• ই-পেপার

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভূ-রাজনীতির প্রভাব

  • বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

রেলযোগাযোগ ও উন্নত যাত্রীসেবায় বাড়বে অভ্যন্তরীণ পর্যটন

মুস্তফা নঈম

রেলযোগাযোগ ও উন্নত যাত্রীসেবায় বাড়বে অভ্যন্তরীণ পর্যটন

আমরা রাস্তা যত বড় করব, তত গাড়ি নামবে এবং ট্রাফিক বাড়বে। তাই রেলকে আমরা উন্নত করতে চাই। রেলযোগাযোগ উন্নত হলে যাতায়াত খরচ কমবে, ব্যাবসায়িক খরচও কমবে। এ জন্য সরকার সারা দেশে রেলযোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ২ মে সিলেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য রেলপ্রিয় সাধারণ মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ সড়কে প্রতিদিন বাড়ছে যানবাহন, বাড়ছে দুর্ঘটনাও। এতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। সে তুলনায় রেল বহুগুণে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। রেলযোগাযোগ উন্নত করা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে রেলের যাত্রীসেবাও উন্নত করা দরকার। রেলসেবা উন্নত হলে ইনল্যান্ড ট্যুরিজম বা দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন সম্প্রসারিত হবে। অন্যান্য পরিবহনের মধ্যে রেলপথ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। দেশের সাধারণ মানুষ দূরযাত্রায় সর্বপ্রথম ট্রেনের কথা চিন্তা করে। বিশেষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরযাত্রায় ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য প্রায় সব জেলা থেকে আন্ত নগর ট্রেন সার্ভিস রয়েছে ঢাকার সঙ্গে। এসব আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট পেতে হিমশিম খেতে হয়। এতে সহজেই বোঝা যায় আন্ত নগর ট্রেনের প্রতি যাত্রীসাধারণের আগ্রহ। কয়েক বছর আগে রেলযোগাযোগে সংযুক্ত হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। ভ্রমণপিয়াসি নাগরিক সুদূর ঢাকা থেকে সাগর দর্শনে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ট্রেনযাত্রাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করে। এর বার্ষিক হিসাব করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি যাত্রী।

রেল পরিবহন এখন সারা দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি ডিভিশনে বিভক্তরেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। বাংলাদেশ রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটার গেজ দুই হাজার ২৫ কিলোমিটার, ব্রড গেজ এক হাজার ৫৭৫ কিলোমিটার। এই তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে আবার ডুয়াল গেজের পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার। সারা দেশে রেলস্টেশনের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯৮। গড়ে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ-ছয় কোটি লোক ট্রেনে যাতায়াত করে। সারা দেশে এর মালিকানায় প্রায় ৬০ হাজার একর জমি আছে। রেলযোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি  যাত্রীসেবাও উন্নত করা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি রেলওয়ের যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবৈধ দখলে চলে গেছে, তা-ও উদ্ধার করা জরুরি।

বাংলাদেশে এখন মূলত দুই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ইএমডি লোকোমোটিভপুরো নাম ইলেকট্রোমোটিভ ডিজেল। এই ধরনের ডিজেল ইঞ্জিন টু স্ট্রোকের হয়। দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। এই দুটি ইঞ্জিন মূলত মার্কিন কম্পানির। উন্নত দেশগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন অনেকটা বাতিলের খাতায় থাকলেও বাংলাদেশে এখনো বেশ চলছে। ব্যয়বহুল ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, এই মুহূর্তে জানা নেই।

ডিজেল ইঞ্জিন ব্যয়বহুল বললাম এই কারণে যে টু স্ট্রোকের ইএমডি লোকোমোটিভের ক্ষমতা চার হাজার ৫০০ জিএইচপি (গ্রস হর্সপাওয়ার)। এই ইঞ্জিন দাঁড়ানো (রেলওয়ের ভাষায় নিষ্ক্রিয়) অবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় ১১ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর এইট নচ-এর ডিজেল লাগে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার। নচ হলো ট্রেনের গতি পরিমাপক। এইট নচ হলো ট্রেনের জন্য সর্বোচ্চ গতি। বাংলাদেশে এই ইএমডি লোকোমোটিভ ইঞ্জিনটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই ইঞ্জিনের গতি ও ভর যত বেশি, জ্বালানির ব্যবহার তত বেশি হবে। তবে ট্রেনের বগিসংখ্যার ওপর নির্ভর করে ট্রেনের গতি।

একইভাবে দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। আর এর ক্ষমতা তিন হাজার ৩০০ জিএইচপি। এই ধরনের ইঞ্জিন কোনো স্থানে চালু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলে প্রতি ঘণ্টায় ২২ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর চললে সর্বোচ্চ এইট নচ গতিতে প্রতি মিনিটে ৯ লিটার ডিজেল পোড়ায়। বাংলাদেশে এই ইঞ্জিনগুলো প্রায় অনেক জায়গায় চলে বলে জানান রেল কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে (যেমনঢাকা বা কমলাপুর আইসিডি) রেলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পণ্যবাহী ওয়াগন বা কনটেইনারের ওজনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। সাধারণত একটি ট্রেনে ৩০ থেকে ৪০টি ওয়াগন বা বগি যুক্ত থাকে। ওজনসীমা (অ্যাক্সেল লোড) বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্রড গেজ ও মিটার গেজ লাইনে অ্যাক্সেল লোড বা প্রতিটি বগির সর্বোচ্চ অনুমোদিত ওজনসীমা সাধারণত ২২.৫০ টন।

চট্টগ্রাম ও ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী প্রতিটি আন্ত নগর ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা বা আসনসংখ্যা গড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ জনের মধ্যে হয়ে থাকে। ট্রেনের বগি (কোচ) বা লোড সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যাটি নির্ধারিত হয়। চট্টগ্রাম-ঢাকা চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেনগুলোর সাধারণ আসনসংখ্যা হচ্ছে ৮৯০। এর মধ্যে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৮৯০ হলেও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৭৪৩। তবে যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধি পেলে (যেমনঈদের সময়) কোচ বাড়িয়ে ধারণক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়। তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতি ও গোধূলি এবং মহানগর এক্সপ্রেসসহ ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক আসনসংখ্যাও ৭০০ থেকে ৮০০-র মধ্যে হয়ে থাকে।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড় রুটে চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেন পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের মোট আসন প্রায় ৯০০-র মতো, যা একবারের যাত্রায় প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। ট্রেনবিন্যাস : এতে ১২টি আধুনিক কোচ রয়েছে, যার মধ্যে এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার, কেবিন এবং খাবার ও নামাজের কোচ অন্তর্ভুক্ত। এই রুটের অন্য ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেসও প্রায় একইসংখ্যক যাত্রী বহন করে। এই পরিমাণ যাত্রী পরিবহনে কতসংখ্যক বাস প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। একইভাবে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্ত নগর ট্রেনগুলো জাহানাবাদ এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ও নকশিকাঁথা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে আসনসংখ্যা প্রায় ৮৬০ থেকে ৯০৮ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই রুটে অন্যান্য ট্রেন : জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস। এই ধরনের একেকটি ট্রেনের যাত্রী পরিবহন করতে কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০টি বাসের প্রয়োজন হবে। রেলপথ যত বাড়বে, চলাচলের জন্য ট্রেন সার্ভিস যত সম্প্রসারিত হবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস হওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। রক্ষা পাবে সাধারণ নাগরিকের জীবন ও দেশের সহায়-সম্পদ।

লেখক : সাংবাদিক

প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর কৃষিতে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সময়ের দাবি

মির্জা কিরণ

প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর কৃষিতে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ সময়ের দাবি

বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানের মূলভিত্তি এখনো কৃষি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর কৃষি আর শুধু বীজ, সার ও শ্রমনির্ভর নয়, আধুনিক কৃষি এখন সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট প্রযুক্তি ও প্রকৌশল নির্ভর। অথচ বাংলাদেশের কৃষি প্রশাসনে এখনো সেচ, কৃষি প্রকৌশল ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সেচ উইং, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রকৌশল উইং প্রায় একই ধরনের কাজ করছে। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা, কাজের পুনরাবৃত্তি ও সম্পদের অপচয় দিন দিন বাড়ছে। তাই সময়ের দাবি হলো এই তিনটি সংস্থাকে একীভূত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি শক্তিশালী ও আধুনিক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠন করা।

বর্তমানে বিএডিসির সেচ উইংয়ের অন্যতম প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে হচ্ছে, সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি ও সেচ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, খাল খনন/পুনঃখনন, সোলার ও বিদ্যুৎ চালিত গভীর নলকূপ ও এলএলপি স্থাপন, সেচ লাইসেন্স প্রদান, বিভিন্ন সেচ অবকাঠামো নির্মাণ, রাবার ড্যাম ও হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্যাম নির্মাণ, পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি যেমনস্প্রিংকলার ও ড্রিপ সেচ ব্যবস্থার প্রচলন, ধান চাষে AWD পদ্ধতি সম্প্রসারণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ সম্পর্কিত বিভিন্ন জরিপ কার্যক্রম সম্পাদন। অন্যদিকে বিএমডিএও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা, খাল পুনঃখনন, পানি সংরক্ষণ ও সেচ প্রকল্প পরিচালনা করে। আবার ডিএইর প্রকৌশল উইং কৃষিযন্ত্র বিতরণ, ক্ষুদ্র পর্যায়ে সেচ, কৃষি অবকাঠামো ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ তিনটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে কৃষি প্রকৌশল। কিন্তু একই ধরনের কাজ তিনটি আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। অনেক সময় একই এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলে তিনটি সংস্থা একই কাজের জন্য আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করছে, অথচ একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। এতে সরকারি অর্থ, সময় ও জনশক্তির অপচয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পানির সংকট কৃষিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করলে চলবে না। একটি সমন্বিত কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর থাকলে জাতীয় পর্যায়ে একক পানি ও সেচ নীতি বাস্তবায়ন সহজ হবে। একই ডেটা বেইস, একই প্রযুক্তিগত মান এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পানিসম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তি দ্রুত সম্প্রসারণ করা যাবে।

বর্তমানে কৃষক বুঝতে পারেন না কোন সমস্যায় কোন দপ্তরে যেতে হবে। আবার প্রতিটি দপ্তরেরই জনবলের সংকট রয়েছে। কিন্তু তিন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত, যাঁরা সমষ্টিগতভাবে কাজ করলে মাঠ পর্যায়ে যথাযথ কৃষিসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। একীভূত দপ্তর হলে অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, মাঠ কর্মকর্তাদের জবাবদিহি বাড়বে, সেবা গ্রহণ দ্রুত হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষিতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ দ্রুত বাড়ছে। কম্বাইন হার্ভেস্টার, রিপার, ট্রান্সপ্লান্টার, থ্রেশার, ড্রোন প্রযুক্তি ও স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু কৃষিযন্ত্র বিতরণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কৃষক প্রশিক্ষণ এখনো সমন্বিত নয়। ডিএই কৃষিযন্ত্র ভর্তুকি দিচ্ছে, বিএডিসি সেচযন্ত্র পরিচালনা করছে এবং বিএমডিএ আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ফলে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। একটি একক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠিত হলে সেচ, কৃষিযন্ত্র, পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষক প্রশিক্ষণ একই কাঠামোর আওতায় চলে আসবে। পাশাপাশি বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা প্রশাসন, অফিস ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে যে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় হচ্ছে, সেটিও কমে আসবে। কৃষকরাও এক জায়গা থেকেই সেচ, কৃষিযন্ত্র ও পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সব ধরনের সেবা পাবেন। ফলে কৃষি খাতে দক্ষতা, জবাবদিহি, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়ন বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের কৃষি আরো টেকসই ও উৎপাদনশীল হয়ে উঠবে। এতে কৃষকের জন্য ʻOne Stop Agricultural Engineering Serviceʼ নিশ্চিত হবে।

এ ছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো সরকারের জন্য অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ। আলাদা অফিস, আলাদা যানবাহন, আলাদা প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ব্যয় সরকারি অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একীভূত অধিদপ্তর হলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং জবাবদিহি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী কৃষি প্রকৌশল ক্যাডার গড়ে উঠবে, যেখানে প্রকৌশলীরা বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নেদারল্যান্ডস, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো কৃষি, সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে সমন্বিত প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় এনেছে। এসব দেশে কৃষি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশেও যদি কৃষিকে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই করতে হয়, তবে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে সমন্বিত কৃষি প্রকৌশল ব্যবস্থায় যেতে হবে।

তবে এই একীভূতকরণ অবশ্যই পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ, প্রশাসনিক ভারসাম্য ও বিশেষায়ন বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি শক্তিশালী কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর বাংলাদেশের কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন যুগে প্রবেশ করাতে পারে।

এই একীভূতকরণে সরকারকে তেমন কোনো বেগ পোহাতে হবে না। এরই মধ্যে তিন প্রতিষ্ঠানেরই উপজেলা পর্যায়েও জনবল সেটআপ, অফিস ভবন ও লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে। ফলে একটি নতুন অধিদপ্তর গঠনে সরকারের অবকাঠামো নির্মাণ ও নতুন জনবল নিয়োগে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে, এখানে তার প্রয়োজন হবে না। শুধু প্রয়োজন হবে কৃষকের কষ্ট লাঘবের আন্তরিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর আগামীর বাংলাদেশের স্বপ্ন।

বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ এখন শুধু জমি বা শ্রমের ওপর নির্ভর করছে না, এটি নির্ভর করছে প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ প্রকৌশল ব্যবস্থার ওপর। তাই সময়ের প্রয়োজনে বিএডিসি, বিএমডিএ ও ডিএইর প্রকৌশল কার্যক্রমকে একীভূত করে আধুনিক কৃষি প্রকৌশল অধিদপ্তর গঠন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন।

লেখক : কৃষি প্রকৌশলী, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)

বাজেট বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ

নিরঞ্জন রায়

বাজেট বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত জাতীয় বাজেট পেশ করেছেন। এই বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সার্বিকভাবে বাজেট ঘাটতি ২৬ শতাংশ, যা জিডিপির ৬.৫ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে এবারের বাজেট যে বিশাল আকৃতির, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশাল আকৃতির বাজেটের কারণে বড় ধরনের ঘাটতি হবে, এটিই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন এবং সেই সঙ্গে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি একেবারেই নতুন কিছু নয়। এই প্রবণতা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের উন্নত এবং অনুন্নত সব দেশেই পরিলক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশে বাজেট প্রণয়নের কিছু বিশেষ দিক আছে। প্রতিবছরই একটি নির্দিষ্ট হারে বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। আগের বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তী অর্থবছরের জন্য বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন করা হয়।

বাজেট সাধারণত শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাজেট প্রণয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়নের মধ্যে তফাত যত কম হবে, সেই বাজেট তত বেশি অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবে। বাজেটের ক্ষেত্রে একটি কথা প্রচলিত আছে তা হচ্ছে, যে বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না, সেই বাজেট প্রস্তুত না করাই ভালো। কেননা এই ধরনের বাজেটে কোনো লাভ হয় না। পক্ষান্তরে বাজেট যদি আকারে ছোটও হয়, কিন্তু যদি দক্ষতার সঙ্গে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সেই বাজেটে অর্থনৈতিক উপকারিতা অনেক বেশি। যেমন১০ লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যদি ৬০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অর্থনীতিতে ভূমিকা থাকবে ছয় লাখ কোটি টাকার। পক্ষান্তরে আট লাখ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যদি ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তখন দেখা যাবে যে অর্থনীতিতে সাত লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অবদান থাকবে। বাজেটের সঙ্গে জড়িত এসব কৌশলগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয় কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে এতটুকু বোঝা যায় যে এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রশ্ন উঠত যে গত বাজেটের বড় একটি অংশ বাস্তবায়িত না হওয়া সত্ত্বেও নতুন বছরের জন্য কেন বিশাল আকৃতির বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে? অবশ্য বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলেও বাজেট প্রণয়নের সময় তা কাজে লাগানোর সুযোগ খুব কম। কেননা আমাদের দেশে বাজেট যত না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

বাজেট বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ   প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বাজেটে উল্লিখিত ঘাটতি এবং প্রকৃত ঘাটতির মধ্যে একটি পার্থক্য সব সময়ই থাকে। শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত ঘাটতি লিখিত ঘাটতির থেকে অনেক বেশি হয়ে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে যে বাজেটে ঘোষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কখনোই পূরণ করা সম্ভব হয়নি। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এরই মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা থেকে এক লাখ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব কম আদায় হয়েছে। আগামী অর্থবছর যে খুব একটা ভালো হবে, তেমন আশা করা কঠিন। কেননা দেশের অর্থনীতিতে একটা মন্দাভাব বিরাজ করছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আছে অনেক অনিশ্চয়তা। দেশের ব্যবসায়ীরা এখনো সেভাবে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাতে পারছেন না। আমদানি-রপ্তানি এখনো নিম্নমুখী। কর্মসংস্থান সেভাবে বৃদ্ধি তো পাচ্ছেই না, উল্টো নতুন করে মানুষ বেকার হতে শুরু করেছে। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর সার্বিক নেতিবাচক প্রভাব যে সরকারের রাজস্ব আহরণের ওপর পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কারণে প্রস্তাবিত বাজেটের এক লাখ কোটি টাকা বা তার অধিক রাজস্ব আদায় কম হতে পারে। যদি তেমনটা হয়, তাহলে এই বাজেটে প্রকৃত ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে তিন লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বা তার বেশি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটের এই বিশাল ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করা হবে কিভাবে? বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে যে মোট ঘাটতির এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। অবশিষ্ট ঘাটতির এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে ব্যাংকঋণ নিয়ে। আর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণে যে ঘাটতি দেখা দেবে, সেই অর্থ কিভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার ব্যাখ্যা কখনোই বাজেটে থাকে না, এবারও নেই। এই ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের ওপরই নির্ভর করে বাজেট বাস্তবায়ন কতটা সফল হবে।

বিশাল ঘাটতির কারণে বাজেটে দুই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথম সমস্যা দেখা দেবে যদি ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করা না যায়। সে ক্ষেত্রে বাজেট বাস্তবায়ন সেভাবে হবে না। শুধু সরকারের পরিচালনা ব্যয় মেটানোর মধ্যে বাজেট বাস্তবায়ন সীমিত হয়ে যাবে। আর এই রকমটি ঘটলে বাজেটের যে লক্ষ্য; যেমনবিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনীতিতে গতি আনা, জিডিপি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি হ্রাসএর কোনো কিছুই অর্জিত হবে না। দ্বিতীয় সমস্যা দেখা দেবে যখন সরকার যেকোনো প্রকারে ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেবে। বাজেটে যদিও বৈদেশিক উৎস থেকে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা কঠিন। আবার প্রস্তাবিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সরকারকে অতিরিক্ত ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করতে হবে। সব মিলিয়ে সরকারকে এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে কমপক্ষে দু-তিন লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে।

সরকারের যেহেতু ঘাটতির অর্থ সংগ্রহের উৎস খুব বেশি নেই, তাই ব্যাংকই হবে শেষ ভরসা। আর এখানেই আছে মূল সমস্যা। প্রথমত, দেশের ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা, তাতে ব্যাংকগুলোর সরকারকে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদানের সক্ষমতা আছে কি না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকঋণের ওপর যেহেতু সুদের হার অনেক বেশি, তাই সরকারকে ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের ওপর উচ্চ হারে সুদ দিতে হবে এবং এর ফলে সরকারের সুদ বাবদ বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে যাবে, যা আগামী বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সরকারকে ঋণ নিয়ে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা সরকারকে ঋণের দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে ফেলতে পারে।

ব্যাংকঋণ নিয়ে বিশাল অঙ্কের বাজেট ঘাটতির অর্থ সংগ্রহ করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেননা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ব্যাংকঋণ। ব্যাংক যদি সরকারকেই মাত্রাতিরিক্ত ঋণ দিয়ে ফেলে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রদানের মতো অর্থই তাদের হাতে থাকবে না। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। বেসরকারি বিনিয়োগ বিঘ্ন হলে অর্থনীতিতে গতি আসবে না এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন করেও বাজেটের লক্ষ্য অর্জিত হবে না। এ কারণেই সরকারের ঘাটতি বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করতে হবে এমনভাবে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বিঘ্নিত না হয়। বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। ব্যাংক ছাড়া অন্যান্য উৎস খুব বেশি না থাকলেও বিকল্প পন্থাই খুঁজতে হবে। বিশাল বাজেট নিয়ে, তা বাস্তবায়ন করার জন্য অর্থের জোগান যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি বেসরকারি বিনিয়োগ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, বরং উৎসাহিত হয়; সেই প্রচেষ্টাও থাকতে হবে। মোটকথা, বাজেট বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগ বিঘ্নিত না করে উৎসাহিত করাএই দুইয়ের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় করাই হচ্ছে মুনশিয়ানা, যার পরিচয় বাজেট বাস্তবায়নের সময় দিতে হবে।

লেখক : সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

ড. শাহরীনা আখতার

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যা সরাসরি দেখা না গেলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করছে। উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ক্ষয়, যা কৃষি, গবেষণা, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্য-প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জন যতটা না আশাব্যঞ্জক, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো বাস্তবতা। এই মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করছে না। ফলে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানো। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতির অভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।

দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্বের হার উচ্চ। লাখ লাখ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। অনেকেই নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মিল রেখে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু তরুণদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের গভীর হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর্মজীবী, মধ্যবয়সী এবং বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী ও পিএইচডিধারী পেশাজীবীরাও আজ গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও অনেকেই দেশে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কাজ, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। এই অনিশ্চয়তা তাদের মনে বারবার প্রশ্ন জাগায়, এই দেশে থেকে ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং জীবনমান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সংকট। অনেক তরুণ পেশাজীবী ও গবেষক মনে করেন, দেশে তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, ধীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কখনো কখনো অদৃশ্য চাপ তাঁদের কাজের পরিবেশকে সীমিত করে তোলে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব বা আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ধারণা সব বয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে তারা এমন পরিবেশ খোঁজে, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার সরাসরি প্রতিদান পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও এখানে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে ডিগ্রি শেষের আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশমুখী হয়ে পড়ে। দেশে তাৎক্ষণিক ক্যারিয়ার, গবেষণা সুযোগ ও মর্যাদার অভাব এই প্রবণতাকে আরো তীব্র করে তুলছে।

অনেক তরুণ কৃষিবিদ মনে করেন, দেশে গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা বেশি প্রাধান্য পায়। নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত গবেষণা তহবিল এবং নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের অভাবও একটি বড় বাধা। ফলে যাঁরা উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান, তাঁদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসে না। এতে কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের গতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু কৃষি নয়, উন্নয়ন খাতেও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যে বিদেশমুখিতা প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যম স্তরের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তার অভাব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান যেখানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, গবেষণা সহায়তা এবং উন্নত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে দেশে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত মনে করেন এবং বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন।

এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ঘাটতি, যা মেধা ধরে রাখার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশত্যাগকে উৎসাহিত করছে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক চিত্রও লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন সরকার এলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অভিজ্ঞতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ঘাটতির অভিযোগও শোনা যায়, যা নীতি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার নামে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো এখন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য স্থায়ী বসবাস এর সুযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা সামাজিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই সংকট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে যে দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেশে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত গবেষক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং ক্যারিয়ার সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অনেক দেশ এরই মধ্যে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে। চতুর্থত, উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্থিতিশীল পেশাগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দক্ষ অংশ যদি একে একে দেশ ছাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। সেতু, রেল বা প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মেধা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সেরা মেধাগুলোকে ধরে রাখতে পারব, নাকি তারা অন্য দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা, উন্নয়নের গতি এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

বাংলাদেশের নির্বাচনে ভূ-রাজনীতির প্রভাব | কালের কণ্ঠ