গবেষণা বলছে, নানা কারণে দ্রুত বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা। বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গত চার দশকে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অন্তত ১০ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫ লাখ ক্যান্সার রোগী রয়েছে এবং প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় দুই লাখ মানুষ। অথচ ক্যান্সারের চিকিৎসা এখনো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক রোগীর পক্ষে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। এ কারণে ২০১৯ সালে আট বিভাগীয় শহরে বিশেষায়িত ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি হাসপাতাল নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়, কিন্তু এখনো সেগুলোতে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়নি।
ক্যান্সারের প্রাদুর্ভাব দিন দিন বাড়লেও অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতায় ব্যাহত হচ্ছে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসকদের মতে, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে বেশির ভাগ ক্যান্সার রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগের কাছাকাছি। কিন্তু প্রাথমিকভাবে রোগ নির্ণয়ের (স্ক্রিনিং) যথাযথ কর্মসূচি না থাকা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা কম থাকায় ক্যান্সার আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীই চিকিৎসার জন্য আসে রোগের শেষ পর্যায়ে। এর ফলে ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি। তার পরও চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে রয়েছে বিড়ম্বনা, দুর্ভোগ ও অতিরিক্ত ব্যয়। ফলে যথাযথ চিকিৎসা না পেয়েই অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
দেশের ৬৪ জেলার ক্যান্সার রোগীদের প্রধান ভরসা এখনো রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। এখানে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পরও একটি শয্যার জন্য রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় এক-দেড় মাস। এই দীর্ঘ অপেক্ষায় অনেক রোগীর শরীরে ক্যান্সার আরো ছড়িয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, হাসপাতালে আটটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে রোগীদের রেডিওথেরাপি নিতে আট থেকে ১০ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগেও একই ধরনের চাপ রয়েছে। চিকিৎসার এই বিলম্বও রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হয়।
আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার হাসপাতাল চালু হলে রোগীদের এই দুর্ভোগ অনেকাংশেই লাঘব হতো। কিন্তু সেগুলো কবে চালু হবে, তা বলা কঠিন। জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন ‘৮টি বিভাগীয় শহরে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৪৩৩ কোটি টাকায়। একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। এখন আবার ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০.৮১ শতাংশ, যদিও নির্মাণকাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৮১.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ ভবনের কাজ এগোলেও হাসপাতাল চালুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, আসবাব স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
আমরা আশা করি, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণে বিভাগীয় হাসপাতালগুলো দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে রোগ নিরূপণে জাতীয় ভিত্তিতে স্ক্রিনিং পরিচালনা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।

