kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দিল্লির চিঠি

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ

জয়ন্ত ঘোষাল

১১ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বখ্যাত দার্শনিক বার্টান্ড রাসেল বলেছেন, যুদ্ধ কখনো সভ্যতার সংকট সমাধানের রাস্তা হতে পারে না। শুধু কিউবা ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেই নয়, ১৯৬২ সালের শেষের দিকে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘাত যাতে যুদ্ধ এবং সর্বগ্রাসী বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে না যায়, তার জন্য রাসেলের উদ্বেগের শেষ ছিল না। তিনি জওয়াহেরলাল নেহরু ও চৌ এন লাইকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যা মিটিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি নেহরুকে চিঠি লিখেছিলেন এবং নেহরু সেই চিঠির জবাবও দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তী সময়ে সীমান্ত যুদ্ধে সাফল্য সত্ত্বেও চীনের একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকেও রাসেল অভিনন্দিত করেছিলেন। রাসেলের লেখা ‘আনআর্মড ভিক্টরি’ গ্রন্থ থেকে এ ব্যাপারে সবিস্তার জানা যায়। রাসেল বলেছেন, ‘ভারত-চীন বিবাদ এটা বুঝিয়ে দিয়েছে যে ক্ষুদ্র সীমান্ত সংঘর্ষ ক্রমে একটা বড় আকার নিয়ে নিতে পারে। ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অস্ত্র সাহায্যের আবেদন করে ভারত তার স্বাধীন শক্তির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। এখনো অবধি অনুমান করা যাচ্ছে না যে ব্রিটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে কি না। যুদ্ধ হতেও পারে। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে চীন তার বিরোধ মিটিয়ে হয়তো লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেবে। তাহলে  তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ তো অনিবার্য হয়ে যাবে। ’ চিন্তিত ছিলেন রাসেল।

রাসেল বারবার বলেছেন, জনসাধারণের মধ্যে এই ‘যুদ্ধংদেহী’ ভাবটা থাকে না। সরকারপক্ষ এই বিদ্বেষ তৈরি করে। এমনকি দুই দেশের কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিক, যাঁরা সরকারপক্ষের নীতি সমর্থন করে অনেক সময় আরো বেশি উৎসাহ নিয়ে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে পাঠককুলকে উত্তেজিত করে লিখে চলেছেন, তাঁদেরও সমালোচনা করে রাসেল বলেছেন, তাঁরা আসলে কাপুরুষতার প্রতীক। কেউ কি ভাবতে পারেন যে এই সাংবাদিকরা সবাই যুদ্ধ কামনা করে তাঁদের পাঠকদের সঙ্গে নিজেরাও বিলুপ্ত হতে চান? আজকের এই পরিস্থিতিতে রাসেলের লেখাটা বড় বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে।

একটা ত্রস্ত সময়ের মধ্য দিয়েই আমাদের এখন জীবনযাপন। ইউক্রেনকে নিয়ে রাশিয়া আর আমেরিকার যুদ্ধ তো চলছেই। তার মধ্যে আমেরিকার প্রতিনিধিসভার স্পিকার তাইওয়ান পৌঁছে যাওয়ায় চীন তাঁকে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরির একটা কারণ দর্শাচ্ছে। চীন কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। তাইওয়ানের সীমান্ত সিল করে দিচ্ছে। জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের সেনাবাহিনী ঢুকে পড়ছে। কী ভয়ংকর একটা পরিস্থিতি!

এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা। আমি মনে করি, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হবে, ততই আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে আফগানিস্তানে বিন লাদেনের হত্যার ১১ বছর পর তাঁর প্রধান উপদেষ্টা, যিনি ছিলেন আল-কায়েদার প্রধান কাণ্ডারি, সেই আইমান আল জাওয়াহিরিকে ড্রোনের মাধ্যমে হত্যা করেছে। আবার এই জাওয়াহিরির কাবুলের সেফ হাউসে থাকা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তালেবান সরকার তাসখন্দে গিয়ে সাংহাই কো-অপারেশনের বৈঠকেও যেসব কথা বলছে বা দাবি করছে, তা সত্য নয়। এখনো তারা সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিচ্ছে এবং রাষ্ট্রসংঘের পরামর্শ তারা শুনছে না। এমনকি দোহার যে ঘোষণা, সেই ঘোষণা পর্যন্ত তারা অমান্য করছে।

এই পরিস্থিতিতে কাবুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে তালেবান সরকার। কিন্তু সন্ত্রাসের সমর্থন করবে কে? চীন এখনো পাকিস্তানের পাশে। পাকিস্তান কাবুলের পাশে। রাশিয়া তালেবান সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রয়েছে। তাহলে পরিস্থিতিটা দাঁড়াচ্ছে কী? তাহলে এই অবস্থায় ভারতের অবস্থানটা কী হবে এই উপমহাদেশে? ভারত যদি এই উপমহাদেশে দুর্বল হয়, তাহলে তো মুশকিল।

ভারতের জন্য পরিস্থিতিটা কিন্তু বেশ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার কারণ হচ্ছে, আফগানিস্তানের নতুন তালেবান সরকার ভারতের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছিল এবং ভারত একটি টেকনিক্যাল টিমও কাবুলে পাঠিয়েছিল। এমনকি তালেবান সরকার কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা নিয়েও বলেছে যে ওটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। সুতরাং তালেবান সরকারও এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো করতে চায়। তাই রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে ভারত তালেবানের সঙ্গে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করে। তালেবান সরকার আসার পর ভারতের সঙ্গে বিরোধ হওয়ার কথা ছিল, সেটা হয়নি। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল মুনশিয়ানার সঙ্গে সেই আলোচনাটাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আফগানিস্তান সরকারকে পাকিস্তানের থেকে আলাদা করতে যথেষ্ট সক্ষম হয়েছেন।

এদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সেই পাকিস্তানের সঙ্গেও ভারত আলোচনায় যেতে চাইছে। তবে এক্ষুনি একটা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা না হলেও আগামী দিনে সেই আলোচনা হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা আছে। তার কারণ নরেন্দ্র মোদিকে যদি কাশ্মীরে নির্বাচন করতে হয়, তাহলে সেখানে যুদ্ধের দামামা না বাজিয়ে শান্তির আলোচনা করে মুসলিম দুনিয়ার কাছে নরেন্দ্র মোদিকে একটি নতুন বার্তা দিতে হবে।

এমনটাও শোনা যাচ্ছে, জাওয়াহিরিকে হত্যা করার পেছনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তথ্য সরবরাহ করেছে। পাকিস্তান সেটা করেছে, তার কারণ পাকিস্তানের চূড়ান্ত আর্থিক সংকট। কাজেই পাকিস্তান এখন আমেরিকাকে খুশি করতে ব্যস্ত। বিশেষত পাকিস্তান সেনাবাহিনী মরিয়া হয়ে আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইছে। তার কারণ পাকিস্তানের অর্থনীতি কার্যত ভেঙে পড়ায় এই উপকারটির জন্য আমেরিকা আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার থেকে পাকিস্তানকে প্রভূত ঋণ দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, চীনের কাছ থেকে পাকিস্তান যে অস্ত্রগুলো পাচ্ছে, সেই অস্ত্রগুলোর গুণগত মান যথেষ্ট ভালো নয়। এ বিষয়টি নিয়ে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও অভিযোগ করছে। এদিকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা তাদের প্রতিরক্ষা খাতে সাহায্য করা বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে এখন অস্ত্র ও অন্যান্য বিস্ফোরকদ্রব্য পাঠানো বন্ধ আছে। পাকিস্তান সেই কারণে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কটার উন্নতি ঘটাতে চাইছে। তাদের জন্য এখন আইএমএফের ঋণ পাওয়া খুব জরুরি। সে কারণে এই কাজটা করে আমেরিকাকে তুষ্ট করাটাও পাকিস্তানের একটা বড় কাজ। কিন্তু আমেরিকাকে তুষ্ট করার প্রক্রিয়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পছন্দ করছে না। পাকিস্তান যদি আমেরিকার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক করে ফেলে এবং পাকিস্তানের পেছনে আবার যদি আমেরিকা এসে দাঁড়ায়, তাহলে কী হবে? যেমন—পাকিস্তান চীনের প্রধান অক্ষ বলে বাইডেন এখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

আজকে পাকিস্তান যদি আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলে, তাহলে সেখানে ভারতের অবস্থানটা কী হবে? ভারত তো কখনোই চাইবে না যে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্ব হোক। আবার এটাও ঘটনা, নরেন্দ্র মোদি যেভাবে সংঘাতের পথে যাচ্ছিলেন, সেখানে এখন যা পরিস্থিতি তাতে প্রতিটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তত একটা ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ দরকার। এ কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গেও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল যোগাযোগ রাখছেন। এমনকি সেপ্টেম্বর মাসে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও যদি একটা শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক হয়ে যায়, তাহলে আমি বিস্মিত হব না।

এ রকম একটা জটিল পরিস্থিতিতে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আসছেন। আবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সদ্য ঢাকা সফর করে গেছেন। সুতরাং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সফরে শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি শুধু নয়, গোটা দেশের বাণিজ্য এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। সেখানে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে তিস্তা চুক্তি পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা সম্ভব।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের এখন বাংলাদেশের মতো বন্ধুরাষ্ট্রকে পাশে পাওয়া আরো বেশি করে প্রয়োজন। বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে যাঁরা দুর্বল করতে চাইছেন এবং মৌলবাদী শক্তি ভারত বিরোধিতার তাস খেলে বাংলাদেশের মাটিতে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে শেখ হাসিনাকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছেন, আর যাই হোক, তাঁরা বাংলাদেশেরও ভালো চান না, ভারতেরও ভালো চান না। এই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও কিন্তু বুঝতে ভুল করছেন না। তাই এই মুহূর্তে ভারত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে শেখ হাসিনার ভারত সফরের জন্য।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের

বিশেষ প্রতিনিধি

 



সাতদিনের সেরা