kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভিন্নমত

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ

আবু আহমেদ

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ

আমাদের শেয়ারবাজারে কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলেও রেগুলেটর তথা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উপেক্ষা করেছে। শুধু কমিশন নয়, অনেক সময় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ এড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। অথচ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা ছাড়া টেকসই পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর ফেরানো দরকার এবং এগুলো নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

এক. ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারির পর বেশ কিছু সংস্কার করা হয়েছিল। ওই সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং এর অর্থমন্ত্রী ছিলেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। ওই কেলেঙ্কারির ঘটনায় হাজার হাজার লোক নিঃস্ব হয়ে যাওয়ায় তিনি খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি তদন্ত কমিটি করেছিলেন। কেলেঙ্কারির হোতাদের চিহ্নিত করে মামলাও করা হয়েছিল। বাজারে আস্থা ফেরানোর জন্য তিনি অনেক কিছু করেছিলেন। অন্যতম পদক্ষেপ ছিল, তিনি এক লাখ টাকা পর্যন্ত ডিভিডেন্ড আয়করমুক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ ডিভিডেন্ড থেকে যে বার্ষিক আয় হয় ব্যক্তি পর্যায়ের রিটেইল বিনিয়োগকারীদের, সেটি এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয়করমুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এটি কমাতে কমাতে ২৫ হাজারে নিয়ে আসা হয়েছিল। এখন সেটি ৫০ হাজার টাকা। এভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতি যে অবিচার করা হলো, সেটি পরবর্তী সময়ের অর্থমন্ত্রীরা খেয়াল করেননি।

দুই. অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া সাহেব তাঁর সময় আরেকটি কাজ করেছিলেন, যা তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। শেয়ারবাজারের প্রাণ হচ্ছে ‘আর্নিং পার শেয়ার’ ও ‘ডিভিডেন্ড পে-আউট’। এটি বাজারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলো যাতে বেশি ডিভিডেন্ড দেয়, সে জন্য যারা ২৫ শতাংশের বেশি ডিভিডেন্ড দেবে, কিবরিয়া সাহেব তাদের কর ছাড় দেন। এমনকি যারা ৩০ শতাংশের বেশি ডিভিডেন্ড দেবে, তাদের আরো বেশি হারে কর ছাড় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই প্রণোদনাও তুলে নেওয়া হয়।

তিন. গ্রামীণফোন ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে বা অক্টোবরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ওই সময় তালিকাভুক্ত অন্যান্য কম্পানির মতো গ্রামীণফোনও ১০ শতাংশ কম করপোরেট আয়কর সুবিধা পায়। আমার স্মরণ মতে, মোবাইল কম্পানিটি দুই থেকে তিন বছর এই সুবিধা ভোগ করে। এতে স্থানীয় শেয়ারহোল্ডাররা উপকৃত হয়। কিন্তু তিন বছর পর সেই ১০ শতাংশকে মডিফাই করে সেটিকে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে আপনি একটি ইনসেনটিভ দিলেন, সেটি দেখে সবাই শেয়ার কিনল, এরপর আপনি সেটি প্রত্যাহার করলেন—এটি কি ঠিক হলো? ঘন ঘন নীতি বদলানো কিন্তু খারাপ বার্তা দেয়। ধারণা করা হয়, গ্রামীণফোন বিদেশি বিনিয়োগকারী কম্পানি বলে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেনি। কিন্তু আমরা যারা স্থানীয় শেয়ারহোল্ডার, তারা তো সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কারণ করপোরেট আয়কর সুবিধার ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা বিশাল ব্যাপার। তালিকাভুক্ত হওয়ায় একসময় সিগারেট কম্পানি (এখানে ধূমপানের পক্ষ-বিপক্ষ ইস্যু কাম্য নয়) ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকাও হ্রাসকৃত হারে করপোরেট আয়কর সুবিধা ভোগ করত। এখন সেটিও নেই। এখন সিগারেট কম্পানিটি সর্বোচ্চ করপোরেট আয়কর ৪৫ শতাংশ দিচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামীণফোনকে ৪০ শতাংশ হারে এবং ব্যাংকিং ও বীমা কম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত হলে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং তালিকাভুক্ত না হলে ৪০ শতাংশ করপোরেট আয়কর দিতে হয়। শুধু কিছু ক্ষুদ্র কম্পানি এখন সাড়ে ২২ শতাংশ হারে করপোরেট কর সুবিধা পাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা।

চার. তালিকাভুক্ত কম্পানি ও তালিকাবহির্ভূত কম্পানির করপোরেট করছাড়ের পার্থক্য কমিয়ে আনা আরেকটি ভুল পদক্ষেপ। আমরা সব সময় বলে আসছি ভালো কম্পানি লিস্টিংয়ে না এলে শেয়ারবাজার ভালো হবে না। এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটি সবারই বোঝার কথা। তখন পার্থক্যটা ১০ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ লিস্টেড হলে করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ১০ শতাংশ কম দেওয়া যাবে এবং সেটি ছিল বেশ কয়েক বছর। কিন্তু দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রী হঠাৎ করে আড়াই শতাংশ কমিয়ে দিলেন নন-লিস্টেড কম্পানিকে। এতে পার্থক্যটা দাঁড়াল সাড়ে ৭ শতাংশে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের কাছে আমার প্রশ্ন, ১০ শতাংশ কর ছাড় দিয়েও যেখানে আপনি ভালো কম্পানিকে লিস্টিংয়ে আনতে পারেননি, এখন সাড়ে ৭ শতাংশে কি কেউ আসবে? আসছে না তো! গত দু-তিন বছরে কয়টি ভালো কম্পানি লিস্টিংয়ে এসেছে, সেদিকে নজর দিলেই বোঝা যাবে। কারণ একটি কম্পানিকে শেয়ারবাজারে এলে অনেক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাকে কোয়ার্টারলি রিপোর্ট করতে হয়, অনেক কাগজপত্র তৈরি করতে হয়, নোটিশ দিতে হয়, অতিরিক্ত অর্থ খরচসহ অনেক কিছু করতে হয়। এখন সাড়ে ৭ শতাংশ করপোরেট কর সুবিধা ভোগের জন্য তারা কি এই সব ঝামেলা নিতে চাইবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চায় ভালো কম্পানি, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করা যায়। কিন্তু সেই স্বার্থটা রক্ষা করা হচ্ছে?

পাঁচ. তিতাস গ্যাস শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত একটি সরকারি কম্পানি। এর বেশির ভাগ শেয়ার সরকারের। কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কাউকে না জানিয়ে তিতাসের হুইলিং চার্জ কমিয়ে দেয়, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিনিয়োগকারীরা। প্রশ্ন হচ্ছে, রেগুলেট হিসেবে কি তারা সাধারণ মানুষ তথা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থটা দেখবে না?

ছয়. সাম্প্রতিক সময়ের একটি উদাহরণ দিচ্ছি। দু-তিন বছর আগের কথা। বাংলাদেশ টেলিফোন রেগুলেটরি কম্পানির (বিটিআরসি) মতে, গ্রামীণফোনের কাছে সরকার ১২ হাজার কোটি টাকা পাবে। কথা হচ্ছে, গ্রামীণফোন যখন পাবলিক ইস্যুতে আসেনি, এটি তারও আগের ইস্যু, ১৯৯৭ সাল থেকে। তারা পাবলিক ইস্যুতে আসে ২০০৯ সালে। এত বড় পেন্ডিং বিষয় থেকে গেল; কিন্তু সেটি শেয়ারহোল্ডারদের আগে অবহিত করা হয়নি। তারপর এটি নিয়ে দাবি-পাল্টাদাবির পর সাধারণ বিনিয়োগকারী হিসেবে আমরা আওয়াজ তুললাম, লেখালেখির মাধ্যমে বললাম যে আদালতে নয়, সালিসের মাধ্যমে এর ফায়সালা হওয়া উচিত। কিন্তু কথাটি তখন কেউ শুনল না। শেষ পর্যন্ত এটি আপিল বিভাগ পর্যন্ত গেল। অথচ এর ফায়সালা হলে বিনিয়োগকারীরা অনেক রিলিফ পেত।

সাত. এই উদাহরণটি বর্তমান কমিশনের ঠিক আগের কমিশনের। দেশে শেয়ারবাজার চালু হওয়ার পর থেকে চলে আসা নিয়ম হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে যা আয় হবে, এর ৭৫ শতাংশ ক্যাশ পে-আউট করতে হবে। অর্থাৎ মিউচুয়াল ফান্ডে যদি এক ইউনিটে একটি টাকা আয় হয়, সেখানে ৭৫ পয়সা দিয়ে দিতে হবে ইউনিট হোল্ডারদের। কিন্তু সেটি হঠাৎ করে বদল করে দিল খায়রুল হোসেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। মার্চেন্ট ব্যাংকার বা মিউচুয়াল ফান্ড ম্যানেজাররা ধরাধরি করলেন যে তাঁরা ক্যাশ দিতে পারবেন না। তাঁরা বললেন, তাঁরা ইউনিট হোল্ডারদের রিপিট ইউনিট বা বোনাস দেবেন, যেটিকে আরআইইউ বলে। এখন এটি দিতে গিয়ে ইউনিট হোল্ডাররা ক্যাশ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো। শেষ পর্যন্ত মিউচুয়াল ফান্ডের যেটির ১০ টাকা পার ভ্যালু ছিল, তা চার-পাঁচ টাকায় বিক্রি হলো। কারণ ফান্ড ম্যানেজাররা যে বোনাস ইউনিট দিচ্ছেন, সেটি বাজারে বিক্রি করা যায় না, গেলেও খুব কম মূল্যে। আমাদের শেয়ারবাজার আকার-আকৃতিতে আগের চেয়ে অনেক বড় হলেও এর বড় বদনাম হচ্ছে এই ইস্যুতে। ফান্ড ম্যানেজারদের বোনাস ইউনিট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। তাঁদের হাতে ক্যাশ থেকে গেল। তাঁদের ফান্ড আকারে বড় হলো, তাঁরা বেশি কমিশনও পেলেন; কিন্তু ঠকল কারা? সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

আট. গত কমিশন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আইপিও কোটা কমিয়ে দিয়েছে। এর ৮০ শতাংশ পেত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এটি কমাতে কমাতে ৬০ শতাংশে নিয়ে আসা হয়। এই ২০ শতাংশ দেওয়া হলো তাঁদের, যাঁরা এই মার্কেট ম্যানিপুলেট করেন, যাঁদের ক্ষমতা বেশি এবং যাঁরা অর্থ-বিত্তের মালিক—মার্চেন্ট ব্যাংকার ও ব্রোকারদের। ব্রোকাররা কেন কোটা পাবেন, প্রশ্নের জবাবটা কেউ দেবেন? কেন তাঁরা এক্সট্রা প্রিভিলেজ পাবেন? এটিও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। বর্তমান কমিশন অবশ্য এই বিষয়টি অনেকটা শুদ্ধ করেছে, কিন্তু সম্পূর্ণটা করেনি।

নয়. পদক্ষেপটি খুবই সাম্প্রতিক, ১৫ থেকে ২০ দিন আগের। ওয়ালটন, বার্জার ও আইসিবি—এই তিনটি কম্পানিকে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, তাদের ১০ শতাংশ ফ্লোটিং শেয়ার ছাড়তে হবে। তাদের মধ্যে বার্জারের আছে ৫ শতাংশ, ওয়ালটনের আছে ১ শতাংশ, আইসিবির আছে ৪ শতাংশের মতো। তাদের বলা হলো, তাদের ফ্লোটিং শেয়ার ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। মানে আরো ৫ শতাংশ বার্জারকে, আরো ৯ শতাংশ ওয়ালটনকে এবং প্রায় ৫ শতাংশ আইসিবিকে ছাড়তে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, বার্জার এসেছে ২০০৫ সালে, যখন ১০ শতাংশের বাধ্যবাধকতা ছিল না। তাহলে তাদের ক্ষেত্রে কিভাবে এই আদেশের ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা (রেট্রোস্পেকটিভ অ্যাফেক্ট) সম্ভব? এর চেয়ে বড় কথা, ফ্লোটিং শেয়ার বাড়ানোর সুযোগে উদ্যোক্তারা তাঁদের শেয়ার বিক্রির সুবিধা পাবেন। এর ফলে কম্পানি তিনটির যথাক্রমে ৫, ৯ ও ৬ শতাংশ শেয়ার বিক্রির টাকা উদ্যোক্তা তথা ব্যক্তির পকেটে চলে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এসইসি তাদের এক বছর সময় দিয়েছে। এতে কয়েক হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে বের হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে এমন বহু উদাহরণ আছে। এসব পদক্ষেপ কখনো পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি নিজে নিয়েছে, কখনো অন্যান্য রেগুলেটর নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিএসইসির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিটিআরসি, বিইআরসি, আইডিআরএর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতাও দেখা গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : আফছার আহমেদ



সাতদিনের সেরা