kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সেলাই করা খোলা মুখ

‘মাহমুদ আলি কেয়ার নট’

মোফাজ্জল করিম

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



‘মাহমুদ আলি কেয়ার নট’

সিলেটে একসময় একটা কথা খুব চাউর ছিল : মাহমুদ আলি কেয়ার নট। অর্থাৎ মাহমুদ আলি কাউকে পরোয়া করে না। যতটুকু জানি, কথাটা সেই ব্রিটিশ আমলের, উনিশ শ সাতচল্লিশ ইংরেজির দেশভাগের আগের কালের কথা। কোনো ডাকাবুকো গোঁয়ার-গোবিন্দকে উদ্দেশ্য করেই বলা হতো কথাটা। এমনি এক লোক নাকি ছিল আধা পাগলা মাহমুদ আলি। সে যাকে তাকে যা খুশি বলে দিত মুখের ওপর, কোনো ভয়-ডর ছিল না তার। কেউ তাকে ভয়-ভীতি দেখালে বুকের ছাতিতে থাপড়া মেরে বলত : মাহমুদ আলি কেয়ার নট। মাহমুদ আলিকে আমি দেখিনি বা আমার চেনা-জানা কেউ দেখেছে বলেও শুনিনি। হয়তো আদতেই মাহমুদ আলি বলে কেউ ছিল না, পুরো ব্যাপারটাই মানুষের মুখে মুখে বানানো একটা মুখরোচক গল্প। সিলেট অঞ্চলের এমনি অনেক কাহিনী, অনেক প্রবচন ইদানীংকালে আর শোনা যায় না। মাহমুদ আলির সঙ্গে সঙ্গে ‘মাহমুদ আলি কেয়ার নট’ কথাটাও হারিয়ে গেছে। আমাদের শৈশব যেমন হারিয়ে গেছে সেই কবে, তেমনি হারিয়ে গেছে অনেক মজার মজার কথা, মজার মজার ঘটনা ও মানুষ। উনিশ শ পঞ্চাশের দশকে এমনি কয়েকটি মজার কথা ছিল ‘আমছইল’, ‘বগোডুল’ ইত্যাদি। লোকের মুখে মুখে ফিরত এই সব শব্দ। এখন আর শোনা যায় না।

তবে সম্প্রতি আমি এক মাহমুদ আলির সন্ধান পেয়েছি। তাঁকে আপনারাও চেনেন। দারুণ সাহসী লোক তিনি। কাউকে কেয়ার করেন না। দুনিয়ার লোকে যদি বলে, এখন রাত বারোটা, বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, তিনি বলবেন, কে বলে অন্ধকার। এখন দুপুর বারোটা, বাইরে ঝকঝকে আলোর বন্যা। ভদ্রলোক আমাদের দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি। তাঁর হাতে আমাদের দেশে গণতন্ত্র নামক সর্বরোগের মহৌষধি সঞ্জীবনী বৃক্ষটির বীজ বপনের দায়িত্ব অর্পিত। হ্যাঁ, এতক্ষণে আপনারা তাঁকে চিনতে পেরেছেন। তিনি আমাদের মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সারা দেশের মানুষ একাট্টা হয়েও যদি বলে, কোনো একটা নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, মারদাঙ্গা, খুনোখুনি, ভোট ডাকাতি হয়েছে, অতএব এমন নির্বাচন বাতিল করা হোক, তবু তিনি মাশাল্লাহ বুক চিতিয়ে বলবেন, কে বলেছে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ক্লাসরুমে দু-চারটা ছেলে পটকা ফোটালে, ছুরি মারামারি করলেই কি ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়ে গেল নাকি? যারা গণ্ডগোল করছে তারা যত খুশি গণ্ডগোল করুক, মাগার পাঠদান বন্ধ করা যাবে না। কয়েকটি দুষ্টু বালকের অপকর্মের জন্য ক্লাসের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হচ্ছে যারা বলে তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে স্কুল প্রশাসন ও কমিটির বিরুদ্ধে। আমি হেডমাস্টার, আমি কিছুতেই এই অপপ্রচারে কান দেব না। এমনকি আমার কোনো বক্রস্কন্ধ অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টার বললেও না। বাইরে কী সুন্দর রোদ ঝলমল দিন, আর বিশ্বনিন্দুকেরা বলে কিনা ঝড়-ঝঞ্ঝা, ঘোর তমসাচ্ছন্ন রাত। প্রিয় শিক্ষকবৃন্দ, আপনারা পাঠদান চালিয়ে যান, শ্রদ্ধেয় অভিভাবকগণ, আপনারা অপপ্রচারে কান দেবেন না, আপনাদের কোমলমতি সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে থাকুন।

২.

গত কিছুদিন যাবৎ দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চলছে। স্থানীয় সরকার মানে পাবলিকের নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার। যেমন—পল্লী অঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদ। এগুলোতে নির্বাচিত ব্যক্তিরা সবাই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দা। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও যে নেই তা নয়। কেউ হয়তো প্রবাসে বা দেশে কোনো শহরে বসবাস করছেন স্থায়ীভাবে যুগ যুগ ধরে। এদিকে নিজ এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম উঠিয়ে রেখেছেন এবং ভোটের সময় দেশে এসে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনেও দাঁড়িয়েছেন। এঁরা সাধারণত অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ব্যক্তি এবং এঁদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার চেয়ে বিত্তের জোরটাই বেশি।

গ্রামীণ মানুষের দৈনন্দিন সকল চাহিদা, সব সমস্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ইউনিয়ন পরিষদ—আরো সরাসরি বললে এর চেয়ারম্যান-মেম্বারগণ। ফলে দেখা যায়, স্থানীয় জনসাধারণ অবশ্যম্ভাবীরূপে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তুমুলভাবে আগ্রহী। এই আগ্রহের আরেকটি প্রধান কারণ হলো চেয়ারম্যান-মেম্বার পদপ্রার্থী সবাই কারো না কারো আত্মীয়। ফলে রাজনীতিতে আগ্রহী না হলেও আত্মীয়কে জেতাবার লক্ষ্যে গ্রামবাসী প্রায় সবাই নির্বাচনের কর্মকাণ্ডে জান সঁপে দিয়ে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উত্তাপ-উত্তেজনা তাই জাতীয় নির্বাচন থেকে কোনো অংশে কম নয়। আর রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু নিজেদের প্রার্থীদের দলীয় প্রতীক বরাদ্দ করে নির্বাচনে দাঁড় করায়, সে জন্য উত্তেজনা আরো বেশি বৃদ্ধি পায়। তবে এবার প্রধান বিরোধী দল বিএনপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ না করায় সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলতে গেলে একাই মাঠ গরম করে রেখেছে, পেয়ে গেছে খানিকটা হলেও ওয়াকওভার।

এই প্রেক্ষাপটেই এরই মধ্যে তিন ধাপে কয়েক হাজার পরিষদের নির্বাচন হয়ে গছে। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপের নির্বাচন হলো গত ২৮ নভেম্বর। এতে প্রধান বলা যায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিএনপি স্বনামে মঞ্চে আবির্ভূত না হলেও কোথাও ‘স্বতন্ত্র’-এর ছদ্মাবরণে, আবার কোথাও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর নেপথ্য মদদদাতা হিসেবে মাঠে ঠিকই ছিল। ২৮ তারিখের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘ওয়াকওভার’ বড় একটা পায়নি। বরং তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের পাকা ধানে অনেক জায়গায়ই মই দিয়েছে। লোকে বলে, নির্বাচনের আগে আওয়ামী শিবিরে নাকি এবার ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ জমজমাট ছিল। এবং আওয়ামী লীগকে অনেক আসনে এটাই নাকি ডুবিয়েছে। আমাদের এলাকায় (১৭ নম্বর ভাটেরা ইউনিয়ন, উপজেলা কুলাউড়া, জেলা মৌলভীবাজার) গত পাঁচ বছর ধরে যে চেয়ারম্যান জনসাধারণের পূর্ণ আস্থা নিয়ে সত্ভাবে যথেষ্ট সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছিলেন তিনি আওয়ামী লীগের একজন সুপরিচিত নেতা ও একনিষ্ঠ কর্মী। সবার ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ এবারও তাঁকে মনোনয়ন দেবে। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে তাঁকে বাদ দিয়ে একজন প্রবাসী প্রার্থীকে ‘নৌকার মাঝি’ বানানো হয়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। জনগণের চাপে বর্তমান চেয়ারম্যান ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে অনায়াসে জয়লাভ করেছেন। আওয়ামী লীগের এ ধরনের বিপর্যয় আরো অনেক আসনেই হয়েছে। আর পর্দার আড়ালে থেকে ‘সোওয়া হুয়া রুস্তম’ বিএনপিও যথেষ্ট ইন্ধন জুগিয়েছে। এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভোটের রাজনীতিতে সবাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে এ তো জানা কথা। তবে সুখের বিষয়, আমাদের এলাকায় ভোট নিয়ে কোনো বড় রকমের ঝগড়া-বিবাদ বা হাঙ্গামা-মারামারি হয়নি। শোনা যায়, এক পক্ষ ভোটের রেজাল্ট ওলট-পালট করার চেষ্টা করেও প্রতিপক্ষের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ও তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে সফল হয়নি। ভালো।

নির্বাচনে হৈচৈ-হুলুস্থুল, উত্তাপ-উত্তেজনা হবে এ তো জানা কথা। এটা কমবেশি সব দেশেই হয়। তাই বলে খুনোখুনি! তাও আবার জাতীয় নির্বাচনে নয়, স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে। আর একটি-দুটি ঘটনা ঘটলে একটা কথা ছিল। এবার সেই প্রথম ধাপের নির্বাচন থেকে শুরু করে সদ্য শেষ হওয়া তৃতীয় ধাপ পর্যন্ত দাঙ্গা-হাঙ্গামা, গোলাগুলি, খুন-জখম সমানে চলেছে। সেদিন একজন বিজিবি সদস্যও নিহত হয়েছেন দায়িত্ব পালনকালে। এটা কিসের আলামত? সামনে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসছে এটা কি তার ড্রেস রিহার্সেল? কিন্তু এর পরও আমাদের সর্বংসহ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র পরম ধৈর্যশীল(!) সচিব মহোদয় বাণী দিলেন, এগুলো নাকি বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং এবারের নির্বাচন একটি সহিংসতাহীন মডেল নির্বাচন হয়েছে। তিনি তো বলেই খালাস। তাঁর সম্বন্ধে লোকগীতির ভাষায় বলা যেতে পারে : হায়রে কপাল মন্দ/চোখ থাকিতে অন্ধ। কিন্তু আমি বা আমার মতো ক্ষীণপ্রাণ নাগরিকদের চিন্তা ভবিষ্যতের বড় পরীক্ষাটি নিয়ে। এখন যারা কচু কেটে হাত পাকাবার সুযোগ পেল তারা জাতীয় নির্বাচনের সময় না জানি কী করে। রক্তপাত, খুন-জখম ছাড়াও কেন্দ্র দখল, জাল ভোট, ব্যালট পেপার ছিনতাই ইত্যাদি অনেক ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা কি এই প্রথম? নির্বাচনে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, ব্যালট পেপার ছিনতাই ইত্যাদি অপকর্ম ব্যাপক আকারে সংঘটিত হলেও নির্বাচন কমিশন ‘ভদ্রলোকের এক কথা’ নীতিই অনুসরণ করে চলেছে। তারা এখন যেমন, নিকট-অতীতেও তেমনি বলে আসছে নির্বাচন সুন্দর-সুষ্ঠু হয়েছে। তাতে দেশবাসীর কাছে তারা নিজেদের কীভাবে উপস্থাপন করেছে, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় গিয়ে নেমেছে, তা কি তারা একবারও ভেবে দেখেছে? নাকি সেই ‘পিঠে বেঁধেছি কুলো, কানে দিয়েছি তুলো’ প্রবচনটির যথার্থতা প্রমাণ করাটাই তারা মোক্ষ বলে ধরে নিয়েছে? কারো কারো মধ্যে কথায় কথায় আজিজ মার্কা, সাদিক মার্কা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বর্তমান কমিশনের তুলনা করে আত্মপ্রসাদ লাভ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কেন বাপু, আবু হেনা, আবু সাইদ, শামসুল হুদাদের কথা কি মানুষ ভুলে গেছে? তাঁদের সুকৃতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন না? বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের মেয়াদ-সায়াহ্নে এসে শেষবেলায় অন্তত ভালো কিছু করে দেখাবে এমনটা লোকে ধারণা করেছিল। বিশেষ করে চলমান ইউপি নির্বাচনের পূর্বাহ্নে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়ের দৃঢ় প্রত্যয়দীপ্ত কিছু কিছু বক্তব্য শুনে তাই মনে হয়েছিল। লোকে ভেবেছিল, নিভে যাওয়ার আগে বোধ হয় বাতি দপ করে জ্বলে উঠবে। তৃতীয় ধাপের ভোট দেখে পাবলিক আবারও দিলে বড় চোট পেল।

৩.

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন, জাতীয় সংসদের শূন্য আসনে উপনির্বাচন ইত্যাদি থেকে নির্বাচন কমিশন তাঁদের ভুলভ্রান্তি সম্বন্ধে হাতে-কলমে অনেক কিছু শিখতে পারে। অবশ্য যদি শিখতে চায়। কিন্তু অ্যাটিচ্যুড যদি হয় মাহমুদ আলি কেয়ার নট মার্কা, তাহলে কোনো কিছু আশা করে লাভ নেই। অবশ্য এরা এখন তল্পিতল্পা গোছাতে ব্যস্ত, এদের কাছ থেকে আশা করার কিছু নেই। এরপর যাঁরা আসবেন আল্লাহ মালুম তাঁরা জাতির জন্য কী নিয়ে আসবেন। তাঁরাও যদি ‘মহাজ্ঞানী মহাজন’ বর্তমান কমিশন ‘যে পথে করেছেন গমন, সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্তিধ্বজা ধরে’ এগিয়ে যান, তাহলে সন্দেহ নেই জাতির কপালে সীমাহীন দুঃখ আছে। তখন সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। প্রার্থনা একটাই : ‘মাবুদ, এত পরিশ্রমী কৃষক, গুণী লক্ষ্মী গার্মেন্টকর্মী, কষ্টসহিষ্ণু প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক, এদের রক্ত পানি করা আজকের উন্নয়নশীল বাংলাদেশকে কতিপয় স্বার্থান্বেষী কুচক্রী, দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করো, প্রভু। তুমি ছাড়া গতি নাই।’

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]



সাতদিনের সেরা