জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততা ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখার পাশাপাশি লেনদেনেও তা বজায় রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইমাম মানাভী (রহ.)-এর মতে, ‘লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদা হলো অপমান ও জুলুম ছাড়া বৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা এবং তা উত্তম কাজে ব্যয় করা।’
(আত-তাওক্বিফ আলা মুহিম্মাতিত তাআরিফ)
কিছু কাজ এমন আছে, বিশুদ্ধ নিয়তে যেগুলো করা গেলে লেনদেনে সততা ও আত্মমর্যাদা অর্জন করা সহজ হয়ে যায়। নিম্নে সেগুলো তুলে ধরা হলো—
সন্দেহজনক বস্তু ত্যাগ করা : মুমিন হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করবে। কিন্তু সম্পদ উপার্জনের লোভে নিজের ঈমান, আকিদা কিংবা মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেবে না। কোথাও লাভ দেখলেই লাফ দেবে না। কারণ লেনদেনের ক্ষেত্রে সততা ও আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে গেলে অবশ্যই হারাম জিনিসের পাশাপাশি সন্দেহজনক বিষয়কেও ত্যাগ করতে হবে।
নোমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি, হালালও সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট এবং এ দুটির মধ্যে অনেক সন্দেহজনক বিষয় আছে। তা হালাল হবে না হারাম হবে, সেটা অনেকেই জানে না। যে লোক এই সন্দেহজনক বিষয়গুলো নিজের দ্বিন ও মান-ইজ্জতের হিফাজতের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দেবে সে নিরাপদ হলো। যে লোক এর কিছুতে লিপ্ত হলো তার হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ারও আশঙ্কা থেকে গেল। (উদাহরণস্বরূপ) নিষিদ্ধ এলাকার আশপাশে যে লোক পশু চড়ায়, তার এতে প্রবেশের ভয় আছে। জেনে রাখো! প্রতিটি সরকারেরই কিছু সংরক্ষিত এলাকা থাকে। সাবধান! আল্লাহ তাআলার সংরক্ষিত এলাকা হলো ‘তাঁর হারাম করা বিষয়গুলো।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৫)
লোভমুক্ত জীবন : লোভ-লালসা মানুষের ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে দেয় এবং সম্পদ থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে সতর্ক করতে গিয়ে মহানবী (সা.) হাকিম ইবনে হিযাম (রা.)-কে বলেন, ‘হে হাকিম! এই সম্পদ শ্যামল সুস্বাদু। যে ব্যক্তি প্রশস্ত অন্তরে (লোভ ব্যতীত) তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় হয়। আর যে ব্যক্তি অন্তরের লোভসহ তা গ্রহণ করে তার জন্য তা বরকতময় করা হয় না। যেন সে এমন ব্যক্তির মতো, যে খায় কিন্তু তার ক্ষুধা মেটে না। ওপরের হাত নিচের হাত থেকে উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস : ১৪৭২)
অল্পে তুষ্টি : অল্পে তুষ্ট থাকা ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় করে এবং সফলতা লাভে সহায়তা করে। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক ইসলাম কবুল করেছে, তার কাছে ন্যূনতম রিজিক রয়েছে এবং আল্লাহ তাকে অল্পে তুষ্ট থাকার তাওফিক দিয়েছেন, সে-ই সফলকাম হলো। (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৮)
উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতা : আমাদের সমাজে বেশির ভাগ মানুষই অন্যের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ঠকাতে চায়। চাতুরতার মারপ্যাঁচে ফেলে জেনেশুনে কোনো সরল মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নীতিকে ইসলাম সমর্থন করে না।
ইমাম নববী (রহ.) মুসলিম শরিফের হাশিয়ায় উল্লেখ করেছেন যে হাফেজ আবুল কাসেম ত্ববরানি সনদের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন—একদা জারির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) তাঁর এক খাদেমকে পাঠালেন একটা ঘোড়া কেনার জন্য। খাদেম ৩০০ দিরহাম মূল্য নির্ধারণ করে একটা ঘোড়া কিনে তাঁর নিকট উপস্থিত হলেন। বিক্রেতাকেও সঙ্গে নিয়ে এলেন মূল্য পরিশোধ করার জন্য। জারির (রা.) বিক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘তোমার ঘোড়ার মূল্য তো ৩০০ দিরহামের চেয়েও বেশি। এখন আমি তোমাকে ৪০০ দিরহাম দিতে চাচ্ছি, তুমি কী বলো?’ সে বলল, ‘আপনার ইচ্ছা।’ এরপর বললেন, ‘না, ৪০০ হলেও কম; ৫০০ দিতে চাই, তোমার কী খেয়াল?’ সে বলল, ‘আপনার ইচ্ছা।’ এরপর বললেন, ‘না, ৫০০ হলেও কম; ৬০০ দিতে চাই।’ এভাবে তিনি বাড়াতে বাড়াতে ৮০০ পর্যন্ত বাড়ালেন এবং তাই বিক্রেতাকে দিলেন।
লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করল, আপনি এমন কেন করলেন? মানুষ চেষ্টা করে কম দিতে, আর আপনি বাড়িয়ে দিলেন, তাও অস্বাভাবিক! তিনি বললেন, রাসুল (সা.)-এর হাতে আমার বায়াত হয়েছিল এই শর্তে যে আমি প্রতিটি মুসলমানের সঙ্গে কল্যাণকর আচরণ করব।
[মুসলিম শরিফ (শরহে নববী) ১/৫৫পৃ.]আল্লাহ সবাইকে লেনদেনে সততা অর্জনের তাওফিক দিন।