kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৬ জুলাই ২০২০। ২৪ জিলকদ ১৪৪১

করোনাভাইরাস ও জলবায়ু : একটি বৈশ্বিক সতর্কবার্তা

অনলাইন থেকে

১৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লকডাউন বা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসাই এখন করোনাভাইরাস থেকে নিষ্কৃতি লাভের ক্ষেত্রে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যসহ সারা বিশ্বের মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য অস্থিরভাবে অপেক্ষমাণ। তবে এর আগে একটি বিষয় নিশ্চিত হতে হবে, স্বাভাবিক জীবনে ফেরা নিরাপদ হবে তো?

কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরা যায়, তা নিয়ে মেতে থাকলেই চলবে না। করোনাভাইরাসের কারণে অর্থনীতি ও রাজনীতি কতটা জটিল ও নাজুক অবস্থায় পড়েছে তার দিকেও নজর দিতে হবে। এ বিষয় দুটি নিয়ে বিশ্বনেতারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। মানবতার কল্যাণের পাশাপাশি যে বিষয় দুটি নিয়ে এখন তাঁরা সবচেয়ে বেশি ভাবছেন, তা সম্ভবত জীবমণ্ডল ও এর ভবিষ্যত্।

জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর করোনাভাইরাস ঠিক কতটা এবং কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিবেগ আকস্মিকভাবে প্রায় রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে; যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে কার্বন নির্গমে। এর মাত্রা অকল্পনীয় পর্যায়ে কমে এসেছে। ফেব্রুয়ারি-মার্চে চীনে কার্বন নির্গমের হার ছিল ১৮ শতাংশ। আর ইউরোপে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ৪০ থেকে ৬০ শংতাশের মধ্যে। যে আচরণ আর অভ্যাসগুলোকে একসময় অসম্ভব বলে মনে হতো, এখন তা-ই স্বাভাবিকতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সড়কগুলোতে ট্রাফিক কমেছে ৭০ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল প্রায় বন্ধ। বন ও বন্য প্রাণীর সঙ্গে মানুষের যে অন্যায়-অত্যাচার—নজর কেড়েছে সে প্রসঙ্গটি। অনেক বিশেষজ্ঞই যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির যতটা ক্ষতি মানুষ করেছে এবং বিভিন্ন প্রজাতিকে অন্যায়ভাবে ব্যবহারে তাদের যে নজির—সেগুলোই আজ এত বড় মহামারির প্রধান কারণ।

মানুষের দিক থেকে দেখতে গেলে এই ভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, তা গভীর মন্দার দিকে নিয়ে যাবে। অন্তত বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস তা-ই বলছে। অর্থাত্ আমাদের জন্য চরম বিপর্যয়কর সময় অপেক্ষা করছে। আজ পর্যন্ত কেউ, এমনকি কোনো নির্বাচিত সরকারও কার্বনের নির্গম এভাবে সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তবে মানুষ যদি তাদের জীবন-জীবিকার পথ আরো অবরুদ্ধ করতে না চায়, করোনাভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী সংকট তৈরি করতে না চায়, তাহলে তাদের এক্ষুনি, জরুরি ভিত্তিতে উত্তরণের ব্যবস্থা হাতে নিতে হবে। সবুজে ভরিয়ে তুলতে হবে এই পৃথিবী। পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে প্রণোদনা দিতে হবে। কার্বনের ব্যবহার শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে অথবা অবকাঠামো ও যানবাহনে কার্বনের ব্যবহার একেবারে কমিয়ে ফেলতে হবে।

উন্নয়নমূলক কর্মসূচির বিপরীতে আশু এবং জরুরি ভিত্তিতে এই পদক্ষেপগুলো নিতে হবে। এরই মধ্যে সরকারগুলো তেল ও গ্যাস কম্পানিগুলোতে বেইল আউট দেওয়ার জন্য চাপের মধ্যে পড়েছে (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এরই মধ্যে এই পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে)। তেলের দাম পড়ছে। সৌদি আরব ও রাশিয়া তেলের দাম নিয়ে যে লড়াইয়ে নেমেছে তা এই জীবাশ্ম জ্বালানিকে আরো সস্তা ও সহজলভ্য করে তুলেছে। সস্তা হওয়ার কারণেই বাড়ছে চাহিদা। এ প্রবণতাকেই রোধ করতে হবে। যাঁরা বিপদ আঁচ করতে পারছেন, যাঁরা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের বিরুদ্ধে তাঁদের এই পরিস্থিতিতে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।   

তেলের ভবিষ্যত্ ছাড়াও এই পরিস্থিতি আরো বহু কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে চলেছে নীরবে। বরিস জনসনের রক্ষণশীল সরকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। একসময় যে পদক্ষেপগুলোকে সমাজবাদী বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তা এখন খুবই স্বাভাবিক এবং সম্ভব। কভিড-১৯ মানুষকে যে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে, তা সম্ভবত সভ্যতার সামনে থাকা অন্য সংকটগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে মানুষকে কিছুটা উদ্যোগী করে তুলছে। জলবায়ু নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তা-ও এর মধ্যে অন্যতম। 

যদিও কোনো কিছুই এখনো নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। তা ছাড়া কোনো অর্জনই সহজ হবে না। বিশেষ করে, যাঁরা আবার স্বাভাবিক ব্যবসা (এবং কার্বন নির্গম) শুরু করার জন্য মুখিয়ে আছেন, তাঁদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতেই হবে। জাতিসংঘের সর্বশেষ জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে করোনাভাইরাসের জন্য। চাপ অব্যাহত রাখার জন্য সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এই পৃথিবী ছাড়া আমাদের আর কোনো আবাসভূমি নেই। এর থেকে বের হয়ে যাওয়ার কোনো পথও আমাদের সামনে খোলা নেই।

সূত্র : সম্পাদকীয়, গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা