kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

টাকা দিয়ে গণতন্ত্র কেনা যায় না

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

২৫ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



টাকা দিয়ে গণতন্ত্র কেনা যায় না

দীর্ঘদিন পর এই প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির নেতা অমিত শাহ ও বঙ্গেশ্বরী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভার নির্বাচনে জোর ধাক্কা খেলেন। বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী বিখ্যাত আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য রাজ্যসভায় নির্বাচিত হলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা থেকে রাজ্যসভায় পাঁচজন সদস্যের নির্বাচিত হওয়ার কথা। সংখ্যার জোরে তৃণমূল চারজন এবং বাম-কংগ্রেস এক প্রার্থীকে পাঠাতে পারল। পঞ্চম আসনের জন্য একদা তৃণমূলের বিধায়ক ধনপতি দীনেশ বাজাজকে দাঁড় করানোর উদ্দেশ্য ছিল, বাম ও কংগ্রেস থেকে ভাগিয়ে এনে বাজাজকে জেতাবেন। সপ্তাহ ধরে নানাভাবে প্রচুর টাকার লোভ দেন। কিন্তু বাম-কংগ্রেসের প্রার্থীদের কেনা যায়নি। হেরে যাওয়ার পর দীনেশ বাজাজ বিধানসভার লবিতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেন, নিয়ম অনুযায়ী ১২ জন তৃণমূল বিধায়ক তাঁর নাম প্রস্তাব করেন। এ জন্য ১২ কোটি এবং দিদির ভাইয়ের ছেলেকে তিন কোটি—মোট ১৫ কোটি টাকা জলে গেল। হায়, সবই দিদির ইচ্ছা! ফলাফল দেখে রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি সোমেন মিত্র ও সিপিএমের রাজ্য সেক্রেটারি সূর্য মিশ্র বলেন, এবার বঙ্গেশ্বরী বুঝবেন, টাকা দিয়ে বারবার গণতন্ত্র কেনা যায় না। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, হিন্দিবলয়ের মধ্য প্রদেশ রাজ্য কংগ্রেস সরকার কেনার জন্য অমিত শাহ ভূপাল থেকে কংগ্রেসের ২২ জন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যকে কর্ণাটকে আটক করেন।

দিল্লিতে মোদি সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে মমতা সরকার—দুই সরকারেরই অভিন্ন লক্ষ্য হলো—যেমন করে হোক, বিরোধী বিধায়ক বা সংসদ সদস্য, এমনকি পৌর প্রতিনিধিদেরও ভাগিয়ে নিয়ে এসে সরকার ভেঙে দেওয়া। এর জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতেও তারা অকুণ্ঠ। ভারতের সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফের একবার সেই একই খেলায় নেমেছে বিজেপি ও তৃণমূল।

দীনেশ বাজাজ প্রতিপত্তিশালী ব্যবসায়ী। সেই কারণে তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরের ধারণা, ভোট ম্যানেজ করার জন্য যা যা করা দরকার, তিনি সেই রাস্তা বেছে নেবেন। তবে বাম কংগ্রেস শিবিরের তরফে এদিনও স্পষ্ট জানানো হয়, ক্রস ভোটিং রোখার জন্য তাঁরা একাট্টা। কোনোভাবেই যাতে এই আসন তৃণমূলের খপ্পরে না যায়, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সারদা-নারদা কেলেঙ্কারির মুখোশ ফাঁস করা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য যেন কোনোভাবেই না জেতেন সেটা সুনিশ্চিত করতে রাজ্যসভা ভোটে ভণ্ডামির মুখোশ এঁটে দলকে বিজেপির পায়ে ধরার রাস্তায় নিয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির সঙ্গে বোঝাপড়া করেই তিনি রাজ্যসভার পঞ্চম আসনে একজন প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিলেন। মনোনয়ন জমা শেষ হতে যখন কয়েক সেকেন্ড বাকি তখন দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিলেন তৃণমূলের সাবেক বিধায়ক দীনেশ বাজাজ। সেই সঙ্গে নাটকীয় হয়ে উঠল এবারের রাজ্যসভা নির্বাচন। ক্রস ভোটিংয়ের জঘন্য খেলা এবং টাকা ছড়ানোর রাজনীতির সূত্রপাত হলো আপাদমস্তক সৎ, হাওয়াই চটি পরিহিত সততার প্রতিমূর্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে।

এদিকে মধ্য প্রদেশে বিজেপির সরকার ভাঙার খেলা এ যাত্রায় সম্ভবত ব্যর্থই হতে চলেছে। কমলনাথ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে কংগ্রেসের যে বিবাদী বিধায়করা গতকাল বেঙ্গালুরুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের সংখ্যা গোড়ায় ছিল ২২। তাঁদের মধ্যে ১২ জন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের ভুল বুঝিয়ে ইস্তফাপত্র লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের কংগ্রেস ছাড়ার কোনো মনোবাসনা নেই।

দিল্লি থেকে রাহুল গান্ধী নিজে গোটা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিবাদী কংগ্রেস বিধায়কদের বলা হয়েছে, কমলনাথের বিরুদ্ধে তাঁদের যদি কোনো ক্ষোভ-বিক্ষোভ থেকে থাকে, তা পূরণের জন্য সব রকম উদ্যোগ নেওয়া হবে। কমলনাথ মন্ত্রিসভার মন্ত্রী পি সি শর্মা জানিয়েছেন, পদত্যাগ করেছেন বলে রটে যাওয়া ছয় মন্ত্রীসহ মোট ১৩ জন বিধায়ক নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। তাঁদের হয়ে যে পদত্যাগপত্র বিজেপি জমা করেছে, সে সব কটিই ভুয়া। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে হয়তো জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া একাই বিজেপিতে থেকে গেলেন। বড়জোর দু-তিনজন বিধায়ক শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে রইলেন।

আইন অনুযায়ী বিধায়ক পদ ছাড়তে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্পিকারের সামনে হাজির হয়েই ইস্তফা দিতে হয়। ওয়াকিফহাল মহলের বক্তব্য, বহু বিধায়কই স্বেচ্ছায় ইস্তফা দেননি। জোর করে তাঁদের দিয়ে ইস্তফাপত্র লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে। স্পিকার বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যেই পদত্যাগী বিধায়কদের ডেকে পাঠানো হবে। নিয়ম অনুযায়ী জানতে চাওয়া হবে—কী কারণে তাঁরা বিধায়কের পদ ছাড়তে চাইছেন।

 

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা