বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বালাইনাশকের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। রোগ, পোকামাকড় ও আগাছা নিয়ন্ত্রণে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা এখনো বাস্তব। তবে একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, বালাইনাশক আর শুধু ফসল রক্ষার উপকরণ নয়, এটি এখন খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, রপ্তানি বাণিজ্য এবং কৃষকের পেশাগত নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়। এই বাস্তবতায় বালাইনাশক আইন, ২০১৮ আমাদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি তৈরি করলেও আধুনিক কৃষি ও বাজার ব্যবস্থার চাহিদার তুলনায় এর কিছু সীমাবদ্ধতা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে।
বালাইনাশক আইন, ২০১৮ মূলত ১৯৭১ সালের পুরনো অধ্যাদেশ রহিত করে আমদানি, উৎপাদন, ফর্মুলেশন, বিক্রয়, বিতরণ, বিজ্ঞাপন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়। আইনটি নিবন্ধন ও লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে বালাইনাশক বাজারজাতকরণে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো দিয়েছে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো বালাইনাশক আমদানি, উৎপাদন, বিক্রয় বা বিজ্ঞাপন করা যাবে না—এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু আজকের কৃষি-বাস্তবতা ২০১৮ সালের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য রপ্তানির মানদণ্ড, নিরাপদ খাদ্যের দাবি, অনলাইন বাজার, নকল পণ্য, পরিবেশদূষণ এবং কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি—সব মিলিয়ে বালাইনাশক ব্যবস্থাপনাকে এখন আরো বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা জরুরি। শোনা যাচ্ছে, বালাইনাশক বিধিমালা হালনাগাদের খসড়া প্রস্তুত হয়েছে বা শেষ পর্যায়ে আছে। সেটি হলে তা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হবে, যদি সেখানে বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো যথাযথভাবে বিবেচিত হয়।
প্রথম সীমাবদ্ধতা হলো, ‘নিম্নমান’, ‘ভেজাল’ বা ‘দূষিত’ বালাইনাশকের বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা আরো স্পষ্ট হওয়া দরকার। কোনো পণ্যে সক্রিয় উপাদানের মাত্রা কম থাকলে, অনুমোদনহীন দ্রাবক ব্যবহৃত হলে, ভারী ধাতু বা বিষাক্ত অমিশ্রণ পাওয়া গেলে সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করা হবে—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। শুধু ‘নিম্নমান’ শব্দটি ব্যবহার করলেই যথেষ্ট নয়, সক্রিয় উপাদানের গ্রহণযোগ্য বিচ্যুতি, অমিশ্রণের সীমা, নিষিদ্ধ দূষক এবং পরীক্ষার পদ্ধতি বিধিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকা দরকার। এতে বাজার তদারকি সহজ হবে এবং মানহীন পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও বাস্তবসম্মত হবে।
দ্বিতীয়ত, Highly Hazardous Pesticides (HHP) নিয়ন্ত্রণ এখন বৈশ্বিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেসব বালাইনাশক মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী, জলজ পরিবেশ, পরাগায়ণকারী পতঙ্গ বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর জন্য সাধারণ নিবন্ধনপ্রক্রিয়া যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক নিবন্ধন, সীমিত ব্যবহার, ধাপে ধাপে প্রত্যাহার এবং নিরাপদ বিকল্পের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নিবন্ধন বাতিলের সুযোগ থাকলেই হবে না, ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, খাদ্যে বালাইনাশক অবশিষ্টাংশ বা residue এখন জনস্বাস্থ্য ও রপ্তানির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। কৃষক কখন স্প্রে করলেন, কত দিন পর ফসল তুললেন, ফসলে Maximum Residue Limit (MRL) মানা হলো কি না—এসব বিষয়কে আইন ও বিধির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা প্রয়োজন। Pre-Harvest Interval (PHI) না মানলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন। তাই কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বাণিজ্য ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত residue monitoring ব্যবস্থা থাকা দরকার।
চতুর্থত, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় আইনি কাঠামো আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। বালাইনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকা দমন করে না; ভুল ব্যবহার বা অতিরিক্ত ব্যবহারে মাছ, ব্যাঙ, পাখি, মৌমাছি, উপকারী পোকা, মাটির অণুজীব এবং জলাশয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষিজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য নতুন বিধিতে পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন, জলাশয়সংলগ্ন এলাকায় ব্যবহারবিধি, পরাগায়ণকারী পতঙ্গ সংরক্ষণ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, বালাইনাশকের প্যাকেট, বোতল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন আর উপেক্ষার বিষয় নয়। খালি বোতল বা প্যাকেট অনেক সময় মাঠে পড়ে থাকে, পুকুরে ফেলা হয় কিংবা ঘরোয়া কাজে ব্যবহার করা হয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—উভয় দিক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন বিধিতে container return system, dealer-based collection, নিরাপদ সংরক্ষণ ও disposal ব্যবস্থা এবং উৎপাদক বা আমদানিকারকের extended responsibility স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
ষষ্ঠত, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি বালাইনাশক পণ্যে QR code, batch number, নিবন্ধন নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ এবং উৎস যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলে নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন পণ্য দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নিবন্ধন ডেটা বেইস, মোবাইল অ্যাপ ভিত্তিক যাচাই এবং বাজার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুললে সরকার, ডিলার, কৃষক ও ভোক্তা—সব পক্ষই উপকৃত হবে।
সপ্তমত, অনলাইন বিক্রি ও সামাজিক মাধ্যম ভিত্তিক বিজ্ঞাপন এখন বাস্তবতা। ফেসবুক পেজ, ইউটিউব প্রচারণা, অনলাইন মার্কেটপ্লেস কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে অনুমোদনহীন বা বিভ্রান্তিকর তথ্যসহ বালাইনাশক বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন বিধিতে অনলাইন বিজ্ঞাপন, অতিরঞ্জিত দাবি, অনুমোদনহীন পণ্যের ডিজিটাল প্রচার এবং কুরিয়ারভিত্তিক বিক্রির ওপর সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন।
অষ্টমত, কৃষকের নিরাপদ ব্যবহার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। সঠিক মাত্রা, সঠিক সময়, সুরক্ষা পোশাক, বাতাসের দিক বিবেচনা, PHI মেনে চলা, মিশ্রণের নিয়ম এবং খালি বোতল ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে আইন মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হয় না। ডিলারদেরও শুধু বিক্রেতা হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল পরামর্শদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য ডিলার প্রশিক্ষণ, প্রত্যয়ন, বিক্রয়-রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং ভুল পরামর্শের দায়বদ্ধতা বিধিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
নবমত, Integrated Pest Management (IPM) এবং biological control-কে আইনগতভাবে আরো অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। রাসায়নিক বালাইনাশক যেন প্রথম নয়, বরং শেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়—এই নীতি কৃষি সম্প্রসারণ ও বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার অংশ হতে হবে। ফেরোমন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক, সহনশীল জাত, ক্ষেত পর্যবেক্ষণ, উপকারী পোকা সংরক্ষণ এবং কৃষক মাঠ স্কুলভিত্তিক পরামর্শব্যবস্থা বিধিতে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
শেষ কথা হলো, বালাইনাশক আইন, ২০১৮ একটি প্রয়োজনীয় ভিত্তি দিয়েছে। তবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরো যুগোপযোগী করা জরুরি। নতুন বিধিমালা হওয়া উচিত জীবনচক্রভিত্তিক—নিবন্ধন থেকে আমদানি, বাজারজাতকরণ, ব্যবহার, খাদ্যে অবশিষ্টাংশ, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত। শুধু শাস্তি বাড়ানো যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ল্যাব সক্ষমতা, মাঠ পর্যায়ের নিয়মিত নজরদারি, ডিজিটাল যাচাই, কৃষকশিক্ষা, ডিলার জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, তবে তা যেন খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিনিময়ে না হয়। আধুনিক বালাইনাশক বিধির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ফসল সুরক্ষা, কৃষক সুরক্ষা, ভোক্তা সুরক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা।
লেখক : বাংলাদেশ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচার ফেলো এবং সাবেক মহাপরিচালক
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট



আমরা বহু বছর সুখ, শান্তি ও সম্প্রীতিতে কাটিয়েছি। সেটি হাজার বছরের কম হবে না। কিন্তু ইংরেজ আমাদের শান্তিতে, সম্প্রীতিতে থাকতে দেয়নি। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ঘটিয়ে তারা দারুণ মজায় শাসন করেছে। মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি করেছে উনিশ শতকে। এই বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটাই দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব আর দ্বন্দ্ব। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে সেটি আবার চরম আকার ধারণ করে। তারপর প্রায় সময়ই দ্বন্দ্ব লেগে থেকেছে। কিন্তু ছোটখাটো কিছু দ্বন্দ্ব থাকার পরও ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে মুসলমানদের পুরোপুরি পিছে ফেলতে পারেনি। সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো বেড়ে যায়। পাকিস্তানিরা সব সময় ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করে। চাণক্যের দেশ ভারত, কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে যতটা করার তা করেনি। ভারত একটি প্রতিষ্ঠিত কৃষ্টিসভ্যতার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতির দেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের যতটা সম্মান-সহমর্মিতা পাওয়ার কথা, তা পায়নি। আজ ভারতের যে উত্থান, সে উত্থানে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই
বাংলাদেশ থেকেও এই সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইডিসিআরের গবেষকরা সেখানে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁদের উপস্থিতি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, গবেষণার ফলাফল এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সফল উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ডেঙ্গু আজ যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে।
এখন দর-কষাকষিতে ইরান এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে যুদ্ধকালে, এমনকি যুদ্ধপূর্ব সময়ে তারা যেসব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়। এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ইরানের শত শত কোটি জব্দ ডলার ফেরত চাওয়া ছাড়াও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিকে তারা চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব দাবি সামনে আনা হয়েছে, তা হচ্ছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে হবে এবং তারা ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যদি হস্তান্তর করতেই হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই কেন করতে হবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর কোনো সদুত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো যেতে পারে