সেই মুহূর্তটা এসেই গেল। শেষ বিশ্বকাপে নামা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো বিশ্বেকাপের শেষ ম্যাচটাও খেলে ফেললেন। ডালাসে গোলশূন্যভাবে অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে থাকা ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন বদলি নামা নামা স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড মিকেল মেরিনো। তাঁর ৯০তম মিনিটে করা একমাত্র গোলেই জয় নিয়ে স্পেন শেষ আটে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় তাই কিংবদন্তির। লামিন ইয়ামাল রয়ে গেলেন আসরটিকে আরো কিছুদিন মাতানোর জন্য।
খেলা শুরুর আগে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণার সময় যে দুটি নামের বেলায় সবচেয়ে বেশি আওয়াজ ওঠে, তা-ও ছিল রোনালদো আর ইয়ামাল। ম্যাচের আবহে দুই প্রজন্মের এই লড়াইয়ের বিষয়টা ছিল। ম্যাচ শুরুর আগে ডালাসের দর্শকরাও জানিয়ে দেন—তাঁরা এর জন্য কতটা অধীর অপেক্ষায়। তবে ইয়ামাল নয়, শেষ পর্যন্ত লুই দা লা ফুয়েন্তের মাস্টারস্ট্রোকে ম্যাচ জিতিয়েছেন মিকে। শুরুতে সহজ সুযোগ নষ্ট করেছিলেন আগের চার ম্যাচে চার গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল। দানি ওলমো দারুণ বল বের করে দিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু গোলরক্ষককে একা পেয়েও চাপটা নিতে পারেননি আগের চার ম্যাচে চার গোল করা এই ফরোয়ার্ড। অন্য প্রান্তে জোয়াও ফেলিক্সের বাড়ানো বল পেয়ে স্প্যানিশ গোলরক্ষককে পরখ করের রোনালদো। ইয়ামালের প্রথম শট ১৭ মিনিটে, বাঁদিক থেকে বাঁ পায়ে তুলে দিয়েছিলেন। দিয়েগো কস্তা ফেরান তা। ফিরতি বলে ডান দিক থেকে আলেক্স বায়েনা দূরের পোস্টে নিশানা করলে সেই বলও ঝাঁপিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্পেন সহজাত পাসিংয়ে ক্রমে চাপ বাড়ায় পর্তুগালের রক্ষণে। রুবেন দিয়াজের সঙ্গে তরুণ রেনাতো ভেইগা আস্থা নিয়ে খেলছিলেন সেই চাপের মুখে। তবে রোনালদো খেলাটা বদলে দিতে পারতেন, পেদ্রো নেতোর ক্রসে ফেলিক্সের হেড বাঁচাতে পোস্ট ছেড়ে অনেকটা বেরিয়ে গিয়েছিলেন উনাই সিমন, সেই বল রোনালদো পেয়েছিলেন, যদিও ততটা জায়গা পাননি, রিভার্স ভলির চেষ্টা করেছিলেন, ততক্ষণে সিমোন জায়গায় ফিরে তা আয়ত্তে নেন। স্পেন যখন উঠছিল, একত্রে উঠছিল। পর্তুগাল বল পেয়ে লম্বা পাসে উঠছিল দ্রুত। প্রথমার্ধটা গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। ওয়াইরসাবাল ম্যাচের তাতে সেরা সুযোগটা পেয়েছিলেন। অন্যদিকে গোল আদায় করে নিতে পারতেন নুনো মেন্দেসও। বিরতির আগে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর পাওয়ারফুল শট পেদ্রো পোরোর মাথা ছুঁয়ে লাগে ক্রসবারে। পোরো ক্লিয়ারই করতে চেয়েছিলেন, নইলে হয়তো জালেই যেত বল।
প্রথমার্ধ শেষে দুই দলের পরিসংখ্যানও কাছাকাছিই। বল পজিশন স্পেনের ৫৫, পর্তুগালের ৪৫ শতাংশ। অন টার্গেট শট স্প্যানিশদের তিনটি, পর্তুগালের দুটি। রোনালদো, ইয়ামালের তখনো আসলে ম্যাচে আলো ছড়ানো বাকি। মেন্দেজ ইয়ামালকে ভালোই সামলাচ্ছিলেন। রোনালদো অপেক্ষায় ছিলেন মোক্ষম সুযোগের। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকেই নেতোর ক্রসে দৌড়ে এসে তিনি নাগাল পাননি। সেটি অবশ্য পর্তুগিজ তারকার গতির সমস্যা নয়, নেতোই বলটা দ্রুত ও আগে ছেড়েছিলেন। ৫৩ মিনিটে ইয়ামালকে ট্যাকল করতে গিয়ে পেশিতে টান পেয়ে মেন্দেজের মাঠ ছাড়া ছিল বড় দুর্ঘটনা। স্প্যানিশ সমর্থকদের মধ্যে তাতে হুল্লোর ওঠে, আর পর্তুগিজরা করতালিতে তাঁকে সহানুভূতি জানায়। ইয়ামালের প্রান্তে তখন নেলসন সেমেদোকে নামান রবার্তো মার্তিনেজ। ৬১ মিনিটে পেদ্রি গোলের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন, কিন্তু বক্সের ওপর থেকে নেওয়া তাঁর শট ক্রসবার উঁচিয়ে চলে যায়। ম্যাচের গতি বদলাতে বদলি খেলোয়াড়েরও তখন প্রয়োজন বোধ হয়, সেটি দুই দলেরই। দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর প্রথম সে বদল আনেন মার্তিনেস। রাফায়েল লিয়াওকে নামান তিনি ফেলিক্সের বদলে, নিচে কেন্সেলোর বদলে দিয়াগো দালত। ইয়ামাল বাঁ প্রান্তে ফ্রি-কিক পেলে স্প্যানিশরা উল্লাস করেছিল, তবে কস্তার জন্য কোনো বিপদ হয়নি। লুইস দে লা ফুয়েন্তেও এরপর বেঞ্চ থেকে খেলোয়াড় ডাকেন, ফেরান তরেসকে আনেন তিনি বায়েনার বদলে। রোনালদোকে মার্তিনেস শেষ পর্যন্ত রাখেন কি না সেটি দেখার ছিল। তবে এরপর জোড়া পরিবর্তনে বার্নান্দো সিলভা ও ফ্রান্সিসকো কনসেসোকে নামান তিনি নেতো ও ভিতিনিয়ার বদলে। এরই মধ্যে গর্তুগিজ বক্সে গোল বাঁকানো ব্লক ছিল সেমেদোর, ওলমোর গোলমুখী শট তিনি ফিরিয়ে দেন। নির্ধারিত সময় শেষ হতে চললে দে লা ফুয়েন্তে যোগ করেন আরো দুই ফরোয়ার্ড মিকেল মেরিনো ও ফাবিয়ান রুইজ, ওলমো উঠে যান। সেটিই যে মাস্টারস্ট্রোক হবে কে জানত। পর্তুগিজ ডিফেন্সের ক্ষণিকের অসতর্কতা ছিল, রুইজের আচমকা থ্রো বলে মেরিনোকে মার্ক করতে পারেননি পুরো ম্যাচ দুর্দান্ত খেলে আসা দুই পর্তুগিজ সেন্টারব্যাক। একেবারে ফাঁকায় বল স্পেনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দেওয়া গোলটি করতে ভুল হয়নি মেরিনোর।
অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে থাকা ম্যাচে এভাবে বাঁক নিয়ে স্পেনের দুযারে ঘুরে যাবে ভাবা যায়নি। রোনালদোরও তাই অপ্রত্যাশিত বিদায়।




