kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ক্রীড়াঙ্গনে বৈষম্য ও রাজনৈতিক চেতনার প্রভাব

ইকরামউজ্জমান

১৭ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রীড়াঙ্গনে বৈষম্য ও রাজনৈতিক চেতনার প্রভাব

বাঙালিদের জন্য পাকিস্তানের ঠিকানা ছিল ভুল! আর এই ভুল ১৯৪৭-এর পরপরই ক্রীড়াঙ্গনেও বাঙালি টের পেয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির মোহ ভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। পাঞ্জাবিরা প্রথম থেকেই ক্রীড়াঙ্গনের বড় পদগুলোর মালিক বনে গেছে। তারা শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, বেলুচিস্তান ও সিন্ধুর ক্রীড়াঙ্গনকেও অবজ্ঞা করেছে। পাঞ্জাবিরা নিজেদের উত্কৃষ্টতর মনে করত। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দখলনীতি অবশ্য প্রথম শুরু করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনে। বাঙালি খেলোয়াড়, ক্রীড়াবিদ ও সংগঠকরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। অংশগ্রহণ, সাধারণ বস্তুগত সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ক্রীড়াক্ষেত্রে বরাদ্দ এবং ক্রীড়া পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে বাঙালিদের বঞ্চিত করা হয়েছে।

ক্রীড়াঙ্গনে অবিচার ও অবহেলাকে কখনো আমল দেয়নি পাকিস্তানের কায়েমি শাসকগোষ্ঠী। এতে বাঙালিরা পদে পদে অবহেলিত হয়েছে। সামর্থ্য ও সম্ভাবনার অপমৃত্যু হয়েছে। প্রথম থেকেই সংগঠকদের মধ্যে বিভাজন ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের (ইপিএসএফ) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এদিকে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনে ক্রমেই বেড়েছে। ধীরে ধীরে বৈষম্যের বিরুদ্ধে জন্ম হয়েছে প্রতিবাদ ও আন্দোলনের। রাজনৈতিক চেতনার।

একটি সময় থেকে ক্রীড়াঙ্গনে বেড়েছে রাজনৈতিক সচেতনতা। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অনুষ্ঠিত যেকোনো খেলার চত্বরে লক্ষ করা গেছে উত্তেজনা, অভিমান, ক্ষোভ আর প্রতিবাদ। ষাটের দশকের শুরু থেকেই ক্রীড়াঙ্গনে অবিচার, বঞ্চনা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের শুরু। এই আন্দোলন শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সংগঠকদের মধ্যেও ছিল রেষারেষি। এই আন্দোলন একপর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ১৯ মার্চ তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রস্তাবিত ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। মানুষের বাঁচার দাবি। স্বায়ত্তশাসনের দাবি। বৈষম্য আর শোষণের অবসানের আন্দোলন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ক্রীড়াঙ্গনে যে বৈষম্য, অবহেলা, বঞ্চনার চেতনা নিহিত ছিল ছয় দফার আন্দোলনে।

প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা ‘আমার বেলা যে যায়’ (পৃষ্ঠা ১৪০) বইয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে নানা পর্বের স্বাধিকার আন্দোলনের উল্লেখ করা হয়েছে বারবার। এই স্বাধিকার আন্দোলনের শুরু বাহান্নর ভাষার জন্য সংগ্রাম, বাষট্টির ছাত্র আন্দোলন, তারপর উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। এসবই হচ্ছে উত্তপ্ত রাজনৈতিক আন্দোলন। এর বাইরেও আরেকটি চেতনার কথা শুধু তত্ত্বভিত্তিক বলে অভিহিত করা হয়। অথচ রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এর অসামান্য অবদান রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার ভিত্তিও হচ্ছে এই চেতনা, তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। প্রধানত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা বলা হয় যদিও পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণের মধ্যে ফারাক ছিল সর্বক্ষেত্রে। এমন একটি ক্ষেত্র খেলাধুলার জগত্।’

বাইরের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ছয় দফা নিয়ে সারা দেশ উত্তাল, অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার, তখন খেলার জগতেও বৈষম্য নিয়ে আন্দোলন চলছিল। এই আন্দোলনের খবর বাইরে কেন, খেলাধুলার অঙ্গনেরও অনেকেই জানতেন না। এর নাম ছিল ক্রীড়াক্ষেত্রে বৈষম্য অবসানের আন্দোলন।

৮ জুন ১৯৬৬। শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা জেলে বন্দি। আত্মবিশ্বাসী ও প্রচণ্ড মানসিক শক্তির অধিকারী জাতীয়তাবাদী এই নেতা লিখেছেন, ‘ছয় দফা পূর্ব বাংলার জনগণের প্রাণের দাবি—পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ও সাম্যবাদীদের দালাল পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক শ্রেণি যে আর পূর্ব বাংলার নির্যাতিত গরীব জনসাধারণকে শোষণ বেশি দিন করতে পারবে না সে কথা আমি এবার জেলে এসেই বুঝতে পেরেছি।’—‘কারাগারের রোজনামচা’, পৃষ্ঠা ৭৩।

ছয় দফা দাবি পেশ এবং তা বাস্তবায়নের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হওয়ায় শাসকগোষ্ঠী প্রমাদ গুনতে শুরু করে। বাঙালি জেগে উঠছে। ছয় দফার মধ্যে আছে বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি। ক্রীড়াঙ্গনেও বাঙালিরা চায় বৈষম্যের অবসান। রাজনৈতিক এই আন্দোলনের প্রভাব বেড়েছে ক্রীড়াঙ্গনে। পাকিস্তানিরা বাধ্য হয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে। পূর্ব পাকিস্তানের বার্ষিক ক্রীড়া অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফুটবল, হকি ও ক্রিকেটের আসরসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। বৃদ্ধি করা হয়েছে যোগ্য খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্ব। জাতীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। বাঙালি সংগঠকদের ক্রীড়াঙ্গনে অন্তর্ভুক্তি বেড়েছে। ১৯৬৭ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আরসিডি ফুটবল (পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক—তিন দেশ নিয়ে) টুর্নামেন্ট। ক্রীড়াঙ্গনে ছয় দফা আন্দোলনকে সামাল দেওয়ার জন্যই পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশন এই টুর্নামেন্টের ‘ভেন্যু’ ঢাকায় দিয়েছিল। ১৯৬৮ সালের ১২ থেকে ১৫ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় প্রতিযোগিতা। পাকিস্তান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এই গেমসের আয়োজন ঢাকায় করেছিল, ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক উত্তপ্ততা যদি কিছুটা হ্রাস করা যায় সেই লক্ষ্য নিয়ে।

 

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা