kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

ভিন্নমত

আগামী বাজেটে যেসব বিষয় দেখা উচিত

আবু আহমেদ

২৪ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আগামী বাজেটে যেসব বিষয় দেখা উচিত

আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন চলছে। প্রথমেই আমি বলব আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বাঁচতে শিখতে হবে। বাজেটে সামর্থ্যের মধ্যে চলার দিকনির্দেশনা থাকা বাঞ্ছনীয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তাই বলছে।

বিজ্ঞাপন

সামর্থ্যের বাইরে চলতে গিয়ে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপাল বিপদে পড়েছে। এই দেশগুলোর পরিণতি এক দিনে হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে, কয়েক বছরে হয়েছে, যা শুরুতে বুঝতে পারেনি তারা। আমাদের ভাবতে হবে ধীরে ধীরে আমরাও সেই পথে হাঁটছি কি না।

বাংলাদেশ বহু উৎস থেকে ঋণ নেয়। এই ঋণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে আছে। আমরা চাই না এই ঋণ একটা পর্যায়ে গিয়ে অসহনীয় হয়ে পড়ুক। আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে বিবেচ্য বিষয়গুলোর এটি অন্যতম। সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস এবং বৈদেশিক নানা উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। আমাদের বহিঃসূত্র থেকে ঋণ আগে কম ছিল। কিন্তু গত দুই-তিন বছরে এটা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে ভালো আছি, এভাবে চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। আমাদের বরং ভাবতে হবে কয়েক বছর আগে আমাদের বৈদেশিক ঋণ কোন অবস্থায় ছিল এবং এখন কেন এত বাড়ল। আগামী কয়েক বছরে এই ঋণগুলো সুদাসলে শোধ করতে গিয়ে বাজেটের কত শতাংশ ব্যয় করতে হবে—সেটাও ভাবতে হবে।

আমাদের ঘাটতি বাজেট দেওয়া হয়ে থাকে। সরকার বেশ কয়েক বছর বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ শতাংশের মধ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এটাই ঠিক ছিল। কিন্তু বিগত অর্থবছর ও চলতি বছরে এসে দেখা গেল, এটা ৫ শতাংশ অতিক্রম করে আরো ওপরে উঠছে। এই ঘাটতি বেড়ে যাওয়াকে এতটা সরলভাবে দেখা উচিত হবে না। আমাদের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ বা সাড়ে ৪ শতাংশের মধ্যে থাকাই ভালো ও বাঞ্ছনীয়। কারণ ঘাটতি বাজেটের খারাপ দিক হচ্ছে, এটা ঋণ গ্রহণের দিকে ধাবিত করে এবং একপর্যায়ে এটা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

যেকোনো সরকারের কর সংগ্রহ নির্ভর করে দেশের অর্থনীতি কতটা ওপরের দিকে ওঠে, অর্থনীতি কতটা প্রাগ্রসর থাকে এবং আর্থিক নীতিগুলো কতটা কাজ করে তার ওপর। সহজ হিসাব হচ্ছে, অর্থনীতি খুব ভালো করলে কর সংগ্রহ ভালো হবে এবং ঋণ পরিশোধেও সমস্যা হবে না। কিন্তু অর্থনীতি যদি ঝিমিয়ে পড়ে, তখন কর সংগ্রহও কমে যাবে এবং ঘাটতি বাজেট তখন সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। তখন বোঝা বহন করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

বহির্বিশ্বে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। শিল্পের কাঁচামালের দামও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের এখানে মূল্যস্ফীতি বাড়তেই পারে। এ অবস্থায় বাজেটে ঘাটতি বেশি হলে এবং সুচিন্তিত ভর্তুকির ব্যবস্থা করা না হলে আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি জোর পাবে। এ জন্য ভর্তুকির বিষয়টি লক্ষ্যনির্ভর করতে হবে এবং সেটা অবশ্যই গরিব লোকদের জন্য। এ মুহূর্তে ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যে রাখাই হবে আমাদের জন্য মঙ্গলজনক।

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর এখন বেশ চাপ পড়ছে। রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হচ্ছে এবং এই পার্থক্যটা দিন দিন বাড়ছে। তাই এখন যেসব দ্রব্য আমাদের আমদানি না করলে চলবে, সেগুলোর ওপর কিছু বিধি-নিষেধ দেওয়া দরকার। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছাড়া বাদবাকি পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন বাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে বিলাসদ্রব্য আমদানি নিরুৎসাহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাজেটের হাতিয়ার হচ্ছে কর। বাজেটে কর বৃদ্ধি করে ওই সব পণ্যের আমদানি সাময়িক সময়ের জন্য নিরুৎসাহ করা উচিত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেতন-ভাতা খাতে সরকারের ব্যয় খুব বাড়ছে। শুনতে পাচ্ছি সরকার নতুন বেতন স্কেলও দিতে পারে। আমার মনে হয় এই মুহূর্তে এটা ঠিক হবে না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না। সবাই এখন কৃচ্ছ্রসাধন করছে। বাংলাদেশকেও রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে তার বেল্ট টাইট করতে হবে।

আরেকটা বিষয় হলো রপ্তানি সম্ভাবনা আছে এমন পণ্য উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া। যেমন—কিছু ইলেকট্রনিকস পণ্যে চলতি বছরেও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে এবং তা আগামী বাজেটেও অব্যাহত রাখা দরকার।

সামগ্রিকভাবে করপোরেট আয়কর কমানো উচিত বলে আমি মনে করি। অনেক দেশই এর মধ্যে করপোরেট কর অনেক কমিয়ে ফেলেছে। আমাদের করপোরেট খাতকে প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য করপোরেট কর আরো কমানো উচিত। আর করের হার কমানো হলে মোট কর আদায় কম হবে—এই ধারণাটা সঠিক নয়। বরং করহার কমলে অনেক কম্পানি ও ব্যাবসায়িক সার্কেলের লোকজন কর দিতে উৎসাহী হবে।

শেয়ারবাজারকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য অন্যতম ভালো উপায় হলো তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে করপোরেট কর আরো কমানো। এটা চলতি বাজেটে ২২.৫ শতাংশ করা হয়েছে। এটাকে ন্যূনতম আড়াই শতাংশ কমিয়ে ২০ শতাংশে নিয়ে আসা যায় কি না গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। তাহলে হয়তো কিছু ভালো কম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহী হতে পারে। মনে রাখতে হবে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কম্পানিগুলো স্বচ্ছতা দেখাতে বাধ্য হয় বলে কর বেশি দেয়, তাই তাদের বাড়তি কর সুবিধা দেওয়া যৌক্তিক। তাই বাজেটে এমন সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত, যাতে বড় কম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে আনা যায়।

গরিব মানুষের জন্য সরকার এই মুহূর্তে যা করছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। এখানে দেওয়া ভর্তুকি সংকোচন করা যাবে না। এর বড় কারণ হচ্ছে, অনেক লোক কভিডের সময় এবং বর্তমানে মূল্যস্ফীতির কারণে গরিব হয়ে যাচ্ছে। এসব মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটে এই বিধান যুক্ত করা উচিত। একই কারণে সামাজিক নিরাপত্তা আওতা বাড়াতে পারলে ভালো হবে। না হলে যা আছে সেটা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।

যা-ই করা হোক, সব কিছুই আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে করতে হবে। আমাদের পরিশোধের সামর্থ্য বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বাইরের অনেক সংস্থাই এখন আমাদের ঋণ দিতে আগ্রহী। তাই ঋণ আনার ক্ষেত্রে আমাদের পার্থক্য করতে হবে যে আমরা কোন ঋণ নিচ্ছি, কোন শর্তে নিচ্ছি। চলতি মেগাপ্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ অব্যাহত রাখতেই হবে। নতুন কোনো কোনো মেগাপ্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে বিদ্যমান প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। একেকটা বড় প্রকল্প নিতে গিয়ে সরকারকে অনেক অর্থের সংস্থান করতে হয় এবং ঋণের জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে সুদের হারটি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। অনেক সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে, কারণ মূল্যস্ফীতি রোধ করার জন্য সুদের হার বাড়ানোর একটি যৌক্তিকতা আছে। আবার সুদের হার বাড়ালে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যেতে পারে, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

এই মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার হু হু করে বাড়তে দিলে আমাদের জন্য সমূহ ক্ষতি হবে। এটা আমাদের জন্য আত্মঘাতী হবে। তাই আমাদের মুদ্রার সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার যাতে আমাদের পক্ষে থাকে, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। দরকার হলে আমদানি আরো কাটছাঁট করতে হবে।  

সুতরাং এসব বিবেচনায় রেখে আয় অনুযায়ী ব্যয় করতে হবে। যখন আয় বাড়বে, ব্যয়ও বাড়বে। আয় যদি কম থাকে, ব্যয়ও কম করতে হবে। এই লাইনেই আমাদের হাঁটতে হবে। তাই আমি বলব, রাজস্ব খাতে বেতন-ভাতা আপাতত বৃদ্ধি না করে বরং ব্যয় কমানোর সব ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে আশাবাদও রাখা দরকার যে এই ব্যয় সংকোচন বেশি দিন করতে হবে না। সব কিছু ঠিকঠাকভাবে করতে পারলে আগামী অর্থবছরগুলোতে আমরা ভালো অবস্থানে থাকতে পারব।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক



সাতদিনের সেরা