• ই-পেপার

মক্কায় হিজরে ইসমাঈলে প্রবেশের নতুন সময়সূচি

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৬১

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

তারা কি অনুধাবন করে না যে আল্লাহ যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং এই সবার সৃষ্টিতে কোনো ক্লান্তি বোধ করেন নাই, তিনি মৃতের জীবন দান করতেও সক্ষম? বস্তুত তিনি সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।...তারা যেন দিনের এক দণ্ডের বেশি পৃথিবীতে অবস্থান করেনি। এটা এক ঘোষণা, পাপাচারী সম্প্রদায়কেই ধ্বংস করা হবে। (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ৩৩-৩৫)

আয়াতে পরকালে অবিশ্বাসীদের সত্য স্বীকারের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. আরবের কাফিররা এটা স্বীকার করত যে আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু তারা পুনরুত্থানকে অসম্ভব মনে করত। অথচ নতুন সৃষ্টির তুলনায় পুনরুত্থান সহজ।

২. অদৃশ্যের বিষয়গুলো অদৃশ্য থাকা অবস্থায় ঈমান আনা আবশ্যক। তা দৃশ্যমান হওয়ার পর ঈমান আনলে গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমনজান্নাত ও জাহান্নাম।

৩. অবিশ্বাসীদের শাস্তি কামনায় তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। কেননা মুসলমানদের মনোতুষ্টির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) কাফিরদের দ্রুত শাস্তি কামনা করলে তাঁকে সতর্ক করা হয়।

৪. দ্বিনি কাজে কষ্ট সহ্য করা এবং ধৈর্য ধারণ করা নবী-রাসুলদের বৈশিষ্ট্য। তাই মুমিন দ্বিনি কাজে বাধা পেলে হতাশ হবে না।

৫. পরকালে মানুষ উপলব্ধি করবে পার্থিব জীবন খুব সংক্ষিপ্ত ছিল এবং তাদের মনে হবে কিয়ামত তাৎক্ষণিকভাবে এসে গেছে। (মাআরেফুল কোরআন : ৭/৮১১)

মেক্সিকোতে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
মেক্সিকোতে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস

উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর দাপ্তরিক নাম ইউনাইটেড মেক্সিকান স্টেটস। এর উত্তরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ-পূর্বে গুয়াতেমালা ও বেলিজ, পূর্বে মেক্সিকো উপসাগর ও ক্যারিবীয় সাগর এবং পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরের অবস্থান। ভূ-প্রাকৃতিকভাবে মেক্সিকো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। দেশটিতে বিস্তৃত মালভূমি, আগ্নেয়গিরি, পর্বতমালা, মরুভূমি, উষ্ণমণ্ডলীয় বনভূমি ও দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে। মেক্সিকোর অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো উৎপাদনশিল্প, তেল ও গ্যাস, অটোমোবাইলশিল্প, কৃষি, পর্যটন। মেক্সিকোর আয়তন প্রায় ১৯ লাখ ৬৪ হাজার ৩৭৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। মেক্সিকো সিটি দেশটির সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী। মেক্সিকোর বেশির ভাগ মানুষ খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। দেশটিতে ১০ হাজারের মতো মুসলমান রয়েছে।

ইতিহাস বলে, আমেরিকায় মুসলিম আগমনের সূচনা হয়েছিল সেখানে স্প্যানিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তখন স্পেন থেকে নির্বাসিত মুসলিমদের দাস ও শ্রমিক হিসেবে আমেরিকা মহাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। তারাই ছিল মেক্সিকোসহ এই অঞ্চলের প্রথম মুসলমান। ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশদের হাতে মেক্সিকোর অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে আমেরিকা মহাদেশে নিউ স্পেনের উদয় হয়। স্প্যানিশরা নতুন উপনিবেশ পরিচালনা করতে এবং এখানের উর্বর ভূমিগুলো চাষাবাদ করতে স্পেন থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিমকে দাস ও শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসে। এ ছাড়া আফ্রিকান উপকূলীয় মুসলিম অঞ্চল থেকে মুসলিমদের ধরে এনে দাসে রূপান্তর করা হতো। তাদের মাধ্যমেই মেক্সিকোতে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটেছিল।

স্প্যানিশরা শুধু মুসলিম দাসদের আমেরিকায় নিয়ে আসেনি, বরং ৭০০ বছরের শাসনামলে মুসলিমরা স্পেনে যে উন্নত সমাজ, সভ্যতা ও প্রযুক্তি গড়ে তুলেছিল তাও সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। যার মধ্যে মুসলিম স্থাপত্য ও কারুশিল্প ছিল অন্যতম। যেমনমুদেজার শৈলী, যা গোথিক ও ইসলামী শৈলীর মিশ্রণে গড়ে উঠেছে। এতে অশ্বখুরাকৃতির খিলান, জ্যামিতিক টালি ও অ্যারাবিস্ক অলংকরণের সংমিশ্রণ দেখা যায়। ঔপনিবেশিক আমলের প্রথম দিকের অবকাঠামোতে মুদেজার শৈলী প্রয়োগ দেখা যায়। স্পেন থেকে নিয়ে আসা কারিগর ও শিল্পীরা এসব স্থাপনা তৈরি করেছিল। অনুমান করা যায়, তাদের অনেকেই হয়তো মুসলিম ছিল। মেক্সিকো সিটির কপিলা দেল পোসিতোতে এখনো মুদেজার শৈলীতে নির্মিত স্থাপনা টিকে আছে।

মেক্সিকোর মুসলিম ইতিহাসের একটি মানবিক অধ্যায় মোরিস্কো। আফ্রিকান মুর শব্দ থেকেই এই শব্দের উৎপত্তি। গ্রানাডার পতনের মাধ্যমে স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসান হলে মুসলমানের সামনে দুটি পথ খোলা রাখা হয় : হয়তো ধর্মান্তর, নয়তো দেশান্তর। অস্তিত্ব সংকটে পড়ে একদল মুসলিম প্রকাশ্যে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু তারা গোপনে ইসলামচর্চা অব্যাহত রাখে। এসব খ্রিস্টরূপী মুসলমানদের মোরিস্কো বলা হতো। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দিলেও তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা তৃতীয় ফিলিপ তাদের বহিষ্কারের আদেশ দেন। ১৫৩০ থেকে ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহুসংখ্যক মোরিস্কো দাস, শ্রমিক ও কারিগর হিসেবে মেক্সিকোতে আগমন করেছিল। ১৬০৯ থেকে ১৬১৪ সালে মধ্যে প্রায় এক হাজার মোরিস্কো মেক্সিকোতে এসে পৌঁছেছিল।

প্রবাসে এসেও মোরিস্কো বা গোপন মুসলিমদের স্বস্তি ছিল না। ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে মেক্সিকো সিটিতে প্রতিষ্ঠিত মেক্সিকান ইনকুইজিশন (স্প্যানিশ ক্যাথলিক আদালতের সম্প্রসারিত রূপ) প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের ইসলাম পালন নিষিদ্ধ করেছিল। তারা মোরিস্কোদের ওপর কঠোর নজরদারি করত। তদন্তে ইসলাম পালনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হতো। ১৬২৩ খ্রিস্টাব্দে আলেক্সো ডে ক্যাস্ত্রোকে গোপনে ইসলাম অনুশীলনের অভিযোগে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। ফলে খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগের পর মেক্সিকোতে মুসলমানদের টিকে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

২০০ বছর পর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মেক্সিকোতে আবার মুসলমানের আগমন শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। তখন কিছুসংখ্যক মুসলমান মেক্সিকোতে পাড়ি জমায়। তারা মূলত অর্থনৈতিক কারণেই মেক্সিকোতে এসেছিল। ফলে তারা মেক্সিকো সিটি, ভেরাক্রুজ, পুয়েবলা ও ইউকাতনের মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে বসতি স্থাপন করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরো কিছু মুসলিম আরব মেক্সিকোতে আসে। তার পরও ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত দেশটির মুসলিম জনসংখ্যা এক হাজারেরও নিচে রয়ে যায়।

মেক্সিকোতে ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রম প্রকৃত অর্থে গতি পায় ১৯৬০-এর দশকের পর। এ ক্ষেত্রে বিদেশি সুফি গোষ্ঠীগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৮ সালে স্পেনের মুরাবিতুন নামের সুফি আন্দোলন মেক্সিকোতে সংগঠিত দাওয়াহ কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকে মেক্সিকো সিটিতে সালাফি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া পাকিস্তান ও মিসর থেকে আসা আলেম, আলোচক ও বক্তারাও মেক্সিকো সিটিসহ বিভিন্ন নগর এলাকায় ইসলামী সাহিত্য বিতরণ এবং ধর্মীয় আলোচনাসভার আয়োজন করেন। ফলে ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ছোট ছোট মুসলিম ধর্মান্তরিত গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।

১৯৮৯ সালে কোয়াহুলিয়ায় সুরাইয়া মসজিদ, যা মেক্সিকোর প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৫ সালে সেন্ট্রো কালচারাল ইসলামিকো ডে মেক্সিকো (সিসিআইএম) প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ইসলামী গ্রন্থের স্প্যানিশ অনুবাদ এবং সমন্বিত দাওয়াহ কর্মসূচি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।                     সূত্র : বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

মুমিনের আত্মপর্যালোচনার এখনই সময়

উম্মে আহমাদ ফারজানা
মুমিনের আত্মপর্যালোচনার এখনই সময়

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, সৌন্দর্য কিংবা খ্যাতি নয়; বরং মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সময়। কারণ হারিয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও কখনো ফিরে আসে না। দিন ও রাতের অবিরাম আবর্তন, মাস ও বছরের পরিবর্তন, শৈশব থেকে যৌবন এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হওয়াএসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা এই পৃথিবীতে স্থায়ী নই; বরং একটি নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি।

প্রতিটি সূর্যোদয় যেন আমাদের জীবনের একটি নতুন পৃষ্ঠা খুলে দেয় এবং প্রতিটি সূর্যাস্ত সেই পৃষ্ঠার হিসাব বন্ধ করে দেয়। তাই একজন সচেতন মুমিনের জন্য সময়ের প্রবাহ শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক গুরুত্বপূর্ণ আহবান। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ করে যে আগামীকালের জন্য সে কী প্রেরণ করেছে।

(সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)

সময়ের পরিবর্তনে মানুষের জন্য শিক্ষা

আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে পরিবর্তনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুখের পর দুঃখ, দুঃখের পর সুখ, শক্তির পর দুর্বলতা, যৌবনের পর বার্ধক্য এবং জীবনের পর মৃত্যুএসবই আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, তোমরা অবশ্যই এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তীর্ণ হবে। (সুরা : ইনশিকাক, আয়াত : ১৯)

একটি ঋতু আসে, মানুষ তার জন্য প্রস্তুতি নেয়; একটি ঈদ আসে, মানুষ আনন্দে মেতে ওঠে; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সবকিছু অতীত হয়ে যায়। যারা একদিন একত্র ছিল, তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে ঘর একদিন মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, তা একদিন নীরব হয়ে যায়। এভাবেই জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে এই পৃথিবী চিরস্থায়ী আবাস নয়; বরং এটি পরীক্ষার ক্ষেত্র।

দিন-রাতের পরিবর্তনে আল্লাহর নিদর্শন

যারা চিন্তাশীল, তারা দিন ও রাতের পরিবর্তনের মধ্যে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০)

এরপর আল্লাহ তাঁদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯১)

সুতরাং প্রকৃত মুমিন সময়ের পরিবর্তন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং নিজের আমল পর্যালোচনা করে।

নতুন হিজরি বছর আত্মসমালোচনার সময়

একটি বছর চলে গেছে, আরেকটি বছর শুরু হয়েছে। এ সময়টি শুধু নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা নয়; বরং নতুন জীবন গড়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ। এই সময়ে একজন মুমিন নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেগত বছরে আমি কী অর্জন করেছি? আমার সালাত, তিলাওয়াত ও ইবাদতের অবস্থা কেমন ছিল? আমি কত মানুষের উপকার করেছি? কত পাপ থেকে তাওবা করেছি? যদি আজ আমার মৃত্যু হয়, আমি কি প্রস্তুত?

আল্লাহ তাআলা বলেন, যেদিন প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃত ভালো ও মন্দ কাজ সামনে উপস্থিত পাবে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩০)

তাই নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত আন্তরিক তাওবা, ইস্তিগফার এবং নেক আমলের দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে।

ডিজিটাল যুগে সময় অপচয়ের ভয়াবহতা

বর্তমান যুগে মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো সময়ের অপচয়। হাতে থাকা স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের অজান্তেই তার জীবনের অমূল্য মুহূর্তগুলো গ্রাস করছে। দিন-রাত স্ক্রিনের সামনে কাটতে কাটতে অনেকেই ভুলে যাচ্ছেকোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া, আত্মউন্নয়ন, সমাজ ও উম্মাহর জন্য কাজ করা ইত্যাদি। একটি নোটিফিকেশন থেকে আরেকটি ভিডিও, একটি সংবাদ থেকে আরেকটি বিতর্কএভাবেই মূল্যবান জীবন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত্তসুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)

অতএব, আসুন আমরা আমাদের অতীত ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিকভাবে তাওবা করি, মহররম ও আশুরার ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো পালন করি, সময়ের সঠিক ব্যবহার করি এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আমরা যেন প্রতিটি দিনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সময়ের মূল্য উপলব্ধি করার, নেক আমলে জীবনকে সমৃদ্ধ করার এবং উত্তম পরিণতি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদার গুরুত্ব

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদার গুরুত্ব

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখার পাশাপাশি লেনদেনেও তা বজায় রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইমাম মানাভী (রহ.)-এর মতে, লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদা হলো অপমান ও জুলুম ছাড়া বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা এবং তা উত্তম কাজে ব্যয় করা।

(আত-তাওক্বিফ আলা মুহিম্মাতিত তাআরিফ)

কিছু কাজ এমন আছে, বিশুদ্ধ নিয়তে যেগুলো করা গেলে লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদা অর্জন করা সহজ হয়ে যায়। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলো

সন্দেহজনক বস্তু ত্যাগ করা : মুমিন হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করবে। কিন্তু সম্পদ উপার্জনের লোভে নিজের ঈমান, আকিদা কিংবা মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেবে না। কোথাও লাভ দেখলেই লাফ দেবে না। কারণ লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে গেলে অবশ্যই হারাম জিনিসের পাশাপাশি সন্দেহজনক বিষয়কেও ত্যাগ করতে হবে।

নোমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, হালালও সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট এবং এ দুটির মধ্যে অনেক সন্দেহজনক বিষয় আছে। তা হালাল হবে না হারাম হবে, সেটা অনেকেই জানে না। যে লোক এই সন্দেহজনক বিষয়গুলো নিজের দ্বিন ও মান-ইজ্জতের হিফাজতের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেবে সে নিরাপদ হলো। যে লোক এর কিছুতে লিপ্ত হলো তার হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ারও আশঙ্কা থেকে গেল। (উদাহরণস্বরূপ) নিষিদ্ধ এলাকার আশপাশে যে লোক পশু চড়ায়, তার এতে প্রবেশের ভয় আছে। জেনে রাখো! প্রতিটি সরকারেরই কিছু সংরক্ষিত এলাকা থাকে। সাবধান! আল্লাহ তাআলার সংরক্ষিত এলাকা হলো তাঁর হারাম করা বিষয়গুলো। (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৫)

লোভমুক্ত জীবন : লোভ-লালসা মানুষের ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে দেয় এবং সম্পদ থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহানবী (সা.) হাকিম ইবনে হিযাম (রা.)-কে বলেন, হে হাকিম! এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ব্যতীত) তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় করা হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মতো, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম। (বুখারি, হাদিস : ১৪৭২)

অল্পে তুষ্টি : অল্পে তুষ্ট থাকা ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করে এবং সফলতা লাভে সহায়তা করে। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক ইসলাম কবুল করেছে, তার কাছে ন্যূনতম রিজিক রয়েছে এবং আল্লাহ তাকে অল্পে তুষ্ট থাকার তাওফিক দিয়েছেন, সে-ই সফলকাম হলো। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৮)

উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতা : আমাদের সমাজে বেশির ভাগ মানুষই অন্যের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ঠকাতে চায়। চাতুরতার মারপ্যাঁচে ফেলে জেনেশুনে কোনো সরল মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নীতিকে ইসলাম সমর্থন করে না।

ইমাম নববী (রহ.) মুসলিম শরিফের হাশিয়ায় উল্লেখ করেছেন যে হাফেজ আবুল কাসেম ত্ববরানি সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেনএকদা জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) তাঁর এক খাদেমকে পাঠালেন একটা ঘোড়া কেনার জন্য। খাদেম ৩০০ দিরহাম মূল্য নির্ধারণ করে একটা ঘোড়া কিনে তাঁর নিকট উপস্থিত হলেন। বিক্রেতাকেও সঙ্গে নিয়ে এলেন মূল্য পরিশোধ করার জন্য। জারির (রা.) বিক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার ঘোড়ার মূল্য তো ৩০০ দিরহামের চেয়েও বেশি। এখন আমি তোমাকে ৪০০ দিরহাম দিতে চাচ্ছি, তুমি কী বলো? সে বলল, আপনার ইচ্ছা। এরপর বললেন, না, ৪০০ হলেও কম; ৫০০ দিতে চাই, তোমার কী খেয়াল? সে বলল, আপনার ইচ্ছা। এরপর বললেন, না, ৫০০ হলেও কম; ৬০০ দিতে চাই। এভাবে তিনি বাড়াতে বাড়াতে ৮০০ পর্যন্ত বাড়ালেন এবং তাই বিক্রেতাকে দিলেন।

লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করল, আপনি এমন কেন করলেন? মানুষ চেষ্টা করে কম দিতে, আর আপনি বাড়িয়ে দিলেন, তাও অস্বাভাবিক! তিনি বললেন, রাসুল (সা.)-এর হাতে আমার বায়াত হয়েছিল এই শর্তে যে আমি প্রতিটি মুসলমানের সঙ্গে কল্যাণকর আচরণ করব।

[মুসলিম শরিফ (শরহে নববী) ১/৫৫পৃ.]আল্লাহ সবাইকে লেনদেনে সততা অর্জনের তাওফিক দিন।