২ এপ্রিল ২০১১, দিগি¦জয়ী সম্রাটের মতোই মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনকক্ষে এসেছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। আর কাল সিডনির সংবাদ সম্মেলন কক্ষে এলেন ঠিক যেন চেনা ‘ধোনি’ হয়ে নয়। যে ধোনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলতে চান, সংবাদ সম্মেলনে বাধ্য না হলে আসেন না, আবার কখনো গোটা দল নিয়ে এসে লিখিত বিবৃতি পড়ে চলে যান, ফুটবল খেলার জন্য দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়ে রাখেন... তাঁর সঙ্গে কালকের ধোনির কোনো মিল নেই। দল হারলেও তাঁর মধ্যে আশ্চর্য শান্ত একটা ভাব। হাসিমুখেই উত্তর দিলেন প্রশ্নের, এমনকি হাসিঠাট্টাও চলল। মনে হচ্ছিল অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হেরে নয় বরং আরব আমিরাতের সঙ্গে জিতে এসেছেন গ্রুপ পর্বের গুরুত্বহীন ম্যাচ! বিশ্বকাপের শিরোপার লড়াই থেকে হেরে যাওয়াটা খুব বড় কিছু নয়, এমন একটা সুরই বাজল তাঁর শব্দে। ভারতজুড়ে বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল, ‘এই কাপ ফিরিয়ে দেব না।’ সেটা ফিরিয়ে দিতেই হচ্ছে, মুকুট খসে পড়ায় কেমন লাগছে জানতে চাইলে ‘ক্যাপ্টেন কুল’-এর উত্তর, ‘এটা আসলে চিরস্থায়ীভাবে কারো নয়। আমরাও এটা কারো না কারো কাছ থেকে নিয়েছিলাম, কেউ আবার এটা আমাদের কাছ থেকে নিয়েও গেল। সোজাভাবে দেখলে ব্যাপারটা তাই। সেরা দল চার বছরের জন্য শিরোপাটা তাদের কাছে রাখে আর অন্য দলগুলো এই চার বছর ধরে পরিকল্পনা করে কিভাবে সেটা শিরোপাধারীদের কাছ থেকে নেওয়া যায়। তারপর তারা শিরোপাধারী দলকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এটা কারো কাছেই বেশিদিন থাকে না, এমনটাই হয়ে আসছে। আমরা যদি আজকে (কাল) ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতাম, তাহলে হয়তো ফাইনালে যেতাম। কিন্তু এভাবেই খেলাধুলা চলে, সেরাটা দিতে না পারলে শিরোপা ভাগ করতে হয়।’ সেমিফাইনালে সেঞ্চুরি করলেন স্টিভেন স্মিথ। গোটা অস্ট্রেলিয়ান গ্রীষ্মেই স্মিথ ভারতের বোলিংকে নিজের ‘প্রিয় খাবার’ বানিয়েছেন, রান করেছেন অনেক। তাঁকে থামাতে নিউজিল্যান্ডের কী করা উচিত- সেই প্রশ্নের উত্তরে ভাবনাটা ব্রেন্ডন ম্যাককালামকেই ভাবতে বলেছেন, তবে আভাস দিলেন, ‘ড্যানিয়েল ভেট্টরির পারফরমেন্স গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, সে এমন একজন যে মাঝের ওভারগুলোতে উইকেট নিতে পারে।’ ভারতের পেসাররা ভালো করেছেন গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে, শেষ ম্যাচে তাঁদের নিয়ে খানিকটা হতাশা আছে তাঁর, ‘আমার মনে হয়েছে আমাদের ফাস্ট বোলাররা আরেকটু ভালো করতে পারত। ম্যাচের দ্বিতীয়ভাগে বল খুব একটা রিভার্স সুইং করত না, যেমনটা প্রথমভাগে করেছে। তবে যেভাবে তারা ম্যাচে ফিরেছে এবং অস্ট্রেলিয়াকে ৩২৭ রানে আটকে দিয়েছে, সেটাও কম কৃতিত্বের নয়।’ এমনকি মিচেল জনসনের ক্যামিওর পরও রানটা বেশি মনে হয়নি তাঁর, ‘একটা সময় মনে হচ্ছিল তারা ৩৫০ করে ফেলবে, কিন্তু আমরা তাদের ৩৩০-এর নিচেই আটকে দিই। জনসন সেই রানগুলো না করলে হয়তো ওদের রানটা ৩০০ হতো, কিন্তু সেটাও তাড়া করতে অনেক রানই করতে হতো।’ অস্ট্রেলিয়াকে এই রানে আটকে ফেলার পর সেটা তাড়া করে জেতার বিশ্বাস ছিল ধোনির, ‘চাপ ছিল কিন্তু ভালো ব্যাটিং করলে আর ভালো জুটি হলে এই রানটাও তাড়া করে জেতা সম্ভব ছিল। এই রানটা করা আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যে ছিল, কিন্তু এই কাজটা খুব কঠিন হতো, বোর্ডে রান জমা করতে অনেক খাটতে হতো।’ সব মিলিয়ে পরিকল্পনা সফল না হওয়াতেই এই হার, মেনে নিচ্ছেন ধোনি, ‘আমাদের ব্যাটসম্যানরা জানে কিভাবে ৩০০ রান তাড়া করতে হয়, আমরাই বেশ কয়েকবার সেটা করেছি। কিন্তু এই ম্যাচে আমাদের পরিকল্পনা ঠিকঠাক কাজে আসেনি।’ দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় ধোনি, এরই মাঝে বাবাও হয়েছেন কিন্তু ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়নি সন্তানকে। লম্বা সময় অস্ট্রেলিয়াতে থাকা নিয়ে রসিকতা করেই বলেছেন, ‘চার মাসের ওপর হয় অস্ট্রেলিয়াতে আছি, আর দিন বিশেক থাকলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যাবে।’ দীর্ঘ সফর শেষে অনেক আনন্দ-বেদনার স্মৃতি নিয়েই দেশে ফিরে যাবেন ধোনি, তখন আর বিশ্বজয়ীর মুকুটটা থাকবে না তাঁর মাথায়।