kalerkantho

বুধবার । ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০। ১২ সফর ১৪৪২

দিল্লির চিঠি

অর্থনীতির সম্পর্ক স্ট্র্যাটেজিক পলিসিতে রূপ নিচ্ছে

জয়ন্ত ঘোষাল

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অর্থনীতির সম্পর্ক স্ট্র্যাটেজিক পলিসিতে রূপ নিচ্ছে

এক প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক সেদিন বললেন, তুমি বাংলাদেশের দিকে কিঞ্চিৎ ঝোল টেনে লিখছ আজকাল। বারবার বলছ, বাংলাদেশকে ভারতের আজ বেশি প্রয়োজন। তাই ভারত বাংলাদেশকে আজকাল বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের পর থেকে কবে ভারত বাংলাদেশকে বন্ধু ভাবেনি? কবে কম গুরুত্ব দিয়েছে? আসলে বাংলাদেশে কেউ কেউ এটা দেখাতে চাইছে যে ভারত যেন চীনের ভয়ে বেশি বেশি বন্ধু সাজতে চাইছে। ওই প্রবীণ বন্ধুটির আরো বক্তব্য—দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিকেও এত গুরুত্ব দেওয়ার কী আছে? কৌশলগত অংশীদারি কূটনীতিতে একটি সহজ-স্বাভাবিক শব্দ। যেকোনো বড় দেশের সঙ্গেই ছোট দেশের এহেন অংশীদারি হয়।

এই দুটি বিষয়কেই আরো স্পষ্টভাবে তাই ব্যাখ্যার প্রয়োজন অনুভব করলাম। এই দুটি বিষয়ে ব্যাখ্যা করার আগে আবার স্মরণ করি, গত ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্করের টেলিফোনে কথা হয়েছে। এই আলাপচারিতায় তাঁরা যৌথ পরামর্শদাতা কমিশন (বা জয়েন্ট কনসালটেটিভ কমিশন) বা জেসিসিয়ের বৈঠকের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছান। করোনা পরিস্থিতির জন্য এই বৈঠকটি হবে ভার্চুয়াল। এ মাসেই বৈঠকটি করার চেষ্টা আছে। জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, করোনার কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই তিনি ঢাকা আসতে চান। বিদেশসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার তাৎপর্যপূর্ণ ঢাকার সফরের পর জয়শঙ্করের সফরের সম্ভাবনা এক নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

এবার আসি সেই প্রবীণ সাংবাদিক উত্থাপিত দুটি বিষয়ে। আমি একমত, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর আজ পর্যন্ত ভারত কখনোই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নেয়নি। এ কথা সত্য, ইন্দিরা-প্রণবের পর যাঁরাই ভারতে ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁরাই বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলেন। গুজরাল ডকট্রিনও বলে আগে প্রতিবেশী। নরেন্দ্র মোদি বিজেপি দলের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলেও তাঁর সময়ে বাংলাদেশ অনেক কিছুই লাভ করেছে। দীর্ঘদিনের বকেয়া স্থলসীমান্ত চুক্তি করাটাও সহজ কাজ ছিল না। ভারতের সংসদে এটি পাস হয় আসাম রাজ্যে বিজেপির বিরোধিতা সত্ত্বেও। আমি জানি, মোদি তো একবার শেখ হাসিনাকে নিজের রাখি বোন বলেছিলেন। এটা ভারতীয় হিন্দুদের একটা রিচুয়াল, যেখানে কোনো নারীকে ভগ্নির সম্মান দেওয়া হয়। তাই বাংলাদেশের আপাকে ভারতের আপা বলে সম্বোধন করেন তিনি। কিন্তু আমি বলব, বিদেশনীতিতে রোমান্টিসিজমের পাশাপাশি কিছু বাস্তবতাও থাকে। অনেক স্তর থাকে বিদেশনীতিতে। একাত্তর সালের যুদ্ধের পরপরই ভুট্টোর সঙ্গে ইন্দিরা ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তি করেন। পাকিস্তানের সঙ্গে এহেন চুক্তিতে বিস্মিত হয় বাংলাদেশের বহু কূটনীতিক। ঢাকার এক কূটনীতিক কিছুদিন আগেও বলেন, এখনো ঢাকার সাবেক কূটনীতিকরা আপনাদের হুড়াহুড়ি করে সিমলা চুক্তির পক্ষে নয়। আমি বলেছিলাম, হয়তো কাশ্মীরে গণভোটের প্রস্তাবকে জাতিসংঘে নিয়ে যাওয়ায় নেহরুর ভুলের খেসারত দিতে, এই বিতর্ক থামাতে এই চুক্তির প্রয়োজন ছিল। সিমলা চুক্তির পর কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকীকরণের বিষয়টির সমাপ্তি হয়। তখন ওই কূটনীতিক বলেন, আসলে বন্ধুত্ব এবং বিরোধ দুই-ই একসঙ্গে চলে কূটনীতিতে। রোহিঙ্গা থেকে নাগরিকত্ব আইন, এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশেও যে শঙ্কা নেই তা তো নয়। তাই বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী করতে গেলেও তার ‘সার্ভিসিং’ করতে হয়। তা না হলে বন্ধুত্বকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ করলে তার পরিণতি জটিল হতে পারে। যেমন—নেপাল এমনকি ভুটান নিয়েও হয়েছে। তাই ভালোবাসা থাকলেও যেমন জন্মদিনের লাল গোলাপের তোড়া দিতে হয়, বন্ধুত্বের শর্ত সেগুলো। ভারত এ ব্যাপারে আজ বেশি সচেতন।

কেন? কেন এই প্রশ্নের জবাবেই আছে কৌশলগত অংশীদারি বিষয়টি। ইংরেজিতে বলা হয় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তো আমরা সবাই জানি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত সুবিস্তৃত। চার হাজার ১৫৬ কিলোমিটার। আজও বহু ক্ষেত্রে কাঁটাতারের সীমান্ত নয়। চীন ও পাকিস্তান বাংলাদেশের জমি কিভাবে ভারতবিরোধী কাজে ব্যবহার করতে চায়, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন যখন কলকাতায় ও ঢাকায় এসেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি আসলে বাংলাদেশের সফরে ইচ্ছুক ছিলেন। কেননা এই ছোট দেশটির জিও-স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অসীম। অথচ এ দেশে আমার আসা হয়নি। মুম্বাই বিস্ফোরণের পর ভারত যখন দাউদ ও পাকিস্তানবিরোধী কূটনীতিকে তীব্র সমালোচনা করে, তখনই ভারতের এক প্রবীণ গোয়েন্দা আমাকে বলেছিলেন, পশ্চিম উপকূলে এ ঘটনার পর ভারতীয় নিরাপত্তাকে আমরা অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়ায় এবার পাকিস্তান বাংলাদেশকে ব্যবহার করে পূর্ব উপকূলবর্তী সীমা দিয়ে ভারতে জঙ্গিদের ঢোকানোর চেষ্টা করবে। ঢাকায় কিন্তু জামায়াতপন্থীদের অবস্থান সম্পর্কে সবাই অবহিত, কিন্তু হাসিনা সরকার সর্বদাই জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।

তবে চীন যে এখন বাংলাদেশে বেশি সক্রিয় হতে চাইছে, সে সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দারা নিশ্চিত। ঢাকায় কিছু সংবাদমাধ্যম এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও চীন প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এ তথ্য নয়াদিল্লি ঢাকাকেও জানিয়েছে। এ জন্য ভারত ঢাকার সঙ্গে এনগেজমেন্ট বাড়াচ্ছে। এতে অস্বাভাবিকতা বা অন্যায় কী আছে! মোদি সরকার তো দেশের স্বার্থেই এই সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে।

জয়শঙ্করের লেখা— ‘The India Way-Strategies for an Uncertain World’  বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটির নামকরণটিও তাৎপর্যপূর্ণ। এ নামেই বলা হয়েছে, আজকের পৃথিবী খুবই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। এত দিন করোনার জন্য জয়শঙ্করের বিদেশযাত্রা কার্যত বন্ধ ছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জয়শঙ্কর আবার এক এক করে বিদেশের রাষ্ট্রগুলোতে সফর শুরু করেছেন। মস্কো সফরের পাশাপাশি চীনের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এরপর তিনি বাংলাদেশেও যাবেন শিগগিরই। এই সদ্য প্রকাশিত বইটি ২১৩ পৃষ্ঠার। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ও বাংলাদেশের কথা এই বইয়ে ১৪ বার উল্লিখিত হয়েছে। খুব দ্ব্যর্থহীনভাবে জয়শঙ্কর বলেছেন, ২০১৪ সালে জাতিসংঘে মেরিটাইম ক্লেইম বা সমুদ্রপথের দাবি নিয়ে আরবিট্রাল অ্যাওয়ার্ড হয়। সেই বিচারের রায়ে বাংলাদেশ ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা লাভ করে। ইউএন ট্রাইব্যুনাল অ্যাওয়ার্ড ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে এই অংশ নিয়ে বিবাদ ছিল দুই দেশের।

ভারত ট্রাইব্যুনালের এই রায় মেনে নেয়। এটা নিয়ে কোনো বিরোধে যায়নি। ২০১৪ সালের ৭ জুলাইয়ের ঘটনা। তখন তো চীনের এই আগ্রাসন ছিল না, বরং চীনের শি-মোদির সঙ্গে সবরমতী নদীর তীরে ঝুলন কূটনীতি করেছিলেন। ২০১৬ সালে দক্ষিণ চীন সমুদ্রনীতির যে রায় ইউএন দেয়, তা কিন্তু একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে যায়। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া চীনকে এই জায়গা ছাড়তে বলে ইউএনের মাধ্যমে। কিন্তু চীন জানিয়ে দেয়, ইউএনের এই অবস্থান অন্যায়। এ রায় তারা মানবে না। জয়শঙ্কর লিখেছেন,  ‘On a matter like maritime claims, India’s acceptance of an arbitral award regarding Bangladesh in 2014 contrasted with what happened to the South China Sea in 2016.’  জয়শঙ্কর নিজেই লিখেছেন,  ‘Look Fast’-কে ‘Act East Policy’ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের greater access I connectivity-র জন্য আমরা সমন্বয় সাধন করে কাজ করছি। শুধু তা-ই নয়, জয়শঙ্কর বলছেন,  ‘Act East Forum’ গঠন করে আমরা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত করতে চলেছি। এ খুব বড় কথা। জয়শঙ্কর নিজেই বলছেন,  ‘this reflects the maturing of economic thinking into larger strategic policy.’

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্লাসে আমার অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয়ে বুঝিয়েছিলেন কূটনীতিতে প্রতিটি শব্দ ভেবেচিন্তে বলা হয়, লেখা হয়। এ ভোটের রাজনীতির ভাষা নয়। আর জয়শঙ্কর তো কূটনীতিক টার্নড পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলছেন, অর্থনীতির সম্পর্ক স্ট্র্যাটেজিক পলিসিতে রূপ নিচ্ছে। এতে এটি সম্পর্কে ভারত টেকেন ফর গ্রান্টেড কৌশল নিচ্ছে না।

 

লেখক : নয়াদিল্লি থেকে কালের কণ্ঠ’র

বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা