• ই-পেপার

ইরানে লাখো মানুষের শোকযাত্রা

  • গাজী আব্দুর রশীদ, তেহরান থেকে

রোনালদোর বিদায় শেষ আটে স্পেন

শাহজাহান কবির, ডালাস থেকে
রোনালদোর বিদায় শেষ আটে স্পেন
গোল উদযাপন মিকেল মেরিনোর। তাঁর একমাত্র গোলেই পর্তুগালকে বিদায় করে শেষ আটে স্পেন। ছবি : রয়টার্স

সেই মুহূর্তটা এসেই গেল। শেষ বিশ্বকাপে নামা ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো বিশ্বেকাপের শেষ ম্যাচটাও খেলে ফেললেন। ডালাসে গোলশূন্যভাবে অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে থাকা ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন বদলি নামা নামা স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড মিকেল মেরিনো। তাঁর ৯০তম মিনিটে করা একমাত্র গোলেই জয় নিয়ে স্পেন শেষ আটে। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় তাই কিংবদন্তির। লামিন ইয়ামাল রয়ে গেলেন আসরটিকে আরো কিছুদিন মাতানোর জন্য।

খেলা শুরুর আগে স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণার সময় যে দুটি নামের বেলায় সবচেয়ে বেশি আওয়াজ ওঠে, তা-ও ছিল রোনালদো আর ইয়ামাল। ম্যাচের আবহে দুই প্রজন্মের এই লড়াইয়ের বিষয়টা ছিল। ম্যাচ শুরুর আগে ডালাসের দর্শকরাও জানিয়ে দেনতাঁরা এর জন্য কতটা অধীর অপেক্ষায়। তবে ইয়ামাল নয়, শেষ পর্যন্ত লুই দা লা ফুয়েন্তের মাস্টারস্ট্রোকে ম্যাচ জিতিয়েছেন মিকে। শুরুতে সহজ সুযোগ নষ্ট করেছিলেন আগের চার ম্যাচে চার গোল করা মিকেল ওয়ারজাবাল। দানি ওলমো দারুণ বল বের করে দিয়েছিলেন তাঁকে। কিন্তু গোলরক্ষককে একা পেয়েও চাপটা নিতে পারেননি আগের চার ম্যাচে চার গোল করা এই ফরোয়ার্ড। অন্য প্রান্তে জোয়াও ফেলিক্সের বাড়ানো বল পেয়ে স্প্যানিশ গোলরক্ষককে পরখ করের রোনালদো।  ইয়ামালের প্রথম শট ১৭ মিনিটে, বাঁদিক থেকে বাঁ পায়ে তুলে দিয়েছিলেন। দিয়েগো কস্তা ফেরান তা। ফিরতি বলে ডান দিক থেকে আলেক্স বায়েনা দূরের পোস্টে নিশানা করলে সেই বলও ঝাঁপিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি। স্পেন সহজাত পাসিংয়ে ক্রমে চাপ বাড়ায় পর্তুগালের রক্ষণে। রুবেন দিয়াজের সঙ্গে তরুণ রেনাতো ভেইগা আস্থা নিয়ে খেলছিলেন সেই চাপের মুখে। তবে রোনালদো খেলাটা বদলে দিতে পারতেন, পেদ্রো নেতোর ক্রসে ফেলিক্সের হেড বাঁচাতে পোস্ট ছেড়ে অনেকটা বেরিয়ে গিয়েছিলেন উনাই সিমন, সেই বল রোনালদো পেয়েছিলেন, যদিও ততটা জায়গা পাননি, রিভার্স ভলির চেষ্টা করেছিলেন, ততক্ষণে সিমোন জায়গায় ফিরে তা আয়ত্তে নেন। স্পেন যখন উঠছিল, একত্রে উঠছিল। পর্তুগাল বল পেয়ে লম্বা পাসে উঠছিল দ্রুত। প্রথমার্ধটা গোলশূন্যভাবে শেষ হয়। ওয়াইরসাবাল ম্যাচের তাতে সেরা সুযোগটা পেয়েছিলেন। অন্যদিকে গোল আদায় করে নিতে পারতেন নুনো মেন্দেসও। বিরতির আগে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর পাওয়ারফুল শট পেদ্রো পোরোর মাথা ছুঁয়ে লাগে ক্রসবারে। পোরো ক্লিয়ারই করতে চেয়েছিলেন, নইলে হয়তো জালেই যেত বল।

প্রথমার্ধ শেষে দুই দলের পরিসংখ্যানও কাছাকাছিই। বল পজিশন স্পেনের ৫৫, পর্তুগালের ৪৫ শতাংশ। অন টার্গেট শট স্প্যানিশদের তিনটি, পর্তুগালের দুটি। রোনালদো, ইয়ামালের তখনো আসলে ম্যাচে আলো ছড়ানো বাকি। মেন্দেজ ইয়ামালকে ভালোই সামলাচ্ছিলেন। রোনালদো অপেক্ষায় ছিলেন মোক্ষম সুযোগের। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকেই নেতোর ক্রসে দৌড়ে এসে তিনি নাগাল পাননি। সেটি অবশ্য পর্তুগিজ তারকার গতির সমস্যা নয়, নেতোই বলটা দ্রুত ও আগে ছেড়েছিলেন। ৫৩ মিনিটে ইয়ামালকে ট্যাকল করতে গিয়ে পেশিতে টান পেয়ে মেন্দেজের মাঠ ছাড়া ছিল বড় দুর্ঘটনা। স্প্যানিশ সমর্থকদের মধ্যে তাতে হুল্লোর ওঠে, আর পর্তুগিজরা করতালিতে তাঁকে সহানুভূতি জানায়। ইয়ামালের প্রান্তে তখন নেলসন সেমেদোকে নামান রবার্তো মার্তিনেজ। ৬১ মিনিটে পেদ্রি গোলের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন, কিন্তু বক্সের  ওপর থেকে নেওয়া তাঁর শট ক্রসবার উঁচিয়ে চলে যায়। ম্যাচের গতি বদলাতে বদলি খেলোয়াড়েরও তখন প্রয়োজন বোধ হয়, সেটি দুই দলেরই। দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর প্রথম সে বদল আনেন মার্তিনেস। রাফায়েল লিয়াওকে নামান তিনি ফেলিক্সের বদলে, নিচে কেন্সেলোর বদলে দিয়াগো দালত। ইয়ামাল বাঁ প্রান্তে ফ্রি-কিক পেলে স্প্যানিশরা উল্লাস করেছিল, তবে কস্তার জন্য কোনো বিপদ হয়নি। লুইস দে লা ফুয়েন্তেও এরপর বেঞ্চ থেকে খেলোয়াড় ডাকেন, ফেরান তরেসকে আনেন তিনি বায়েনার বদলে। রোনালদোকে মার্তিনেস শেষ পর্যন্ত রাখেন কি না সেটি দেখার ছিল। তবে এরপর জোড়া পরিবর্তনে বার্নান্দো সিলভা ও ফ্রান্সিসকো কনসেসোকে নামান তিনি নেতো ও ভিতিনিয়ার বদলে। এরই মধ্যে গর্তুগিজ বক্সে গোল বাঁকানো ব্লক ছিল সেমেদোর, ওলমোর গোলমুখী শট তিনি ফিরিয়ে দেন। নির্ধারিত সময় শেষ হতে চললে দে লা ফুয়েন্তে যোগ করেন আরো দুই ফরোয়ার্ড মিকেল মেরিনো ও ফাবিয়ান রুইজ, ওলমো উঠে যান। সেটিই যে মাস্টারস্ট্রোক হবে কে জানত। পর্তুগিজ ডিফেন্সের ক্ষণিকের অসতর্কতা ছিল, রুইজের আচমকা থ্রো বলে মেরিনোকে মার্ক করতে পারেননি পুরো ম্যাচ দুর্দান্ত খেলে আসা দুই পর্তুগিজ সেন্টারব্যাক। একেবারে ফাঁকায় বল স্পেনকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দেওয়া গোলটি করতে ভুল হয়নি মেরিনোর।

অতিরিক্ত সময়ে গড়াতে থাকা ম্যাচে এভাবে বাঁক নিয়ে স্পেনের দুযারে ঘুরে যাবে ভাবা যায়নি। রোনালদোরও তাই অপ্রত্যাশিত বিদায়।

উক্তি

উক্তি

তৃণমূল থেকেই দুর্নীতিকে একেবারে না বলতে হবে। নিজে ঠিক থাকলে অন্যকে ঠিক করা যাবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী

টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে পাহাড় ধসে নিহত ১০

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার
টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারে পাহাড় ধসে নিহত ১০

প্রবল বর্ষণের জেরে পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রাণহানি ঘটেছে নারী ও শিশুসহ আটজনের। বাকি একজন নিহত হন কক্সবাজার শহরে। এ ছাড়া জেলার পেকুয়ায় আরো এক শিশু পাহাড়ধসে মারা যায়। গত রবিবার প্রথম প্রহর ও গতকাল সোমবার ভিন্ন সময়ে এসব ঘটনা ঘটে।

এদিকে, ভারি বর্ষণে কয়েকটি স্থান পানিতে নিমজ্জিত হলে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কেও যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। বর্ষণের পানিতে জেলা শহরসহ কয়েকটি উপজেলার জনজীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ।

তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন নিহতের বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। রবিবার পাহাড়ধসের প্রথম ঘটনা ঘটে রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। রাতে ক্যাম্পের বস্তিসংলগ্ন পাহাড়ের মাটি রোহিঙ্গা মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর ধসে পড়ে। ওই সময় বস্তিতে ঘুমন্ত রোহিঙ্গা কামাল হোসাইন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা (৩৯) ও ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪) মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ও রোহিঙ্গারা তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে তিনজনকে মৃত ও দুজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে। রাত ১টা ৪৫ মিনিটে মাটিচাপায় একরাম নামে সাত বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। নিহত একরাম ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে। ক্যাম্পের মাঝি এনায়েত উল্লাহ জানান, খবর পেয়ে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে। রাত ৩টায় উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ চারজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন, ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাকের মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তাঁর বোন তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রশিদের ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও তার ভাই হারুনুর রশিদ (৩)। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, ভারি বর্ষণে পাহাড়ধসের আশঙ্কার বিষয়টি আগেভাগেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পাহাড়গুলো আগে থেকেই মাটি কাটার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই এমন দু:খজনক ঘটনা ঘটেছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনায় পাহাড়ধসে আলী আকবর (৫৫) নামের একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার ভোর ৪টার কিছুক্ষণ পর এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় পাহাড়ধসে চাপা পড়ে একই পরিবারের চারজন। স্থানীয়রা তিনজনকে উদ্ধার করে। এ সময় আলী আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাঁকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে বর্ষণে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের রামু ও উখিয়া উপজেলার কয়েকটি স্থান নিমজ্জিত হয়ে পড়ায় গতকাল সকালে যানবাহন চলাচল কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল। কক্সবাজার শহরে পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সাগরপারের পর্যটন এলাকা কলাতলীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কুতুবদিয়া দ্বীপে বর্ষণের পানিতে লেমশিখালী-কৈয়ারবিল পাকা সংযোগ সেতুটি বিধ্বস্ত হয়। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায়  ২৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করার তথ্য দিয়েছেন কক্সবাজারের  সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান।

 

পেকুয়ায় শিশুর মৃত্যু

আমাদের চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান,  কক্সবাজারের পেকুয়ায় গতকাল সোমবার সন্ধ্যার দিকে টৈটং ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের খলিফামুড়ার আলিম্যার ঝিরি এলাকায় মো. মিনহাজ উদ্দিন (৭) নামের এক শিশু পাহাড়ধসে মারা যায়। সে একই এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর ও বিকেলের ভারি বর্ষণে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে কলিম উল্লাহর বাড়ির ওপর। ওই সময় বাড়ির দেয়ালে চাপা পড়ে শিশুটি মারা যায়। স্থানীয় লোকজন মাটির নিচ থেকে শিশুকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। স্থানীয় ইউপি সদস্য মনজুর আলম পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, শিশু ও তার নানি পানি নিষ্কাশনের কাজ করছিল। এ সময় হঠাৎ পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে বসতঘরের ওপরে গিয়ে পড়ে। এতে বাড়ির দেয়ালে চাপা পড়ে শিশুটি মারা যায়। এ সময় নুরুন্নাহার বেগম (৫৫) নামের সঙ্গে থাকা নানিও আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

চীন প্রস্তাবিত করিডরে বড় বাধা মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ

আবদুল্লাহ আল মিরাজ
চীন প্রস্তাবিত করিডরে বড় বাধা মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারকে নিয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয় বেইজিং। প্রস্তাবটি এখনো আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই করিডর বাস্তবায়নে বড় বাধা মিয়ানমার পরিস্থিতি। এ ছাড়া ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলোর মনোভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত করিডরের সম্ভাব্য রুট হিসেবে চীনের খুনমিং, মিয়ানমারের রুইলি-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকফিউ-রাখাইন অঞ্চল-মংডু এবং বাংলাদেশের টেকনাফ-কক্সবাজার-চট্টগ্রাম বন্দরের কথা ভাবা হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে খুনমিং-রুইলি-মান্দালয়-রাখাইন-পালেতোয়া-মংডু-টেকনাফ-চট্টগ্রাম রুট নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এই রুটে সড়ক, রেল, সমুদ্রপথ ও লজিস্টিকস সুবিধার সমন্বিত একটি মাল্টিমোডাল করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে।

সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য সড়কপথে খুনমিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব দুই হাজার কিলোমিটারের মতো। বর্তমানে চীনের পূর্ব উপকূল থেকে সমুদ্রপথে চট্টগ্রামে পণ্য পৌঁছাতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। করিডর চালু হলে ট্রাক বা রেলপথে সেই সময় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই কমবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে এই করিডর বাস্তবায়নে কত ব্যয় হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়নি। কারণ প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, চীন ধাপে ধাপে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কৌশল নিতে পারে। প্রথম পর্যায়ে বিদ্যমান সড়ক ও বন্দর অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমিত ট্রানজিট চালু করা হতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রেললাইন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এতে প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলক কম হবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অর্থায়নের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। সেখানে স্থিতিশীলতা না ফিরলে বড় আকারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন হবে।

চীন সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত করিডর সম্পর্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, চীনের প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নেওয়া হয়নি।

করিডর গঠনে চীনের আগ্রহের কারণ : কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে ইউনান প্রদেশকে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা। বর্তমানে চীনের বেশির ভাগ সমুদ্র বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেলের বড় অংশ ওই পথেই চীনে পৌঁছে। কোনো সংঘাত বা অবরোধের কারণে মালাক্কা প্রণালি অচল হয়ে গেলে চীনের জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। সে কারণে বিকল্প সংযোগপথ গড়ে তোলার কৌশলের অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরমুখী একটি স্থল করিডরকে গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এই করিডরে যুক্ত হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে চীন সরাসরি বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক উপস্থিতি আরো শক্তিশালী হবে এবং ইউনান প্রদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। পাশাপাশি ভারত মহাসাগর অঞ্চলেও চীনের কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

করিডর বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ : বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের চলমান সংঘাত। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন বিস্তীর্ণ এলাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বর্তমানে মংডু, বুথিডংসহ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় করিডর বাস্তবায়নে তাদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া চীনের এই উদ্যোগ নিয়ে ভারতেরও কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দরে চীনের গভীর সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের উপস্থিতি আরো জোরালো করতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চীনের একটি স্থল করিডর গড়ে উঠলে দিল্লি সেটিকে নিজের কৌশলগত পরিসরে চীনের প্রবেশ হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর এবং ওই সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনার বিষয়টিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়।

অতীতে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) করিডর বাস্তবায়নের উদ্যোগেও ভারত সক্রিয় আগ্রহ দেখায়নি। ফলে এখন ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন ত্রিপক্ষীয় করিডর বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরের পেছনে কোনো ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। এটি মূলত অর্থনৈতিক সংযোগের উদ্যোগ। যেকোনো দেশ চাইলে এতে অংশ নিতে পারে।

ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ভারতের আপত্তি থাকার সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। বরং ভবিষ্যতে ভারত চাইলে এ ধরনের সংযোগ ব্যবস্থার অংশও হতে পারে। তিনি বলেন, চীন ও ভারত বর্তমানে ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করছে। ফলে বিষয়টি শুধু প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ কম।

তিনি আরো বলেন, এই প্রকল্প নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে নানা মতামত দেওয়া হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা গবেষণাভিত্তিক নয়। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই ও গবেষণা সম্পন্ন করে আলোচনায় এগোনো উচিত। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডরকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় সুযোগ হিসেবে দেখছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ যে সংযোগ সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে, এ ধরনের একটি করিডর বাস্তবায়িত হলে তা অনেকাংশে দূর হতে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সরাসরি স্থল যোগাযোগ গড়ে উঠলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সংযোগে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে তিনি মনে করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। প্রথমত, মিয়ানমার এই করিডরের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তাই দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সহযোগিতার মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এটি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্প হওয়ায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের অবস্থানও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব দেশের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকল্পটির অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ যদি নীতিগত, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করতে পারে এবং বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, তাহলে করিডরটি দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত করিডরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়িত হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের পথ সহজ হতে পারে।