kalerkantho

রবিবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৯ নভেম্বর ২০২০। ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২

ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিমবাস

সম্প্রতি হংকংয়ে হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে (আইবিসিওএল) প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েই ‘আইবিসিওএল ২০২০ বেস্ট প্রটোটাইপ অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছে ‘ডিইউ নিমবাস’। তাদের মূল লক্ষ্য, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসা। তাদের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি মূলত সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করবে। ডিইউ নিমবাস দলের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

১ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিমবাস

বাঁ থেকে—জাহিদ, তাহিল, আতিক ও সোহরাওয়ার্দী। আলোকচিত্র : মোহাম্মাদ আসাদ

শুরুটা যেভাবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) শিক্ষার্থী তাহিল তাঁর  ডিপার্টমেন্টের ছোট ভাই আতিকের কাছ থেকে জাতীয় ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড প্রতিযোগিতার কথা প্রথম শুনতে পান। আতিকই জানান, এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী দল হংকংয়ে আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে (আইবিসিওএল) অংশ নিতে পারবে। এটি শুনে তাহিল উৎসাহ পান। একসময় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার। তাহিল ও আতিকের সঙ্গে আরো যোগ দেন কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের জাহিদ।

জাতীয় পর্যায়ে ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে তিনজনের টিম ডিইউ নিমবাসের হয়ে অংশগ্রহণ করেন তাঁরা। জাতীয় পর্যায়ে সাড়ে চার শ প্রতিযোগী অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেন। প্রতিটি দল একটি নির্দিষ্ট প্রচলিত সমস্যা নিয়ে তাদের ব্লকচেইন ভিত্তিক সমাধান উপস্থিত করে। সব মিলিয়ে ৬৫টি প্রজেক্ট জমা পড়ে। প্রতিযোগী দলগুলো নিজেদের প্রজেক্ট উপস্থাপনের জন্য একটি হোয়াইট পেপার, একটি পোস্টার ও পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন জমা দেয়। টিম ডিউ নিমবাস জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান লাভ করে।

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা শেষে তাদের দলে চতুর্থ সদস্য হিসেবে যোগ দেন সোহরাওয়ার্দী। তাহিলরা যখন প্রতিযোগিতার জন্য নিবন্ধন করেন তখনো কোনো প্রজেক্ট বা প্রকল্প ঠিক হয়নি তাঁদের। তবে ব্লকচেইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে এমন বেশ কয়েকটি বিষয়ের কথা ভেবে রেখেছিলেন তাঁরা। বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করতে তাঁদের সহায়তা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. বি এম মাইনুল হোসেন। তাঁরা প্রজেক্ট ঠিক করার জন্য অনেক দলীয় মিটিংও করেন। অবশেষে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কথায় কথায় তাঁরা জানান, এই প্রজেক্ট ঠিক করার কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, যদি ব্লকচেইন ভূমি প্রশাসনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে তাহলে এটি শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই নয়, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়ত, ব্লকচেইন ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি ছিল। কারণ কার্যকর জমি প্রশাসন ব্যবস্থার জন্য নিরাপদ সংরক্ষণ এবং নিরাপদ লেনদেন অন্যতম প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য, যা ব্লকচেইন নিশ্চিত করতে সক্ষম। তাঁরা প্রকল্পটির কারিগরি কাঠামো দাঁড় করানোর সময় সিদ্ধান্ত নেন ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্ম ক্লাউডে সংরক্ষণের এবং ক্লাউডের গোড়া থেকে কাঠামো ডিজাইন করার। এতে শুধু ব্লকচেইন অ্যাপ্লিকেশনই নয়, পুরো ব্যাকএন্ড কিভাবে সেট হবে সেটি সংজ্ঞায়িত থাকবে। ক্লাউড ডিজাইনের চিন্তা থেকে তাঁদের দলের নাম ‘নিমবাস’ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার মানে হচ্ছে ‘মিথিক্যাল ক্লাউড’ বা ‘পৌরাণিক মেঘ’।

ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে

আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াড ৩-৫ জুলাই অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ থেকে মোট ১২টি দল অংশ নেয়। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধানে প্রকল্প তৈরিতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহ জোগাতে ২০১৭ সাল থেকে এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৬০টি দল এবারের আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছিল।

বিজয়ীদের জন্য ছিল ছয়টি পুরস্কার। যদিও বাংলাদেশ প্রথমবার অংশগ্রহণ করেছিল, তবু ছয়টির মধ্যে দুটি পুরস্কার জিতে নিতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে দল ডিজিটাল ইনোভেশন পেয়েছিল একটি রৌপ্যপদক আর ডিইউ নিমবাস পেয়েছে ‘বেস্ট প্রটোটাইপ অ্যাওয়ার্ড’।

 

মুঠোফোনেই জমিজমার সেবা

মুঠোফোন অ্যাপ ও ওয়েবসাইট নির্ভর সেবা প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন জমিজমা সংক্রান্ত কাজের দীর্ঘসূত্রতা কমবে, অন্যদিকে বন্ধ হবে এ খাতের দুর্নীতি। তাঁদের বানানো অ্যাপের প্রধান ফিচারগুলো হচ্ছে—জমি লেনদেন, লিজ নেওয়া, বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়া, জমির মালিকানা যাচাই ইত্যাদি। কিন্তু অন্যতম ফিচার হচ্ছে জমির মালিকানাবিষয়ক তথ্যাদি সুরক্ষিত রাখা এবং জমি লেনদেনের সময় তথ্য নিরাপত্তার সঙ্গে হালনাগাদ করা। আর এটি সম্ভব হয়েছে ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে। তাঁদের এই প্রকল্পটি ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজ করবে। বর্তমানে দেশের ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থার বেশির ভাগ ধাপই হাতে-কলমে এবং সময়সাপেক্ষ। যদি একটি জমির দলিল নিবন্ধন করতে চান তাহলে এখানে কাগজে-কলমে ১৯টি ধাপ পার করতে হয় এবং এতে সাধারণত সময় লাগে তিন মাস। সরকার এরই মধ্যে রেকর্ড ডিজিটাইজকরণ শুরু করেছে, তবে কেন্দ্রীভূত ডিজিটাইজড সিস্টেমে নিরাপত্তাঝুঁকিও রয়েছে। নিমবাস একটি ব্লকচেইন ভিত্তিক ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থা, যার ফলে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে রেকর্ড ও রেজিস্ট্রেশন সুবিধাটি একই প্ল্যাটফর্মে চলে আসবে। ডিইউ নিমবাসের সদস্য তাহিল বলেন, ‘আমাদের সমাধানটি এমনভাবে তৈরি করেছি, যাতে এটি শুধু বর্তমান ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর সিস্টেমই নয়, এটি সুরক্ষা ও স্বচ্ছতার বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ডিজিটাল সিস্টেমগুলোর চেয়েও ভালো। নিমবাসকে টেকসই ব্যাবসায়িক মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছি, যাতে এটি নাগরিকদের ঝামেলামুক্ত সেবা প্রদানের সুবিধা করে দেয়।’ তাঁদের দাবি, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মাধ্যমে কমে আসবে দুর্নীতি।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, এটাকে পরিপূর্ণভাবে পুরো দেশে বাস্তবায়ন করা, যার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সহায়তা দরকার। আর এটি বাস্তবায়িত হলে ভূমিসংক্রান্ত সেবাগুলো অনলাইনে চলে আসবে, উপকৃত হবে সবাই। তাহিল আরো বলেন, ‘আমাদের প্রজেক্টটি সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। মাননীয় তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক আমাদের প্রজেক্টের বাস্তবায়নের জন্য খুবই আগ্রহ দেখিয়েছেন। ‘লেভারেজিং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি’ থেকে তাঁদের সঙ্গে দুইবার যোগাযোগ করাও হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই আমরা সরকারের সহায়তায় এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে দিতে পারব।’

২৮ অক্টোবর ডিইউ নিমবাসকে তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়; যেখানে তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী কথা দিয়েছেন, তাঁদের ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজের সুযোগ করে দেবেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা