প্রশ্ন : গোলাম সারোয়ার টিপু মানেই 'মোহামেডানের টিপু'। কিন্তু আপনি তো আবাহনীতেও খেলেছেন। যত দূর জানি, আবাহনী প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় আপনার নেতৃত্বে। সেখান থেকে কি আলোচনা শুরু করা যায়? গোলাম সারোয়ার টিপু : অবশ্যই, কেন নয়! প্রশ্ন : মোহামেডান থেকে আবাহনীতে আসার সেই গল্পটি যদি একটু বলতেন? গোলাম সারোয়ার : সত্তরের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে আশি-নব্বইয়ের দশকজুড়ে মোহামেডানের খেলোয়াড়ের আবাহনীতে যাওয়া কিংবা আবাহনীর ফুটবলারের মোহামেডানে যাওয়া যেমন অসম্ভব ব্যাপার ছিল- তখন কিন্তু তা নয়। আবাহনী নতুন দল গড়ছে মাত্র। তারা যে কয়েক বছরের মধ্যে মোহামেডানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে, সেটি বোঝেনি কেউ। আমাকে ওরা খুব করে চাইল, নিজের ব্যক্তিগত কয়েকটি সমীকরণও মিলল; তাই চলে যাই আবাহনীতে। প্রশ্ন : প্রস্তাবটা তো শেখ কামালই আপনাকে দিয়েছিলেন? গোলাম সারোয়ার : হ্যাঁ। তবে এর আগেও একটি ঘটনা আছে। ১৯৭২ সালের মার্চে স্বাধীনতা দিবস টুর্নামেন্ট হলো। মোহামেডান সেখানে চ্যাম্পিয়ন। আমি ও সালাউদ্দিন তখন মোহামেডানে। টুর্নামেন্ট জিতে বেরিয়ে আসার সময় দেখি, আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হারুন, মন্টু তারা দুই-তিনজন। সালাউদ্দিন ধানমণ্ডিতে থাকত, তারা ওর পূর্বপরিচিত। ওকে দেখি বলছে, 'চ্যাম্পিয়ন হয়েছ ভালো কথা। একটু পরে ইসলামিয়ার দিকে এসো তো। আমরা একটা ফুটবল দল বানাচ্ছি, এ নিয়ে একটু পরামর্শ আছে।' সালাউদ্দিন আমার পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, 'দেখুন তো টিপু ভাই, কী আরেকটা ক্যাঁচাল বাধাইতাছে। আমি কি বুঝি নাকি দল ক্যামনে করে?' আমি বললাম, 'যাও, তোমার এলাকার ছেলেরা দল করছে, সেখানে তোমাকে পরামর্শের জন্য ডাকবে না?' এর কয়েক দিন পর আমি আমার বাড়ির কাছে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। একটা জিপ এসে দাঁড়াল সেখান। নামল কামাল, হারুন, মন্টু, বরকতরা। শেখ কামালের গোঁফ বঙ্গবন্ধুর মতো মোটা ছিল না। চিকন গোফ, দুই পাশে আঙুল ঘুরিয়ে সব সময় তা দিত। আর কথা বলার সময় চোখ টিপ মারত। কামালকে আমি আগে থেকে চিনি, কারণ ও মোহামেডানে বাস্কেটবল খেলত। ও গাড়ি থেকে নেমে হাসতে হাসতে বলল, 'টিপু ভাই, আপনি তো আমার পাড়ায় থাকেন। আমার দলে খেলেন না!' আমি বললাম, 'কোন দল?' ও বলল, 'আপনি জানেন না, আমরা আবাহনী নামে দল বানাচ্ছি। যদি ভালো দল বানাই, তাহলেই আপনি আমার দলে খেলবেন। নইলে আমি অনুরোধ করব না।' কথাটা ও বলেছে অধিকার নিয়ে। ওর ছোটভাই জামালের এক বন্ধু থাকত আমাদের সোবহানবাগের বাসার কাছে। ধানমণ্ডি ৩২ থেকে জামাল অনেক সময় লুঙ্গি পরে পায়ে হেঁটে সেই বন্ধুর বাড়িতে চলে আসত। কামাল সেটি মনে করিয়ে দিয়ে বলল, 'টিপু ভাই, আমার বাসা থেকে জোরে আওয়াজ দিলে আপনার বাসায় শোনা যায়। আমরা এত কাছাকাছি থাকি, আপনি আমার দলে অবশ্যই খেলবেন।' প্রশ্ন : এই কথাতেই আবাহনীতে চলে এলেন? ব্যক্তিগত সমীকরণ মেলার কথা বলছিলেন... গোলাম সারোয়ার : হ্যাঁ, আমার তখন একটা চাকরি খুব প্রয়োজন। কাস্টমসে চাকরি নিয়ে ১৯৭১ সালের পুরোটা সময় চট্টগ্রামে এক রকম আটকা পড়েছিলাম। যে কারণে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে পর্যন্ত যেতে পারিনি। ওই আক্ষেপ আমার কখনো যাবে না। অনিশ্চিত পরিস্থিতি, কারো সঙ্গে যোগাযোগের উপায় নেই। অথচ আমার ঘনিষ্ঠ সব বন্ধু-ছোট ভাই চলে গেল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নিয়ে। নদীয়া-কৃষ্ণনগরে প্রথম ম্যাচের ধারাভাষ্য শুনছিলাম রেডিওতে। মনে আছে, সালাউদ্দিনকে ওরা বলছিল তূর্য হাজরা। সালাউদ্দিনের ডাকনাম তূর্য আর হাজরা লাগিয়ে নিয়েছিল। সেই ধারাভাষ্য শোনার সময় আটকে রাখতে পারিনি চোখের পানি। কারণ তাদের সঙ্গে তো আমারও থাকার কথা ছিল। যাই হোক, যুদ্ধের পর আমার ঢাকায় ফেরা খুব প্রয়োজন। খেলতে হবে, আবার পরবর্তী জীবনের কথা ভেবে চাকরিও করতে হবে। মোহামেডানকে তখন বললাম যে আমার চাকরির ব্যবস্থা করলে আর আবাহনীতে যাব না। তারা চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এর আগেই কামাল আমার চাকরি দিয়ে দিল কোহিনূর কেমিক্যালসে। বললাম যে সেখানে চাকরি করব না। ব্যাংকে হলে ভালো হয়। এরপর আমাকে সোনালী ব্যাংকে চাকরি দেয়। ওদিকে সালাউদ্দিন নাকি কামালকে বলেছিল, 'টিপু ভাইকে আনতে পারলে আমি আবাহনীতে আসব।' তো পরে যখন আমাকে চাকরি দিল, ভালো পারিশ্রমিক দিল, আবার দেখলাম, দলটাও হয়েছে চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইট দেওয়ার মতো- চলে এলাম আবাহনীতে। প্রশ্ন : এ নিয়ে মোহামেডানের কর্মকর্তারা মন খারাপ কিংবা গালিগালাজ করেনি? গোলাম সারোয়ার : আরে না না। তখন পরিবেশটা ছিল অন্য রকম। তারা তো পুরো ব্যাপারটা জানত। আর আমি কামালকে বলেছিলাম যে আবাহনীতে এলেও আমি কিন্তু আড্ডা মারব মোহামেডানেই। ও মেনে নেয়। আর নেবে না কেন? কামাল পরে যাকে বিয়ে করেছিল, সেই সুলতানা কামালও তো ছিল মোহামেডানের সমর্থক। মোহামেডানের হয়ে অ্যাথলেটিকসে অংশ নিত। কি হাসিখুশি চটপটে একটা মেয়ে যে ছিল ও! কামালের সঙ্গে ছিল তুই-তোকারি সম্পর্ক। একটা ঘটনা মনে আছে। তত দিনে শেখ কামালের সঙ্গে ওর সম্পর্ক বোধহয় তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে। মোহামেডান ক্রিকেটের এএসএম ফারুক আছে না, তিনি এক দিন সুলতানাকে বলেছিলেন, তুমি যে মোহামেডান সমর্থন কর, কামাল কিছু বলে না? ও জবাব দিল, মোটেই না। আমাদের যে সম্পর্ক, এর সঙ্গে একে মেলানোর কিছু নেই। আর আবাহনী তো অ্যাথলেটিকসের দল গড়ে না। প্রশ্ন : আবাহনী-মোহামেডানের এই সুসম্পর্ক ছিল কত দিন? গোলাম সারোয়ার : শেখ কামাল বেঁচে থাকার পুরো সময়টাই ছিল। সমর্থকদের রেষারেষি তো থাকবেই, কিন্তু ক্লাবের কর্মকর্তা কিংবা খেলোয়াড় পর্যায়ে বরাবর ছিল সুসম্পর্ক। আবাহনীতে থাকার সময়ও তো আমি প্রতিদিন দুপুরের খাবার খেতাম মোহামেডান ক্লাবে। ১৯৭৭ সালে এসে এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে একজন মাত্র মানুষের কারণে। তাঁর নামটি আমি বলব না। তিনি দুই ক্লাবের খেলোয়াড়দের বলে দিলেন যে এক দলের খেলোয়াড়ের অন্য দলের খেলোয়াড়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না। সেই থেকে আবাহনী-মোহামেডানের সম্পর্কটা খারাপ হয়ে যায়। যেটি আমাকে আজও অনেক কষ্ট দেয়। প্রশ্ন : আবাহনী থেকে আপনি তো আবার মোহামেডানে ফিরেছিলেন? গোলাম সারোয়ার : হ্যাঁ। ১৯৭২, '৭৩, '৭৪- এই তিন মৌসুম ছিলাম আবাহনীতে। এর মধ্যে শেষ দুবার অধিনায়ক। ১৯৭৪ সালে আবাহনী প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়ন হয় আমার নেতৃত্বে। তবে সত্য বলছি, মোহামেডানের মতো খেলা আমি সেখানে খেলতে পারিনি। মূল কারণ ছিল, ১৯৭২ সালের হাঁটুর ইনজুরি। পরে দেখলাম, মোহামেডান আমাকে খুব করে ফেরত নিয়ে চাইছে। আমি আবাহনী ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে তারা আবার চুন্নুকে নিয়ে আসে। সব মিলিয়ে মোহামেডানের ঘরের ছেলে মোহামেডানে ফিরে যাই। খেলি ১৯৭৮ সালের লিগ পর্যন্ত। এরপর ১৯৭৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের ফান্ড রেইজিংয়ের জন্য কলকাতা মোহামেডানকে এনে যে প্রদর্শনী ম্যাচ হয়, সেখানে মোহামেডানের সাদা-কালো জার্সি পরি শেষবারের মতো। চলে যাই অবসরে। প্রশ্ন : দাঁড়ান, দাঁড়ান। আমরা তো সাক্ষাৎকার শুরু করতে না করতেই রকেটের গতিতে গিয়ে আপনার ক্যারিয়ারের শেষে চলে এলাম... গোলাম সারোয়ার : হ্যাঁ, কথায় কথায় তাই তো দেখছি (হাসি)। প্রশ্ন : এবার শুরু থেকে যদি একটু শুরু করতেন? ফুটবলের সঙ্গে পরিচয়-সখ্যতার ঘটনাটি? গোলাম সারোয়ার : আলাদা কিছু না। বাংলাদেশের ছেলে-সন্তানদের জন্য বাবার প্রথম উপহার হয় রাবারের বল। স্বাধীনতার পর থেকে অবশ্য দেখছি, উপহার হিসেবে পিস্তল দেয়। আমার আব্বা বলই দিয়েছিলেন। আর তাতে লাথি মেরে শুরু। আব্বা পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন। তিনি যখন আড়াইহাজার থানার ওসি, তখন আমাকে চামড়ার বল ও পাম্পার কিনে দেন। ১৯৫০ সালে ওই পাঁচ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো চামড়ার বলে লাথি মারি। প্রশ্ন : বাবা পুলিশে চাকরি করতেন মানে তো আপনাদের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো? গোলাম সারোয়ার : ঠিক তাই। এ কারণেই বাবা একটা সময় আমাদের ভাই-বোনদের পড়ালেখার জন্য ফার্মগেটে এনে আমাদের সেটল করলেন। আমার ফুটবলে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ায় সেটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিভাবে? বলছি। সম্ভবত ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় তেজগাঁও স্কুলে ভর্তি হলাম। পাড়ায় একটি ফুটবল ক্লাব ছিল তেজগাঁও ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন নামে। সেখানে জহির ভাই, ইউজিনদা, ইউসারাও, চার্লস, সোনা ভাই, আনোয়ার ভাইরা ছিলেন। বিকেলে গিয়ে পাড়ার মাঠে খেলতাম। সেখানে আমার খেলা দেখে তাঁরাই প্রথম আমার মধ্যে ভবিষ্যতের ফুটবলার টিপুকে আবিষ্কার করেন। মনে আছে, বাবাকে বলে ইউজিনদা আমাকে প্রথম ফুটবলের বুট এনে দিয়েছিলেন। ওহো, এখানে আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের যে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ হয়, সেখানে বাংলাদেশের ঢাকা হোয়াইট হয় রানার্সআপ। আমার এক মামা ছিলেন তখন ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র। তিনি আমাকে নিয়ে যান ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে। স্টেডিয়ামটি তখন একতলা। প্রথম দেখাতেই আমার মনে হলো, এই মাঠে আমাকে খেলতেই হবে। একই সময়ে ওই ফ্রেন্ডস ইউনিয়ন ক্লাবের বড় ভাইদের সংস্পর্শে এলাম। আমার জীবনটা হয়ে উঠল ফুটবলময়। প্রশ্ন : বাবা নিশ্চয়ই ফুটবলার বানাতে চাননি? গোলাম সারোয়ার : আমার আব্বা এএম গোলাম মোস্তফা আমাকে অনেক কিছু বানাতে চেয়েছেন। তিনি খুব সংস্কৃতিমনা লোক ছিলেন তো! তাঁর নির্দেশিত নাটক ঢাকার বিভিন্ন অডিটরিয়ামে অভিনীত হয়েছে। আব্বা আমাকে ওস্তাদ রেখে গান শিখিয়েছেন, আবৃত্তি শিখিয়েছেন, সিনেমায়ও অভিনয় করিয়েছেন... প্রশ্ন : সিনেমায়ও? গোলাম সারোয়ার : তখন তো পিচ্চি ছিলাম, করে ফেলেছি। ফতেহ লোহানী ছিলেন আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ। সিনেমার হাসান ইমাম, নারায়ণ চক্রবর্তী, আনোয়ার হোসেনদের কত দেখেছি আমাদের বাসায়! সেই ফতেহ লোহানী চাচা আব্বাকে একবার বললেন, 'বড় ভাই, টিপুকে কিন্তু আমার দরকার হবে।' এরপরই আমার ১১-১২ বছর বয়সে অভিনয় করলাম 'আকাশ ও মাটি' নামের চলচ্চিত্রে। মুখ ও মুখোশের পর সম্ভবত এখানকার দ্বিতীয় মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা এটি। আর মঞ্চে আমি অনেক অভিনয় করেছি, গান করেছি। আমার আম্মা আমার গান পছন্দ করতেন খুব। সতীনাথের 'জীবনে যদি দ্বীপ জ্বালাতে নাহি পার' আর সনৎ সেনের 'পিয়াল শাখার ফাঁকে' গান দুটি ছিল তাঁর পছন্দ। আব্বার পছন্দ ছিল হেমন্তের 'শান্ত নদীটি পটে আঁকা ছবিটি'। আমাকে প্রায়ই তাঁরা এই গানগুলো গেয়ে শোনাতে বলতেন। এরপর ১৯৭৪ সালে বিটিভিতে একটি অনুষ্ঠানেও একবার গান গেয়েছিলাম। প্রশ্ন : ডিভিশনে ফুটবল খেলেছেন কি তেজগাঁও ফ্রেন্ডস ইউনিয়নেই প্রথম? গোলাম সারোয়ার : হ্যাঁ। আমি ম্যাট্রিক পাস করলাম ১৯৬২ সালে। পরের বছর খেলি ফ্রেন্ডস ইউনিয়নে। ক্লাবের বড় ভাইদের কথা তো আগেই বলেছি। সঙ্গে বলতে হবে আমার তেজগাঁও স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার দীনেশ দত্ত স্যারের কথা। তিনিও আমাকে উৎসাহ দিতেন খুব। ১৯৬৪ সালেই বিজি প্রেসে খেলি প্রথম বিভাগ। সেখানে কোনো টাকা পাইনি। চুনা রশিদ নামে একজন ছিলেন, তিনিই এরপর আমার পারিশ্রমিক ও দল ঠিক করে দিতেন। পরের বছর ওয়ারীতে খেললাম ৮০০ টাকায়। ১৯৬৬ সালে রহমতগঞ্জে খেলে পাই এক হাজার ৯০০ টাকা, এর মধ্যে এক হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে মোটরসাইকেল কিনে ফেলি। পরের বছর গেলাম ভিক্টোরিয়ায় পাঁচ হাজার টাকায় আর ১৯৬৮ সালে আমি মোহামেডানে। এখানে এসে আমার মনে হলো, যেন এত দিনে নিজের ঠিকানা খুঁজে পেলাম। আমার পরিচয়ই হয়ে গেল 'মোহামেডানের টিপু'। প্রশ্ন : আপনার আব্বা খেলা দেখতে যেতেন? গোলাম সারোয়ার : আমি ভিক্টোরিয়াতে খেলার সময় থেকেই নিয়মিত যেতেন তিনি স্টেডিয়ামে। তিনি ছিলেন আমার খেলার সবচেয়ে বড় সমালোচক। নিজে কিছু বলতেন না। বাসায় ফিরলে হুদা চাচাকে দিয়ে বলাতেন আমার ভুল-ত্রুটিগুলো। আমি যখন মোহামেডানে খেলি, আব্বা খেলা দেখতেন ওয়ান্ডারার্সের গ্যালারিতে। তখনো তো আবাহনী গ্যালারি হয়নি, আবাহনী দলই হয়নি। সবাই বলত, 'আপনি গেট দিয়ে ঢুকে ডানে যান কেন? আপনি যাবেন মোহামেডানের গ্যালারিতে।' আব্বা বলতেন, 'আমি ওয়ান্ডারার্সের গ্যালারিতে গিয়ে বসি, কারণ ওরা যখন টিপুকে গালি দেয়, তখন আমি বুঝি যে ছেলেটা আমার ভালো করছে।' প্রশ্ন : আবাহনীতে খেলার আগে-পরে মোহামেডানে তো অনেক খেলেছেন? আপনি যত দলে খেলেছেন, এর মধ্যে সেরা কোনটি? গোলাম সারোয়ার : আমি এগিয়ে রাখব ১৯৬৯ সালের দলটিকে। ঘরোয়া ফুটবলে এত ভালো দলে কখনো খেলিনি। গোলরক্ষক শুরুতে সান্টু থাকলেও পরে নুরুন্নবী ভাই জায়গা করে নিলেন। রাইট ব্যাক জহির ভাই, স্টপার পিন্টু ভাই, লেফট ব্যাক আইনুল ভাই, রাইট হাফে রসুল বক্স, লেফট হাফে আমির বক্স। এবার আসুন ফরোয়ার্ড লাইনে। রাইট উইঙ্গার প্রতাপদা, আবদুল্লাহ রাইট ইনসাইড ফরোয়ার্ড, সেন্টার ফরোয়ার্ড ইদ্রিস, লেফট ইনসাইড আলী নেওয়াজ, আমি লেফট উইঙ্গার। মূলত এটি ছিল নিয়মিত একাদশ। এ ছাড়া কায়কোবাদ, আশরাফও ছিল। ওই দলটি নিয়ে আমরা লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। তখন মাঠে নামলে মনে হতো, আমাদের কেউ হারাতে পারবে না। প্রশ্ন : পাকিস্তান জাতীয় দলে তো তত দিনে আপনি খেলেছেন? গোলাম সারোয়ার : ১৯৬৬ সালে প্রথম পাকিস্তান দলের ট্রায়ালে যাই। ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান দলে প্রথম সুযোগ পাই। এরপর ১৯৬৮, '৬৯ সালে খেলেছি। ১৯৭০ সালে ট্রায়ালেই যাইনি পড়াশোনর জন্য। শুরুতে আমি, হাফিজ ভাই, শান্টু, প্রতাপদা ছিল। ১৯৬৯ সালে পিন্টু ভাই, মাহমুদ হাসান যুক্ত হন। নুরুন্নবী ভাই এলেন ১৯৭০ সালে। পশ্চিম পাকিস্তানি, বিশেষ করে পাঞ্জাবিদের বৈষম্য আমরা স্পষ্ট টের পেতাম। একবার তো করাচির ক্যাম্পে গিয়ে আমি বিরাট ঝামেলাই বাঁধিয়ে দিই। বলেছিলাম, রুটি খাব না, আমাকে ভাত দিতে হবে। সেটি না দেওয়ায় আমি দুই দিন জেদ করে বাইরে হোটেলে খেয়েছি। পরে কোচের নির্দেশে ক্যাম্পে ভাত দেওয়া চালু হলো। প্রশ্ন : এরপর যুদ্ধ, আবাহনীতে যাওয়া, মোহামেডানে ফেরা নিয়ে আলোচনা করেছি আমরা শুরুতেই। এবার কিছু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। সেকালের পেলে-ম্যারাডোনা কিংবা একালের মেসি-রোনালদোর মতো বাংলাদেশের ফুটবল রোমান্টিকদের প্রিয় এক তুলনা সালাউদ্দিন-এনায়েত। আপনি দুজনের মধ্যে কাকে এগিয়ে রাখবেন? গোলাম সারোয়ার : আমি কাউকে এগিয়ে রাখব না, কাউকে পিছিয়েও রাখব না। নিজের মতো বিশ্লেষণ করতে পারি কেবল। সালাউদ্দিন বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার। আর এনায়েত ভীষণ কার্যকর ফুটবলার। দুজনের খেলার ধরন আলাদা। সালাউদ্দিনের গ্যালপটা অসম্ভব সুন্দর ছিল। যেভাবে দৌড়ে গিয়ে বল ধরত, সেটি দেখার মতো। আবার এনায়েত হচ্ছে এমন জিনিস, ওর সামনে প্রতিপক্ষের চার-পাঁচজন ফুটবলারও কিছু না। আবাহনী যেদিন খারাপ খেলত, সেখান থেকে দলকে বের করে আনতে পারত না সালাউদ্দিন। এনায়েত আবার নিজে খেলে, খেলিয়ে, সতীর্থদের গালি দিয়ে হলেও উদ্বুদ্ধ করে দলকে কোণঠাসা অবস্থা থেকেও ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য রাখত। সালাউদ্দিন তুখোড় ফরোয়ার্ড। বল এত সুন্দরভাবে বারে রাখত যে গোলের জন্য জোরে মারার প্রয়োজন ছিল না। এনায়েত আবার ছিল দূরপাল্লার বুলেট শটে গোল করায় ওস্তাদ। এনায়েতের বড় সমস্যা বলব, ও জনপ্রিয় দলে এসেছে ক্যারিয়ারের একেবারে শেষে, ১৯৭৮ সালে। যে কারণে সমর্থক, মিডিয়া সবার থেকে দূরে ছিল ও। সালাউদ্দিন সব সময় ছিল লাইমলাইটে। প্রশ্ন : যদি আবাহনীর সালাউদ্দিনের মতো মোহামেডানের এনায়েত হতেন? গোলাম সারোয়ার : দুজনের জনপ্রিয়তা সমান হতো সম্ভবত। প্রশ্ন : আপনার পজিশন লেফট উইংয়ে কার খেলা ভালো লাগত? গোলাম সারোয়ার : নারায়ণগঞ্জের আলাউদ্দিন ভাই ছিলেন খুব দ্রুতগতির। শাহ আলম ভাইও দারুণ খেলতেন। তবে আমার পছন্দ ছিল মাকরানি এক লেফট উইঙ্গার, মুসা নাম। আমি ওকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। রাইট উইংয়ে প্রতাপদাও ছিলেন দারুণ। প্রশ্ন : উইংয়ের কথা ধরলে আপনার পরে চুন্নু, ওয়াসিম, জোসি, সাবি্বররা এসেছেন। তাঁদের খেলার বিশ্লেষণটা যদি করেন? গোলাম সারোয়ার : প্রতাপদার পর ওয়াসিমের মতো রাইট উইঙ্গার আসেনি। প্রতাপদার ক্রস ছিল দুর্দান্ত। ওয়াসিমের ড্রিবলিং অসাধারণ, প্রতিপক্ষে ত্রাস ছড়িয়ে দিত। চুন্নুর বল কন্ট্রোল দারুণ। অসাধারণ ড্রিবলিং আর সঙ্গে স্পেস তৈরি করতে পারত। জোসির গতি ছিল হয়তো তাদের সবার চেয়ে বেশি কিন্তু গতির কারণে ও ফাইনাল বলে প্রায়ই গণ্ডগোল করে ফেলত। আর সাবি্বরের খেলায় আভিজাত্য অন্য রকম। পা দিয়ে বল যেন ধাক্কা দিত না, ছোঁয়া দিত যেন। প্রশ্ন : কোচ গোলাম সারোয়ার টিপুর দৃষ্টিতে খেলোয়াড় গোলাম সারোয়ার টিপু কেমন ছিলেন? গোলাম সারোয়ার : হা হা হা। আমার খেলা তো আমি দেখিনি। কিভাবে বলব? প্রশ্ন : তার পরও... গোলাম সারোয়ার : লেফট উইঙ্গার টিপুর গতি মন্দ ছিল না। ড্রিবলিংও। এক-দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নিয়ে ভেতরে যারা আছে, তাদের বল ছাড়ত গোলের জন্য। আবার নিজের গোলক্ষুধাও ছিল প্রবল। বলতে পারেন, আমার খেলায় পেস অ্যান্ড ট্রিকারির কম্বিনেশনটা ছিল। প্রশ্ন : বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা একাদশ করতে বললে সেটি কি আপনার জন্য খুব কঠিন হয়ে যায়? গোলাম সারোয়ার : খুব। আর আমি তা করবও না। এক যুগের সঙ্গে অন্য যুগকে মেলানো অসম্ভব। তবে আমার বিবেচনায় বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা একাদশে সব সময় দুজন থাকবেনই থাকবেন। গোলরক্ষক হিসেবে রণজিৎদা আর স্ট্রাইকার মারিদা। বাকিরা যুগে যুগে বদল হবে। একসময় প্রতাপদা, একসময় ওয়াসিম। একসময় চুন্নু, একসময় জোসি। একসময় আশীষ, একসময় নান্নু। এমনো হতে পারে, সালাউদ্দিন-এনায়েত দুজনকে রাখতে গিয়ে একজনকে মিডফিল্ডে, আরেকজনকে ফরোয়ার্ডে খেলাব। কারণ একজন ফরোয়ার্ড মারিদা তো থাকবেই। রক্ষণে জাকারিয়া পিন্টু ভাই, মুন্না, কায়সার হামিদরা আসবে। মঞ্জু-টুটুলরা আসবে রাইট সাইডে। লেফটে ওই রকমভাবে কেউ নেই, যাকে নিতেই হবে। মিডফিল্ডে এনায়েত, সঙ্গে আশীষ। অন্য রকম ফর্মেশন হলে আরেকজন আসবে। খুব কঠিন কাজ। এ কারণেই বলছি, বাকি ৯ জন যে কাউকে নিলে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু রণজিৎদা ও মারিদা ছাড়া আমার কোনো একাদশ হবে না। প্রশ্ন : খেলোয়াড় হিসেবে অবসর নেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তো কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল আপনার। নতুন ধারার ফুটবল কোচিংও নিয়ে এসেছিলেন আপনি বাংলাদেশে... গোলাম সারোয়ার : আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিই ১৯৭৯ সালে। ওইবার লিগে মোহামেডান খুব খারাপ করেছিল। ক্লাবের কর্মকর্তারা তাই আমার ওপর দিলেন কোচিংয়ের ভার। প্রথমবারই লিগ চ্যাম্পিয়ন হই আমরা। কিন্তু ইংল্যান্ডে গিয়ে একটি কোচিং কোর্স করার পরই কেবল আমি বুঝতে পারি, ফুটবল কোচের কাজটা কী! কেউ ভুল করলে শুধু বকা দেওয়া না, কিভাবে সেটি ঠিকঠাক করা যায়, সেটি শিখিয়ে দেওয়াই কোচের দায়িত্ব। আমার কোচিংয়ের ধরন ছিল, হিট অ্যান্ড রান। প্রতিপক্ষকে ছারখার করে দেওয়া পাওয়ার অ্যান্ড পেসে। এ জন্য অ্যাটাকিং থার্ডে দ্রুত চলে যাওয়াকে গুরুত্ব দিতাম। খেলোয়াড়দের ফিটনেস লেভেলও বাড়িয়েছিলাম অনেক। ১৯৮৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোহামেডানকে কোচিং করিয়েছি। এরপর আরামবাগ, অগ্রণী ব্যাংকে অল্প সময়ের জন্য কোচিং করিয়েছি। আর মোহামেডানের ডাকে সাড়া দিয়ে কোনো বিপদের সময় প্রায়ই যেতাম সেখানে। আর জাতীয় দলকে কোচিং করিয়েছি সম্ভবত ১৮ দফায়। বয়সভিত্তিক দলেও চার-পাঁচবার। ২০০৮ সালে মুক্তিযোদ্ধায় কোচিং করানোর সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। এরপর কোচিং ছেড়ে দিতে হলো। প্রশ্ন : আপনার ছেলেকে ফুটবলার বানাতে চাননি। আচ্ছা, এর আগে একটু বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ক্রিকেট অধিনায়ক নাঈমুর রহমানের কথা যদি একটু বলেন। যিনি সম্পর্কে আপনার ভাগিনা... গোলাম সারোয়ার : আমার আপন ছোট বোনের ছেলে। ১৯৬৮ সালে যেবার মোহামেডানে এলাম, ওই বছরই ছোট বোনের বিয়ে হলো। দুর্জয়-দুর্বারের বাবা কিন্তু খেলাধুলা পছন্দ করত খুব। 'দাদা আমার টিকিট লাগবে' বলে প্রায়ই খেলা দেখার টিকিট নিয়ে যেত। ভাগিনাদের বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়ার কথাটি এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। প্রথম বছর দুর্বার হকিতে হয়ে গেল কিন্তু দুর্জয় (নাঈমুর) ফুটবলে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে পারল না। পরের বার ওদের বাবাকে বললাম, 'দুর্জয়ের উচ্চতা তো খুব বেশি হবে না। ওকে ক্রিকেটে দেওয়ার চেষ্টা কর।' তো ক্রিকেটের সেই পরীক্ষায় মোহামেডানের রকিবুল হাসান যাবে বিশেষজ্ঞ হিসেবে। দুর্জয় যে আমার ভাগিনা সেটি না বলে ওকে শুধু বললাম, 'মানিকগঞ্জ থেকে একটি ছেলে আসবে, ওকে একটু দেখো তো।' পর দিন সন্ধ্যায় মোহামেডান ক্লাবে বসে আড্ডা দিচ্ছি। রকিবুল এসে ওর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল, 'অ্যাই টিপু ভাই, আপনি কার সম্পর্কে আমার কাছে বলছেন?' আমি ওর ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম যে দুর্জয় ক্রিকেটে টেকেনি। রকিবুলকে বললাম, 'আচ্ছা ও ভর্তি না হতে পারুক, এ নিয়ে তোমার ভাব দেখানোর কিছু নেই।' রকিবুল তখন হেসে বলল, 'আরে, হবে না মানে? ও তো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভবিষ্যৎ ক্যাপ্টেন।' রকিবুলের সেই কথাটি আমার এখনো মনে আছে। প্রশ্ন : একটু আগে আপনার স্ত্রী এসে বলে গেলেন, আপনাদের ছেলে ফুটবলটা পছন্দ করত খুব? গোলাম সারোয়ার : আমার দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটা সত্যি ফুটবল ভালোবাসত খুব। খেলতও খুব মমতা দিয়ে। কিন্তু আমার কারণেই ও ফুটবলটা সিরিয়াসলি নেয়নি। প্রশ্ন : বাধা দিয়েছিলেন? গোলাম সারোয়ার : আমি বাধা দিইনি। কিন্তু ওর মনে খুব দুঃখ ছিল। আমি তো ফুটবল খেলে আর্থিকভাবে খুব ভালো জায়গায় যেতে পারিনি। ২০০২ সালে সোনালী ব্যাংকের চাকরি থেকে নিয়েছি অবসর। আমার ছেলে মোস্তফা ওয়ালিদ সারোয়ার বিরল মনে করে, ফুটবল থেকে আমার আরো অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। এক ধরনের অভিমান থেকে ও খেলাটি সিরিয়াসলি নেয়নি। এখন ইংল্যান্ডে আছে ও এমবিএ করার জন্য। প্রশ্ন : আপনার ছেলের অভিমানের সূত্র ধরে শেষ প্রশ্ন। হিসাব মেলাতে বসে এখন আপনারও কি অভিমান হয়? গোলাম সারোয়ার : (বেশ কিছুটা সময় নিয়ে) না, বিরলের যেমন অভিমান, আমার তেমন অভিমান নেই। টাকাপয়সা হয়তো হয়নি, তাতে কী! হাজার হাজার মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। দোকানে প্যান্ট-শার্টের কাপড় কিনতে গেলে দাম কম নিত। সিনেমা হলে টিকিট কেটে হয়তো ঢুকেছি, চেকার লাইটের আলো ফেলে দেখার পর 'আরে টিপু ভাই আপনার আবার টিকিট কিসে' বলে কাউন্টার থেকে টিকিটের টাকা এনে ফেরত দিত। আব্বা একবার বলেছিলেন, ঠাঁটারীবাজারে ভালো গরুর মাংস পাওয়া যায়। ওখানকার কসাইরা তো সব মোহামেডানের সমর্থক, ভালো মাংস নিয়ে এসো। মোহামেডান ক্লাবের আলমাসকে নিয়ে সেখানে যাই, দেখি হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। আমাকে গরুর মাংস দিয়ে দিল, কিন্তু কোনো দাম রাখল না। রাস্তা দিয়ে গেলে বাবার বয়সীরা জোরে ডেকে বলত, 'টিপু ভাই আসসালামুআলাইকুম।' এখনো সবাই কত সম্মান করে। ফুটবলের কারণেই তো এক জীবনে এত সম্মান পেয়েছি। ছোটখাটো অভিমানের চেয়ে সেটি অনেক বড় ব্যাপার।