kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

শিশু শিক্ষা শুরু হয় কোচিং সেন্টার দিয়ে

ড. মো. আনিসুজ্জামান

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু শিক্ষা শুরু হয় কোচিং সেন্টার দিয়ে

অনেক দিন পর আমার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। স্কুলের পরিবেশ দেখে ভালো লেগেছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পায়ে জুতা। আমরা খালি পায়ে স্কুলে গেছি।

বিজ্ঞাপন

স্কুল মাঠের এক পাশে শহীদ মিনার। স্কুলে বৈদ্যুতিক পাখা চলছে। ক্লাসরুম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। প্রজেক্টরের সাহায্যে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকার থেকে ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সরকারের মহৎ উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসেনি। বঙ্গবন্ধু কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, শেখ রাসেল কর্নার রয়েছে স্কুলের একটি ক্লাসরুমে। বেশির ভাগ স্কুলে ক্লাসরুমের সংখ্যা কম থাকায় কোনো একটি রুমের এক পাশে নির্ধারিত কয়েকটি ছবি দিয়ে করা হয়েছে কর্নার। ছবিগুলো দেখে খুদে শিক্ষার্থীরা অনুপ্রাণিত হয়। জাতীয় সংগীত এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নামে শপথবাক্য পাঠের মধ্য দিয়ে স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয় প্রতিদিন। কিন্তু সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কি জাতীয় সংগীত এবং সরকার নির্দেশিত শপথবাক্য পাঠ করানো হয় প্রতিদিন?

শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে প্রশংসার দাবি রাখে। প্রাথমিক শিক্ষার পরিমাণগত মানের সঙ্গে গুণগত মানও পরিবর্তিত হয়েছে। অবকাঠামোর সঙ্গে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণ আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। কিন্তু মূল্যায়ন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে কোথায় যেন ফাঁক। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখে আশান্বিত হয়েছিলাম। রাজশাহী শহরের কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে আত্মবিশ্বাসী না হলেও আশান্বিত হতে পারিনি। রাজশাহীর স্কুলগুলোতে শহীদ মিনার দেখিনি। দেশের যেসব স্কুলে শহীদ মিনার নেই, আশা করি আগামী শহীদ দিবসের আগে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার গড়ে উঠবে। মাদরাসাকে বাইরে রাখার কোনো যৌক্তিক কারণ দেখি না। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন করা উচিত। কেজি স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতেও শহীদ মিনার বাধ্যতামূলকভাবে স্থাপন করার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা আছে বলে মনে হয় না। যাঁরা এমএর সমমান নিয়ে গর্ব বোধ করেন, তাঁরাও সরকারি নির্দেশনার বাইরে থাকতে পারেন না। শিশু শিক্ষার্থীদের সামনে দৃশ্যমান একটি শহীদ মিনার থাকলে ভাষার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের মনে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হবে। কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা কর্মকর্তারা সুহৃদ হলে প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার স্থাপন করা কোনো কঠিন কাজ নয়। স্কুলে জাতির জনকের একটি ম্যুরাল স্থাপন করার যৌক্তিক সময় অতিক্রম করেছে বহু আগেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য বহুদিন থেকেই শুনছি নির্মাণ করা হবে। মাস গেল, বছর গেল, প্রশাসনে পরিবর্তন হলো, কিন্তু ভাস্কর্যের ‘ভ’ও এখনো হয়নি দৃশ্যমান। শোনা যায়, বহুগুণে গুণান্বিত সাবেক একজন উপাচার্যের ভাস্কর্যবিরোধী মনোভাবের জন্য কাজের সূচনা পর্বের সূচনাও হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে জাতির জনকের একটি ম্যুরাল ছাড়া আর কোনো ম্যুরাল বা প্রতিকৃতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেই।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু কর্নার, রাসেল কর্নার ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে সরকার নির্ধারিত কয়েকটি ছবি দেয়ালে লাগানো রয়েছে। ছবিগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্বাচিত কিছু বই একটি আলমারিতে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত। বইগুলো থেকে সপ্তাহে অন্তত এক দিন এক ঘণ্টা পড়ে শোনালে শিক্ষার্থীদের দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে এবং জাগ্রত হবে দেশপ্রেম। যেসব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রজেক্টরের ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোতে জাতীয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি মাত্র। এ ছাড়া এলাকার সম্মানিত মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় স্কুলগুলোতে জাতীয় দিবসে যুদ্ধদিনের গল্প শোনানোর ব্যবস্থা করা উচিত। শিশু বয়সেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পরিচিতি দরকার। এমএ, বিএ ও বিএড শিক্ষকের সংখ্যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক। সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা প্রয়োজন।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগে শিশুদের ‘সোনার বাংলায়’ কোচিং সেন্টারে ভর্তি করা হয়। শিশু শিক্ষা শুরু হয় কোচিং সেন্টার দিয়ে। স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুকে নামতে হয় ভর্তি প্রতিযোগিতায়। শিশুকে ভর্তি প্রতিযোগিতায় নামাতে গিয়ে পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ নিশ্চিন্তে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন না। শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার ফলে শিশুর স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। ফলে শারীরিক ও মানসিক বৈকল্য সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। শিশুরা আগামী দিনের কর্ণধার—এই স্লোগান কার্যকর করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাধিক। শিশুদের কোচিং সেন্টারে যাওয়া বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোচিং, প্রাইভেট বন্ধ করা উচিত। সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক কোচিং সেন্টারে পড়াতে পারবেন না। শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়েও শিক্ষকের পড়ানো বন্ধ করা উচিত। কোনো দুর্বল শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হলে স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পড়ানো যেতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী হিসেবে তৈরি করার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার পরবর্তী সময়ে প্রশাসনে যাচ্ছেন, সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। শিশুরা বেড়ে উঠুক, নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক সে কী হতে চায়। সোনার বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী দিনের নাগরিকদের ওপর।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা