kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

উন্নতি হচ্ছে তবে কেমন এবং কাদের

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



উন্নতি হচ্ছে তবে কেমন এবং কাদের

দেশের একটি ঘটনা আরেকটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষের সহনশীলতা কি বৃদ্ধি পাচ্ছে? হয় তো তাই, তবে আরো বড় সত্য এই যে মানুষ ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, মানুষ অত্যন্ত ব্যস্ত থাকছে নিজেকে নিয়ে। ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। জীবিকার সমস্যা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিযোগিতা রয়েছে, আছে প্রদর্শনবাতিক। অসুবিধা আছে যোগাযোগের। সামাজিক যোগাযোগ যা আছে তা বিকল্প হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানবিক যোগাযোগের; তাতে ছায়া আছে, তাপ নেই। ওদিকে দার্শনিকভাবে এই মতও প্রচার করা হচ্ছে যে ছোট ছোট সমস্যাই তো ভীষণ বড়, সেগুলোর মীমাংসা করা না গেলে বড় বড় সমস্যার মীমাংসা করব কিভাবে? দেখানো হচ্ছে যে ছোট সমস্যাগুলো আসলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ক্রেতা-বিক্রেতা, স্বামী-স্ত্রী, মা-বাবা, ডাক্তার-রোগী, শিক্ষক-ছাত্র, বাসের হেলপার-বাসের মহিলা যাত্রী, ছেলে-মেয়ে, উকিল-মক্কেল; হাজার হাজার দ্বন্দ্ব, এগুলোর দিকে না তাকিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এসব মস্ত মস্ত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালে ব্যবস্থা বদল হবে না। বড় রয়েছে ছোটর ভেতরেই। ছোটকে আগে মোকাবেলা করা চাই। আবার এও তো বলা যাবে, এবং বলা হচ্ছেও যে সমস্যা তো শুধু আমাদের নয়, সারা বিশ্বেরই। বিশ্বের সর্বত্রই রয়েছে বঞ্চনা ও অত্যাচার। হত্যা, আত্মহত্যা। ধর্ষণ কোথায় না ঘটছে? কোথায় নেই দুর্নীতি? ভোগবাদিতা, নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, প্রকৃতির সঙ্গে নির্মম শত্রুতার কোথায় অভাব? ইত্যাদি ইত্যাদি।

ভ্রান্তির এসব বিলাস কিন্তু বাস্তবতাকে বদলাবে না। ঝড়ের মুখে বালিতে মুখ লুকালে বিপদ কাটে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো আমরা দেখছি, বড়াই করে বলিও যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। একাত্তরে আমরা যুদ্ধ করেছি, প্রাণ দিয়েছি। হটিয়ে দিয়েছি হানাদারদের।

কিন্তু কই বেশির ভাগ মানুষের বেশি বেশি দুঃখ তো কাটল না, বাড়লই। ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যা হচ্ছে শাসক বদলেছে, শাসন বদলায়নি। রাষ্ট্র আগের মতোই রয়ে গেছে; বরং পুরনো হওয়ায় এবং বেপরোয়া চালকদের হাতে পড়ে রাষ্ট্রযন্ত্রটি আগের চেয়েও কষ্টচালিত ও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন হলো? রাষ্ট্র তো ভাঙল, আকারে গেল ছোট হয়ে; কিন্তু বদলাল না কেন স্বভাবচরিত্রে? বদলাল না এই জন্য যে রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে পেটি বুর্জোয়াদের হাতে। পাকিস্তানি বুর্জোয়ারা রণে ভঙ্গ দিয়ে লেজ গুটিয়ে সরে পড়েছে; কিন্তু তাদের জায়গায় বসে গেছে বাঙালি পেটি বুর্জোয়ারা, যাদের আজম্ম স্বপ্ন বুর্জোয়া হওয়ার।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বটা পেটি বুর্জোয়াদের হাতেই ছিল, থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। সমাজতন্ত্রীরা যুদ্ধে ছিল ঠিকই; কিন্তু নেতৃত্বে থাকতে পারেনি। রাষ্ট্রক্ষমতা চলে গেছে জাতীয়তাবাদী পেটি বুর্জোয়াদের হাতে। তারা তাদের স্বপ্ন সফল করার জন্য পাকিস্তানিরা যা যা করত, ঠিক তা-ই তা-ই করেছে। সমানে লুটপাট ও জবরদখল করেছে। এবং সে কাজে রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার করার ব্যাপারে কোনো গাফলতি করেনি।

বাঙালি পেটি বুর্জোয়ারা বিত্ত-বেসাতের দিক থেকে বুর্জোয়া হলো বটে, বুর্জোয়াদের দোষগুলো তাদের আচার-আচরণে ঠিকই চলে এলো; কিন্তু যে দু-চারটি গুণের জন্য বুর্জোয়ারা বড়াই করে থাকে সেগুলো তারা অর্জন করতে পারল না। যেমন—রাজনৈতিক সহনশীলতা। বুর্জোয়ারা এক ধরনের রাজনৈতিক সহনশীলতা দেখায়, যার ফলে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হয়, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার হস্তান্তরও ঘটে। জাতীয় সংসদ টিকে থাকে; সেখানে রাষ্ট্রীয় নীতি, আইন-কানুন, বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে তর্কবিতর্ক চলে, সরকারের জন্য জবাবদিহির কিছু দায় থাকে। রাষ্ট্রের তিন অঙ্গকে পৃথক করে রাখার চেষ্টা বুর্জোয়ারা করে, যার দরুন বিচার বিভাগ আপেক্ষিক ধরনের হলেও কিছুটা স্বাধীনতা পায়। আইনের শাসন ও সংবিধানের মর্মবস্তু আক্রান্ত হয়েও টিকে থাকে। আবার সীমিত পরিসরে হলেও নাগরিকদের সুযোগ থাকে মতপ্রকাশের। নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা চলে, সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করা হয়, নতুন নতুন অর্জনও ঘটে।

রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের পেটি বুর্জোয়ারা ওসবের ধার ধারতে পছন্দ করে না। পণ্যের উপাসনা এবং বিত্তের সংগ্রহের বাইরে তারা তেমন একটা তাকায় না। ওদিকে পেটি বুর্জোয়াদের দুটি সাধারণ দুর্বলতাকে তারা ধারণ ও লালন-পালন করে। একটি হলো অস্থিরতা, অন্যটি পরনির্ভরতা। পেটি বুর্জোয়ারা সব ব্যাপারেই অস্থির, বিশেষভাবে অস্থির তারা অর্থোপার্জনের কাজে। অতি দ্রুত বড়লোক হতে চায়। সবুর নেই, তর সয় না, আবার সন্ত্রস্ত থাকে গরিব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। ওদিকে শ্রেণিগতভাবে তারা যেহেতু অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেনি এবং অর্থনৈতিক ভিতটাও যেহেতু তাদের শক্ত নয়, তাই মেরুদণ্ড সোজা করে যে দাঁড়াবে সেটা পারে না। ইংরেজ শাসনামলে এই শ্রেণিটির আদি পত্তন ঘটেছিল এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর দিয়ে, যার উদ্দেশ্য ছিল গোলাম ও দালাল তৈরি করা। সেকালে বাঙালি মুসলমান কিছুটা পিছিয়ে ছিল; কিন্তু তাদেরও আকাঙ্ক্ষা ছিল ওই শ্রেণিতে ঢোকার। সুবিধা হচ্ছিল না অগ্রসর হিন্দুরা পথ আগলে রেখেছিল বলে। পাকিস্তান হওয়ায় বেশ কিছুটা সুবিধা হলো; কিন্তু উন্নতির দরজা যে অবারিত হয়ে গেল তা নয়। কারণ অবাঙালি মুসলমান শাসকরা দরজায় পাহারা বসিয়ে রেখেছিল। বাংলাদেশ হওয়ায় বিত্ত-বেসাতে বুর্জোয়া হওয়ার সুযোগ-সুবিধা এসে গেল একেবারে হাতের মুঠোয়। এরপর আর দ্বিধা কেন?

না, দ্বিধা করেনি। ওপরে উঠে গেছে। সবাই পারেনি, কারণ সিঁড়িটা সংকীর্ণ। যারা পারেনি, তারা পড়ে গেছে নিচে। আহত যে হয়নি তাও নয়। ওপরে উঠনেওয়ালারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা ভাঙতে যাবে কোন দুঃখে? এর যত সুবিধা তার সবটা উপভোগ করাই তাদের মুখ্য সাধনা। একাত্তরের যুদ্ধে এরা মেহনতি মানুষের কাছে গিয়েছে, যে মেহনতিরা পাকিস্তানি হিংস্র হায়েনাদের মুখে গিয়ে পড়েছিল পেটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের লম্ফঝম্পের ও প্রস্তুতিবিহীন লড়াই-লড়াই ভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে। পেটি বুর্জোয়াদের জন্য তবু দেশের বাইরে ও ভেতরে পালানোর কিছুটা সুযোগ ও পরিসর ছিল, মেহনতিরা রয়ে গেছে একেবারে খোলা মাঠে। তারা মার খেয়েছে এবং প্রাণপণে মার ফিরিয়ে দিয়েছে। লড়াইটা যে জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল তা পেটি বুর্জোয়াদের কারণে নয়, মেহনতিদের কারণেই। কিন্তু যে মুহূর্তে যুদ্ধ শেষ হলো, ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রমাণ পাওয়া গেল যে মেহনতিরা হেরে গেছে। টের পেল যে তাদের জন্য পাওয়ার কিছুই নেই; স্বাধীনতার সব সুযোগ-সুবিধা স্বাদ-আহ্লাদ পেটি বুর্জোয়ারা দখল করে নিয়েছে। ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্তদের মধ্যে বিরোধ তত্ক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেল। এবং মীমাংসা করতে না পারার দরুন দেখা দিল হিংস্রতা। কিন্তু ক্ষমতা এরাই, ওই পেটি বুর্জোয়ারাই ভোগ করেছে, বিভিন্ন নামে ও পোশাকে। জনগণের বঞ্চনা ও জনগণের ওপর অত্যাচার মোটেই কমেনি; বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রমাণ প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে সর্বত্র পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধকালীন ঐক্যটা টেকেনি। ঐক্যটা ছিল একেবারেই সাময়িক একটা ঘটনা; বিপদে পড়ে এক হওয়া। বিপদ কেটে যাওয়া মাত্রই অবস্থাপন্নরা কেটে পড়েছে, মেহনতিরা গিয়ে পড়েছে পুরনোদের খপ্পরে—প্রথমে অভাবের, পরে অত্যাচারের। তারা দেখেছে দেশি লোকেরা কেমন বিদেশিদের মতো আচরণ করছে, করতে পারে।

সমাজ-পরিবর্তনের আন্দোলন যে হয়নি তা নয়। হয়েছে। তাতে পেটি বুর্জোয়ারা যে ছিল না, তাও নয়। ছিল, এবং নেতৃত্ব দিয়েছে তারাই। কিন্তু সে আন্দোলন যে সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারেনি, অর্থাৎ আন্দোলন যে রাষ্ট্র ও সমাজে ধনিক শ্রেণির অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তার কারণ ওই নেতৃত্বই। নেতৃত্ব তার শ্রেণিচরিত্র ত্যাগ করতে সক্ষম হয়নি। পেটি বুর্জোয়াদের যে দুই বদগুণ, অস্থিরতা ও পরনির্ভরতা, তা সমাজপরিবর্তনের আন্দোলনের ভেতরও রয়ে গেছে। তাই দেখা গেছে আন্দোলনকারী কখনো উগ্রপন্থী হয়ে দপ করে জ্বলে উঠছে, আবার কখনো একেবারে মিইয়ে যাচ্ছে। কখনো হঠকারী, কখনো সুবিধাবাদী। হঠকারিতা তবু কাটিয়ে ওঠা যায়, সুবিধাবাদিতা সুযোগ খোঁজে রক্তে ও মস্তিষ্কে প্রবেশের। সমাজপরিবর্তনের লক্ষ্যে আন্দোলনকারীরা স্বাধীনভাবে রণকৌশল গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি; তারা শুরুটা করেছিল মস্কোনির্ভর হয়ে, পরে ভাগ হয়ে কেউ ধরতে চেয়েছে মস্কোর হাত, কেউ হাত বাড়িয়েছে বেইজিংয়ের দিকে। দুর্বল মেরুদণ্ডীরা কিন্তু আবার আত্মম্ভরীও হয়ে থাকে, ভাবে অভিনব কিছু করবে; কিন্তু পারে না। কারণ গভীরতা নেই। সমাজবিপ্লবীরা বুর্জোয়াদের পিছু পিছু হাঁটবে, এটা তো হতেই পারে না, বিপ্লবী আচরণের কোনো সংজ্ঞাতেই কুলায় না। সমাজবিপ্লবীর কাছে প্রত্যাশিত তো বরং এটাই যে বুর্জোয়াদের তারা ছাড়িয়ে যাবে, হারিয়ে দেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্রে; একটি হচ্ছে জ্ঞান, অন্যটি হচ্ছে নৈতিকতা। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের যা কিছু অর্জন, বিপ্লবীরা সেটা আয়ত্তে আনবে, এবং অর্জনকে বিচার করবে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে, সঙ্গে নেবে সেই অংশ, যেটা বিপ্লবের সহায়ক, বর্জন করবে বাকিটা, এবং তারা আরো বেশি ধনী হয়ে উঠবে ইতিহাসের অধ্যয়নে ও বাস্তবতার বিশ্লেষণে। আর নৈতিকতার ক্ষেত্রে তারা হবে বুর্জোয়াদের তুলনায় অনেক উচ্চমানের। তারা নিজেদের স্বার্থ ও নিজেদের শ্রেণির স্বার্থ দুটির কোনোটিই দেখবে না। সবার স্বার্থকে এক করে নেবে। নিজের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়, চাইবে সবার জন্য সাধারণ সুবিধা।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে জ্ঞানের ও নৈতিকতার ওই দুই গুণের নিরিখে আমাদের দেশের সমাজবিপ্লবীদের অবস্থান যে অত্যন্ত উঁচুতে, তা মোটেই নয়। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অর্জন দৃশ্যমানরূপেই বুর্জোয়াদের অর্জনের তুলনায় নিচুতে। তবে এটা অবশ্যই বলা যাবে যে নৈতিকতার ক্ষেত্রে মানটি বেশ উঁচুতে। বুর্জোয়াদের নৈতিক সঙ্কীর্ণতা তাদের নেই। কিন্তু বিপ্লবীদের সবাই যে সুবিধাবাদিতার ঊর্ধ্বে ছিলেন এমন নয়। যৌবনে বিপ্লবের আওয়াজ দিয়েছেন, কিন্তু বয়স বাড়লে জাতীয়তাবাদী ধারায় বিলীন হয়ে গিয়ে সুবিধা হাতড়েছেন, সমাজবিপ্লবী নেতাদের ভেতর এমন দৃষ্টান্ত মোটেই বিরল নয়। পুঁজিবাদ তাদের কোলে টেনে নিয়েছে।

একাত্তরের স্বাধীনতার পরে দেশপ্রেম অবশ্যই জেগে উঠেছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি এলাকার কথাই ধরা যাক। সেখানে রাজাকার ছিল না। তরুণদের কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই দেখা গেল আসল-নকল মিলে যোদ্ধার সংখ্যা অনেক। নকল এবং আধা-নকলরা জবরদখল শুরু করল। অন্যদের কয়েকজন উদ্যোগ নিল পাঠাগার পুনর্গঠনে এবং একটি কলেজ স্থাপনে। এলাকায় কোনো কলেজ ছিল না। পড়াশোনায় তাই অনেক বিঘ্ন ছিল, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। স্বাধীনতার পরে বিদ্যোৎসাহ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রবল হওয়ায় একটি নয়, দুটি কলেজই দাঁড়িয়ে গেল। একটি কলেজের কথা আমরা বিশেষভাবে জানি। সেই কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে ছাত্র ও শিক্ষকদের খেয়াল হলো যে কলেজে একটি শহীদ মিনার চাই। প্রিন্সিপাল নবীন যুবক, ছাত্রজীবনে সদস্য ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের; তাঁর উৎসাহে ছেলে-মেয়েরা উদ্দীপ্ত হলো একটি শহীদ মিনার নির্মাণে। সাবেক মুসলিম লীগের দু-একজন মৃদু আপত্তি তুলেছিলেন। কিন্তু উৎসাহ তাতে বাধা মানেনি; বরং প্রবল হয়েছে। প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল ইট পাওয়া নিয়ে। তিন কিলোমিটার দূরে একটি ইটখোলা ছিল; তার মালিককে রাজি করানো গেল বিনা মূল্যে ইট সরবরাহে। ইট তো পাওয়া গেল; কিন্তু আনা যাবে কিভাবে? রাস্তা বলতে গেলে ছিলই না, যানবাহন পাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু উৎসাহ তো বাধ মানবে না। ঠিক হলো ছেলে-মেয়েরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যাবে, কলেজ থেকে ইটখোলা পর্যন্ত তিন কিলোমিটারজুড়ে তৈরি হবে এক মানববন্ধন। হাতে হাতে ইট উঠে আসবে। উৎসাহ দেখে এলাকার লোকেরাও যোগ দিল সেই স্থির মিছিলে। হাতে হাতে ইট ঠিকই চলে এসেছে। শহীদ মিনার তৈরি হয়েছে।

এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত দু-চারজন ছিলেন। তাঁদের প্রভাবে ছাত্র ইউনিয়নের একটি শাখা আগে থেকেই ছিল। স্বাধীনতার পরে ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যসংখ্যা বেড়েছে; তারা কর্মশালা করেছে; নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলার আয়োজনে এসবে মন দিয়েছে এবং হাত লাগিয়েছে স্থানীয় লোকদের উপকারে। রাস্তাঘাট ঠিক করা, বিপন্ন মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, মজা পুকুর উদ্ধার করা, গাছ লাগানো, ছাত্ররা এসব কাজ করেছে। এমনটা লোকে আগে কখনো দেখেনি, এই প্রথম দেখল। মনে হয়েছিল নতুন দিন এসে গেছে। কিন্তু তার পরে? এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির নামকরা যে ব্যক্তিটি ছিলেন তিনি দেখা গেল যোগ দিয়েছেন বাকশালে, কলেজের প্রিন্সিপাল চলে গেছেন সরকারি চাকরিতে, পরে শোনা গেছে সমাজতন্ত্রে তিনি আস্থা হারাননি ঠিকই; তবে হজ করে এসেছেন, নিজের পয়সায়। ওই দুয়ের ভেতর তিনি কোনো বিরোধ দেখতে পাননি।

ওই এলাকায় এখন অনেক উন্নতি হয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে, শহরের সঙ্গে বাস সার্ভিস রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে যোগ দিয়ে কেউ কেউ খুব ভালো ফল পেয়েছে। বিদেশে গেছে বহু মানুষ। তাদের পাঠানো টাকায় ঘরবাড়ি সুন্দর হয়েছে। কিন্তু সেই উৎসাহ সেই, উদ্দীপনা আর নেই। হাতে হাত ধরে ছেলে-মেয়েরা আর দাঁড়ায় না। সাংস্কৃতিক জীবনের চাঞ্চল্য যা ছিল, এখন প্রায় নিঃশেষ। আগে যেখানে নাটক হতো, এখন হয় না। ঘরে বসে সবাই চ্যানেল দেখে, মোবাইল নিয়ে এপথে ওপথে ঘোরে। মোটরসাইকেল এসেছে। মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুল-কলেজে যায়। শিক্ষার ব্যাপারে মেয়েদের আগ্রহ ছেলেদের চেয়ে বেশি। ছেলেরা বিদেশে যায়, তাদের ভাই ভাতিজা ভাগনেরা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে মোটরসাইকেলে চড়ে কালো চশমা চোখে লাগিয়ে ঘোরাফেরা করে। তাদের একটাই নির্দিষ্ট কাজ—মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা। পিছু-লাগা সইতে না পেরে একটি তেজস্বী মেয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাই করেছে। পঞ্চাশের মন্বন্তরে এলাকার একজন লোক আত্মহত্যা করেছিল; গত বছর একজন নয়, তিনজন আত্মহত্যা করেছে, একই পরিবারের; স্বামী, স্ত্রী ও কন্যা। তারা ঋণের ভার সইতে পারেনি। ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছিল একাধিক এনজিও থেকে। উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ কোথায়?

 

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা