পণ্য মাপার দাঁড়িপাল্লায় মানুষের মগজ মেপে দেখার এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নাম তার আউটকাম-বেসড এডুকেশন (ওবিই)। যেকোনো নতুন দাওয়াইয়ের মতোই একে ঘিরেও স্তুতি আর প্রচারের কোনো কমতি নেই। বলা হচ্ছে, এই পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাকে এক ধাক্কায় বৈশ্বিক মানে উন্নীত করবে এবং পাস করার পরপরই শিক্ষার্থীরা করপোরেট দুনিয়ায় নিজেদের স্থান করে নেবে। আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার এই চমৎকার মোড়কটি বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষার বাইরে, বিশেষ করে কলা ও সমাজবিজ্ঞানের মতো মানবিক অনুষদগুলোর জন্য এই মহাযজ্ঞ আসলে কেমন এক গভীর সংকট আর চ্যালেঞ্জ বয়ে আনছে, তা তলিয়ে দেখার সময় এসেছে।
এখানেই আধুনিক শিক্ষার এক অদ্ভুত বাণিজ্যিক বাস্তবতার কথা বলতে হয়। আমরা যখন উত্তর-আধুনিক সমাজতত্ত্বের চোখ দিয়ে এই পরিবর্তনকে দেখি, তখন ফরাসি দার্শনিক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার্দের সেই ল্যাঙ্গুয়েজ গেম বা ভাষার খেলার তত্ত্বটি মনে পড়ে। লিয়োতার্দ সতর্ক করেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বে জ্ঞানের বৈধতা নির্ধারিত হয় তার সত্যতা বা নৈতিকতা দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা বা পারফরমেটিভিটি দিয়ে। অর্থাৎ আপনার অর্জিত জ্ঞান বাজারে ঠিক কতটা বিক্রি করা যাবে, সেটিই হবে তার একমাত্র পরিচয়। ওবিই পদ্ধতি মূলত এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। এটি শিক্ষাকে স্রেফ কতগুলো পরিমাপযোগ্য আউটকাম বা দক্ষতার ছাঁচে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সমাজবিজ্ঞান বা দর্শনের মতো বিষয়গুলো কি শুধু জিপিএ বা নির্দিষ্ট কোনো চাকরির দক্ষতার ছকে বেঁধে ফেলা সম্ভব?
সমাজবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসরুমে কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’ পড়ে কিংবা কোনো নৃবিজ্ঞানী মাঠ পর্যায়ে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের গল্প শোনে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের বিমূর্ত চিন্তার জন্ম হয়। সে সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখে, কাঠামোগত বৈষম্যগুলো ধরতে পারে এবং একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ওবিইর নতুন নিয়মে এই গভীর মানবিক রূপান্তরকে মাপা হবে কতগুলো কাঠখোট্টা পয়েন্ট বা অবজেক্টিভের মাধ্যমে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে—শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু ভাবার বা পড়ার চেয়ে শুধু অ্যাসাইনমেন্টের ছক পূরণ করে দ্রুত গ্রেড পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে। সৃজনশীলতার এই অমানবিক অবদমন মানবিক অনুষদগুলোর মৌলিক চরিত্রকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এখানেই কার্ল মার্ক্সের সেই পণ্যপূজা বা কমোডিটি ফেটিশিজমের তত্ত্বটি এক নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককে পণ্যের সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। ওবিইর এই জামানায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও যেন এক নতুন পণ্যপূজার শিকার। এখানে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যকার সেই চিরাচরিত গভীর আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মিথস্ক্রিয়া আড়ালে চলে যাচ্ছে, আর বড় হয়ে উঠছে স্রেফ একটি ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নামের চূড়ান্ত পণ্য। শিক্ষক এখানে আর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বা পথপ্রদর্শক নন, তিনি হয়ে উঠছেন একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর বা করপোরেট ম্যানেজার, যাঁর দিন কাটবে ওবিইর জটিল ফরম পূরণ আর রিপোর্টিংয়ের পেছনে। আর শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে সেই কারখানার কাঁচামাল, যাদের ঘষেমেজে করপোরেট দুনিয়ার জন্য সস্তা শ্রমিক হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।
হয়তো না বুঝেই এক ধরনের পদ্ধতিগত উপনিবেশায়নের ফাঁদে পা দিচ্ছি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধে যেভাবে গবেষণার আড়ালে পশ্চিমা নব্য উপনিবেশবাদী শোষণের
রূপটি দেখিয়েছিলেন, এই ওবিই পদ্ধতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ওবিই মডেলটি মূলত পশ্চিমা করপোরেট এবং টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং গ্রামীণ বাস্তবতা পশ্চিমা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় যেমন বিউপনিবেশায়ন দরকার, তেমনি ওবিইর ব্যবচ্ছেদ বা স্থানীয়করণ দরকার ছিল। আমাদের সমাজবিজ্ঞানের কাজ ছিল এ দেশের মাটির মানুষের ভাষা ও অধিকারের কথা বলা, কিন্তু ওবিই যখন শুধু গ্লোবাল মার্কেট ডিমান্ডের কথা বলে, তখন আমাদের নিজস্ব লৌকিক জ্ঞান বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের লড়াইয়ের মতো বিষয়গুলো কারিকুলাম থেকে চিরতরে ব্রাত্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের চাকরির বাজার এখনো এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য আর অঘোষিত গ্লাস সিলিং বা কাচের ছাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এখানে শুধু দক্ষতা থাকলেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় না; অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, লিঙ্গীয় পক্ষপাত এবং সামাজিক পরিচয় বড় ভূমিকা পালন করে। ওবিই পদ্ধতি দাবি করে যে এটি শিক্ষার্থীদের শতভাগ কর্মমুখী করবে, কিন্তু এটি আসলে আমাদের করপোরেট বাজারের গভীর বৈষম্যগুলোকে আড়াল করে এক ধরনের মেকি মেরিটক্রেসির (মেধাতন্ত্র) ধারণা তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা যখন ওবিইর সব ছক পূরণ করেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাবে না, তখন তাদের মধ্যে তীব্র একাকিত্ব এবং হতাশার জন্ম নেবে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখাইমের ভাষায়, এ ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন ও সামাজিক নিয়মহীনতা সমাজে অ্যানোমিক বা অরাজকতাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার লক্ষণ আমরা এরই মধ্যে এ দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।
এখানেই শেষ নয়, ওবিই পদ্ধতির এই অতি যান্ত্রিকতা আমাদের পরিবেশগত ও মানবিক সংকটের সংবেদনশীলতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ উপকূল ছেড়ে শহরে এসে উদ্বাস্তুজীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এক গভীর রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বোঝাপড়া। কিন্তু ওবিইর সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট দক্ষতার সিলেবাস মানুষকে শুধু তার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখায়, চারপাশের বড় বড় সামাজিক সংকটের প্রতি তাকে উদাসীন করে তোলে। মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীরা যদি শুধু করপোরেট রিপোর্টিং শেখে আর সামাজিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়, তবে এই বিশাল মানবিক দুর্যোগগুলো মোকাবেলা করবে কে?
কেন এটি নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবা দরকার? কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক কারখানা নয় যে দিনশেষে সেখানে শুধু কতগুলো দক্ষ রোবট তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তি আর বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই চেষ্টার মূল্য যদি হয় মানুষের মুক্তচিন্তা ও মানবিক বোধের বলিদান, তবে সেই উন্নয়ন হবে অন্তঃসারশূন্য। কলা ও সমাজবিজ্ঞানের কাজই হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখানো, বাজারের দাস বানানো নয়।
ওবিইর এই মহাযজ্ঞকে যদি আমরা কলা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে প্রয়োগ করতে থাকি, তবে আমরা হয়তো ভালো কেরানি বা ম্যানেজার পাব, কিন্তু কোনো সংবেদনশীল দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী বা চিন্তাশীল লেখক কিংবা ক্রিটিক্যাল বুদ্ধিজীবী না পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই সময় এসেছে এই যান্ত্রিক ছকগুলোকে ভেঙে সামাজিক-মানবিক অনুষদগুলোর জন্য একটি নিজস্ব, নমনীয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতিবান্ধব মূল্যায়নের মডেল তৈরি করার। জ্ঞানের জগৎ যেন শুধু বাজারের পণ্য না হয়ে ওঠে, বরং তা যেন মানুষের মনের জানালা খুলে দেওয়ার অবারিত আকাশ হিসেবেই টিকে থাকে। কাচের ছাদ ভাঙার লড়াইটা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার ওপর চেপে বসা এই যান্ত্রিকতার শিকল ভাঙাটাও আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।
লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




বিশ্বকাপ ফুটবল তো শুধু একটি বৃহৎ প্রতিযোগিতা নয়, এটি একটি আবেগ। একটি স্বপ্ন। মানবতার সপক্ষে ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন। এই ফুটবলের মধ্যে মানবজাতির কল্যাণ ও অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য লুকিয়ে আছে শক্তিশালী অস্ত্র। কথা হলো কূট আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিপক্ষে লড়ার শক্তি ফিফার খুব কম। এই অবস্থায় মানবতার অপমানকে ফিফা রুখতে পারবে না। এটিই বাস্তবতা। ইরানের প্রতি স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দনীয় আচরণের পরও ইরান ফুটবলে অংশ নিয়েছে। ইরানের অংশগ্রহণ পুরো দুনিয়াকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। ইরান যেভাবে বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থন পেয়েছে, এটি খেলায় জেতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু! এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
