শিশুরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে, তা হতে পারে একটি সুস্থ সমাজের মাপকাঠি। কিন্তু উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করতে হয়, আমাদের সমাজে শিশুরা মোটেও নিরাপদে নেই। জীবনের ডালপালা মেলার আগেই তাদের ওপর নেমে আসছে খুন, ধর্ষণ, হত্যার মতো পৈশাচিকতা। গতকাল কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রতি মাসে গড়ে ৪২ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, এর চেয়ে অনেক বেশি শিশু প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সামাজিক ভয় বা সম্মানহানির কারণে অনেক ঘটনা আমাদের সামনে পর্যন্ত আসছে না।
দেখা যাচ্ছে, সামান্য কারণেও শিশুদের ওপর নেমে আসছে পাশবিক নির্মমতা। সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে কানের দুল ছিনিয়ে নিতে ফারজানা ইয়াসমিনকে (৯) শ্বাস রোধ করে হত্যার পর আলমিরার ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখেন প্রতিবেশী এক নারী। জানাজানি হলে অভিযুক্ত নারীকে স্থানীয় লোকজন পিটিয়ে হত্যা করে। রাজধানীর তুরাগ থানায় স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার এক পর্যায়ে সাত মাস বয়সী শিশুকে আছাড় মেরে হত্যা করেন স্বামী কবির হোসেন। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। এমন ঘটনা একটি-দুটি নয়, হাজার হাজার। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে গত সাড়ে পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত) দুই হাজার ৭৭৬ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৪২ জন শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় ৫৬৬ জন শিশুকে। আর ৪৭৪ জন শিশু পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে অপর এক খবরে বলা হয়েছে, সামাজিকভাবে ৯ ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। উৎকণ্ঠার ব্যাপার হলো, এসব নৃশংসতা সমাজে বেড়েই চলেছে। জানা গেছে, গত ছয় মাসে এক হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪২। অর্থাৎ নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, জীবিকার অনিশ্চয়তা থেকে বেশির ভাগ সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বিচারহীনতার পরিবেশ সব ধরনের অপরাধকে উসকে দিচ্ছে। এ ছাড়া দেশের অবকাঠামোগত নানা দিক উন্নত হলেও সামাজিক মূল্যবোধ এখনো পশ্চাৎপদ।
আমরা মনে করি, সমাজে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই। শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের উপযুক্ত সাজা দিতে হবে। একই সঙ্গে পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা অপরিহার্য।

