পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যার জীবনে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, হতাশা কিংবা কষ্ট নেই। সবাই সুখ-শান্তি চায়, প্রাচুর্য চায়, কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি বা আরাম—কোনোটিই মানুষের অন্তরকে স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না। দুনিয়ার জীবনে এটাও মহান আল্লাহর এক ধরনের পরীক্ষা। তবে যিনি অন্তরের মালিক, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা গেলে অন্তর ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়। ফলে এক ধরনের আধ্যাত্মিক সুখ অনুভূত হয়। অহেতুক যে দুশ্চিন্তা আর অপ্রাপ্তি আমাদের কুরে কুরে খায়, তা থেকে নিস্তার পাওয়া যায়। নিম্নে এ রকম কিছু আমল তুলে ধরা হলো—
জিকির : মুমিন হৃদয়ের প্রশান্তির জন্য এটি সবচেয়ে বড় ওষুধ। কারণ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এক প্রশান্তি লাভের মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’
(সুরা : রা‘দ, আয়াত : ২৮)
নামাজ : নামাজ হলো মহান আল্লাহর সঙ্গে নির্জনে কথোপকথনের মাধ্যম। পৃথিবীর সব দরজা যখন বন্ধ মনে হয়, তখনো একটি দরজা খোলা থাকে, তা হলো মহান আল্লাহর দরজা। যেখানে সিজদার মাধ্যমে নিজের অসহায়ত্বগুলো মহান আল্লাহর কাছে পেশ করা যায়।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলে বা উদ্বেগজনক বিষয় দেখা দিলে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩১৯)
তা ছাড়া খুশুখুজুর সঙ্গে আদায়কৃত নামাজের মাধ্যমে মুমিনের হৃদয়ে অন্য রকম প্রশান্তি তৈরি হয়। নামাজের সঙ্গে যে অন্তরের প্রশান্তির একটি সংযোগ আছে, তা মহানবী (সা.)-এর হাদিস দ্বারা বোঝা যায়। মহানবী (সা.) বেলাল (রা.)-কে বলতেন, ‘হে বেলাল! নামাজ কায়েম করো। আমরা এর মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করতে পারব।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৫)
কোরআন : অন্তরের অশান্তি ও অস্থিরতা কখনো কখনো রোগের কারণে হয়। কখনো মানসিক রোগ, কখনো আত্মিক রোগ। তাই এর রোগগুলো থেকে নিস্তার পেতে কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। কেননা পবিত্র কোরআনকে মহান আল্লাহ ‘শিফা’ বা আরোগ্য বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি কোরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত, কিন্তু তা জালিমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮২)
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করলে আল্লাহর রহমত নাজিল হয়, যা ভাঙা হৃদয়কে প্রশান্ত করতে উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।
দোয়া : যখন মানুষ অসহায় বোধ করে, তখন তা থেকে উত্তরণের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হলো দোয়া। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয়ই নিকটবর্তী। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৬)
তাই অন্তরে অশান্তি অনুভব করলে তা থেকে উত্তরণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
দরুদ : দরুদ পাঠ দুশ্চিন্তা দূরীকরণে সহায়ক। এক সাহাবি দিনের পুরো সময় দরুদ পাঠের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে মহানবী (সা.) তাঁকে বলেন, ‘তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭)
ইস্তিগফার : ইস্তিগফার সব ধরনের সংকট থেকে উত্তরণের একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ ও প্রতিটি সংকট থেকে উদ্ধারের পথ বের করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক দান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৮১৯)
তাওয়াক্কুল : যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তাঁর গায়েবি সাহায্য পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
আল্লাহ যার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়, তাকে কোনো দুশ্চিন্তা পরাস্ত করতে পারবে না।
সদকা : কখনো কখনো অতিরিক্ত গুনাহের কারণে অন্তরে দুশ্চিন্তার অন্ধকার নেমে আসে, সে সময় সদকা করলে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করা যায়। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দান-খয়রাত গুনাহসমূহ বিলীন করে দেয়, যেমন পানি আগুনকে বিলীন করে (নিভিয়ে) দেয়।’
(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২১০)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুশ্চিন্তামুক্ত জীবন দান করুন। আমিন।