kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৪ আগস্ট ২০২০ । ২৩ জিলহজ ১৪৪১

স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং জনগণের সুচিকিৎসা

ড. কুদরাত-ই-খুদা

১৩ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং জনগণের সুচিকিৎসা

একটি রাষ্ট্রের কাছে ওই রাষ্ট্রের জনগণের যত চাহিদা থাকে, স্বাস্থ্যসেবা হচ্ছে তার অন্যতম। স্বাস্থ্য মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ১৮(১)-এ চিকিৎসাসেবা ও জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসা নামক এই মৌলিক চাহিদাটি পূরণ করতে গিয়ে দেশের জনগণকে কম হয়রানির শিকার হতে হয় না, বিশেষ করে জনগণ যদি যায় কোনো সরকারি হাসপাতালে। এ দেশে চিকিৎসাক্ষেত্রে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে এসংক্রান্ত খবরাখবর।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্তে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট একটি অসাধুচক্র যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই ওই অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এ ধরনের দুর্নীতিগুলোকে বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘পুকুরচুরি’ না বলে ‘সাগরচুরি’ বলাই ভালো। ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যালয়ে কিছুসংখ্যক অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। ‘শক্তিশালী’ এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ওষুধ, সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘সিন্ডিকেট’ গঠন করে স্বাস্থ্য খাতে জনসাধারণের জন্য বরাদ্দ সরকারি বাজেটের একটি বড় অংশ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে নিয়মিত বঞ্চিত হচ্ছে। গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করে ওই সংস্থা। তখন স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে সংসদেও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি থেমে নেই। বরং তা পাগলা ঘোড়ার মতো দ্রুত বেগে চলমান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছেন। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা, ঋণ ব্যবহারসহ যেসব বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে এবং দুর্নীতি হচ্ছে, তা দ্রুত ভালোভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক।

তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এই ক্রান্তিলগ্ন দেশের চিকিৎসকদের  জন্য অনেক বেশি সংকটপূর্ণ সময় বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ করোনার এই মহামারির সময়ে তাঁরা সম্মুখযোদ্ধা বা ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করছেন। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরই মধ্যে দেশে অনেক চিকিৎসক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাও গেছেন। আবার অনেক চিকিৎসকই রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ চিকিৎসা নিয়ে এরই মধ্যে সুস্থ হয়েছেন। বলা বাহুল্য, রোগীদের খুব কাছাকাছি গিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হয় চিকিৎসকদের। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। অন্যথায় তাঁরা চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করবেন না। বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার বিরুদ্ধে জিততে হলে অবশ্যই চিকিৎসক আর নার্সদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল স্টাফসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের সবারই সুনজর দেওয়া উচিত। যেসব চিকিৎসক বর্তমান সময়ে খেয়ে-না খেয়ে, না ঘুমিয়ে করোনা মোকাবেলায় আন্তরিকভাবে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন, রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, যাঁরা দিনের পর দিন করোনার বিরুদ্ধে নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলেছেন, চিকিৎসক নামক সেই মহৎ মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সবারই শ্রদ্ধা নিবেদন করা নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের যেকোনো সমস্যা বা চাহিদা অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এরই মধ্যে করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় যেসব চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রত্যক্ষভাবে কাজ করছেন, তাঁদের পুরস্কৃত করার ঘোষণা দিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। চিকিৎসকদের কাছে জনগণের এখন একটি বিশেষ প্রত্যাশা রয়েছে, আর তা হচ্ছে করোনাকালীন এই সংকটময় মুহূর্তে যেন কোনো রোগীকে বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে না হয়। কারণ চিকিৎসকদের কাছ থেকে একটু ভালো সেবা আর যত্ন পেলে করোনা আক্রান্ত অনেক মানূষ সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরতে পারবে। করোনা মোকাবেলায় চিকিৎসক, নার্স আর মেডিক্যাল স্টাফদের আন্তরিক নিরলস লড়াই এবং সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার দায়িত্বশীল কর্তব্য পালন এবং সর্বোপরি জনগণ কর্তৃক সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হলে করোনার বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে আমাদের জয় সুনিশ্চিত।

বর্তমান সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ চিকিৎসকদের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চিকিৎসকদের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগেও অনেকবার নির্দেশ দিয়েছেন, সতর্ক করেছেন। সার্বিক দিক বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে এমন একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চিকিৎসকরা গ্রামীণ এলাকায় থেকে কাজ করতে বাধ্য হন। আর বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রণয়নসহ তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, একটা খারাপ সময়ও অনেক ভালো ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির সুযোগ করে দেয়। করোনাকালের সমাপ্তি শেষে এ দেশ একদিন নিশ্চয়ই আলোকিত হবে। সরকার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের ফলে সেই আলোকিত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে আর কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটবে না এবং চিকিৎসকরাও দায়িত্বে অবহেলা না করে জনগণের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আন্তরিক হবেন—এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা