‘ভামোস ভামোস সেলেসিওন, হোয়ে তে ভিনিমোস, আলেন্তের পারা...’ ডালাস স্টেডিয়ামকে এক টুকরা আর্জেন্টিনা বানিয়ে গাইছিলেন সমর্থকরা। ম্যাচ শুরুর আগেই আকাশি-নীলে আবিষ্ট পুরো মাঠ। খেলা শুরু হলে তা নিমগ্ন লিওনেল মেসিতে। শুরুতেই যে পেনাল্টি স্পটে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এলএম টেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর এ ম্যাচের শুরুতেই আবার গোলের সুযোগ তাঁর সামনে। তবে মহাকাব্যে যেমন নানা বাঁক থাকে, এখানেও থাকল, লিওনেল মেসির সেই শট ফিরিয়ে দিলেন অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক
আলেক্সান্ডার শ্লাগার।
কিন্তু এই গল্পে অস্ট্রিয়া তো উপলক্ষ মাত্র। তাই ম্যাচ এগোয়, আকাশি-সাদারা ফের গোলের জন্য ঝাঁপায়। ৩৮ মিনিটে সেই মেসির পায়েই গোল, মঞ্চ সাজানো যে তাঁর জন্য। থিয়াগো আলমাদা বল নিয়ে উঠে বাঁদিকে বাড়ান ফাকুন্দো মেদিনাকে, সেখান থেকে মেদিনার কাট ব্যাক বক্সের ভেতর লিওর বাঁ পায়ের সীমানায়। পেনাল্টি মিস তো ছিল অঘটন। এমন মুভের পর সুযোগ নষ্ট হয় নাকি আর্জেন্টিনা তারকার। শ্লাগার হিসাবে ভুল করলেন অথবা হিসাব মেলানো সম্ভব ছিল না। মেসি এত দ্রুত বক্সে ঢুকে চোখের পলকে শট নিলেন যে অস্ট্রিয়ান গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়ে দেখলেন বল জালে। আর এই গোলেই মিরোস্লাভ ক্লোজাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসে যান মেসি। আসর শুরু করেছিলেন ক্লোজার থেকে তিন গোলে পিছিয়ে থেকে, দুই ম্যাচ না পেরোতেই সেই রেকর্ড ভেঙে দেন আগামীকালই ৩৯-এ পা রাখতে যাওয়া এই তারকা। মেসি এই আসরে ঠিক আক্রমণ সাজাচ্ছেন না, অপেক্ষা করছেন বলের জন্য। আর বল পেলেই গোলের জন্য এমন সব মুভ নিচ্ছেন যে মুহূর্তের সেই ঝলক প্রতিপক্ষের জন্য সামলানো বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তেমনি ম্যাচের একেবারে শেষ প্রান্তে তাঁর বাড়ানো বলে হুলিয়ান আলভারেস যখন পারলেন না, আবার সেই তিনিই এগিয়ে এসে ম্যাচে নিজের দ্বিতীয় গোলটাও করে ফেললেন। ১-০-তেই জয়ের পথে এগোচ্ছিল আলবিসেলেস্তেরা। শেষের ওই গোল আরো রং যোগ করল। বিশ্বকাপের শুরুর দুই ম্যাচেই পাঁচ গোল! নিজের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে এমন চিত্রনাট্য ধরে এগোবেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি কেই বা ভেবেছিল!
এদিন শুরুটা করেছিলেন অবশ্য লাউতারো মার্তিনেস। বল নিয়ে এমন দুর্দান্তভাবে বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন যে অস্ট্রিয়ার দুই ডিফেন্ডার একযোগে ট্যাকল করেন তাঁকে। রেফারি মাঠের পাশের ক্যামেরা দেখে এসে সিদ্ধান্ত দেন পেনাল্টির। ম্যাচের তখন কেবল ৭ মিনিট। মেসির সেই পেনাল্টি মিস হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনার খেলায় এর পরও এমন একটা প্রত্যয় ছিল যে গোলের সম্ভাবনা তাতে কমে না। ১৯ মিনিটে মার্তিনেস থেকেই মেসির বক্সের ভেতর বল পেলে আতঙ্ক ছড়ায় অস্ট্রিয়ান ডিফেন্সে। ডেভিড আলাবা মেসির পায়ের নাগাল থেকে বল সরাতে পোস্টের দিকেই ক্লিয়ার করেন, গোলরক্ষক ফেরান সেই বল। অন্য প্রান্তে মার্সেল সাবিটজারের শট ব্লক করেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। এরপর ৩২ মিনিটে বাঁদিক দিয়ে আলমাদা, ফাকুন্দোর সেই মুভ। বার্সেলোনায় ইহোর্দি আলাবার এমন কত মুভে গোল করেছেন মেসি, এ তো তাঁর মুখস্থ পাঠ। যখন পেনাল্টি মিস করেছিলেন গ্যালারির দর্শকরা দাঁড়িয়ে গেয়েছিলেন ‘মেসি’ মেসি’। যখন গোল পেলেন আরো একবার সেই নাম ধরে তাদের আনন্দ যাপন।
আর্জেন্টিনা এই গোলটি ধরে রেখেই ম্যাচ এগিয়ে নেয়। বাড়তি সতর্ক হয় রক্ষণে। বিরতির পর অস্ট্রিয়া বক্সের খুব কাছে ফ্রিকিক পেলে এমিলিয়ানো মার্তিনেসেরও নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পেলে। সাবিটজারের শট হিরোর মতো ঝাঁপিয়ে তা ফিরিয়েও দিয়েছেন গত বিশ্বকাপের গোল্ডেন গ্লাভস জেতা এই তারকা। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি স্কালোনি প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনেন। লাউতারোকে তুলে হুলিয়ান আলভারেস আর আলমাদাকে তুলে নামান নিকো গনসালেসকে। এই দুজন আগের ম্যাচেও বদলি নেমে ভালো খেলেছিলেন, তাতে আর্জেন্টাইন সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রবল ধারণা ছিল, তাঁরা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে শুরুর একাদশেই থাকবেন। কিন্তু স্কালোনি ৩-০ গোলের জয়ের পরও এমন বদলের যৌক্তিকতা দেখেননি, মার্তিনেস, আলমাদা দুজনকেই রেখে দেন শুরুর একাদশে। এদিন শুরু থেকে ধারালোও ছিল তাঁদের পারফরম্যান্স। মেসির সঙ্গে বোঝাপড়াও ছিল বেশি। পরে নিকো নেমে মেসির কর্নারেই গোলের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন। দূরের পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায় তাঁর সেই হেডার। ওদিকে ম্যাচ যখন শেষের পথে, আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগ দেখায় দৃঢ়তা একমাত্র গোলটা ধরে রাখতে। সেই গোলেই শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত হতো, হয়তো বা নকআউটও। তবে মেসি এবার প্রত্যাশার পেয়ালা ভরিয়ে দেবেন বলেই যেন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। শেষ সময়ে তাই আরো এক গোল তাঁর জাদুকরী বাঁ পায়ে।




