kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

মধ্য এশিয়ায় রুশ নিয়ন্ত্রণ কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

নিকোলা মিকোভিচ

১৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



 মধ্য এশিয়ায় রুশ নিয়ন্ত্রণ কমাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার মিত্র দেশগুলো ধীরে ধীরে ক্রেমলিনের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এটি ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এমন একটি পরিবর্তন, যা ক্রমেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মস্কো যখন ইউক্রেনে তার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খেলোয়াড়রা এই অঞ্চলটিতে তাদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অথচ এই অঞ্চল ঐতিহ্যগতভাবেই রাশিয়ার          ভূ-রাজনৈতিক বলয়ের অংশ।

বিজ্ঞাপন

ক্রমবর্ধমান নতুন স্নায়ুযুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে মধ্য এশিয়ার জন্য একটি নতুন কৌশল গড়ে তুলেছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে এখানে মার্কিন মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো এবং ‘আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের প্রভাব মোকাবেলায় ভারসাম্য সরবরাহ করা। ’

মস্কো দাবি করে যে ‘রাশিয়া এই অঞ্চলটিকে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে না। ’ গত ১২ মে মধ্য এশীয় দেশগুলো ইন্টারপার্লামেন্টারি ফোরাম ও রুশ ফেডারেশনের একটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে রাশিয়ার এ অবস্থানের কথা বলেন দেশটির ফেডারেশন কাউন্সিলের স্পিকার ভ্যালেন্তিনা মাতভিয়েংকো।

তাহলে কি মাতভিয়েংকোর এই ঘোষণার অর্থ এই যে ক্রেমলিন এরই মধ্যে মধ্য এশিয়ায় তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছে? সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়া ঐতিহ্যগতভাবে সার্বভৌম উন্নয়নের জন্য এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অধিকারকে সম্মান করে এবং আন্তঃ আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করার প্রবণতাকে স্বাগত জানায়। ’

ওয়াশিংটন এখন এই অঞ্চলে যাত্রা শুরুর ইঙ্গিত দিয়ে তার অপেক্ষাকৃত বিনয়ী অবস্থানকে শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগী হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ১০ মে তাজিকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন মার্ক পোমারশেইম জানিয়েছেন, নিরাপত্তার জন্য তাজিকিস্তানকে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এই সহায়তার মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পুমা সামরিক পর্যবেক্ষণ ড্রোনও থাকবে।

দুশানবেতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এরই মধ্যে তাজিকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে ২.৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের আটটি আইভিসিও ট্রাক, টায়ার ও প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। অথচ তাজিকিস্তান রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সিএসটিও) সদস্য এবং অর্থনৈতিকভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়া থেকে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স মধ্য এশিয়ার দরিদ্রতম দেশটির অর্থনীতির শক্তির জোগান দেয়। আনুমানিক ১০ লাখ তাজিক নাগরিক রাশিয়ায় বসবাস ও কাজ করে। এর পরও ক্রেমলিন কেন দুশানবেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে না, তা স্পষ্ট নয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ কোনো ন্যাটো সদস্য দেশকে দেবে না।

এ ক্ষেত্রে একটি মাত্র ব্যতিক্রম হতে পারে তুরস্ক। এই মার্কিন মিত্র ২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছিল। এই তুরস্ক এখন সক্রিয়ভাবে মধ্য এশিয়ায় তার অবস্থান বৃদ্ধি করছে। তবে এটা ওয়াশিংটনের চিন্তার সঙ্গে মিলেও যায়। কারণ রাশিয়া ও চীনের মতো ‘আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের প্রভাব মোকাবেলায় ভারসাম্য সরবরাহ করা’র লক্ষ্য পূরণে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান মধ্য এশীয় কৌশলের সঙ্গেই খাপ খায়।

তুরস্ক এরই মধ্যে রাশিয়ার সিএসটিও মিত্র কিরগিজস্তানের কাছে তার ‘বেরাকতার টিবি২ ড্রোন বিক্রি করেছে এবং আরেক প্রতিবেশী তাজিকিস্তানে মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান সরবরাহের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। এর বাইরে তুরস্ক ও সিএসটিও সদস্য কাজাখস্তান সম্প্রতি যৌথভাবে আনকা ড্রোন বা মাঝারি উচ্চতার শক্তিশালী মনুষ্যবিহীন আকাশযান উৎপাদন শুরু করার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।

আংকারায় তুরস্ক ও কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্টের মধ্যে মে মাসের বৈঠকের পর এমন সব গুজব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে যে রাশিয়ার মধ্য এশীয় মিত্র মস্কো-নিয়ন্ত্রিত ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন-ইইউ ছেড়ে চলে যেতে পারে। যদিও  নুর-সুলতান (আস্তানা) তা অস্বীকার করেছে। তবে কিছু সংকেত ক্রেমলিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সম্প্রতি কাজাখস্তানের পার্লামেন্টের (মজলিস) ১০৭ জন সদস্যের মধ্যে ৩৬ জন দেশটির সংবিধানে রুশ ভাষার মর্যাদা পরিবর্তনের ধারণাকে সমর্থন করেছেন। এটাও পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী কিরগিজস্তানে গাড়িতে ইংরেজি বর্ণ ‘জেড’ চিহ্নযুক্ত স্টিকার লাগানোর জন্য চালকদের জরিমানা করা হচ্ছে, যা ইউক্রেনে রুশ হামলার সমর্থনের একটি প্রতীক। তা ছাড়া কিরগিজস্তান কর্তৃপক্ষ ৯ মে বিজয় দিবস উদযাপনের সময় এই প্রতীকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, কিরগিজস্তান বা রাশিয়ার মধ্য এশীয় মিত্রদের কেউই ইউক্রেনে মস্কোর পদক্ষেপকে প্রকাশ্যে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেনি। তারা ক্রেমলিনের সামরিক অভিযানের নিন্দাও করেনি। গত ২ মার্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভোটে কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তান এই হামলার নিন্দা করা থেকে বিরত থাকে, যা তাদের সরকারিভাবে নিরপেক্ষতার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। আবার রাশিয়া সক্রিয়ভাবে আগ্রাসনের পক্ষে তার মিত্রদের নেওয়ার জন্য চাপ দিতে পারছে না। তাতে এটা ভাবা যেতে পারে, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো এই অঞ্চলে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করছে।

এই ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য গতকাল মস্কোয় অনুষ্ঠিত সিএসটিও শীর্ষ সম্মেলনকে নিশ্চয়ই কাজে লাগিয়েছেন রুশ নেতারা। কারণ গতকাল ছিল কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটির ৩০তম বার্ষিকী এবং কালেকটিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন-সিএসটিওর ২০তম বার্ষিকী।

এটা ঠিক যে ক্রেমলিন তার কৌশলে আমূল পরিবর্তন করতে চায় কি না এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও ইউক্রেনে তার কর্মকাণ্ডকে স্পষ্টভাবে সমর্থন করার জন্য সিএসটিও সদস্যদের ওপর চাপ দিতে চায় কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে রাশিয়া যদি তার পররাষ্ট্র, অভ্যন্তরীণ ও প্রতিরক্ষা নীতিতে উল্লেখযোগ্য ও দ্রুত পরিবর্তন না আনে, তাহলে রাশিয়া শুধু ইউক্রেনে একটি মারাত্মক পরাজয়ই নয়, বরং প্রতিবেশী মধ্য এশিয়ায় তার প্রভাব হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

লেখক : সার্বিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এবং প্রধানত রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।

সূত্র : এশিয়া টাইমস, সংক্ষেপিত ভাষান্তর



সাতদিনের সেরা