kalerkantho

রবিবার। ৩ মাঘ ১৪২৭। ১৭ জানুয়ারি ২০২১। ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

প্রশাসন হবে জনবান্ধব এবং মানবিক

নাছিমা বেগম

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রশাসন হবে জনবান্ধব এবং মানবিক

একবিংশ শতকের একজন নারী কর্মকর্তা, যিনি একজন জেলা প্রশাসক, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের প্রাক্কালে তিনি একি করলেন! চাকরিজীবনের সূচনায় তিনি কী রীতিনীতি শিখেছিলেন? আর এত দিন তিনি কী শেখালেন তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মীদের? এই প্রশ্ন এখন অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই উঠছে। প্রশাসনের এই দু-চারজন কর্মকর্তার নিজের নাম জাহির করার বাজে নজির সমাজের জন্য কী বার্তা দেয়? জেলা প্রশাসকরা জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবেন, উদ্যোগ নেবেন, এটাই স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু এই উন্নয়নের সঙ্গে নিজের নাম জুড়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা কেন? এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসাটাই এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছি।

যথাযথভাবে কার্যসম্পাদনে ব্যর্থ হলে, অনৈতিকভাবে কোনো কাজ সম্পাদিত হলে, এর দায়ভার সেই কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে বৈকি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা প্রকাশিত হওয়ার সুবাদে সেই প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে এ রকম অনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের এখতিয়ার তিনি কোথায় পেলেন? গণমাধ্যমে প্রকাশ, হাত-পা-চোখ বেঁধে, বিবস্ত্র করে রিগ্যানকে পিটিয়েছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কনিষ্ঠদের ওপর দায় চাপিয়ে নিজের দায় এড়ানো যায় কি? যায় না। তিনি লজ্জিত এবং শঙ্কিত হয়েছেন কি না, জানি না। একজন নারী হিসেবে আমার লজ্জা এবং শঙ্কা দুই-ই হচ্ছে। কারণ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মাঠপ্রশাসন থেকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। কর্মরত সময়ের বিশ্লেষণে লক্ষ করেছি, সাধারণত নারী কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেন না। অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে থাকেন। আর দু-চারজন যাঁরা দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকেন, তাঁদের কোনো মাত্রা থাকে না। তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত পুরুষ কর্মকর্তাদেরও ছাড়িয়ে যান।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকের সহযোগী কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের যেসব সচিত্র প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে শঙ্কিত হওয়ারই কথা। চাকরিজীবনের দীর্ঘ ১৯ বছর মাঠপ্রশাসনে কাজ করেছি। কর্মস্থলে কর্মকর্তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলন, ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ শুনেছি। প্রমাণও পেয়েছি। কিন্তু নিজেদের অপকর্ম ঢেকে রাখার নিমিত্তে রাতের আঁধারে বাড়ির দরজা ভেঙে কাউকে তুলে এনে বিবস্ত্র করে নিপীড়ন করার কথা শুনিনি। বঙ্গবন্ধুর বহু বক্তৃতায় ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ হয়েছে। তিনি সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা প্রত্যেককেই হুঁশিয়ার করে ঘুণে ধরা সমাজকে  আঘাত করে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর সুযোগ্য কন্যা ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শূন্য-সহিষ্ণুতা নীতি গ্রহণ করে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু এক শ্রেণির কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তি নির্বিকার। তাঁরা কোনো কিছুর পরোয়া না করে অনৈতিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

বর্তমানে জনসেবায় ইতিবাচক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জনপ্রশাসন পদক নীতিমালা ২০১৫-এর আলোকে জনপ্রশাসন পদক প্রদান করা হচ্ছে। পদকপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় প্রশাসন যেখানে নানামুখী জনবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সেখানে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনে একি ত্রাসের রাজত্ব! এ রকম অপ্রত্যাশিত ঘটনা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। 

সম্প্রতি আরো এক নতুন খবর যোগ হলো। বাবার সমান বয়সী দুই ব্যক্তিকে কান ধরে উঠবোস করিয়ে গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)। তিনিও একজন নারী। তিনি নিজেই আবার ওই ঘটনার ছবি তুলেছেন। জাতীয় মানবিক বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে তিনি কী দেখাতে চাইলেন বোধগম্য নয়। মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কাজ করে কোনো ব্যক্তিকে তামাশার পাত্র করার অধিকার তো রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাউকে দেওয়া হয়নি। তাঁদের বিচার-বুদ্ধি সব কি লোপ পেল? এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছি।

আমাদের শিক্ষানবিশকালে বলা হয়েছে, অপরাধীকে সাজা দেওয়া হয় শুধু তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং অন্যরা যাতে সেই একই অপরাধ করতে সাহস না পায়; মূলত সে জন্যই সাজা দেওয়া। আমি মনে করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে কুড়িগ্রামের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে কেউ সাহসী না হয়।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যায়, মাঠপ্রশাসনের চাকরিজীবনের শুরু কুমিল্লা কালেক্টরেটে। তখনকার জেলা প্রশাসক ছিলেন সৈয়দ আমিনুর রহমান। তিনি জেলার উন্নয়নের জন্য, জেলার পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ভালো ভালো কাজ করেছেন। নতুন নতুন উদ্ভাবন করেছেন, যেমন—পয়োনিষ্কাশনের জন্য ড্রেনেজ সিস্টেম চালু করেন এবং যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর সংস্কৃতি থেকে কুমিল্লাকে বের করে এনেছিলেন। সে সময় অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালের পাশাপাশি মানুষের বাসাবাড়ির দেয়ালে নানা রকম পোস্টার লাগিয়ে দেয়ালের সৌন্দর্য নষ্ট করত। শহরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পোস্টার লাগানোর দেয়াল নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কুমিল্লার জনগণকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন যাতে তারা তাদের প্রয়োজনে পোস্টার লাগানোর জন্য সেসব দেয়াল ব্যবহার করে। কুমিল্লার জনগণ তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই দেয়াল ছাড়া অন্য কোথাও পোস্টার লাগাত না। সাধারণ মানুষের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের জাগরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে তিনি রাস্তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বাণী, বিভিন্ন মনীষীর বাণী বিলবোর্ড আকারে স্থাপন করেছিলেন। এসব কীর্তির কোথাও তাঁর নাম ছিল না। লেখা ছিল জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা আর সেই সময়ের তারিখ। তিনি কোথাও নিজের নামফলক স্থাপন করেননি।

মনে পড়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান স্যার, শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রায়ই প্রশিক্ষণ দিতেন। বিভিন্ন উপদেশ, নির্দেশ দিতেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তিনি আমাদের কিভাবে পত্র প্রাপ্তি এবং পত্র জারি রেজিস্টার দুটির পরিচিতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এ দুটি রেজিস্টার অফিসের আয়না। আরো বলেছিলেন, এ দুটি যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে অফিস ব্যবস্থাপনা ভালো না হয়ে যেতেই পারে না। তিনি আমাদের বলেছিলেন, তোমাদের কাছে অনেক সাধারণ মানুষ তাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসবে, বিভিন্ন কাজের জন্য আসবে, সমস্যা নিয়ে আসবে। তাদের কথা শুনলেই বুঝতে পারবে কোন বিষয়টি তোমার দ্বারা সমাধান করা সম্ভব। কোনটি সম্ভব নয়। যার কাজটি করা সম্ভব, তাকে বেশি সময় না দিলেও কোনো অসুবিধা নেই। তার সঙ্গে তেমন ভালো ব্যবহার না করলেও চলবে। সে তোমার কক্ষ থেকে বের হয়ে বলবে, মানুষ ভালো, কাজ করে দেয়। আর যার কাজটা করা সম্ভব নয়, তার সঙ্গে যথেষ্ট রকমের ভালো ব্যবহার করতে হবে। বুঝিয়ে বলতে হবে যে কেন কাজটি করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে তাকে এক কাপ চা খাইয়ে বিদায় দেবে, যাতে বের হয়ে সে বলে যে কাজ না হলে কী হয়েছে, মানুষ ভালো। কাজটি আসলে করা সম্ভব ছিল না বলেই তিনি করেননি।

তবে এটি স্বীকার করতেই হবে সে সময়ের জেলা প্রশাসনে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, দু-একজন ব্যতিরেকে প্রত্যেকেই অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। আমাদের যেভাবে হাতে-কলমে শিখিয়েছেন, সেটি ভোলার নয়। পুরো কর্মজীবনে সেই শিক্ষাকেই কাজে লাগিয়ে তা অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। এর সুফল হিসেবেই কর্মজীবনের শেষ ধাপ পার করতে পেরেছি বলে মনে করি। এখনো অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হলে যখন বলে থাকেন, ‘স্যার, আপনি আমাদের আইকন।’ তখন ভালো লাগার পাশাপাশি সেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

আমি মনে করি, একজন কর্মকর্তার ভবিষ্যৎ জীবনের কর্মদক্ষতা বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো কর্মে প্রবেশের পর প্রথম তিনি কী শিখেছিলেন? কে শিখিয়েছিলেন? গোড়াপত্তনটি কেমন হয়েছিল? সঙ্গে পারিবারিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধ তো আছেই। প্রশাসন হবে জনবান্ধব, মানবিক। শিক্ষানবিশকাল থেকে পরবর্তী জীবনের সব প্রশিক্ষণে সেই শিক্ষাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন

 

 

 

মন্তব্য