kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

ব্লকচেইনে ই-পেনশন

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ব্লকচেইনে ই-পেনশন

মডেল : এ কে আজাদ, ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

ব্লকচেইন প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বের পাশাপাশি দেশেও শুরু হয়েছে কাজ। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের উদ্যোগে নেওয়া প্রাথমিক শিক্ষকদের ই-পেনশন কর্মসূচি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

খুব অল্প সময়েই ব্লকচেইন প্রযুক্তি বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ, এটি অধিক মাত্রায় নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। আর সে কারণে দেশেও বিভিন্ন খাতে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা শোনা যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি অনেক প্রযুক্তি সংস্থা এখন ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে কাজ করতে এগিয়ে আসছে। এরই মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে কিছু কার্যক্রমও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে দেশে, যার মধ্যে রয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি বিভাগ। সংস্থাটি প্রযুক্তিটির মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের পেনশন সুবিধা সহজ করতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ই-পেনশন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্পের অধীনে বাগেরহাট জেলায় ই-পেনশনের প্রাথমিকভাবে পাইলটিং শেষ হয়েছে। সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে তা বাস্তবায়ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

 

ব্লকচেইন প্রযুক্তি কী?

ব্লকচেইন একটা প্রযুক্তি। অন্যান্য ডাটাবেইসের মতো ব্লকচেইনেও রেকর্ড হিসেবে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি রেকর্ডকে বলা হয় ‘ব্লক’। প্রতিটি ব্লকে তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী ব্লকের ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ এবং টাইম স্টাম্প যুক্ত করা থাকে, পাশাপাশি আরো থাকে ট্রানজেকশন ডাটা। ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ হচ্ছে একটি ব্লক তৈরির পর তার বিশেষত্বগুলো নিয়ে তৈরি করা একটি কোড। কোনো কারণে যদি ব্লকটিতে পরিবর্তন করা হয়, তাহলে তার ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশও বদলে যায়। ব্লকে থাকা রেকর্ড কোন ব্যক্তি কখন যুক্ত বা পরিবর্তন করেছেন তা দেওয়া থাকে টাইম স্টাম্প ও ট্রানজেকশন ডাটায়। আর ব্লকগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলে তৈরি হয় ব্লকচেইন। তথ্যের পরিমাণ যত বাড়বে, চেইনে তত বেশি ব্লক যুক্ত হবে। প্রয়োজনে চেইনে অসীমসংখ্যক ব্লকও যুক্ত করা সম্ভব।

যখন ব্লকচেইনের তথ্য কোনো ব্যবহারকারী দেখবেন বা পরিবর্তন করতে চাইবেন, তখন তাঁর কাছে পুরো চেইনটিই পাঠানো হবে। এভাবে কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার ছাড়া শুধু ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে অগণিত কপি সংরক্ষণের মাধ্যমে ব্লকচেইন টিকে থাকতে পারে। এ ধরনের সার্ভারবিহীন তথ্য সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের উপায়কে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কিং’।

পুরো চেইনের প্রতিটি কপি যে ডিভাইসগুলোতে আছে, তাকে বলা হয় ‘নোড’। প্রতিবার নতুন ব্লক যুক্ত বা পরিবর্তন হলে প্রতিটি নোডেই সঙ্গে সঙ্গে তা আপডেট করা হবে। ফলে নতুন তথ্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যাবে নিমেষেই।

 

পেনশন কেন ব্লকচেইনে?

প্রাথমিক শিক্ষকদের ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে পেনশন দেওয়ার জন্য হাতে নেওয়া ই-পেনশন কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য হয়রানি বন্ধ করে দ্রুত ও সঠিক সময়ে পেনশন গ্র্যাচুইটি প্রদান ও গ্রহণ নিশ্চত করা। যেহেতু ব্লকচেইন প্রযুক্তি ডাটার এনক্রিপ্টেড একটি পদ্ধতি, তাই এটি সহজেই দেশের বড় অঙ্কের এই শিক্ষকদের সুবিধা দেবে। সে কারণেই এ কার্যক্রম।

কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল—বিসিসির ই-গভর্ন্যান্স কার্যক্রমের কনসালট্যান্ট তানিমুল বারী বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষকদের একটা সার্ভিস বই থাকে। এটা অনেকটা লগ বইয়ের মতো। সেখানে তাঁর চাকরিতে যোগদান, বয়স, কবে পদোন্নতি পেলেন—সব কিছু অন্তর্ভুক্ত থাকে। অবসরের পর সেই বইয়ের তথ্য অনুযায়ীই তাঁর পেনশন ও গ্র্যাচুইটি নিশ্চিত করা হয়।

ই-পেনশন কার্যক্রমে সেই সার্ভিস বইকে ডিজিটাল আকার করে ফেলা হয়। এরপর সেই তথ্য অনুযায়ী তাঁর পেনশনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হয়। এখন দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সেই সার্ভিস বইয়েও গরমিলের মতো ঘটনা ঘটে। কারো জন্ম তারিখ বদলে দেওয়া কিংবা অবসর গ্রহণের তারিখ গরমিলসহ নানা রকম অবৈধ উপায়ে সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু যখন ব্লকচেইনে সেই ডাটাগুলো এনক্রিপ্ট করা হবে, তখন সেটি বদলানো অসম্ভব। এমনকি কেউ যদি তা করেনও, সেটি দেখা যাবে এবং তার হিস্ট্রি সেখানে থাকবে। ফলে এটি এমন প্রক্রিয়া, যেখানে গরমিল করার কোনো সুযোগ থাকছে না। একই সঙ্গে ঝামেলা ছাড়াই পেনশন পাবেন শিক্ষকরা।

 

পিআরএল আবেদনও ই-পেনশনে

পেনশন ও গ্র্যাচুইটির পাশাপাশি শিক্ষকরা এই সিস্টেমে থেকে ঘরে বসেই অনলাইনে অবসর-উত্তর ছুটির (পিআরএল) আবেদন করতে পারবেন। আবেদন পাওয়ার পর ই-মেইলের পাশাপাশি ফেসবুক মেসেঞ্জার, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষা অধিদপ্তর অফিস আদেশ পাঠিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিসার এবং হিসাবরক্ষক কর্মকর্তাকেও অবহিত করে।

চলতি বছরে যে শিক্ষকরা পিআরএলে যাবেন, এরই মধ্যে তাঁদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। নাম, পদবি, বিদ্যালয়ে শেষ কর্মদিবস এবং কবে থেকে পিআরএলে যাবেন, ই-মেইল ও মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করে অনলাইনে নির্দিষ্ট ফরম পূরণ করতে হবে তাঁদের।

 

পাইলটিং শেষ, অপেক্ষা মূল কার্যক্রমের

বাগেরহাটে ছিল ই-পেনশনের পাইলট কার্যক্রম, যার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন হয়েছে এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষরকরা ই-পেনশনভোগী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এ ছাড়া পাইলট হিসেবে টাঙ্গাইলের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে বাগেরহাটের পাইলটিং শুরু হলেও এখনো মূল প্রকল্প কাজ শুরু করা যায়নি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের জন্য কাজের গতি কিছুটা কমে এসেছে বলে জানালেন কার্যক্রমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যেহেতু এর সঙ্গে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর যুক্ত, তাই সবার সমন্বয় ছাড়া কাজ এগোনো সম্ভব হয় না বলেও জানান তাঁরা। তবে আশা করা যাচ্ছে, করোনার পর ই-পেনশন কার্যক্রমটি শিগগিরই সমগ্র দেশে বাস্তবায়ন করতে কার্যক্রম ব্যাপকভাবে শুরু হবে।

 

কাজ হচ্ছে আইবিএমের সঙ্গে

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ই-পেনশনের কাজ করছে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস বা আইবিএমের সঙ্গে। এক চুক্তির ফলে ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার টেকনোলজি বা ডিএলটি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের স্কুল শিক্ষকদের ডিজিটাল পেনশন সিস্টেম দেখভাল করবে প্রতিষ্ঠানটি। এখানে শিক্ষকদের অনুমোদিত নেটওয়ার্ক আইবিএমের পাইলট ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগঠিত হবে। পেনশনের সব তথ্য সেখানে থাকবে।

এই পাইলট প্রগ্রাম বিভিন্ন সেক্টরে ব্লকচেইন পদক্ষেপ নিতে সরকারকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা