kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ভিন্নমত

ভাবনার বিষয় বাণিজ্য ঘাটতি

আবু আহমেদ

১৪ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভাবনার বিষয় বাণিজ্য ঘাটতি

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে গেছে। আর টাকার মান ধরে রাখতে গত কয়েক মাস বাংলাদেশ ব্যাংক দুই বিলিয়নের বেশি ডলার বাজারে ছেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৫০ শতাংশের বেশি আমদানি বেড়েছে। মূলত আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণেই ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই চাহিদা বাড়লে ডলার বেশি দামে কিনতে হয়। বিষয়টি চাহিদা-সরবরাহ নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ডলারের সরবরাহ বেশি হলে টাকার মান বাড়বে, ডলারের সরবরাহ কমে গেলে টাকার মান কমবে। মূলকথা, যার চাহিদা যত বাড়বে, তার দামও তত বেশি। এই মুহূর্তে দেশে ডলারের চাহিদা বেশি। মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রতি ডলারের দাম এখন সরকারিভাবে (ব্যাংক রেট) ৮৬ টাকার বেশি। আর কার্ব মার্কেটে (অনানুষ্ঠানিক বাজার) ৯১-৯২ টাকা।

এই পরিস্থিতিতে একটা চিন্তার বিষয় হলো ডলারের সরকারি দাম ও কার্ব মার্কেটের দামের মধ্যে পার্থক্য বেড়ে যাওয়া। যে ব্যবধান সাধারণত দুই-আড়াই টাকার মধ্যে থাকতে দেখা গেছে, সেটা বেড়ে এখন চার-পাঁচ টাকা হয়ে গেছে। এই পার্থক্য বৃদ্ধির বড় সমস্যা হচ্ছে তাতে হুন্ডি (অবৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ) উৎসাহিত হবে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স বা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আসতে বিকল্প পথ হিসেবে হুন্ডির আশ্রয় নেবে। কারণ তাতে প্রবাসীরা রেট বেশি পাবেন। হুন্ডির মাধ্যমে আগেও দেশে অর্থ এসেছিল। এখন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে ডলারের দামের পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায় হুন্ডির ব্যাপ্তিটা বেড়ে যাবে। এর ফলে প্রবাসীদের আয় দেশে এলেও তা সরকারি হিসাবে আসবে না বা ডলার হিসাবে দেখানো যাবে না, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে যাবে না। অর্থাৎ অর্থটা দেশে এলেও ডলারটা থেকে যায় দেশের বাইরে, যেহেতু হুন্ডিতে স্থানীয়ভাবে টাকা দেওয়া হয়। ফলে ডলারটি আমাদের অর্থনীতিতে প্রবেশ করবে না। এটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।

প্রশ্ন হতে পারে বিকল্পটা কী? একটা বিকল্প হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রা তথা টাকাকে ফ্রি ফ্লোটে (চাহিদা-সরবরাহ নীতির ওপর) ছেড়ে দেওয়া। এর ফলে টাকার মান পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের ক্ষতির দিক আছে। কারণ ডলার কেনাবেচায় বাংলাদেশ ব্যাংক যদি হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলেই ডলারের দাম বেড়ে ৯১-৯২ হয়ে যেতে পারে। তখন আমদানি ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি করবে। দেশে এমনিতেই আমদানি বেশি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতিও বাড়ছে। এর ওপর টাকার মান কমতে থাকলে আমদানি ব্যয় আরো বেড়ে মূল্যস্ফীতি ঘটাবে। তখন উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। আরেকটি উপায় হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাজারে ডলার ছাড়া, যেটা এরই মধ্যে করেছে।

এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক শাঁখের করাতের মধ্যে পড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি যদি হস্তক্ষেপ করে, যা ডলার বাজারে ছেড়ে করছে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ক্ষয় হতে থাকবে। আবার যদি নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়, তাহলে টাকার মান দ্রুত পড়তে পারে, যার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে আমদানি ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়া। এই উভয় সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের আরেকটা পথ অবলম্বন করতে হবে। সেটা হচ্ছে আমদানি সীমিত করা। অর্থাৎ আমদানির ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ করে দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। যেমন—শুল্ক বাড়িয়ে বিলাসজাতীয় পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহ করা। দ্বিতীয় উপায় হলো অভ্যন্তরীণভাবে খরচ কমানো তথা সরকারের ব্যয় সংকোচন।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের দেখতে হবে, যদি মূলধনী যন্ত্রপাতি বেশি আসে, তাহলে উদ্বেগের কিছু নেই। বরং সেটাতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। কিন্তু ভোগ্য পণ্য ও বিলাসদ্রব্য যদি বেশি আসে তা অবশ্যই নিরুৎসাহ করা উচিত। এখন আমাদের চাল আমদানি হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে ডলারের দাম বাড়ছে। চাল আনা বন্ধ রাখা যাবে না। তেল আমদানিও বন্ধ রাখা যাবে না। তাই বিলাসদ্রব্য আমদানি নিরুৎসাহ করা উচিত। আরেকটা দিক হচ্ছে, রপ্তানি আয় বাড়ানো, যেটা বাংলাদেশ কয়েক মাস ধরেই ভালো করছে। বিশেষ করে আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের অর্ডার অনেক বাড়ছে। তাই বাংলাদেশ ততটা সমস্যার সম্মুখীন হবে না—এটা আশা করা যায়।

তবে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, এই সুযোগে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের মতো বিদেশি ঋণদাতারা আমাদের ঋণ দিতে চাইবে। কারণ বাংলাদেশের মতো দেশের যখনই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিম্নমুখী হয়, তখন রিজার্ভ ধরে রাখা নিয়ে চিন্তিত থাকে। এ সুযোগে দাতারা ঋণ দিতে চায়। সতর্কতার বিষয় হলো, এই ঋণগুলো নেওয়ার সময় আমাদের একটু চিন্তা-ভাবনা করা উচিত। কারণ যে যেটা সাধে, সেটা নেওয়া উচিত নয়। এভাবে ঋণ নিয়ে কিন্তু শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান বিপদে পড়েছে।

সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ সাধ্যের মধ্যে থেকে ব্যয় করতে হবে, সাধ্যের বাইরে গিয়ে নয়। নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করতে হবে, এতে যদি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের প্রশ্ন থাকে, তাহলে সেটা আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখনই ১০ বিলিয়ন বা এ ধরনের অঙ্কে কমে যাবে, তখন চারদিকে একটা অসন্তুষ্টি বা খারাপ সংকেত ছড়িয়ে পড়বে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভবত দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের টাকার মান যেমন ধরে রাখতে হবে, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ধরে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে বর্ধিত সংখ্যায় বিদেশে কর্মী প্রেরণ। তাই আমি মনে করি না বাংলাদেশ অন্য দেশের মতো স্থানীয় মুদ্রার মান হারাতে থাকবে। সেটা হলে আমাদের জন্য বেদনাদায়ক হবে।

সুতরাং যারা বলে যে টাকার অবমূল্যায়ন করা হোক বা ফ্রি ফ্লোটে দেওয়া হোক, আমি তাদের দলে নেই। আমি মনে করি, মাঝেমধ্যে দরকার অনুযায়ী রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহের নীতিটি সঠিক। এর পাশাপাশি অর্থনীতি পূর্ণ মাত্রায় সচল হওয়ার আগ পর্যন্ত আমদানি সীমিত ও সরকারি ব্যয় সীমিত করতে হবে।

আগামী ছয় মাস দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে যদি কভিডজনিত বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়, তা অর্থনীতিকে নিরুৎসাহ করবে। বাসের অর্ধেক আসন খালি রাখা, রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া যাবে না বা শর্ত সাপেক্ষে খাওয়ার নিয়ম—এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা অর্থনীতিকে আবার নিরুৎসাহ করবে। তাই এটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এরই মধ্যে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই আমাদের কোমরের বেল্ট আমাদেরই টাইট করতে হবে এবং আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চলতে হবে।

সারা পৃথিবীতে মূল্যস্ফীতি শুরু হয়ে গেছে। সেটা থেকে আমরা রক্ষা পাব না। তবে আমাদের মূল্যস্ফীতি যাতে অন্তত বৈশ্বিক গড়ের নিচে থাকে, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের মূল্যস্ফীতি বহুদিন ধরে একটা সীমার মধ্যে ছিল এবং মডারেট ছিল। সেটা যাতে থাকে। আগামীতে যে বাজেট আসছে তাতে বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

মোটকথা আমাদের মূল্যস্ফীতি ইস্যুটা দেখতে হবে, টাকার মানের ব্যাপারটা বিবেচনায় নিতে হবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নজর রাখতে হবে, আমরা কী ধরনের জিনিস আমদানি করছি সেগুলো যাচাই-বাছাই করা উচিত। রপ্তানি সহজ করতে আমাদের বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে অর্ডার করা পণ্য পৌঁছতে সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে পারি এবং বিদেশি ক্রেতারা আরো আগ্রহী হয়। সুতরাং আমাদের পদক্ষেপগুলো সুচিন্তিত হতে হবে, যাতে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়। আজ কেন তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা