বেসবলের শব্দ 'পিঞ্চ হিটিং'কে ক্রিকেটে আমদানি করেছিল কে, সেটা জানা না থাকলেও মার্ক গ্রেটব্যাচ যে পিঞ্চ হিটিংয়ের পথপ্রদর্শক এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। দিনের আলোয় সাদাপোশাকে আর লালবলে টেস্টম্যাচের গন্ধমাখা এক দিনের ক্রিকেটটা বদলে গিয়েছিল ১৯৯২'র বিশ্বকাপে। ক্যারি প্যাকার সিরিজের বদৌলতে সাদা ক্যানভাসে লাগে রঙের পরত, 'বিগ বয়েজ প্লে অ্যাট নাইট' স্লোগানে খেলা হয় নৈশালোকে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে ১৯৯২'র বিশ্বকাপই দেখেছিল এই পালাবদল, সময়ের চাকা ঘুরে ২৩ বছর পর আবার যখন বিশ্বকাপ ফিরল অস্ট্রেলেশিয়াতে, সেখানেও পালাবদলের সুর। এবারে পিঞ্চ হিটিংয়ের হার্ডরক থেকে স্লগিংয়ের 'মেটাল মিউজিকের উন্মত্ত ঝঙ্কার। অ্যাকশন সিনেমার মতই মারই এখন ক্রিকেটের শেষকথা। উদ্বোধনের দিনে দুই দেশে কোরি অ্যান্ডারসন ও অ্যারন ফিঞ্চের ব্যাটে যে রান উৎসবের সূচনা, সেটা ক্রমেই হচ্ছে আরো জোরালো। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন, পেস বোলিং সহায়ক উইকেট, বড় বাউন্ডারি এমন অনেক কিছুই শোনা যাচ্ছিল বিশ্বকাপ শুরুর আগে। মনে হচ্ছিল রান হবে কম, উইকেট পড়বে বেশি। কিন্তু ব্যাটসম্যানদের দাপটে সবই উড়ে গেছে মাঠের বাইরে! ছোট মাঠ, ভারী ব্যাট, শারীরিকভাবে শক্তিশালী ব্যাটসম্যান, দুই প্রান্তে দুই নতুন বল, মরা পিচ আর বাউন্ডারির বাইরে গ্যালারিজুড়ে উন্মাতাল দর্শক-এই হচ্ছে ফরমুলা। বছরজুড়ে টোয়েন্টি টোয়েন্টি দেখতে অভ্যস্ত দর্শক এখন আর 'ফাইনেস্ট লেট কাট' দেখে তালি বাজান না, দারুণ ইনসুইঙ্গারে ব্যাটসম্যানকে বোকা বানালেও বোলারের জন্য উঠে দাঁড়ান না। তাদের চাই ছক্কা! একের পর এক ছক্কায় বল আসবে গ্যালারিতে, ক্যাচ লুফে নিয়ে পাওয়া যাবে পুরস্কার, চেহারা দেখানো হবে মাঠের বড় পর্দায় ও টেলিভিশনে। এটাই যখন দর্শকদের চাহিদা, আয়োজকরা সেটা মেটাতেই বোলারদের নিয়মের অদৃশ্য শেকলে হাত-পা বেঁধে নামিয়ে দিয়েছেন 'গ্ল্যাডিয়েটর'রূপী ব্যাটসম্যানদের সামনে। তাই শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটটা ব্যাটসম্যান ও বোলারদের দ্বৈরথ থেকে কোন দলের ব্যাটসম্যানরা সবচেয়ে জোরে মারতে পারেন, রূপ নিয়েছে সেই প্রতিযোগিতায়। শুরু থেকেই সেই প্রতিযোগিতায় ব্রেন্ডন ম্যাককালাম, ডেভিডমিলার,আন্দ্রে রাসেলরা কালীপূজার পটকা ফোটাচ্ছিলেন, আসল বিস্ফোরণটা ঘটিয়েছেন ক্রিস গেইল। বহুদিন ধরেই এই জ্যামাইকানের নামের পাশে লেখা হচ্ছে 'ক্যারিবিয়ানের কসাই'। নির্মম নিষ্ঠুরতায় তিনি বোলারদের কচুকাটা করেন, সেটা হোক দেশের জার্সিতে বা ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টিতে। আইপিএলে তিনিই অন্যতম চাহিদাসমপন্ন খেলোয়াড়, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলতে এসে সকালে বিমানবন্দরে নেমে বিকেলেই মাঠে এসে করে ফেলেন সেঞ্চুরি! বলকে সীমানাছাড়া করার অমিত শক্তি ও বিস্ময়কর প্রতিভা সম্পন্ন গেইলের ব্যাটে বিশ্বকাপের আগে আগুনের ফুলকি দেখা গেলেও প্রথম দুটি ম্যাচে ছিলেন নিষপ্রভ। কিন্তু কে না জানে, ঝড় ওঠার আগেই যে থমথমে হয়ে যায় পরিবেশ! ঘূর্ণিঝড় মার্সিয়া ব্রিসবেনে আঘাত হানার দিনকয়েক বাদেই ক্যারিবিয়ান সাগর থেকে ভেসে আসা দমকা হাওয়া আঘাত হানে মানুকা ওভালে। ফল, বিশ্বকাপের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি! বিশ্বকাপটা যে গেইলের মতো হার্ডহিটারদেরই হতে চলেছে, তার প্রমাণ প্রথম ১০ দিনে শেষ হওয়া ম্যাচগুলোর পরিসংখ্যানেই। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১০ রান সংগ্রাহকের মধ্যে মাত্র তিনজনের স্ট্রাইকরেট ১০০-এর নিচে। তবে সেগুলোও ৮০'র আশপাশে! এ ছাড়াও সুরেশ রায়না, ড্যারেন সামি, আন্দ্রে রাসেল, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ও মিচেল মার্শের মতো অলরাউন্ডাররাও নিচের দিকে ব্যাট করতে নেমে বলের চেয়ে বেশি রান করছেন এবং দলকে জেতাচ্ছেন। বলা যায়, হার্ড হিটাররাই এখন ম্যাচ উইনার! আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবারের বিশ্বকাপে ৪৬ জন ব্যাটসম্যান বলের চেয়ে বেশি রান করেছেন যাঁদের ১৯ জনেরই ইনিংস ছিল ৭৫ রানের বেশি। সবশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিম্বাবুয়ে ম্যাচ ধরে, ১৫ ম্যাচের ৯টিতেই প্রথম ইনিংসে ৩০০ রানের বেশি হয়েছে, একটি ম্যাচে ৩০৪ রান তাড়া করে জেতার নজিরও দেখা গেছে। ইংল্যান্ডের ১২৩ রান নিউজিল্যান্ড তাড়া করে জিতেছে মাত্র ১৩ ওভারে, ১০-এর বেশি রানরেটে। এই সাফল্যের রেসিপিটা এ রকম, টসে জিতে ব্যাটিং সহায়ক পিচে আগে ব্যাট করা এবং যত জোরে পারা যায় বলকে পেটানো। বিশেষ করে 'পাওয়ার প্লে'তে, যখন বৃত্তের বাইরে ফিল্ডারের সংখ্যা থাকে কম। এখন পর্যন্ত ৬০০-এর বেশি বাউন্ডারি মেরেছেন ব্যাটসম্যানরা, ছক্কা মেরেছেন ১০০টিরও বেশি। অথচ টুর্নামেন্টের বয়স মাত্র ১৫ ম্যাচ! ৪৯ ম্যাচের এই বিশ্বকাপ আয়োজনের এক-তৃতীয়াংশেই যেভাবে চার-ছক্কার ছড়াছড়ি, টুর্নামেন্ট শেষে হিসাবটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা ঈশ্বরই জানেন! তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, বিশ্বকাপটা এখন থেকে বিগহিটারদের, সোজা ভাষায় বললে স্লগারদের। কিছুদিন আগে ফিঞ্চ কালের কণ্ঠকেই বলেছিলেন, 'সব কিছু বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি আসছে। ক্রিকেট আর ব্যাটিং বদলাবে না কেন?' আইপিএল, সিপিএলের কল্যাণে অনেক কিছু বদলে গিয়েছিল ঠিকই, তবে চূড়ান্ত পরিবর্তনটা হলো বিশ্বকাপে। ঠিক ১৯৯২'র মতো!