kalerkantho

বুধবার । ৮ বৈশাখ ১৪২৮। ২১ এপ্রিল ২০২১। ৮ রমজান ১৪৪২

এই সব নৃশংসতা কেন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

৫ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এই সব নৃশংসতা কেন

মানুষের আচরণে নৃশংসতা যেন আজ চরম আকার ধারণ করেছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম কিংবা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। মানুষ যেন আজ পশুতে রূপান্তরিত হতে চলছে। মানব আচরণ আর পশুর আচরণ কোনোভাবেই এক হওয়ার কথা নয় বিধায় মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা। মানুষের মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-চেতনা ও সৃজনশীলতা। মানুষ সৃষ্টিশীল সৃষ্টির অন্বেষণে নিজের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগায়, বিকশিত করে এবং এর মাধ্যমেই মানুষ বেঁচে থাকে। আমরা কাজের মধ্যে বেঁচে থাকি এবং অন্যকে বাঁচিয়ে রাখি। এর মাধ্যমে আমরা যাবতীয় প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করি। কিন্তু সেই মানুষ যখন সৃষ্টিশীলতাকে প্রাধান্য না দিয়ে সৃষ্টির কারিগরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে, তখন তাকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা অবান্তর নয়।

অনেকের কাছে আজ বড় প্রশ্ন, কেন আমরা এতটা হিংস্র হয়ে উঠেছি। কেন আমরা এমনকি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও কাউকে হত্যা করছি। আমাদের হাত কি একটুও কাঁপছে না। বরং সাহসের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পর উল্লাস প্রকাশ করছি। ঢাকার দক্ষিণখানে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পুলিশের সামনে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয় এবং হত্যার দৃশ্য ফেসবুক আইডি থেকে লাইভ করা হয়। সাধারণত অপরাধ করার পর অপরাধীর মধ্যে অনুশোচনা কাজ করে এবং নিজেকে গ্রেপ্তার থেকে আড়াল করতে চায়। কিন্তু এখানে দেখা যায় বিপরীত চিত্র। অপরাধ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা আজ বদলে যাচ্ছে। এমন ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা কতটা নৃশংস ও হিংস্র। আমাদের অপরাধ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা যেন কাউকে ভয় করছি না। ভয় করছি না অন্যায় করলে পরকালের শাস্তিকে, তেমনি রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনের প্রতি নেই কোনো ভয়। এমন ঘটনা অতীতেও ঘটেছে কিন্তু নৃশংসতার মাত্রা আজ চরম আকার ধারণ করছে। আমরা কোনোভাবেই এর লাগাম টেনে ধরতে পারছি না। আমাদের আর্থ-মনো-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা কোনোভাবেই আমাদের রেহাই দিচ্ছে না। বিকৃত মানসিকতা, সাহস, ভয় না করার মানসিকতা, কাউকে তোয়াক্কা না করার মনোভাব আমাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে আজ বড় ফারাক এবং একটি জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয় হিসেবে আমরা যেন কুলিয়ে উঠতে পারছি না। কঠোর আইন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল বাড়ানো এবং প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও আমরা কাজ করছি। কিন্তু সামগ্রিক ফলাফল ভালো নয়। যদি তা-ই না হতো, তাহলে সহিংসতা এতটা হিংস্র পর্যায়ে যেত না।

মানুষ তখনই স্বাভাবিক আচরণ করবে, যখন সে স্বাভাবিক আচরণ করার মতো উপযোগী পরিবেশে বড় হবে। এর মধ্যে ছেদ ধরলে অস্বাভাবিক মনোভাব সম্ভবপর হয়ে ওঠে। সমাজে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন এবং অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্ত থাকার জন্য শিখনের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের বীজ তৈরি ও বিকশিত হওয়া দরকার। নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করতে পারে। ব্যক্তির চরিত্র গঠনে নৈতিক মূল্যবোধ বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নৈতিক মূল্যবোধগুলো এমনভাবে শিখতে হয় যেন বাইরের প্রতিবেশ, পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিক ও তাত্ক্ষণিক অনুকূল পরিবেশও তাকে ঘায়েল করতে না পারে। শক্ত ও মজবুত মূল্যবোধ ব্যবস্থা আমাদের পারে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। সবার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি প্রথমে মনে রাখতে হবে। ব্যক্তির মূল্য ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে হবে। থাকতে হবে সততা, সত্যবাদিতা, সাহায্য মনোভাব, ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, দয়ালু মনোভাব, মহানুভবতার মতো নৈতিক মূল্যবোধ ও গুণাবলি। প্রথমে বিশ্বাস, পরে ধারণ ও লালন এবং ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে সম্ভব একমাত্র ভালো মানুষ হওয়া এবং অপরাধ জগৎ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। কিন্তু আমরা নৈতিক মূল্যবোধগুলো ভালোভাবে শিখতে ও শেখাতে পারছি না। ভোগবাদিতা আজকে আমাদের সততায় আঘাত হানছে। বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বয়োজ্যেষ্ঠ ও মুরব্বিদের যথাযথ সম্মান প্রদানে বাধা হয়ে কাজ করছে। আমরা ছুটছি সামনে যাওয়ার জন্য কিন্তু ভুলে যাচ্ছি প্রক্রিয়া ও নৈতিকতার কথা। যে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ও বলয়ের তৈরি হয়েছে, সেখানে হাত দিতে যাওয়াই যেন সমস্যা। সমাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ সনাতন ব্যক্তিবর্গ ও সংগঠনের পরিবর্তে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আজ অলিখিত ও অস্বীকৃত ব্যক্তিবর্গ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যারা আইনানুগ স্বীকৃত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে চলছেন, যেমন জনপ্রতিনিধি, তাঁদের কাছ থেকে আমরা ভরসা পাচ্ছি না।

নৃশংস আচরণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য প্রতিশোধ, নিবারণ, প্রতিরোধ ও সংশোধনমূলক সমাধান ব্যবস্থার কথা আমরা ভাবি। আমরা ঢেলে সাজাই আমাদের অপরাধ বিচারপ্রক্রিয়াকে। ক্রমাগত অপরাধ ধরনের পরিবর্তনকে মাথায় নিয়ে এবং নৃশংসতাকে বিবেচনায় এনে নীতি ও পরিকল্পনার মধ্যেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। কিন্তু সাফল্য আমাদের অনেক কম। আমরা যে সমাজব্যবস্থায় বসবাস করছি সেখানে হতাশার সুরই বাজছে। আজকে অপরাধ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সাক্ষী পাওয়া যায় না। সাক্ষী সুরক্ষা আমাদের ভালো নয়। আইনের ফাঁকফোকর কিংবা অন্য কোনো কারণে আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় অপরাধীদের আনতে পারছি না। তাদের এমনভাবে শাস্তি দেওয়া উচিত, যাতে অন্যদের কাছে তা দৃষ্টান্ত হয়ে দেখা দেয় এবং নিজেদের অপরাধ জগৎ থেকে দূরে রাখে। অপরাধ করলে শাস্তি অবধারিত, এটা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। সমাজে ঘটে যাওয়া নৃশংস আচরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের সমাজ খারাপের দিকে যাচ্ছে। নীতিহীনতা আমাদের চরমভাবে পেয়ে বসেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে আমরা চরম অরাজক পরিস্থিতিতে পড়তে পারি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের উচিত নতুন করে ভাবা। অপরাধ, অপরাধের শাস্তি, শাস্তির ধরন নিয়েও ভাবতে হবে। অপরাধের পেছনে রাজনীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায় কিংবা অপরাধীরা রাজনীতিকে অপরাধের জন্য ব্যবহার করে চলছে। সময় এসেছে এ বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখা। অপরাধী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে রোধ করার জন্য দরকার নৈতিক মূল্যবোধগুলো সন্তানদের ভালোভাবে শেখানো এবং নিজেদেরও অনুশীলন করা। অপরাধ ও বিচারপ্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া। নইলে শুধু নৃশংস অপরাধই নয়, সাধারণ ছোটখাটো অপরাধ থেকেও আমরা মুক্ত থাকতে পারব না।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য