• ই-পেপার

উদারনৈতিক রাজনীতিতে আলোর পথযাত্রী

  • আলী হাবিব

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়

ড. কবিরুল বাশার

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়

১৫ জুন বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘One World Against Dengue’ (ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব)আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ডেঙ্গু আজ আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি রোগ নয়, এটি বিশ্বের দ্রুততম বিস্তারমান মশাবাহিত সংক্রামক রোগগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, বৈশ্বিক যোগাযোগ ও মানুষের ক্রমবর্ধমান চলাচলের ফলে ডেঙ্গু এখন একটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রতিবছর আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের নগর ও উপনগর এলাকাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমণ উপসর্গহীন অথবা মৃদু জ্বর হিসেবে দেখা দেয়, কিছু ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ডেঙ্গুতে রূপ নিয়ে প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস সামনে রেখে সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে এশিয়া ডেঙ্গু সামিট ২০২৬, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের গবেষক, বিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছেন। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন। ডেঙ্গুর মতো একটি আন্তঃসীমান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় কোনো দেশ এককভাবে সফল হতে পারে না; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময়, গবেষণার সমন্বয় এবং অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি। তাই এশিয়া ডেঙ্গু সামিট শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলন নয়, বরং বৈশ্বিক সংহতির এক প্রতীক।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়বাংলাদেশ থেকেও এই সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইডিসিআরের গবেষকরা সেখানে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁদের উপস্থিতি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, গবেষণার ফলাফল এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সফল উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ডেঙ্গু আজ যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুর বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি সংক্রামক রোগ নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোগটির প্রকোপ ও বিস্তার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৯, ২০২৩ ও ২০২৪ সাল বাংলাদেশের ডেঙ্গু ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। ২০১৯ সালে দেশে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা সে সময় পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে যায়। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ এবং একই বছরে এক হাজার ৭০৫ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি; ওই বছরে এক লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। এই ধারাবাহিক উচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুহার প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন কার্যত একটি এন্ডেমিক রোগে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ সক্রিয় রয়েছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি জমে থাকার প্রবণতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘায়িত বর্ষাকাল, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার জীবনচক্রকে আরো অনুকূল করে তুলছে। ফলে যে মৌসুমে আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ সীমিত থাকত, এখন সেই সময়সীমা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতার ঘাটতি এবং প্রতিক্রিয়াশীল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে সমস্যাটি আরো জটিল হয়ে উঠছে।

ডেঙ্গুর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও বটে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, রক্তের চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কর্মচাপ একটি নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের বিস্তার উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং বহু পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং অন্যান্য জটিলতার কারণে মৃত্যুর ঘটনাগুলো এই সংকটকে আরো গভীর করে তুলছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সীমিত ভেক্টর নজরদারি ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কীটনাশকনির্ভর নিয়ন্ত্রণ কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ফল দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব এবং পরিবেশগত ঝুঁকির তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা হয় না। একই ধরনের কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় উদ্বেগ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল গ্রহণ করা। Integrated Vector Management (IVM) বা সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা হতে পারে এর মূলভিত্তি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস। কারণ এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ না করে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, নির্মাণাধীন ভবন এবং সরকারি স্থাপনাগুলোতে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক লার্ভিসাইড ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

ফগিং কার্যক্রমকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালনা করা জরুরি। অকারণ ও নির্বিচারে ফগিং যেমন দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নয়, তেমনি এটি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর পরিবর্তে রোগের হটস্পট এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব এবং আবহাওয়াগত উপাত্ত একত্রে বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা বা Early Warning System গড়ে তোলা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, জিআইএস ম্যাপিং, মোবাইলভিত্তিক রিপোর্টিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জনসম্পৃক্ততা। ডেঙ্গু মোকাবেলা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতসবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। মানুষের আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত উৎস ধ্বংস কার্যক্রমকে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে।

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেউ একা নয়। এটি এমন একটি সংকট, যার সমাধান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কার্যকর নীতিনির্ধারণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের জন্য এই দিবস শুধু সচেতনতা বৃদ্ধির উপলক্ষ নয়, বরং একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ, যেখানে আমাদের বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী, সমন্বিত ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এখনই সময় প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিরোধভিত্তিক, তথ্যনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল বাস্তবায়নের। তাহলেই হয়তো আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ এবং ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্ভাব্য চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

ড. ফরিদুল আলম

সম্ভাব্য চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি

গত ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। অবশ্য এই সময় থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উভয়ের পক্ষ থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত দুই দফা হামলায় ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশকেই লক্ষ্যবস্তু করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা হিসেবে বাহরাইন, জর্দান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে উদ্দেশ করে হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো হলেও বলা হয়েছে, ইরান আর হামলা না করলে তারাও হামলা চালাবে না। সে ক্ষেত্রে ইরানের এই মুহূর্তের অন্যতম দাবি হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানকে সংগত কারণেই এর জবাব হিসেবে ইসরায়েলে হামলা চালাতে হচ্ছে, যা একটি সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কিছুদিন ধরে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। সর্বশেষ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার পর এক টেলিফোন কথোপকথনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন যে তাঁদের কারণে যদি ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবে না, তাদের একাই চলতে হবে। প্রায় দুই মাস ধরে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনেক দেনদরবার চলছে। ইসলামাবাদ থেকে শুরু হওয়া আলোচনাটি এখন ইউরোপের জেনেভায় গিয়ে ঠেকেছে। এই সময়ের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন, একটি চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দুই পক্ষই। তবে এই বিষয়ে ইসরায়েল রয়েছে অন্ধকারে। জানা গেছে, তারা নানাভাবে এই চুক্তির বিষয়বস্তুগুলো নিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য যত দূর কূটকৌশল অবলম্বন করা দরকার, এর সবটাই করে যাচ্ছে। লেবাননে এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

ইসরায়েলের এ ধরনের অবস্থান অবলম্বন এবং যুদ্ধের মাঠ না ছেড়ে এই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে চাওয়াটাকে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। এই যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ নানা চাপে জর্জরিত। দেশের ভেতর জনমত এর বিরুদ্ধে, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা দ্বিধাবিভক্ত, রয়েছে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক চাপও। এই সবকিছু সামাল দিতে এখন তারা এই যুদ্ধবিরতি অবস্থাকে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইতি টেনে মান রক্ষার সর্বশেষ চেষ্টা করছে। ইরানকে তারা যতটা একা ভেবেছিল এবং তাদের সামর্থ্যকে যতটা খাটো করে দেখেছিল, এমনটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি, বরং চীন ও রাশিয়ার রহস্যজনক ভূমিকাটা এখানে অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সুতরাং এই যুদ্ধে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হওয়া বেশ কঠিন। একটি চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতে ইরানের অবস্থান এটিকে আরো জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে। হরমুজ প্রণালিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা তাদের সামর্থ্যের ভালোই প্রমাণ দিয়েছে।

সম্ভাব্য চুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিএখন দর-কষাকষিতে ইরান এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে যুদ্ধকালে, এমনকি যুদ্ধপূর্ব সময়ে তারা যেসব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়। এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে ইরানের শত শত কোটি জব্দ ডলার ফেরত চাওয়া ছাড়াও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিকে তারা চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব দাবি সামনে আনা হয়েছে, তা হচ্ছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে হবে এবং তারা ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যদি হস্তান্তর করতেই হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই কেন করতে হবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর কোনো সদুত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো যেতে পারেএমন বিষয়ে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে। আর সেটি করা গেলে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে নাএমন শর্ত আরোপ করার আর প্রয়োজন হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য বারবারই বলা হচ্ছিল যে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে ইচ্ছুক নয়, বরং তারা পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করতে চায়।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল দিকটি হচ্ছে, ইরাক যুদ্ধের মতো করে তারা ইরান যুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। ইতিহাসের এই পুনরুত্থান ঘটাতে গিয়ে তারা হোঁচট খেয়েছে, ইরানকে ইরাকের মতোই দুর্বল ভেবেছে এবং বড় ভুল করেছে। সবচেয়ে সহজ কাজটিকে তারা অনেক জটিল করেছে এবং সেটি ইসরায়েলের স্বার্থে দেখতে গিয়েই তারা করেছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতি চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেটি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনাই যদি করে থাকতেন, তাহলে হয়তো তার সপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কিছুটা বৈধতা থাকত। কিন্তু বিষয়টিকে করা হয়েছে শুধু ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রভাগে রেখে। কেননা যুক্তরাষ্ট্র যখন এই চুক্তি থেকে সরে আসে, তখন ইরানের বিরুদ্ধে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ ছিল না, ছিল শুধু নেতানিয়াহুর প্ররোচনা। ট্রাম্প সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন। চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এই দফায় নির্বাচিত হয়ে একই ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সর্বশেষ দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ ক্ষেত্রে মৌলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি আগের মতোই উন্মুক্ত করে দেবে। সেই সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘটবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে। অবশ্য এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ইরান শর্তগুলো মেনে চললে তাদের জব্দকৃত কিছু সম্পদ অবমুক্ত করাসহ মার্কিন অবরোধ কিছু সময়ের জন্য তুলে নেওয়া হবে, যেন ইরান আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছু রাজস্ব সঞ্চয় করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এখানে ইসরায়েলের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয় এবং তাদের দাবি হচ্ছে, বর্তমানে এ নিয়ে কী হচ্ছে না হচ্ছে, এর কিছুই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জানাচ্ছে না।

এমন অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা স্মারক সই এবং পরবর্তী সময়ে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বিষয়টি এমন যে এই মুহূর্তে নিজেদের স্বার্থে একটি চুক্তির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সরে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার শঙ্কা থেকেই যাবে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ইসরায়েলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্তভাবে নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ খুবই সংকুচিত। সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করেই ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সবটাকেই গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। তবে চুক্তি হোক আর না-ই হোক, ইসরায়েলকে তাদের বর্তমান আগ্রাসী অবস্থায় রেখে শুধু ইরানকে নিবৃত্ত করতে যাওয়াটা ইরানকে আবারও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শক্তি সঞ্চয়ের তাড়া দেবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব : অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

মীর আব্দুল আলীম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব : অনন্য উচ্চতায় বাংলাদেশ

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বহুপক্ষীয় কূটনীতির সবচেয়ে বড় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (UNGA)। সম্প্রতি এই সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি (President of the UNGA) হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া জাতীয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক। এটি শুধু একটি বৈশ্বিক পদপ্রাপ্তি নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বজায় রাখা সুসংহত ও দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতির এক বিশাল স্বীকৃতি। বিশ্বজুড়ে যখন নানা ভূ-রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিগ্রহ এবং বহুপাক্ষিকতার ওপর আস্থা হ্রাসের মতো চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান, ঠিক তখনই বিশ্বমঞ্চের এই চালকের আসনে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ঐতিহাসিক অর্জন আমাদের যেমন বৈশ্বিক নেতৃত্বের এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনি বিশ্বশান্তি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে আমাদের কাঁধে তুলে দিয়েছে ঐতিহাসিক বৈশ্বিক দায়িত্ব।

এই মর্যাদাপূর্ণ জয় প্রমাণ করে বাংলাদেশ আজ আর শুধু একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়, বরং বিশ্ব কূটনীতির এক অন্যতম নীতিনির্ধারক শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে দেশটিকে মূলত দাতানির্ভর উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো, সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ভেতরে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই অর্জন শুধু একটি পদ বা দায়িত্ব পাওয়া নয়, বরং বৈশ্বিক আস্থার এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশের সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর আস্থা রেখেছে।

এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা এখন আর শুধু বক্তব্য বা নীতিগত অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই প্রভাবের ফলে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক আলোচনায় শুধু অংশগ্রহণকারী নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে আলোচনার দিকনির্দেশক হিসেবেও ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা, শান্তি রক্ষায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বমঞ্চে আরো সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

এই শীর্ষ পদের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক নীতিমালার এজেন্ডা নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে মধ্যস্থতা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে কাজ করার এক অনন্য আইনি ও নৈতিক কর্তৃত্ব লাভ করেছে, যা আমাদের জাতীয় মর্যাদাকে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, উন্নয়ন সহায়তা এবং শান্তি রক্ষাএই ধরনের বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা এখন আরো প্রভাবশালী ও সিদ্ধান্তমূলক হয়ে উঠতে পারে।

শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকায়ও বাংলাদেশের নাম বারবার উঠে আসে। ব্লু হেলমেটের গৌরব জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম শীর্ষ সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রদানকারী দেশ (Troop Contributing Country) হিসেবে অনন্য গৌরব ধরে রেখেছে। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতময় অঞ্চলগুলোয় আমাদের শান্তিরক্ষীদের পেশাদারি, সাহসিকতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। এই নতুন নেতৃত্বের আসনে বসে বাংলাদেশ এখন বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় আরো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হলেও এই সংকট মোকাবেলায় আমাদের নিজস্ব অভিযোজন কৌশল ও ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (CVF) নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ আগেই জলবায়ু কূটনীতিতে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছিল। এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির মঞ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance) এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড (Loss and Damage Fund) কার্যকর করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারে।

মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এই বিপুল জনসংখ্যা আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল দীর্ঘমেয়াদি বোঝা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের এই আসনটি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার। এই পদের কার্যকারিতা ব্যবহার করে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টিকে বিশ্বসম্প্রদায়ের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে।

আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।  বৈশ্বিক সংকটে মধ্যস্থতা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে এক চরম মেরুকরণ ও অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক জটিল সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি হলো—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়। এই নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখার অপার সম্ভাবনা রাখে।

বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান জাতিসংঘের এই শীর্ষ পদটি বাংলাদেশের জন্য শুধু ভূ-রাজনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক কূটনীতির (Economic Diplomacy) এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশে মসৃণ উত্তরণের (Graduation) এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা, শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (GSP) বৃদ্ধি এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণের জন্য এই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মটি অত্যন্ত কার্যকর। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ) এবং উন্নত দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগের পরিধি আরো বিস্তৃত হবে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ তার রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে নিজের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে পারবে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২০৩০ অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম অগ্রগামী দেশ হিসেবে পরিচিত। সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের এই মেয়াদে বাংলাদেশ এসডিজি বাস্তবায়নে বৈশ্বিক তহবিল সংগ্রহ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, মানসম্মত শিক্ষা ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের সফল মডেলগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে পারে।

কূটনৈতিক সাফল্য ধরে রাখতে করণীয় কী? বিশ্বমঞ্চের এই অনন্য অর্জনকে টেকসই করতে এবং দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায়ে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে : (১) দক্ষ ও বিশেষায়িত কূটনৈতিক প্যানেল গঠন : জাতিসংঘের এই এক বছরের মেয়াদকে সফল করতে পেশাদার, দক্ষ ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স বা প্যানেল গঠন করতে হবে, যারা সার্বক্ষণিক নীতিগত সহায়তা দেবে। (২) রোহিঙ্গা ও জলবায়ু ইস্যুতে রোডম্যাপ : সাধারণ পরিষদের এজেন্ডায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং জলবায়ু অর্থায়নকে শীর্ষে রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক রোডম্যাপ তৈরি করে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে লবিং জোরদার করা। (৩) অর্থনৈতিক জোটের সঙ্গে সংযোগ : ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান এবং ওআইসির মতো প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক জোটগুলোর সঙ্গে এই মেয়াদে দ্বিপক্ষীয়কও বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া।

​​জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্ব প্রাপ্তি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এক নতুন ও গৌরবময় যুগের সূচনা করেছে। এটি প্রমাণ করে যে ভৌগোলিক সীমানা বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কখনোই একটি দেশের বৈশ্বিক নেতৃত্বের পথে বাধা হতে পারে না, যদি তার থাকে দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্যতা। তবে এই শীর্ষ পদ আমাদের জন্য যেমন বিপুল সম্মানের, তেমনি এটি এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষাও বটে। বিশ্বরাজনীতির জটিল সমীকরণ ও মেরুকরণের মধ্যে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।

আমরা যদি এই সুযোগকে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পক্ষে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তবে এই অর্জন শুধু একটি মেয়াদের ইতিহাস হয়ে থাকবে না, বরং তা চিরতরে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এ ছাড়া উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ যদি একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি হবে এক স্থায়ী কূটনৈতিক উত্তরাধিকার, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলবে।

লেখক : সাংবাদিক, মহাসচিব-কলামিস্ট

 ফোরাম অব বাংলাদেশ

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জাল

মাসুদ রুমী

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জাল

পুকুরপারে এক তরুণ ছবি তুলছে। বন্ধুর হাতে স্মার্টফোন। নির্দেশনা আসছে-ঘাড় সোজা কেন, একটু বাঁকা করো। ঘাড় বাঁকা হতেই ক্যামেরার ক্লিক। শহরের কোনো এক ঝলমলে রেস্টুরেন্টে দুই বান্ধবী খাবার টেবিলে বসা। ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খাবার সামনে রেখেই শুরু হয়েছে অন্য এক মহাসমারোহ। খাওয়া শুরুর চেয়েও তখন জরুরি ক্যামেরাবন্দি হওয়ার নিখুঁত প্রস্তুতি। একজন ঠোঁট বাঁকাচ্ছেন, অন্যজন অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গিতে নিজেকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় মত্ত।

দৃশ্যগুলো আমাদের চেনা। এই শহরের প্রতিটি কোণে, প্রতিদিন এমন হাজারো ফ্রেম তৈরি হচ্ছে। এসব খণ্ডচিত্রের শেষ গন্তব্য একটাইসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অতিরিক্ত মেকআপের প্রলেপ, রঙিন জমকালো পোশাক, কৃত্রিম আলোকসম্পাত কিংবা আকর্ষণীয় লোকেশন খোঁজার পেছনের মূল মনস্তত্ত্বটি আসলে কী? খুব গভীরে না গিয়েও বলা যায়, এর পেছনে কাজ করে ছবি বা পোস্টটি শেয়ার করার পর ভার্চুয়াল বন্ধু মহল থেকে একটু বাড়তি লাইক, কমেন্ট আর প্রশংসা কুড়ানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু একটি ছবি বা স্ট্যাটাস পোস্ট করলেই কিন্তু গল্পের শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় এক নতুন মানসিক অস্থিরতা। একটি স্ট্যাটাস লিখতে গিয়েও যেমন চলে নানামুখী ভাবনা তেমনি পোস্ট করার পরই টুংটাং শব্দে আসতে থাকে নোটিফিকেশন। এই যে এক অদ্ভুত ভার্চুয়াল ব্যস্ততা, তা আমাদের অজান্তেই গিলে খাচ্ছে আমাদের চারপাশের বাস্তব সময় আর আসল সম্পর্কগুলোকে।

রাতে ঘুমানোর আগেও অনেকে ব্যস্ত থাকেন ফেসবুকে কে কী স্ট্যাটাস দিল, কোন নতুন রিল বা শর্টস আপলোড হলো তা দেখতে। শরীর ও মস্তিষ্কের বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও কেড়ে নিচ্ছে এই মাধ্যম। একদিকে ব্যয় হচ্ছে মোবাইল ডেটা, অন্যদিকে অনুৎপাদনশীল কাজে অপচয় হচ্ছে সময় ও মনোযোগ। অথচ এই সময় কাজে লাগতে পারত নতুন কোনো পেশাগত নতুন দক্ষতা অর্জনে, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চায় কিংবা সৃজনশীল কাজে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি বিচ্ছিন্নতার জালসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য ছিল যোগাযোগ সহজ করা। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এর গঠনমূলক ব্যবহার থেকে সরে এসে এটিকে পরিণত করেছেন আত্মপ্রদর্শন ও সময় অপচয়ের মাধ্যম হিসেবে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই লাইক-কমেন্টের সংস্কৃতি মানুষকে এক ধরনের ছদ্ম-স্বীকৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা আমাদের সুখ, সৌন্দর্য এবং যোগ্যতার মাপকাঠি সঁপে দিয়েছি অন্যের হাতের একটা ডিজিটাল ক্লিকের ওপর। কোনো পোস্টে লাইক কম হলে একবিংশ শতাব্দীর তরুণ মন বিষাদে আক্রান্ত হচ্ছে, নিজেকে ভাবছে ব্রাত্য। আর লাইকের সংখ্যা হাজার পার হলে ক্ষণিকের জন্য মিলছে এক কৃত্রিম পরম তৃপ্তি। আমরা কি তবে ক্রমেই এক আত্মরতিমূলক (Narcissistic) সমাজে রূপান্তরিত হচ্ছি, যেখানে বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে সেই অভিজ্ঞতার ডিজিটাল প্রদর্শন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

তথ্যের দ্রুত প্রবাহ, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের যে সম্ভাবনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যাত্রা শুরু হয়েছিল, বাস্তবে তা অনেকাংশে আসক্তি, ভুয়া তথ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট এবং সময়ের অপচয়ে পরিণত হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি; যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, এরপর ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম। এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি তরুণদের মধ্যে।

একসময় যৌথ পরিবারে সন্ধ্যার আড্ডা, একসঙ্গে খাওয়া কিংবা পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন অনেকটাই হুমকির মুখে। পরিবারের সদস্যরা একই ছাদের নিচে থাকলেও অনেকেই ডুবে থাকছেন নিজ নিজ স্মার্টফোনে। ফলে কথোপকথন কমছে, বাড়ছে মানসিক দূরত্ব। বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের, এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। বয়স্করা ভুগছেন একাকিত্বে, শিশুরা বাস্তব সম্পর্কের বদলে আশ্রয় নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে।

একটা সময় ছিল যখন মানুষের অন্দরমহলের কথা অন্দরেই থাকত। কিন্তু বর্তমানের শেয়ারিং কালচার বা সবকিছু প্রকাশ করার সংস্কৃতিতে প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। অনেকে নিজের অজান্তেই ঘরের খুঁটিনাটি তথ্য, সন্তানের স্কুলের অবস্থান, এমনকি নিজের দৈনন্দিন রুটিনও তুলে দিচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ আমরা যখন কোনো পাঁচতারা হোটেলে চেক-ইন দিই কিংবা ভ্রমণের লাইভ আপডেট দিই, তখন শুধু নিজের সামর্থ্যের প্রচার করছি না, বরং অপরাধীচক্র বা ডেটা শিকারি বিভিন্ন গ্রুপের হাতে তুলে দিচ্ছি নিজের লোকেশন ও ব্যক্তিগত তথ্য।

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফিডগুলোতে এখন এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলে—‘কে কার চেয়ে কত বেশি সুখী এবং সফল। গাড়ি-বাড়ি, দামি রেস্তোরাঁ কিংবা বিদেশভ্রমণের চাকচিক্যময় ছবি যাঁরা প্রতিনিয়ত পোস্ট করছেন, তাঁরা হয়তো নিজেদের এক ধরনের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে চাইছেন। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠ অত্যন্ত নির্মম।

সমাজের একটি বিশাল অংশ, যারা সৎ উপায়ে জীবনসংগ্রাম করছেন, যাঁদের এই ধরনের বৈভব প্রদর্শনের সামর্থ্য নেই, তাঁরা যখন অবিরত এই সমস্ত লাইফস্টাইল দেখতে বাধ্য হন, তখন তাঁদের অবচেতনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও আফসোসের জন্ম নেয়। এই অবাস্তব তুলনা সমাজে এক ধরনের হতাশা ও অসন্তোষ তৈরি করছে।

সামাজিক মাধ্যমের এই জাঁকজমকপূর্ণ দুনিয়া মানুষকে এক ধরনের নেশায় বুঁদ করে রাখছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই স্ক্রিন টাইম মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে এক ধরনের ছদ্ম-উত্তেজনা তৈরি করে। এর শারীরিক ও মানসিক মূল্য অত্যন্ত চড়া। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং স্ক্রল করার কারণে যুবসমাজের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা এবং স্থূলতার মতো শারীরিক সমস্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ভার্চুয়াল দুনিয়ার পারফেক্ট জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারে না, তখন গ্রাস করে তীব্র মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশন। বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকরা এখন এই ডিজিটাল ফ্যাটিগ বা মানসিক ক্লান্তিকে এক নতুন মহামারি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নারীদের ওপর বিশেষ ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে সাইবার হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, সেক্সটরশন ও ডিজিটাল সহিংসতা এখন উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝুঁকি আরো গভীর। অশ্লীল কনটেন্ট, আসক্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগহীনতা ও শিক্ষাগত ক্ষতি এর বড় প্রভাবগুলোর মধ্যে অন্যতম। ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে, যা তাদের ঘুম, শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশ কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ২০২৫ সালে ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিশ্বে নজির সৃষ্টি করেছে। আইন অমান্য করলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বলেছেন, শিশুদের আবেগ কোনো পণ্যে পরিণত হতে পারে না। যুক্তরাজ্যও ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য কঠোর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালুর পথে এগোচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়া ২০২৬ সাল থেকে ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বয়স যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও একই ধরনের নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে।

শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার ১ জুন থেকে ১৬ বছরের কম বয়সী কেউ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব কিংবা একই ধরনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না।

বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কার্যকর ও সমন্বিত নীতি জরুরি। প্রথমত, বয়সভিত্তিক বিধি-নিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। ১৬ বছরের নিচে শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র বা নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট যাচাই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। তৃতীয়ত, সাইবার অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় দ্রুত প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল সহিংসতার অভিযোগ দ্রুত তদন্ত ও বিচারের জন্য বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে। চতুর্থত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে সাইবার নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন ও দক্ষ করে তুলতে হবে। পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলা ভাষায় কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা ও দ্রুত সাপোর্ট প্রদানে প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করা প্রয়োজন। ষষ্ঠত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রিত নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ডিজিটাল ডিটক্স বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পারিবারিক বন্ধন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীলতা ও সচেতনতার বিকল্প নেই। 

আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ডিজিটাল ডিটক্স বা প্রযুক্তি থেকে সাময়িক বিরতি নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখাই শ্রেয়। অন্দরমহলের শান্তি আর বাইরের জগতের চাকচিক্যএই দুইয়ের মাঝে একটি সুস্থ সীমানা টেনে দেওয়া জরুরি। প্রদর্শনীর এই মোহময় ফাঁদ থেকে বের হয়ে এসে যদি আমরা বাস্তব জীবন, প্রকৃতি এবং রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে না পারি, তবে এক কৃত্রিম ও অবসাদগ্রস্ত সমাজ থেকে আমাদের কেউ রক্ষা করতে পারবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

উদারনৈতিক রাজনীতিতে আলোর পথযাত্রী | কালের কণ্ঠ