, ইসহাক মিয়া, শাহ মহিউদ্দিন জিল্লুর, জহির ও কদ্দুছ মিয়া। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর সময় করাচিতে খেলতে গিয়ে কোনোরকমে ঢাকাগামী শেষ বিমানে দেশে ফিরেছিলেন শাহ মহিউদ্দিন জিল্লুর। স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখসমরে প্রাণ হারানো হবিগঞ্জের প্রথম দুই শহীদের একজন ছিলেন মোহামেডান ক্লাবের লেফট হাফ মহফিল হোসেন। শায়েস্তাগঞ্জে এখনো স্মৃতিফলক আছে তাঁর নামে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ফুটবলের জাতীয় লাল দলে হবিগঞ্জের ঝাণ্ডা তুলে ধরেন মোক্তার হোসেন। ছিলেন সাব্বির, ঠাণ্ডা মিয়া ও আলী হোসেনের মতো খেলোয়াড়। জাতীয় ক্রিকেটার নাজমুল হাসানের বাবা মোক্তার হোসেন ছিলেন সেনাবাহিনীর ডিফেন্ডার। ওয়ান্ডারার্সের পর তিনি চুক্তি করেছিলেন মোহামেডানের সঙ্গে। কিন্তু সে বছরই সেনাবাহিনী আইন করে তাদের কেউ খেলতে পারবে না ঢাকা লিগে। তাই মোহামেডানে আসা হয়নি মোক্তারের। কালে কালে ফুটবলার তৈরির এই ধারায় ছেদ পড়েছে এখন। বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে বলার মতো নাম মামুন। তিনি খেলেছেন শেখ রাসেল আর মুক্তিযোদ্ধার মতো ক্লাবে। বাংলাদেশে ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট খেলার চর্চা শুরুর সময়ও ছিল হবিগঞ্জের অংশগ্রহণ। তখনকার জাতীয় দলের তারকা খন্দকার নেহাল হাসনাইনের বাড়িও এই জেলায়। অবসরের পর নেহাল আবাস গড়েছেন কানাডায়। আহমদ জুলকারনাইন ক্রিকেটে আলো ছড়ানোর পাশাপাশি জুনিয়র জাতীয় ব্যাডমিন্টনে হয়েছিলেন রানার্সআপ। অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলেছেন সিরাজুল্লাহ খাদেন নিপু। হবিগঞ্জের ক্রিকেটারদের মধ্যে অবশ্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন জাতীয় দলের তারকা নাজমুল হোসেন। এই পেসারের বয়স মাত্র ২৭ বছর। কিন্তু মনে হয় কত আগের ক্রিকেটার! নাজমুলকে 'লাকি' ক্রিকেটারও বলেন অনেকে। কেননা বড় দলগুলোর বিপক্ষে শুরুর দিকের কয়েকটি জয়ের দলে খেলেছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কার্ডিফে জয়টার কথাই ধরুন। অসাধারণ জয়ের পেছনে মোহাম্মদ আশরাফুলের সেঞ্চুরিটা মনে গেঁথে আছে ক্রিকেট ভক্তদের। সেই ম্যাচে ভয়ংকর ম্যাথু হেইডেনকে বোল্ড করেছিলেন নাজমুল। ১৯৯৬ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রথম ওয়ানডে জিতে ২০০৬ সালে বগুড়ায়। সেই ম্যাচেও একটা উইকেট ছিল এই ফাস্ট বোলারের। ২০০৯ সালে মিরপুরে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য এক জয়ও এনে দিচ্ছিলেন নাজমুল। মাত্র ১৫২ রানের পুঁজি নিয়ে নাজমুলের বোলিং তোপে শ্রীলঙ্কাকে ৬ রানে ৫ উইকেটে পরিণত করেছিল বাংলাদেশ। এই ৫ উইকেটের ৩টি নাজমুলের। তবে কুমার সাঙ্গাকারা দৃঢ়তায় ম্যাচটা জেতা হয়নি বাংলাদেশের। সেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়াবর্ধনে,সাঙ্গাকারা আর দিলশানের উইকেট নিয়ে এশিয়া কাপে জয় এনে দিয়েছিলেন নাজমুল। তবে ফাইনালের পর আর জাতীয় দলে খেলা হয়নি তাঁর। ৩৮ ওয়ানডে আর ৪টি টি-টোয়েন্টি খেলা নাজমুল টেস্ট খেলেছেন মাত্র দুটি। ২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর টেস্ট অভিষেকের ৭ বছর পর একই দিনে খেলেন দ্বিতীয় টেস্ট। এরপর মজা করে একজন জানতে চেয়েছিলেন তৃতীয় টেস্টটাও কি ৭ বছর পর খেলবেন? জবাবে বিনয়ী নাজমুল, 'তত দিনে আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে!' নাজমুল হোসেন আর তাঁর বাবা মোক্তার হোসেন মিলে চালান দুটি ক্লাব নূরপুর টাইগার ক্লাব ও নূরপুর ক্রিকেট একাদশ। হবিগঞ্জের ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য আছে ক্লাব দুটির। অসীম গোপ জাতীয় হকি দলের নিয়মিত গোলরক্ষক এখন। বিকেএসপিকে গড়ে ওঠা অসীম জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পান ২০১২ সালে। আবাহনীকে দুইবার লিগ শিরোপা জেতাতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ ছাড়া খেলেছেন আজাদ আর ঊষার মতো ক্লাবেও। একটা সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অ্যাথলেটিক্সে জড়িত ছিলেন আবদুল্লাহ আল মুমিন। তবে অ্যাথলেটিক্স ছেড়ে চলে আসেন ভারোত্তলনে। জাতীয় দলে ডাকও পেয়ে যান ২০০৮ সালে। দুই বছর পর ব্রোঞ্জ জিতেন ঢাকায় অনুষ্ঠিত এস এ গেমসে। ব্রোঞ্জ আছে নেপালে অনুষ্ঠিত এশিয়ান ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপেও। তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যে অবশ্য হবিগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার ভূমিকা নেই। পুরোটাই সেনাবাহিনীতে অনুশীলনের ফসল। তাই খেলাটার প্রসারে মুমিনের আহ্বান, 'আমি হবিগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্তাদের কাছে অনুরোধ করেছি ভারোত্তলনের প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি চালু করার। এতে উঠে আসবে অনেক খেলোয়াড়। কর্তারা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন এ ব্যাপারে।' এ ছাড়া জ্যাভলিন থ্রোতে দুটি ব্রোঞ্জ আছে রায়হানের। নাহাদ জাহেদ চৌধুরী ছিলেন বিকেএসপির বাস্কেটবল কোচ।