kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ১ ডিসেম্বর ২০২০। ১৫ রবিউস সানি ১৪৪২

কী যে হতো!

২৬ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কী যে হতো!

তোমরাও বোধকরি শুনে থাকবে, বিদ্যাসাগর মাইলস্টোন পড়ে পড়ে গুনতে শিখেছিলেন। বাড়িতে বাতি জ্বলত না বলে রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে গিয়ে বই মেলে ধরতেন। মায়ের অসুখের কথা শুনে রাতের বেলায় খরস্রোতা দামোদর নদী পাড়ি দিয়েছিলেন। বাবার হাতে ছোটবেলায় বেদম মার খেতেন। জেদি ছিলেন যে! তিনি কিন্তু ছোটদের জন্য ‘বর্ণপরিচয়’ও লিখেছিলেন। সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মের ২০০ বছর এই ২০২০ সাল। যদি তিনি না আসতেন তবে কী যে হতো! লিখেছেন মো. সিরাজুল ইসলাম

বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অনেক গল্প চাউর আছে। একবার যেমন তিনি বাড়িতে ছিলেন। নৌকা থেকে একজন কোট পরা ভদ্রলোক নামতে দেখলেন। ঘাটে নেমেই লোকটি ইতিউতি চাইছিলেন। মানে তিনি কুলি খুঁজছিলেন। তাঁর কাছে যে একটা ভারী বোঁচকা ছিল। এগিয়ে গেলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তুলে নিলেন বোঁচকাটি। বিদ্যাসাগর খুব সাদামাটা পোশাকে চলাফেরা করতেন। তাই সাহেব লোকটির তাঁকে কুলি ভেবে নিতে এতটুকু কষ্ট হলো না। কিন্তু রাস্তায় বাধল গোল। বোঁচকা মাথার বিদ্যাসাগরকে অনেকে আদাব জানাচ্ছিল। সাহেবটির সন্দেহ হলো। তবে গভীর হলো না। ওই দিন বিকেলেই বাড়ির ধারের মাঠটিতে একটি বড় অনুষ্ঠান ছিল। সাহেব লোকটাও গিয়ে হাজির। দেখেশুনে তাঁর তো চোখ ছানাবড়া। দেখেন কী, ওই কুলি বেটা অনুষ্ঠানের সভাপতি। সাহেব পরে তো কুলি বেটার পায়ে পড়েন আর কী!

বিদ্যাসাগরকে নিয়ে মজার মজার গল্প লোকমুখে ফিরত সেকালে। ঈশ্বরচন্দ্র বাবার সঙ্গে হেঁটে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় আসার সময় মাইলস্টোন পড়ে পড়ে নাকি ইংরেজি সংখ্যা শিখে ফেলেছিলেন। জানো, বিদ্যাসাগর এমন একসময়ে জন্মেছিলেন, যখন বাংলায় লেখাপড়ার সুযোগ বেশি ছিল না। বেশি লোক তখন পড়তই না। সারা ভূ-ভারতে স্কুল-কলেজ ছিল হাতে গোনা। তখনো বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির আমল। ঈশ্বরচন্দ্র জন্মেছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে। পিতা ঠাকুর দাস তাঁকে বেদম উত্তম-মধ্যম দিতেন। গোঁয়ার মানে জেদি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। পিতামহ নাম রেখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজে স্বাক্ষর করতেন ‘ঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা’ নামে। ঊনবিংশ শতকের তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও গদ্যশিল্পী। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যে

তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য প্রথম জীবনেই পান বিদ্যাসাগর উপাধি। ভালো জ্ঞান ছিল ইংরেজি আর বাংলায়ও। রবি ঠাকুর তাঁকে বাংলা গদ্যের প্রথম শিল্পী বলে গেছেন।  

 

সেকালটা দ্যাখো

ওই যে একটু আগে বলছিলাম, সেকালে বাংলায় পড়াশোনাই হতো না। সাজানো-গোছানো ছিল না বাংলা বর্ণগুলোও। স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণের আলাদা নামকাম ছিল না। তারপর ধরো যুক্তাক্ষর, চিহ্ন ইত্যাদি ব্যাপার তো বোঝাই ছিল কঠিন। তাহলে বাংলার লোক মাতৃভাষায় পড়ে কী করে? ফারসি বা ইংরেজিই শুধু পড়ার মাধ্যম হবে? রামমোহনসহ সে আমলের বিশিষ্টজনরা চিন্তায় পড়ে গেলেন। রবীন্দ্রনাথের দাদা-বাবাও সে দলে পড়েন। তত দিনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ বসে গেছে কলকাতায়। সেখানে ছেলেপুলেদের শুধু শেকসপিয়ার পড়ানো হবে? অতঃপর কাছা মেরে নেমে পড়লেন বাঙালি পণ্ডিতরা। ক্ষেত্রমোহন দত্ত, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, রামসুন্দর বসাকদের কথাও মনে রাখা দরকার।  বিদ্যাসাগর মশায়েরও ঘুম হারাম। মদনমোহনবাবু লিখেছিলেন ‘শিশুশিক্ষা’। ঈশ্বরচন্দ্রের ‘বর্ণপরিচয়’ লেখার ছয় বছর আগে। ‘বর্ণপরিচয়’ লেখা হয়েছিল ১৮৫৫ সালে। বলো তাহলে, ‘শিশুশিক্ষা’ কত সালে লেখা হয়েছিল? রামসুন্দর লিখেছিলেন বিদ্যাসাগরের পরে—‘বাল্যশিক্ষা’। প্রথম ছাপা হয় কিন্তু ঢাকাতেই। ছাপাখানার নাম সুলভ যন্ত্র। ‘বাল্যশিক্ষা’ জনপ্রিয় হয়েছিল। তাই ১৮৭৮ সালে কলকাতা থেকেও ছাপা হয়েছিল। তারপর এসেছে ‘আদর্শলিপি’। সীতানাথ বসাক এর রচয়িতা। তোমরাও অনেকে দেখে থাকবে। এতে স্বরবর্ণ ছিল ১২টি। এখন অবশ্য বাংলায় স্বরবর্ণ ৯টি।  ‘আদর্শলিপি’তেই পড়েছি ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’। কবিতাটি মদনমোহন তর্কালঙ্কারের লেখা।

 

এবার শুধু বর্ণপরিচয়                

প্রথম ভাগ ছাপা হয়েছিল ১৮৫৫ সালের এপ্রিলে আর দ্বিতীয় ভাগ জুন মাসে। দাম ছিল দুই পয়সা। সংস্কৃতের খটোমটো থেকে বাংলাকে মুক্ত করেন বিদ্যাসাগর ‘বর্ণপরিচয়’ দিয়ে। একবার মফস্বলে স্কুল পরিদর্শনে যাওয়ার সময় পালকিতে বসে নাকি ‘বর্ণপরিচয়’ লিখে ফেলেছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনিই কিন্তু সহজ ও ছোট বাক্য দিয়ে শিশুদের উপযোগী রচনা লেখেন। দুই বা তিন অক্ষরের শব্দ তিনি বেছে নিয়েছিলেন ছোটদের কথা ভেবে। তিনি প্রথম দুই শব্দের বাক্য, তারপর তিন শব্দের এভাবে চার, পাঁচ, ছয় ইত্যাদি শব্দের বাক্য তৈরি করেন। অ-তে অজগর পড়ার রকম কিন্তু বিদ্যাসাগরই দেখিয়ে গিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের আগের বাংলা ছিল জবুথবু, গুরুগম্ভীর, জটাজুটধারী। তিনি সহজ, সাবলীল, আধুনিক বাংলা গদ্য লেখার পথ খুলে দিয়েছেন। যতিচিহ্নের ব্যবহারও বেশি ছিল না। দেখো, যতি বা বিরতিচিহ্নের ওলটপালটে কী দশা হয়—

আমরা সবাই বসে খাচ্ছিলাম একটি কুকুর। এল ঝড়ের বেগে এক বন্ধু। দেখে ছুটে পালাতে গিয়ে ডিগবাজি খেলেন বাবা। ঠিক সেই সময়ে অফিস থেকে ফিরছেন বাড়ির বেড়ালটা। তাঁকে দেখে দিল দৌড়। 

বিদ্যাসাগর এখানেও ভূমিকা রাখলেন। যেমন ‘বর্ণপরিচয়’-এর ১৯ সংখ্যক পাঠে—‘গোপাল যখন পড়িতে যায়, পথে খেলা করে না; সকলের আগে পাঠশালায় যায়; পাঠশালায় গিয়া আপনার জায়গায় বসে; আপনার জায়গায় বসিয়া, বই খুলিয়া পড়িতে থাকে; যখন গুরু মহাশয় নূতন পড়া দেন, মন দিয়া শুনে।’

তারপর ছোট বাক্যের নমুনা দেখো, তাও আবার ছন্দে—

বড় গাছ। লাল ফুল।

জল খাও। হাত ধর। বাড়ী যাও।

মেঘ ডাকে। জল পড়ে। খেলা করে।

কাল পাথর। সাদা কাপড়। শীতল জল।

কপাট খোল। কাগজ রাখ। কলম দাও।

পাখি উড়িতেছে। পাতা নড়িতেছে। জল পড়িতেছে।

 

বিয়ে হতো না!

১৮৯১ সালে মারা যান বিদ্যাসাগর। তার আগেই ‘বর্ণপরিচয়’-এর প্রথম ভাগের ১৫২টি সংস্করণ হয়ে গেছে। প্রথম তিন বছরে ১১টি সংস্করণে ছাপা হয়েছে ৮৮ হাজার কপি। এ সংখ্যাটিকে এখনো ‘এতো’ বলা যায়। তারপর দেখো ১৮৬৭ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছরে ছাপা হয়েছে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার কপি। ড, ঢ, য এই তিনটি বর্ণের নিচে ফুটকি দিয়ে ড়, ঢ়, য় বানিয়েছেন কিন্তু বিদ্যাসাগরই। তাহলে বুঝলে তো বিদ্যাসাগর না এলে আমাদের বিয়ে লেখা মুশকিল হতো। আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হয়তো আসত না।

দারুণ সাহসী ছিলেন মানুষটি। আপসহীনও ছিলেন। ছিলেন গরিবের বন্ধু। বিদ্যাসাগর দুর্ভিক্ষের সময় অন্নছত্র খুলে অভুক্তদের দুবেলা খাইয়েছেন। আরো বড় হয়ে তোমরা বিদ্যাসাগরের কথা আরো জানবে কিন্তু।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা