ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের শান্তি ফিরিয়ে আনার এবং সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ আজ তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে জাতিসংঘ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে পূর্ণ সমর্থন করে এবং বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ও কান্ট্রি টিমের মাধ্যমে সহায়তা প্রদানের প্রস্তুতি রয়েছে।’
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সকাল ১১টা ২৪ মিনিটে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীদারি এবং একটি ন্যায্য, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে।
এই লক্ষ্যে আমাদের নতুন প্রজন্ম জীবন উৎসর্গ করেছে।’
গুতেরেস ও ড. ইউনূসের বক্তব্যে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সমতা ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মৌলিক মানবিক মুক্তি ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস।’ এর মূল ভিত্তি হলো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা।
প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমেই জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ভোট ছাড়া কোনো স্তরে প্রকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখা শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার অপরিহার্য ভিত্তি। প্রত্যক্ষ ভোটের বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলকে দুর্বল করবে এবং জনগণের আস্থার সংকট তৈরি করবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে মজবুত করতে হলে সর্বস্তরে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার অবিচল রাখতে হবে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন পর্যায়ে চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা বাতিল করে ওয়ার্ডভিত্তিক নির্বাচিত সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ভোটাররা শুধু সদস্য বা কাউন্সিলর নির্বাচন করবেন এবং নির্বাচিত সদস্যরাই নিজেদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচন করবেন। এই পদ্ধতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
চেয়ারম্যান ও মেয়ররা তাঁদের সহযোগী হিসেবে কয়েকজন সার্বক্ষণিক সদস্য মনোনীত করবেন, যাঁরা আলাদা বেতন পাবেন।
বাকিরা আংশিক সময় কাজ করবেন এবং তাঁদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীরাও নির্বাচন করতে পারবেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদে নারী সদস্য নির্বাচনের জন্য তিনটি পৃথক ওয়ার্ড নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে শুধু নারীরা ভোট করবেন।
উপজেলা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তন এবং জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৩৯টি ওয়ার্ড রাখার সুপারিশও করা হয়েছে, যদিও ন্যূনতম ওয়ার্ডের সংখ্যা ৯-ই থাকবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে সরকারি চাকরিতে থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ। অথচ সংস্কার কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের নির্বাচন করার সুযোগের সুপারিশ করেছে, যা বিদ্যমান আইন ও নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কমিশনের পক্ষ থেকে অনেক পৌরসভা বিলুপ্তির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩৩০টি পৌরসভায় প্রায় ৩০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। আয়-ব্যয়ের মূল্যায়ন করে ১০০টি পৌরসভার বিলুপ্তির সুপারিশ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের সুপারিশ গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনার পরিপন্থী।
গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে জনগণের সরাসরি ভোটাধিকার। পরোক্ষ নির্বাচন বা নিয়োগব্যবস্থা জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার খর্ব করে, প্রশাসনে পক্ষপাত ও দুর্নীতি বাড়ায় এবং গণতন্ত্রকে এলিট গোষ্ঠীর খেলায় পরিণত করে।
জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে সরকার ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয় বলেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বৈধতা পায়। তাই নির্বাচন ছাড়া কোনো সরকারই প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধি হতে পারে না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্রের বনিয়াদ কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। যদি কোনো স্তরে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার সংকুচিত করা হয় বা নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তন করে পরোক্ষ নিয়োগ চালু হয়, তবে তা গণতন্ত্রের অবমূল্যায়ন এবং জনগণের অধিকার হরণের শামিল হবে। এতে জনগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি কমে যাবে এবং প্রশাসনে স্বচ্ছতার অভাব সৃষ্টি হবে।
গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে স্থানীয় ও জাতীয় সব স্তরে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।
জাতিসংঘসহ বিশ্বজুড়ে দায়িত্বশীল নেতারা প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্রের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। তাই বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোট বাতিলের সুপারিশ অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এটি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা দুর্বল করবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি মানে শুধু নির্বাচনের দিনে ভোট দেওয়া নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে ন্যায়বিচার, সমান সুযোগ ও সক্রিয় নাগরিকত্বের চর্চা; যেখানে জনগণ শুধু শাসিত হয় না, বরং সক্রিয়ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার হয়ে ওঠে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রই একটি মানবিক, টেকসই ও ন্যায়বদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সব শ্রেণি ও গোষ্ঠীর মানুষ সমানভাবে সুবিধা পায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি ভিন্নমত, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে রাজনৈতিক দলগুলোকে একে অপরের মতামত ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি, যা ‘সবার বাংলাদেশ’ নির্মাণের ভিত্তি—এই ধারণাটি তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল বিষয়, যা গণতন্ত্র, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক; যার শিকড় রয়েছে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে, যা এক সর্বজনীন ও বৈষম্যহীন দর্শন—যার ভিত্তিতে তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা এবং ভিশন-২০৩০-এ যুক্ত রয়েছে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক দর্শন বিশ্বব্যাপী বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও গবেষকদের আলোচনায় এলেও এটি কোনো নির্দিষ্ট পলিটিক্যাল টার্ম বা মুভমেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বাংলাদেশে এই দর্শন প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমান অনন্য ভূমিকা পালন করছেন। তিনি বলেছেন, ‘সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবার জন্য বাসযোগ্য ও উপভোগযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা বিএনপির লক্ষ্য’, যা গণতন্ত্রের পূর্বাভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে নতুন, উন্নত এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়। অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের লক্ষ্যকে সামনে রেখে তারেক রহমানের রাজনীতি, তাঁর দলের রাজনৈতিক আদর্শ এবং কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের একটি উন্নত ও পরিমার্জিত ধারণা, যেখানে সমাজের প্রত্যেক সদস্যের সমান অধিকার, অংশগ্রহণ ও সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সাংগঠনিক সম্পাদক, ডিইউজে