লোকটি বাঁশি বাজান। এটাই তাঁর পরিচয়। সবাই ডাকে বাঁশিওয়ালা। এর বাইরে তাঁর অন্য কোনো পরিচয় কেউ জানে না। জানবে কী করে? লোকটি তো এই এলাকার বাসিন্দা নয়। টঙ্গী রেলস্টেশনে হঠাৎ একদিন তাঁর আবির্ভাব। আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। দেখতে অদ্ভুত কিসিমের। মুখ ভর্তি দাড়ি। পরনে লম্বা কালো ওভারকোট। পায়ে শতচ্ছিন্ন চামড়ার স্যান্ডেল। এই ধরনের অদ্ভুত একটি লোক হঠাৎ কেন টঙ্গী রেলস্টেশনে এলেন? কী তাঁর পরিচয়?
বাঁশি তো ভালোই বাজান। প্রশ্ন করলে জবাব দেন না। শুধুই দাঁত বের হাসেন। রেলস্টেশনে তাঁকে ঘিরে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হলো! নানাজনের নানা মন্তব্য! স্টেশনের সবচেয়ে পুরনো চায়ের দোকানদার হাফিজ মিয়ার ধারণা, লোকটি টিকটিকি। অর্থাৎ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার লোক! স্টেশনের কুলির সর্দার মালেকের ধারণা, এই লোক টিকটিকি নয়। ব্যর্থ প্রেমিক। প্রেমে ব্যর্থতার কারণে মনের দুঃখে দেশান্তরি হয়েছেন। হাফিজ মিয়া ও মালেকের ধারণার পক্ষে দুটি দল দাঁড়িয়ে গেল। একটি দলের ধারণা, এই লোক টিকটিকি। কাজেই তাঁর ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে। বলা তো যায় না, কাকে কখন ফাঁসিয়ে দেন। অন্য দলের ধারণা, লোকটি ব্যর্থ প্রেমিক। তবে হ্যাঁ, তিনি ভালো বাঁশি বাজান এ ব্যাপারে দুই পক্ষই একমত।
এই মাত্র তাঁর বাঁশি শুনে এসেছে বাদাম বিক্রেতা ইসমাইল। চা খাওয়ার জন্য হাফিজ মিয়ার দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কুলির সর্দার মালেক আগে থেকেই হাফিজ মিয়ার চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিল। ইসমাইল চায়ের অর্ডার দিয়ে অদ্ভুত লোকটির প্রসঙ্গ তুলল—ভাইরে ভাই, আমি জীবনে এমন বাঁশির সুর শুনি নাই। মানুষটা সেই রকম বাঁশি বাজায়... ফাসক্লাস টাইপের বাঁশি।
হাফিজ মিয়া ইসমাইলকে প্রশ্ন করল—মানুষটার পরিচয় জানতে পারছ? বাড়ি কোথায়? এই এলাকায় কেন আসছে...?
ইসমাইল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল—না, এই ব্যাপারে এখনো কিছু জানতে পারি নাই। প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না। শুধু হাসে! হাসিটা সুন্দর। মায়া লাগে। আমার মনে হয়, মানুষটা কামেল-দরবেশ টাইপের কেউ হবে।
ইসমাইলের কথা শেষ হতে না হতেই হাফিজ মিয়া সামনের দিকে তাকিয়ে একটু তটস্থ হয়। মানুষের একটা জটলা তার দোকানের দিকেই আসছে। জটলার মাঝখানে অদ্ভুত মানুষটিও আছে। তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে এলাকার একজন তরুণ। তার নাম মন্টু। পেশায় পকেটমার। লোকটিকে একনজর দেখার জন্য উত্সুখ মানুষের ভিড় ক্রমে বাড়ছে।
এই যে ভাই, সরেন তো। হাফিজ চাচা, বাবারে এক কাপ চা দেও তো! বাবা, আপনি কি চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাইবেন? বাটার বন, বিস্কুট, কলা...
লোকটি কোনো উত্তর দিলেন না। মালেকসহ অন্য যারা চা খাচ্ছিল, তারা উঠে দাঁড়িয়ে লোকটিকে বেঞ্চিতে বসার আহবান জানায়। লোকটি বেঞ্চের ওপর বসে শুধুই নিঃশব্দ হাসতে থাকেন। হাফিজ মিয়া প্রশ্ন করে—বাবা, আপনি কি শুধুই চা খাবেন? কলা, রুটি, বিস্কুট একটা কিছু দেই?
লোকটি এবারও কিছু বলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখেন। তারপর বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেন।
মফিজ মিয়া বিনয়ের সঙ্গে লোকটির দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লোকটি স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন—দুধ চা। আল্লায় দিছে। বলেই ডান হাত ওপরে তুলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়।
হাফিজ মিয়া বিনয়ের সঙ্গে প্রশ্ন করে—বাবা, আপনার বাড়ি কোথায়?
লোকটি এবার কিছু বলেন না। হাসতে হাসতে আকাশের দিকে ডান হাত তোলেন।
মালেক প্রশ্ন করে—বাবা, আপনার সংসার আছে? স্ত্রী, পুত্র, কন্যা...
লোকটি বলেন, সবই মায়ার খেলা।
হাফিজ মিয়া প্রশ্ন করে—বাবা, আপনি তো এই দেশেরই মানুষ, নাকি? বাংলাদেশ...
এবার লোকটি যেন অতিমাত্রায় সতর্ক হয়ে ওঠেন। ভয়ার্ত চোখে আশপাশে তাকান। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলেন।
লোকটি সতর্ক চোখে আশপাশে দেখে নিয়ে বলেন, বিপদ আসতেছে। অনেক বড় বিপদ। হুঁশিয়ার, সাবধান...লোকটি কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ সামনের দিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকেন।
কী বুঝল্যা মালেক? মানুষটার মাথায় মনে হয় ছিট আছে? মালেক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কী জানি, কার মনে যে কী আছে বলা মুশকিল। তবে আমি শিউর, এই লোক টিকটিকি না। মেন্টাল প্রবলেম আছে। দেখে মনে হইল, লেখাপড়া জানা মানুষ।
ঢাকাগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস এইমাত্র প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়েছে। হাফিজ মিয়ার চায়ের দোকানে আবার ভিড় শুরু হলো। মালেক বলল, হাফিজ ভাই আমি যাই।
পরের দিন সকালে ঢাকাগামী নীলসাগর ট্রেনযোগে একজন তরুণী টঙ্গী রেলস্টেশনে এসে নামল। তার হাতে একটা ফটো। যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই দেখাচ্ছে। পকেটমার মন্টু তরুণীকে টার্গেট করেছে। ছলে বলে কৌশলে তরুণীর ভ্যানিটি ব্যাগ হাপিস করার সুযোগ খুঁজছে সে। ইদানীং পুরুষের মানিব্যাগ হাপিস করে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। মন্টু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে পুরুষের বদলে মহিলাকে টার্গেট করবে। নীলসাগর এক্সপ্রেস থেকে তরুণীটিকে একা নামতে দেখেই তাকে টার্গেট করেছে মন্টু। তরুণী যাকে কাছে পাচ্ছে তাকেই একটা ফটো দেখাচ্ছে। মন্টু কৌতূহলী হয়ে উঠল। দ্রুত পায়ে হেঁটে তরুণীর সামনে এসে দাঁড়ায় মন্টু। বিনীত কণ্ঠে জানতে চায়—ম্যাডাম, আপনি কি কাউকে খুঁজতেছেন?
তরুণী ক্লান্ত কণ্ঠে জবাব দেয়—হ্যাঁ। তারপর হাতের ফটোটা উঁচিয়ে ধরে জানতে চায়, এই মানুষটাকে কি দেখেছেন?
ফটো দেখে চমকে ওঠে মন্টু! এটা কার ফটো?
আমার বাবার।
আপনার বাবা?
হ্যাঁ! আমার মোবাইলে একজন মেসেজসহ ছবি পাঠিয়েছে। বাবাকে নাকি এই রেলস্টেশনেই দেখা গেছে। আপনি কি এই রেলস্টেশনে থাকেন?
হ্যাঁ।
তাহলে নিশ্চয়ই তাঁকে দেখেছেন?
তিনি কি বাঁশি বাজান? প্রশ্ন করে মন্টু।
হ্যাঁ। আগ্রহভরে উত্তর দেয় তরুণী!
আপনার বাবা কি মানসিক রোগী?
হ্যাঁ। মানসিক রোগীই বলতে পারেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
তরুণীর মুখে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দটা শুনে বিচলিত হয়ে ওঠে মন্টু। তরুণীর নাম জানতে চায়। তরুণী নিজের নাম বলে।
আমার নাম মেঘনা। আমরা তিন ভাই-বোন। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। পদ্মা আমার বড় ভাই। আমি মেঘনা। আমার ছোট যমুনা। বাবাই আমাদের নাম রেখেছেন। আপনি কি তাঁকে দেখেছেন? হঠাৎ কেঁদে ফেলে মেঘনা।
মন্টুর হিসাব-নিকাশ বদলে যায়। মেঘনার কথা শুনে সিদ্ধান্ত পাল্টায়। মেঘনাকে সহযোগিতা করার কথা ভাবে। মেঘনাকে সহযোগিতা করা মানে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা করা। মন্টুর বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। লেখাপড়া জানতেন না। দেশকে জালিমের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর বীরের বেশে দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো মর্যাদা পাননি। কয়েক বছর আগে মারা যান মন্টুর বাবা। মন্টুরা তিন ভাই, দুই বোন। ভাইদের মধ্যে বড় দুজনের একজন ডিমের ব্যবসা করে। অন্যজন ঢাকা শহরে রিকশা চালায়। মা আর অবিবাহিতা দুই বোনকে নিয়ে বাবার সংসারেই থেকে গেছে মন্টু। বাবার মতো সেও অশিক্ষিত। তাই কোনো চাকরি মেলেনি। বাধ্য হয়ে পকেটমার হয়েছে। পরিবারের সবাই জানে মন্টু ঢাকা শহরে চাকরি করে।
মেঘনা অসহায়ের মতো মন্টুর দিকে চেয়ে আছে। বাঁশিওয়ালাকে গতকাল সন্ধ্যার পর টঙ্গী রেলস্টেশনে আর দেখা যায়নি। কোথাও গেছে, নাকি রেলস্টেশনেই আছে খোঁজ নিতে হবে। তার আগে হাফিজ মিয়ার সঙ্গে মেঘনার দেখা করিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ হাফিজ মিয়ার কাছে বাঁশিওয়ালার খবর থাকলেও থাকতে পারে।
মেঘনাকে দেখে হাফিজ মিয়া তার চায়ের দোকান থেকে নেমে এলো! পরম মমতায় জিজ্ঞেস করল, বাঁশিওয়ালা কি তোমার বাবা?
হ্যাঁ। মাথা নাড়ে মেঘনা।
তোমাদের বাড়ি কোথায়?
ঢাকা, মিরপুরে। ১০ নম্বর গোলচত্বরের পাশে।
তুমি আসো আমার সঙ্গে।
মেঘনা ও মন্টুকে সঙ্গে নিয়ে রেলস্টেশনের অপেক্ষাকৃত একটি ফাঁকা জায়গায় আসে হাফিজ মিয়া। যাত্রীদের বসার জন্য একটা বেঞ্চ খালি পড়ে আছে। মেঘনাকে ওই বেঞ্চে বসিয়ে নিজেও মেঘনার পাশে বসে হাফিজ মিয়া।
আমার বাবা কোথায় আপনি জানেন?
তোমার বাবা আছেন, ধারেকাছেই আছেন! তোমাকে কি আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারব?
প্রশ্ন করেন।
তোমার বাবার পরিচয় কী?
তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। রিটায়ার করেছেন। তাঁর বড় পরিচয় তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
হাফিজ মিয়া বলে, তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন?
হ্যাঁ। হি ইজ আ ফ্রিডম ফাইটার।
আজ তাঁর এই দশা কেন?
হাফিজ মিয়ার প্রশ্ন শুনে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায় মেঘনা। উদাস কণ্ঠে বলে, বাবা এত দিন ভালোই ছিলেন। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এত মানুষের মৃত্যু দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। এত রক্তপাত মেনে নিতে পারছিলেন না। প্রতিদিন একটা কথাই বলতেন, অনেক অন্যায় হচ্ছে। এত রক্তপাতের মাশুল দিতে হবে। দেশটার ক্ষতি হবে। তরুণ প্রজন্মের প্রশংসা করতেন। বলতেন—হ্যাঁ, এরাই পারবে...যখন গণ-অভ্যুত্থান চলছিল তখন একদিন কী একটা কাজে মিরপুর থেকে বাসে চড়ে গুলিস্তানের দিকে যাচ্ছিলেন। ওই বাসে কয়েকজন বেপরোয়া তরুণ উঠেছিল। তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বেশ কটাক্ষ করছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নাকি তাদের কাছে কোনো জরুরি বিষয় না। বাবা প্রতিবাদ করেছিলেন। বেপরোয়া ওই তরুণরা সেদিন কদর্য কথা ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বাবাকে চরম অপমান করে। বাসায় ফিরে বাবা সেদিন অনেক কেঁদেছেন। তাঁর একটাই কথা, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এই দেশের মূল শিকড়। অথচ শিকড়ের কোনো স্বীকৃতি নাই। শিকড় ছাড়া এই দেশ বাঁচবে কী করে? আবার জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক তোলা হচ্ছে। জাতীয় সংগীত কার পাকা ধানে মই দিয়েছে? এইসব প্রশ্ন বাবাকে অস্থির করে তোলে। বাসা থেকে বের হন না। নিজের ঘরে যখন-তখন বাঁশির সুর তোলেন। স্বাধীনতাসংগ্রামে বাঁশি বাজিয়ে সহযোদ্ধাদের সাহস ও শক্তি জোগাতেন। সেই বাঁশিকেই সঙ্গী করে নেন। হঠাৎ একদিন সবার অলক্ষ্যে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান বাবা। একটি জাতীয় দৈনিকে বাবার নিখোঁজ সংবাদ ছাপা হয়েছিল। সেই সংবাদ পড়ে একজন আমাকে ফোন করে। তার পরের ঘটনা তো বুঝতেই পারছেন। কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে মেঘনা। পরক্ষণেই দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে হাফিজ মিয়ার দিকে তাকায়—কোথায় আমার বাবা? প্লিজ আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে চলুন, প্লিজ...
হাফিজ মিয়া ও মন্টু দুজনই বিব্রত ভঙ্গিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। কারণ তারা নিজেরা জানে না বাঁশিওয়ালা এখন কোথায় আছেন। মেঘনা আবার একই প্রশ্ন করল, আমার বাবা কোথায়?
হাফিজ মিয়া কোনো উত্তর দিল না। মন্টু বলল, আপনার বাবা এই স্টেশনেই কোথাও না কোথাও আছেন। চলেন খুঁইজ্যা দেখি! আসেন...
আপনাদের মনে হয়তো একটা প্রশ্নের উদয় হয়েছে, আমি একা কেন বাবাকে খুঁজতে এসেছি। সহজ উত্তর, আমরা চার ভাই-বোন। মা বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের আমিই একমাত্র বোন। সবার ছোট। ভাইয়েরা চাকরি ও ব্যবসার সুবাদে কেউ ঢাকায় কেউ চট্টগ্রামে থাকে। বাবা আমার সঙ্গেই থাকেন। তাই আমিই বাবাকে খুঁজতে বেরিয়েছি। বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে মেঘনা।
মন্টু অস্থির হয়ে ওঠে। নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন মাথার ওপর একটা ছাদ ছিল। নির্ভরতার ছাদ। এখন ছাদটা নেই। মেঘনারও হয়েছে সেই দশা। তার বাবাকে খুঁজে দিতে পারলে নিজের বাবাকেই যেন খুঁজে পাবে এমন একটা অনুভূতি পেয়ে বসল তাকে। মন্টু সিদ্ধান্ত নিল, আজ পকেটমারের ধান্দা বাদ। বাঁশিওয়ালাকে খুঁজে বের করতেই হবে। হঠাৎ দূরে কোথাও বাঁশির সুর শোনা গেল। মন্টু সতর্ক ভঙ্গিতে বলল—ম্যাডাম শুনতেছেন? বাঁশিওয়ালার বাঁশি...
মেঘনা বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, এটা তো বাবার বাঁশির সুর।
হাফিজ মিয়া বলল, আমিও শুনতে পাইতেছি। বাঁশিওয়ালার বাঁশি...
বাঁশির সুর যেদিক থেকে আসছে মেঘনা সেদিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকল। মন্টু ও হাফিজ মিয়াও তার সঙ্গে শামিল হলো।
টঙ্গী রেলস্টেশনের পাশেই একটি খোলা জায়গায় বাঁশি বাজাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা এজাজুল হক। শখানেক বিভিন্ন বয়সী মানুষ গোল হয়ে তার বাঁশি শুনছে। দেশাত্মবোধক বেশ কয়েকটি গানের সুরে পর্যায়ক্রমে বাঁশি বাজালেন এজাজুল হক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বাঁশি শুনছে সবাই। হঠাৎ তিনি জাতীয় সংগীতের সুর তুললেন। তখনই তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল মেঘনা। মেয়েকে কাছে পেয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন এজাজুল হক।
মা, তুই এসেছিস?
হ্যাঁ, বাবা। বাড়িতে চলো।
এজাজুল হক চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, জাতীয় সংগীত শুরু করেছিলাম। কারা নাকি আমাদের জাতীয় সংগীতও বদলাতে চায়। আমার জীবন থাকতে সেটা হতে দেব না। কক্ষনো না।
মেঘনা দূঢ়তার সঙ্গে বলল—বাবা, তুমি তোমার সিদ্ধান্তে অটল থাকো। আমি আছি তোমার সঙ্গে। বাজাও তোমার বাঁশি...
এজাজুল হক বাঁশিতে জাতীয় সংগীতের সুর তুললেন। হঠাৎ কী যে হলো, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ ছুটে আসতে থাকল এজাজুল হককে ঘিরে সৃষ্ট মানুষের জটলার দিকে। জনতার মহাসমুদ্রে বাজছে বাঁশি। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...






ইসরাতের ছিল ভীষণ পড়ার ঝোঁক। অনেকেই তাকে বলত বইপোকা। আগে সে বই সংগ্রহ করত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে। কিছু বই কিনত নীলক্ষেত থেকে। কিন্তু আরাবের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও রিলেশনে আসার পর বই সংগ্রহের সব দায়িত্ব নিয়েছিল আরাবই। ইসরাতের পছন্দের বেশির ভাগ বই আরাব গিফট করেছে। তার মাঝারি মানের পড়ার অভ্যাসটাও বড় পড়ুয়ায় পরিণত হয়েছে। বই পড়ার পর দুজনে আবার সেই বইয়ের আলোচিত চরিত্র, বইয়ের থিম, লেখার মান নিয়ে আলোচনা করত।